Saturday, 30 May 2020

মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে রামায়ণ পর্যালোচনা : প্রতিবাদে তারাশঙ্কর



মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে রামায়ণ পর্যালোচনা : প্রতিবাদে তারাশঙ্কর
দেবাশিস্ মুখোপাধ্যায়

রামায়ণ মহাকাব্যের রাম, রাবণ এবং সীতা এই তিন চরিত্রই আমাদের কাছে সর্বাধিক আলোচিত এবং সমালোচিত হয়ে থাকে। তার মধ্যে সীতা কিম্বদন্তীমূলক পঞ্চসতীর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আর বহুগুণের অধিকারী হয়েও রাবণ আমাদের কাছে এক আতঙ্কের আধার হিসেবেই পরিচিত। লঙ্কেশ্বর রাবণ যেন ভারতীয় সংস্কৃতির এক বিখ্যাত খল নায়ক। বহু বিবাহিত পুরুষ হয়েও নারী হরণ ও ধর্ষণ যেন তাঁর নিত্য কর্ম হিসেবেই সর্বজন-বিদিত। সেই জন্যই বোধ হয় সীতাকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময়ে রাবণের কথায় মধুকবির কথা—‘কার ঘর আঁধারিলি এবে নিবাইয়া প্রেমদীপ / এই তোর নিত্য কর্ম জানি’। রামায়ণের রাবণ এবং সীতা সম্পর্কে এমন ধারণা মানুষের কল্পনা প্রসূত নয়; মহাকবি বাল্মিকীর চরিত্র-চিত্রণের সূত্র ধরেই আমাদের এমন ধারণা সম্ভব হয়ে উঠেছে। সেই সূত্র থেকেই যুগ যুগ ধরে প্রচলিত হয়ে রয়েছে—ধরিত্রী কন্যা সীতা—সর্বংসহা, সীতা অপহৃতা হয়েও সতী। মহাকবি বাল্মিকী ভারতীয় নারী ঐতিহ্যের আদর্শকেই সীতা চরিত্রে মহিমান্বিত করেছেন। এমন প্রবাদ প্রতীম প্রামাণিক সত্যকে বিকৃত ব্যাখ্যায় কলঙ্কিত করতে চেয়েছিলেন কিছু বস্তুতান্ত্রিক পণ্ডিত। ভারতীয় সংস্কৃতির এক সাধক এবং পরবর্তীকালে জ্ঞানপীঠ পুরষ্কারপ্রাপ্ত মহান কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজরে এসেছিল তেমন এক কলঙ্কিত আলোচনা। তিনি তাঁর তীব্র প্রতিবাদে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেই বিকৃত আলোচনাকে। ‘আমার কথা’ নামক আত্মজীবনীর পাতায় তারাশঙ্কর তাঁর জীবনের তেমন এক চরম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছেন—
মার্কসবাদীদের অনেকগুলি কাগজ তখন ছিল—তার মধ্যে প্রধান একখানি মাসিক পত্রের পৃষ্ঠায় প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল—যাঁর লেখক একজন ইংরেজি সাহিত্যের খ্যাতনামা অধ্যাপক। প্রবন্ধটিতে রামায়ণ কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রে মহাকবি বাল্মীকি এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের তুলনামূক সমালোচনা করেছিলেন। তাতে একস্থানে বলেছিলেন বাল্মীকি আশ্চর্যভাবে মধুসূদন অপেক্ষা অধিকতর মার্কসবাদী।
একটু বাহ্য। তিনি এতে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে অরণ্যকাণ্ডে রাবণ যখন সীতাকে হরণ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন লঙ্কার দিকে, তখন পথে বিহঙ্গরাজ জটায়ুর সঙ্গে যুদ্ধের পরই তিনি বনমধ্যে সীতাকে ধর্ষণ অর্থাৎ দেহগতভাবে তাকে ভোগ করেছিলেন।
মূল বাল্মীকি-রামায়ণের অরণ্যকাণ্ড ৫২ সর্গ থেকে কয়েকটি শ্লোকও তিনি উদ্ধৃত করে তাঁর এই চমকপ্রদ গবেষণাকে অকাট্য ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন।
              
     তারাশঙ্কর রামায়ণের এক একনিষ্ঠ নিবিড় পাঠক ছিলেন। বালক বয়সেই তিনি তাঁর পিতার পুস্তকভাণ্ডার থেকে কৃত্তিবাসী রামায়ণ প্রায় মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। সংস্কৃত রামায়ণ পাঠ করেছিলেন অনেক পরে। তারাশঙ্করের মতে ভারতীয় সাহিত্যের এক মহান সৃষ্টি মহামুনি বাল্মিকী বিরচিত রামায়ণ মহাকাব্য অখণ্ড ভারতের সমাজ-সংস্কৃতি থেকে ধর্ম-দর্শন-আধ্যাত্মিকতা সমস্ত কিছুরই এক অক্ষয় ভাণ্ডার—এবং সর্বকালের সর্বমানবের এক অবিস্মরণীয় গ্রন্থ। এই গ্রন্থের কোনোরূপ বিকৃত ব্যাখ্যা ভারতীয় ঐতিহ্যের অপমান বলেই মনে করতেন তিনি। এই মানসিকতা থেকেই ইংরেজি সাহিত্যের ওই অধ্যাপকের ওই প্রবন্ধ পাঠে শিউরে উঠেছিলেন এবং তাঁকে এই বিষয়ে এক দীর্ঘ চিঠিও লিখেছিলেন তারাশঙ্কর। অধ্যাপক প্রাবন্ধিক সহস্র বৎসর পরে অভিনব সত্যকে আবিষ্কার করার গৌরবে খুব সপ্রতিভ অহঙ্কারে উত্তর দিয়েছিলেন তারাশঙ্করকে। বিষয়টি নিয়ে তারাশঙ্কর বিধানসভাতেও আলোকপাত করেন। ফলে ওই অধ্যাপক তাঁর সেই প্রবন্ধটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। এই নিয়ে কমিউনিষ্ট পার্টির সঙ্গে তারাশঙ্করের মতবিরোধও হয়। বিধানসভা সংক্রান্ত ঘটনাটির কথা জানতে পারি তারাশঙ্কর পৌত্র অমলশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কাছে।
     ওই প্রাবন্ধিকের অভিনব আবিষ্কারের অভিমতগুলি বাল্মিকী রামায়ণ পাঠেই ভ্রান্ত প্রমাণ করেছিলেন তারাশঙ্কর। তিনি নিজেই জানিয়েছেন—
আমি মূল সংস্কৃত রামায়ণ দেখবার জন্য ব্যগ্র হয়ে ঠিক সেই রামায়ণখানিই সংগ্রহ করেছিলাম যেখানি এই অধ্যাপক মহাশয় পড়েছিলেন এবং যা থেকে তিনি এই সত্য আবিষ্কার করেছিলেন।
 
    এর আগে তারাশঙ্কর রামায়ণের কেবলমাত্র একজন তত্ত্বদর্শী পাঠক ছিলেন।  রামায়ণে দস্যু রত্নাকরের বাল্মীকি হয়ে ওঠার তত্ত্বটি তিনি তাঁর ‘কবি’ উপন্যাস ও ‘যুগবিপ্লব’ নাটকে—নায়ক-চরিত্রের উত্তরণে প্রয়োগ করেছেন। আর এই ঘটনার সময় থেকে তিনি হয়ে উঠলেন তথ্য-অনুসন্ধানী এক গবেষক। একেবারে তথ্যনিষ্ঠ দৃষ্টিতে বাল্মিকীর কবিত্ব এবং সীতা সম্পর্কে মহাকবির অভিমত উদ্ঘাটনই তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী পাওয়ার জন্য নয়, বিকৃত ব্যাখ্যার হাত থেকে ভারতীয় আদর্শের ঐতিহ্যকে অম্লান রাখতেই তারাশঙ্কর রামায়ণ গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। একজন গবেষকের ন্যায় অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে মহামুনি বাল্মীকি বিরচিত সুবিশাল সংস্কৃত রামায়ণের প্রতিটি পঙক্তি একেবারে শব্দ ধরে ধরে সমগ্র  রামায়ণটি একবার কি দু’বার নয় একেবারে তিন তিন বার পাঠ করেন তারাশঙ্কর। কেবলমাত্র ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই তারাশঙ্করের রামায়ণ পাঠের এই দৃষ্টান্ত আমাদের কাছে অবিস্মরণীয়।
     প্রথমবার রামায়ণ অনুসন্ধানে তারাশঙ্কর দেখেন অরণ্যকাণ্ডের ৫১ সর্গে জটায়ুর মৃত্যুর পর ৫২ সর্গের শুরুতেই বাল্মিকী বলেছেন—‘রাবণ সীতার দিকে তাকালেন এবার’। দেখলেন জটায়ুর মৃত্যুতে সীতা বিলাপ করছেন। রাবণ সীতাকে পুনরায় আয়ত্ত করার জন্য অগ্রসর হলেন। আর সীতা বনের মধ্যে গাছের আড়ালে আত্মরক্ষার জন্য চেষ্টা করছিলেন। তখন রাবণ তাঁকে জোর করে গাছের আড়াল থেকে টেনে আনেন। সেই সময় বাল্মিকী একটি শ্লোকে বলেছেন—‘প্রধর্ষিতায়াং বৈদেহ্যাং বভুব সচরাচরম্’। তারাশঙ্করের মন্তব্য—এই ‘প্রধর্ষিতা বৈদেহী’ শব্দ দুটিতেই ব্যাখ্যার যত জটিলতা। এই শব্দদুটির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেই ব্যাখ্যাকার এই ব্যাখ্যা করেন যে—সীতাকে রাবণ বনমধ্যে দেহগতভাবে ধর্ষণ করেছেন, এই কথাই বাল্মিকী লিখেছেন। তার সঙ্গে লিখেছেন—এখানেই মার্কসবাদীদের দৃষ্টিতে বাল্মিকী চরম প্রগতিশীল। মার্কসবাদীর তত্ত্ব এর মধ্যে পরিস্ফুট। প্রথমবার রামায়ণ পাঠে তারাশঙ্কর দেখেন অধ্যাপক মহাশয় উদ্ধৃতি উদ্ধারে কোনো ভুল করেন নি। তাই তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের কোনো সূত্র তিনি পান নি—অথচ মহামুনি বাল্মিকী সীতা সম্পর্কে এমন কথা লিখতে পারেন বলে বিশ্বাসও করতে পারলেন না। তাই, তিনি কেবলমাত্র অরণ্যকাণ্ডের উপর নির্ভর করে নিশ্চিত হতে পারলেন না; সমগ্র রামায়ণের নিরিখে ওই শ্লোক ও শ্লোকের শব্দগত তাৎপর্য অনুসন্ধানে সচেষ্ট হলেন।
     দ্বিতীয়বারে সত্যানুসন্ধিৎসু পাঠক তারাশঙ্কর গভীর নিষ্ঠা সহ সযত্মে সমগ্র রামায়ণখানির প্রতি-শ্লোকের প্রতি-ছত্রের পাঠ গ্রহণ করলেন। পড়তে পড়তে তিনি দেখেন—‘কর্মণা মনসা বাচা’ ইত্যাদি শ্লোকে সীতার অগ্নি-পরীক্ষার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। তারপর লঙ্কাকাণ্ডের ১১৮ সর্গের একটি শ্লোকে তিনি আরও পড়েন—‘পরাধীনেষু গাত্রেষু কিং করিষ্যাম্যনীশ্বরা’ ইত্যাদি। যেখানে সীতা বলেছেন পরাধীন দেহের উপর তাঁর কোনো হাত ছিল না। প্রথমবারের পাঠে তারাশঙ্কর বিস্মিত ও স্তম্ভিত হয়েছিলেন আর দ্বিতীয়বারের পাঠে পেলেন আঘাত। তথাপি তখনও পর্যন্ত তিনি অধ্যাপক মহাশয়কৃত রামায়ণের সহজ ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারলেন না। আরও অগ্রসর হলেন তিনি। লঙ্কাকাণ্ড বা যুদ্ধকাণ্ডের ১২শ ও ১৩শ সর্গে দেখলেন, রাবণ সভা ডেকে পারিষদবর্গকে সীতা হরণের বৃত্তান্ত প্রকাশ করছেন।
   বলেছেন, ‘দণ্ডকারণ্য থেকে আমি তাকে হরণ করে এনেছি কিন্তু সে আজও আমার শয্যাভাগিনী হয়নি’। বলেছেন, “এই নারীর জন্য আমি কামার্ততায় বহ্নিজ্বালার মতো দাহ অনুভব করছি সর্বদেহে সর্বক্ষণ। সে আমার কাছে এক বৎসর সময় প্রার্থনা করেছে। সে প্রতীক্ষা করছে রামের”। অন্য এক জায়গায় সীতাকে ভয় দেখিয়ে তিনি বলেছেন—“বৎসরান্তে আমার অনুগামিনী না হলে তোমাকে কেটে তোমার মাংস আমি প্রাতঃরাশের সঙ্গে গ্রহণ করব”। ১৩শ সর্গে মহাপার্শ্ব নামক পারিষদ রাবণকে অনুযোগ করে বলেছেন, “বলপূর্বক কুক্কুটেরা যেমন রমণ করে—সেই ভাবে ‘প্রবর্ত্তস্ব মহাবল’। সীতাকে বার বার আক্রমণ করে ‘ভুঙ্ক্ষ্ব চ রমস্ব চ’।” তাছাড়া, সীতাকে হরণ করে দেহগতভাবে বলপূর্বক ভোগ না করা—নিজের মূর্খতা বলেই জানিয়েছেন রাবণ।
   কৌতূহল জাগে তাহলে কি ধীশক্তি তথা চারিত্রিক স্থিতিশীলতার গুনেই রাবণের পক্ষে এমন ধৈর্যধারণ সম্ভব হয়েছিল! একেবারে উদাহরণ উদ্ধার করে তারাশঙ্কর জানিয়েছেন, সীতার সামনে রাবণের এই স্থিতিশীলতা রাবণ চরিত্রের কোনো মহত্ব নয়, এ এক চরম অভিশাপের ভয়। পূর্বে একদিন রাবণ পুঞ্জিকস্থলী নামে এক অপসরাকে আকাশলোকে জোরপূর্বক ভোগ করেন। এই ঘটনার জন্য ব্রহ্মা তাঁকে অভিশাপ দেন যে—রাবণ বলপূর্বক কোনো নারীকে ভোগ করলে তাঁর দশমুণ্ড একশত ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। সেই শাপের ভয়ে রাবণ সীতার উপর বলপ্রয়োগ করেন নি। আর সীতার যে কথা, ‘দেহ আমার পরাধীন ছিল’—তার অর্থ এই যে,  বলপূর্বক অপহরণকালে রাবণ তাঁর হাত ধরেছিল, জটায়ুর সঙ্গে যুদ্ধকালে রথ চূর্ণ হলে রাবণ সীতাকে বাঁ কাঁধের উপর ফেলে ডান হাতে যুদ্ধ করেছিল।–এখানে এই অঙ্গস্পর্শের কথাই বলা হয়েছে।
     এখানেও ক্ষান্ত হননি তিনি, এরপর আরও কী আছে এবং ‘প্রধর্ষিতায়াং’ ও ‘বৈদেহী’ শব্দদুটিকে মহাকবি কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা জানার জন্য তারাশঙ্কর আবার নব-উদ্যমে নব-নিরিখে রামায়ণ পাঠে মনোনিবেশ করেন। তৃতীয়বার রামায়ণ পাঠ প্রসঙ্গে তারাশঙ্কর জানিয়েছেন—
গোটা রামায়ণখানির প্রতি পঙক্তি খুঁজে দেখছিলাম কোথায় ধর্ষিত, ধর্ষণ শব্দ আছে।  এবং কী অর্থে ব্যবহার করেছেন মহাকবি।–বলপূর্বক নারীদেহ ভোগের কথা কয়েকবারই আছে, সেখানে একস্থানেও বাল্মিকী ‘ধর্ষণ’ শব্দ ব্যবহার করেননি সেটি আমার চোখে পড়েছিল। রম্ ধাতু এবং ভুঙ ধাতুর ব্যবহার দেখেছি। কুক্কুটবৃত্তেন ভুঙ্ক্ষচ রমশ্চ’। রাবণ পুঞ্জিকস্থলী প্রসঙ্গে বলেছেন—‘ময়াভুক্তা’। রাবণকে অভিশাপ প্রসঙ্গে ব্রহ্মা একবার বলেন, ‘বলান্নারী গমিষ্যসি’। ধর্ষণ শব্দই নেই। আমার সন্দেহ হয়েছিল বাল্মিকী ধর্ষণ শব্দ এই অর্থে ব্যবহারই করেন নি। তাই কোথায় কোন পঙক্তিতে ধর্ষণ শব্দ আছে খুঁজে বের করে একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিলাম। দেখেছিলাম, আমার এ অনুমানই সত্য। শতাধিকবার (বোধ হয় ১২৭ বার) ধর্ষণ শব্দের ব্যবহার আছে রামায়ণে। সর্বত্রই এক অর্থ—সে অর্থ জোরপূর্ব্বক বিপর্যস্ত বা লাঞ্ছিত করা। রাবণ স্বর্গজয় করেছে, হনুমান লঙ্কা দগ্ধ করেছে, বানরকটক সুগ্রীবের মধুবন লণ্ডভণ্ড করেছে—সবই ‘ধর্ষিত’ হয়েছে; এবং এই অর্থেই ধর্ষণ শব্দ ব্যবহার হয়েছে রামায়ণে। দেহভোগ অর্থে রম্ এবং ভুঙ ধাতু ব্যবহার করা হয়েছে।                  

   আমরা জানি সীতার অগ্নি পরীক্ষা এর আর এক অকাট্য যুক্তি। বর্তমান কালের মতো সেযুগে চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নত হলে প্রজানুরঞ্জনের জন্য স্বয়ং রামচন্দ্রও হয়তো বা সীতার সতীত্ব পরীক্ষায় সে পথও অবলম্বন করতেন। কিন্তু স্মরণীয় যে ডাক্তারি পরীক্ষা অপেক্ষাও অগ্নি পরীক্ষার ন্যায় এক ভয়ঙ্করতম পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল সীতাকে। সীতার অগ্নিপরীক্ষা রামচন্দ্রের চরিত্রকে কিছুটা কলুষিত করলেও—সীতা যে রাবণ কর্তৃক ধর্ষিত হন নি সে কথা মহাকবি বাল্মিকী কেবলমাত্র রাবণের কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখেন নি। লঙ্কার অরণ্যের অন্ধকারে লোক চক্ষুর অগোচরে রাবণের মতো ভয়ঙ্কর মানুষের কবলেও যে সীতা চরিত্র নিষ্কলুষতায় অম্লান আলোকে উজ্জ্বল ছিল—সে কথা অযোধ্যায় সর্বজন সমক্ষে প্রমাণ করতেই সীতার অগ্নি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। মহাকবির বর্ণনা থেকেই আমরা জানি—
   সীতা অগ্নিতে প্রবেশ করলেন। সীতার নিষ্পাপ দেহের বিন্দুমাত্রও দগ্ধ করতে পারলেন না; বরং অগ্নিদেব তাঁকে কোলে করে নিয়ে উঠে আসেন এবং সেই জনসমক্ষেই চিরায়ত নারী আদর্শ সীতাকে রামের হাতে তুলে দেন। অগ্নিদেব রামচন্দ্রকে বলেন—
রাম তোমার সীতাকে তুমি গ্রহণ কর। সীতা মনে-প্রাণে পাপহীনা বিশুদ্ধচিত্তের নারী। তাঁর অন্তরে ক্ষণিকের জন্যও রাম ভিন্ন রাবণের কথা অঙ্কুরিত হয়নি। সীতাকে বিন্দুমাত্র পাপস্পর্শ সম্ভব হয়নি। সীতা অনলেও নির্মল।

   এ সম্পর্কে তারাশঙ্করের অভিমত—সীতা ভারত সংস্কৃতির যজ্ঞকুণ্ডু থেকে যজ্ঞফলের মতো উত্থিতা এক নারী আদর্শ—নারী মহিমা। তিনি অম্লান দীপ্তিময়ী, যার মহিমার কাছে দেবীমহিমাও ম্লান হয়। সেই সীতার দেহ রাবণের দ্বারা কলুষিত হলে তিনি তৎক্ষণাৎ বিগতজীবন হয়ে লুটিয়ে পড়তেন এবং রামের সম্মুখীন হয়ে কলুষিত দেহ ভস্মীভূত হওয়ার আবেদন জানাতেন। ওই অধ্যাপক সমালোচক বা প্রাবন্ধিকের গবেষণালব্ধ তথ্যকে প্রামাণিক তথ্য দ্বারা ভ্রান্ত প্রমাণ করে তারাশঙ্কর জানিয়েছেন, যে সীতা সহস্র সহস্র বৎসর ধরে দু-দু’বার মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অনুপম স্ফটিক প্রতিমার মতো কোটি কোটি মানুষের অন্তর্লোকে মণিবেদীর উপর অধিষ্ঠিতা রয়েছেন, মহাকবি বাল্মিকী যাঁকে কলুষহীন প্রদীপ্ত বহ্নির মতো নির্মাণ করেছেন তাঁকে অপব্যাখ্যায় কলুষিত করা সঙ্গত নয়। 
-------------------
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
হাটজনবাজার, সিউড়ি, বীরভূম-৭৩১১০২।
মোবাইল-৯২৩৩১২৪৭১৮।


বিদ্রোহী কবির জাতীয়তাবাদী কুঠার




বিদ্রোহী কবির জাতীয়তাবাদী কুঠার
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

“তুই নাগ, জন্ম তোর বেদনার দহে
কাঁটাকুঞ্জে বসে তুই গাঁথিবী মালিকা
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টিকা”
—নজরুল ইসলাম

কবি জীবনের বেদনা কখনও সুরের ধ্বনিতে আমাদের প্রাণ ও মনকে মাতিয়ে তুলেছে, কখনও ভক্তিরসের সাগরসিক্ত হৃদয় অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে আবার কখনও বা শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঝলসিত হয়ে উঠেছে জেহাদী তরবারির শাণিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। বেদনাসিদ্ধ শতদলে বসেই তিনি হয়ে উঠেছেন কবি; সাম্যবাদী, জাতীয়তাবাদী, মানবতাবাদী—এমন অনেক অভিধায় অভিহিত হয়েছেন তিনি। বেদনাদৃপ্ত পৌরুষের লৌহকঠিন কুঠার হাতেই সমাজের দেশের সঙ্কীর্ণতা এবং শোষণ ও শাসনকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে চেয়েছিলেন। বেদনাময় কাঁটার মুকুটই তাঁর কবি-জীবনের অলঙ্কার এবং শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার। যেন এক নিষ্ঠুর বেদনা-লগ্নেই জন্ম হয়েছিল নজরুল ইসলামের। পিতামাতার চার সন্তানের মৃত্যুর পর জন্ম বলে নামও রাখা হয় দুখু মিঞা। এই নামের ব্যঞ্জনাটুকুতেই যেন তাঁর আমৃত্যু বেদনাবাহী জীবন ইতিহাসের আসল অস্তিত্বকে উদ্ভাসিত করে তোলে। মাত্র আট বছর বয়সে পিতার মৃত্যু এবং তার পরেই পরিবারে দারিদ্রতার নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে দুখু মিঞার জীবনে নেমে আসে নিবিড় বেদনালিপ্ত দুঃখের কালোছায়া। এই কবিই এক সময় লেখেন—“যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটির মুখের গ্রাস / যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।
   পারিবারিক দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনিতে যোগ দেন এবং কবিতা লেখাও শুরু করেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে এসে সাহিত্যজগতে পরিচিত করে তোলেন নিজেকে। সাহিত্য হয়ে ওঠে তাঁর আন্দোলনের হাতিয়ার। বাংলা সাহিত্যেসমাজে তখন রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র থেকে মোহিতলাল, সত্যেন্দ্রনাথ—প্রমুখ উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজি বিরাজিত। সেই সময়ের সারস্বত সমাজে নজরুল কঠিন কুঠারের শাণিত বাণীতে স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। বলে নেওয়া দরকার নজরুল নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিলেন জাতীয় আন্দোলনের শরিক হতে। সাহিত্য ছিল তাঁর আন্দোলনের হাতিয়ার। নজরুলের নিজের কথা—“আমি রাজনীতিকে সাহিত্যায়িত করবো, কবিতা লিখবো, প্রবন্ধ লিখবো যেমনভাবে দরকার। আমি গান লিখবো, গান গাইব, মানুষকে গাইয়ে নিয়ে বেড়াব। চারণ হব আমি। ঘুমন্ত মানুষগুলোকে জাগাতে হলে যত রকমের পথ আছে সব দিক দিয়ে প্রাণপনে চেষ্টা চালিয়ে যাব”। এই মানসিকতা নিয়েই—মুজফফর আহমদ সহ কয়েকজন মিলে প্রকাশ করলেন ‘নবযুগ’ পত্রিকা। নবযুগে প্রকাশিত রচনাগুলিতে কৃষক ও শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতির চরম প্রকাশ ঘটে। বিশেষ করে ‘ধর্মঘট’ প্রবন্ধ প্রকাশের পর তা রাজরোষে বাজেয়াপ্ত হয়। নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের ‘মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ি কে’ নামক প্রবন্ধটির জন্য সরকার কবির প্রতি সবচেয়ে বেশি রুষ্ট হয়েছিলেন বলেই জানা যায়।
   ১৯২১ সালে ‘বিজলি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা-যে কবিতা বাংলার সারস্বত সমাজে নজরুল ইসলামকে স্বতন্ত্র আসনে চিহ্নিত করেছিল। স্মরণ করতে হয়, গান্ধজীর স্বদেশী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ক্ষণকালের জন্য হলেও জাতীয় জীবনে নেমে আসে হতাশার অন্ধকারএই সময় নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা—বিপ্লবীদের হতাশাপূর্ণ প্রাণে প্রাণশক্তি যুগিয়ে জীবনের ডাক দিয়েছিল। এক নব চেতনায় আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বাংলা। এক সপ্তাহে প্রায় ঊনত্রিশ হাজার কপি কবিতা বিক্রি হয়েছিল। ১৯২১ সালেই ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতে্ কবি লিখলেন—“যুগে যুগে আমি আসয়াছি, পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু/ এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধুমকেতু”। প্রথম সংখ্যাতেই নজরুল লিখলেন, “সর্বপ্রথম ধুমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়”। ইংরেজ শাসনের যে সময় ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার কল্পনাও ছিল স্বপ্নাতীত, মহাত্মার মতো নেতাও ‘ডোমিনিয়ন স্টাটাসের’ কথা ভেবেছিলেন, এমনকি জাতীয় কংগ্রেসেরও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী ছিল আনেক পরে, যে সময় পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলে বিখ্যাত উর্দু কবি ফজলুল হাসান হসরত মোহানী কারাদণ্ড ভোগ করেন—সেই চরনতম ভয়ঙ্কর সময়েও সমস্ত ভয়কে তুচ্ছ করে নজরুল ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী করেন।   
   সাহিত্যকে হাতিয়ার করে জাতীয় আন্দোলনে সামিল হলেন নজরুল। তাঁর কঠিন কুঠারাঘাতে মানবতার রুদ্ধ কপাট ভেঙে যেমন জাতীয় প্রাণের জাগরণ ঘটে তেমনি রাস্ট্রীয় রোষানলে পড়তে হয় কবিকে। কবির এক একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় আর ইংরেজ সরকার তা বাজেয়াপ্ত করেন। কারাবাসও করতে হয় কবিকে। এমন ঘটনার কিছু নমুনা এখানে তুলে ধরা গেল শিশির কর রচিত ‘নিষিদ্ধ নজরুল’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়—কবি নজরুল ইসলামের—(‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘শিকল ভাঙ্গার গান’, ‘প্রলয়শিখা’ এবং ‘চন্দ্রবিন্দু’) পাঁচখানি কাব্য বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। এছাড়াও ‘অগ্নিবীণা’, ‘সঞ্চিতা’, ‘ফণিমনসা’, ‘সর্বহারা’, এবং ‘রুদ্রমঙ্গল’ কাব্যগুলিও নিষিদ্ধ তালিকায় ছিল কিন্তু নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয় নাই।
১৯২২ সালে যুগবাণী নিষিদ্ধ, ১৯২৪ সালে বিষের বাঁশী নিষিদ্ধ /১৯৩০ সালে প্রলয়শিখা নিষিদ্ধ হয় এবং কবিকে ছয় মাসের জন্য সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। হাইকোর্টে আপীল করে মুক্তি পান। ১৯৩১ সালে চন্দ্রবিন্দু নিষিদ্ধ হয় কিন্তু ইংরেজ শাসনামলেই নষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ধুমকেতুতে প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতাটির জন্য কবিকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ এ ধারা অনুসারে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে বিচারককে কবি বলেছিলেন, “একধারে রাজার মুকুট; আর ধারে ধুমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আর জন সত্য হাতে ন্যায় দণ্ড। রাজার পক্ষে নিযুক্ত রাজবেতনভোগী রাজ-কর্মচারী। আমার পক্ষে সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্তকাল ধরে সত্য—জাগ্রত ভগবান। ... রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে রুদ্র। রাজার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য স্বার্থ, লাভ, অর্থ; আমার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য সত্য, লাভ পরমানন্দ। ... যা অন্যায় বলে বুঝেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি...”।
   কবিকে প্রথমে প্রেসিডেন্সি জেলে এবং পরে আলিপুর সেণ্ট্রাল জেলে বন্দ করে রাখা হয়। এই জেলে থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত নাটকটি কবি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। আলিপুর জেল থেকে কবিকে হুগলীর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। জেলের অবিচার এবং উৎপীড়নের কারণে কবি অনশন শুরু করেন। কবিকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সমগ্র বাংলা জুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। রবীন্দ্রনাথ কবিকে চিঠি লেখেন ‘আওয়ার লিটারেচার ক্লেমস ইউ’। শেষ পর্যন্ত কবির মাতৃস্থানীয়া বিরজাসুন্দরীর অনুরোধে ২৯ দিন পর কবির অনশন ভাঙে। নজরুলকে শিকল পরিয়ে বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। কবি লেখেন ‘শিকল ভাঙ্গার গান’ –‘কারার ঐ লৌহকপাট/ ভেঙে ফেল, কররে লোপাট /--কবির এই রচনা বাংলার বিপ্লবীদের উন্মত্ত করে তুলেছিল। বিপ্লবীদের মুখে মুখে, সভা সমিতিতে এই গান গাওয়া হত।
আনন্দময়ী কবিতা—“আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?/স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল/ দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি/ ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?”
   মনে রাখতে হবে ফেসবুকের এমন এক পরিসরে কবি নজরুলের জাতীয়তাবাদ নিয়ে অধিক আলোচনার অবকাশ নেই। তবে এইটুকু বলতে হয় যে কবি নজরুল—সত্যবাদী, সাম্যবাদী, জাতীয়তাবাদী এবং সর্বোপরি মানবতাবাদী। তিনি তাঁর কলমের কঠোর কুঠারাঘাতে মানবতা বিরোধী কঠিন কপাটকে যেমন ভেঙে চূড়মার করতে চেয়েছিলেন তেমনি ইংরেজ শাসনের লৌহদণ্ড এবং লৌহশৃঙ্খলকেও ভাঙতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাব্যকুঠার কতটা কি ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল তার হিসাবের থেকেও বড় কথা সমকালের বিপ্লবী বুকে বিপ্লবের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিতে পেরেছিলেন। একদিকে যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ আর দিকে তেমনি নজরুলের কাব্যমালা সমকালীন জাতীয় আন্দোলনের উজ্জ্বল অগ্নিশিখা সম প্রজ্জ্বলিত ছিল। ...।


Sunday, 8 December 2019

বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাহ্মণের মূলস্থান বন্দ্যঘটী গ্রাম

বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাহ্মণের মূলস্থান বন্দ্যঘটী গ্রাম
দেবাশিস মুখোপাধ্যায় C@DM
রাজা আদিশূরের সময়ে কনৌজ বা কান্যকুব্জ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণের বঙ্গে আগমন ও বসবাসের কথা ইতিহাস হয়ে আছে। ওই পঞ্চ-ব্রাহ্মণের প্রত্যেক সন্তানকে বসবাসের জন্য রাজা ক্ষিতিশূর এক এক গ্রাম প্রদান করেন। ২ সেই সেই গ্রামের নাম অনুসারে, তাঁদের সন্তানপরম্পরা অমুকগ্রামীন বা অমুকগাঞি বা গাঁই বলে প্রসিদ্ধ হন। সেই সূত্রে শাণ্ডিল্যগোত্রে ভট্টনারায়ণবংশে ‘বন্দ্য’ আদি ষোলোটি গ্রামের কথা জানা যায়। ৩ ভট্টনারায়ণপুত্র বরাহকে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম দেওয়া হয়েছিল।
বলে নেওয়া দরকার, ‘বন্দ্য’ গ্রামকে বন্দ্যঘটী বা বন্দ্যঘাটি নামেও কোথাও কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামকে বলা হত গাঞি বা গাঁই। সেই সূত্রে বন্দ্যগাঞি বা বন্দ্যঘটী গ্রামের ব্রাহ্মণ—বন্দ্যঘটী বা বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ। বিখ্যাত ভবদেব ভট্টের মাতা সাঙ্গোকা ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ কন্যা। ‘টীকাসর্বস্ব’ গ্রন্থের রচয়িতা আর্তিহরণপুত্র সর্বানন্দ (১১৫৯-১১৬০) ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ, প্রসিদ্ধ কুলাচার্য দেবীবর মিশ্রও বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। বন্দ্যোপাধ্যায় পদবী-র উৎসও এই বন্দ্যঘটি গ্রাম থেকেই।
বন্দ্যঘটী গ্রাম ছিল বীরভূম জেলায়
বর্তমান ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটি’ নামে কোন গ্রামের সচল-অস্তিত্বের কথা জানা যায় না। কিন্তু ইতিহাস অনুসন্ধানে এবং ক্ষেত্রসমীক্ষায় জানা যায় একসময় বীরভূমে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ নামে একটি গ্রাম ছিল।
১. এ বিষয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেন বলেছেন—
রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের অধিকাংশ মূলস্থান(গাঁঞি) এই ভূভাগে—দক্ষিণপূর্ব বীরভূমে এবং উত্তর ও উত্তরপূর্ব বর্ধমানে অবস্থিত। ৪
রাজা ক্ষিতিশূর কনৌজ থেকে আগত পঞ্চব্রাহ্মণের সন্তানদের ছাপান্নটি গ্রাম দিয়েছিলেন। ভট্টনারায়ণের সন্তানদের যে ষোলোটি গ্রাম দেওয়া হয় তারমধ্যে বন্দ্য, গড়গড়, কড়ি, পারিহা, দুগ্ধবাটি, পিপলাই, ঘোষগ্রাম, দায়া—গ্রামগুলি বীরভূম ভূখণ্ডেই অবস্থিত। ‘গড়গড়’ গ্রামটি বর্তমানে সিউড়ি বোলপুর সড়ক পথের পাশে ‘গড়গড়ে’ নামে পরিচিত রয়েছে। ‘পারিহা’ সাঁইথিয়ার কাছে বর্তমানে ‘পরিহারপুর’, ‘ঘোষলী’ রামপুরহাটের কাছে ‘ঘোষগ্রাম’ নামে পরিচিত। সেই সূত্রেই আমাদের বক্তব্য বন্দ্য বা বন্দ্যঘটী গ্রাম বীরভূমে থাকাটা খুব স্বাভাবিক। রাঢ় গবেষক প্রভাতরঞ্জন সরকারের মতে বন্দ্যোপাধ্যায় পদবীধারী ব্রাহ্মণদের মূলস্থান বা গাঁঞি বীরভূমের বন্দ্যঘটী গ্রাম। ৫
২. বিখ্যাত ভবদেব ভট্টের ‘কুলপ্রশস্তি’তে ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রামের উল্লেখ করে বলা হয়েছে—
বন্দ্যাং বন্দ্যঘটীয়স্য ব্রহ্মণঃ প্রযতাং সুতাং
সাঙ্গোকামঙ্গদ রত্নং পত্নীং স পরিণী ভবান। ৬
আমরা জানি ভবদেব ভট্ট লাভপুরের সন্নিকট সিদ্ধল গ্রামের মানুষ ছিলেন। সেই গ্রামে তাঁদের সাতপুরুষের বাস ছিল। ভবদেবের মা ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ কন্যা সাঙ্গোকা।
৩. আজ থেকে শত বৎসরের অধিক কাল পূর্বে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় শ্রীনগেন্দ্রনাথ বসু বিরচিত ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস—ব্রাহ্মণ খণ্ড, প্রথমাংশ’ নামে একটি গ্রন্থ। অনেক অনুসন্ধান করে ‘গাঞিমালার’ অধিকাংশ গ্রামের বাস্তব অস্তিত্বের কথা ওই গ্রন্থে তিনি জানিয়েছেন। ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম সম্পর্কে তিনি বলেছেন—
সুপ্রাচীন ভবদেবভট্টের কুলপ্রশস্তিতে ‘বন্দ্যঘটীয়’ নাম থাকায় যেন সেই গ্রামের বন্দ্যঘট নামই ছিল বলিয়া বোধ হইতেছে। ... বন্দ্য বা বন্দিঘাট—বীরভূমের অন্তর্গত কাণানদীর নিকট। (অক্ষা ২৪০ ৫৫/ ৫১ // উঃ ও দ্রাঘি ৮৭০ ৫২/ ২৫ // পূঃ) ইহার নামানুসারে বন্দ্যগ্রামিগণ ‘বন্দিঘাটি’ নামেও পরিচিত।৭
উপর্যুক্ত তথ্যগত যুক্তির বিচারে—রাঢ়ের বীরভূম জেলায় বন্দ্যঘটী গ্রামের অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়ার অবকাশ থাকে।
বীরভূম জেলার লাভপুর-অট্টহাস অঞ্চলে বন্দ্যঘটী গ্রাম
বীরভূমের কোনস্থানে সেই ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম?
ভবদেব ভট্ট’র কুলপ্রশস্তিকা অনুসারে বলতে হয়—তাঁর নিবাস সিদ্ধলগ্রামের কাছাকাছি কোথাও। বীরভূমের সিদ্ধল গ্রাম লাভপুরের পূর্বদিকে। নগেন্দ্রনাথ বসুর নির্দেশ বীরভূমে ‘কাণানদীর নিকট’ বন্দ্যঘটী গ্রাম। ইতিপূর্বে সুকুমার সেনের বক্তব্য থেকে জানা গেছে রাঢ়ী ব্রাহ্মণদের মূল গাঞিস্থান বীরভূমের দক্ষিণপূর্ব অংশও রয়েছে। বীরভূমের দক্ষিণপূর্ব অংশে অট্টহাস বা লাভপুর নামে গ্রামটির কথা সহজেই ভাবা যায়। লাভপুরের পূর্বে নৌ-পথের নৌ-চলাচল এখন বন্ধ। শত বৎসরের অধিককাল পূর্বে নগেন্দ্রনাথ বসুর অনুসন্ধানের সময় তা ‘কাণানদী’ হওয়ারই কথা। তাছাড়া, বীরভূমে ময়ূরাক্ষী নদী-সংলগ্ন ‘ওলকুণ্ডার ঘাট’ নামে একটি নদীঘাট রয়েছে। এই ওলকুণ্ডা ঘাটের উত্তরে গঙ্গাগামী ময়ূরাক্ষীর শাখাকে কাণানদী বলা হয়। ময়ূরাক্ষীর উত্তরে কাণানদী আর দক্ষিণে অনতিদূরে ‘লাঘাট’ নামে নদীবন্দর অধ্যুষিত অট্টহাস অঞ্চল। আমাদের বিশ্বাস লাভপুরের এই এলাকার কোন এক স্থানে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম এক সময় ছিল।
১. ‘পশ্চিমবঙ্গের ভূগোল ও সংস্কৃতি’ নামক রচনায় বিনয় ঘোষ বলেছেন, ‘লোকচলাচলের পথ ধরে গ্রামনির্ণয়ের রীতি আজও প্রচলিত’।৮ বন্দ্যনীয় গ্রাম বন্দ্যগ্রাম এমন কথাও বলার অবকাশ রয়েছে। আমরা জানি লাভপুর একটি প্রাচীন ভূখণ্ড। একান্নপীঠের এক পীঠ অট্টহাস মহাপীঠ সেই প্রাচীনতার পরিচয় বহন করছে। ৯ পাল রাজাদের সময়ে লাভপুর অঞ্চল অট্টহাস নামেই পরিচিত ছিল। অট্টহাসকে কেন্দ্র করে জনবসতির কথাও আমরা সহজেই বলতে পারি। অট্টহাস রাজাদেরও বন্দ্যনীয় ছিল। পাল রাজত্বে মহারাজ ধর্মপাল যে পঞ্চাশটি বিহার নির্মাণ করেন তার মধ্যে ‘ফুল্লহরি বিহার’ অট্টহাসে নির্মিত হয়েছিল বলেই মনে করতে হয়। ১০ পাল রাজত্বেই রাজা নয়পালদেব অট্টহাস মন্দির সংস্কার করে মন্দিরশীর্ষে স্বর্ণকলস স্থাপন করেন। ১১ পাল রাজত্বের সময় হয়তো বা আরও পূর্ব থেকেই অট্টহাস বন্দ্যনীয় ছিল। ১২ বন্দ্যনীয় বলেই বোধ হয় অট্টহাস অঞ্চল বন্দ্যগ্রাম নামে পরিচিত হয়।
২. আমাদের ধারণা কালান্তরে একসময় ‘বন্দ্যগ্রাম’ ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম’ নামে পরিচিত হয়। ‘বন্দ্যগ্রামটি’ কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে যদি বলা হয়ে থাকে বন্দ্যগ্রাম বন্দরঘাটের গায়ে; আবার বন্দরঘাট যদি বন্দ্যগ্রামের মধ্যেই অবস্থিত হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয়—বন্দরঘাটই তো বন্দ্যগ্রাম। এমন প্রসঙ্গ উত্থাপনের মতো সঙ্গত যুক্তি রয়েছে।
জরিপ মানচিত্র অঙ্কিত হওয়ার পূর্ববর্তীকালে লাভপুরের অনুমান নির্ভর একটি ভৌগোলিক রেখাচিত্রের কথা আমরা ভাবতে পারি। আমরা জানি, প্রাচীনকালে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল জলপথ। নদীবিধৌত সমভূমি জুড়ে গড়ে উঠত মানবসভ্যতা। লাভপুর ভূখণ্ড তেমনই এক সমভূমি। এই ভূখণ্ডের দুপাশে দুই নদী—কোপাই ও ময়ূরাক্ষী সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। কালাতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিক্ষয়ের কারণে নদীর নাব্যতাশক্তি এখন হ্রাস পেয়েছে সত্য কিন্তু এক-কালে এই দুই নদীই ছিল মানব-সভ্যতার সঙ্গে এই এলাকার মানুষের যোগসূত্রের প্রবেশ-দ্বার। সেন রাজাদের সময়ে শাসনকার্যের ও রাজস্ব-আদায়ের জন্য দেশ-বিভাগ পর পর এই রকম ছিল—ভুক্তি, বিষয়, মণ্ডল, বীথী, চতুরক, গ্রাম। ময়ূরাক্ষী ও কোপাই—এই দুই নদীর মধ্যবর্তী এক ভৌগোলিক চিত্র; যা এক সময় ‘মণ্ডল ভুক্তি’র অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বর্তমান লাভপুর ছিল সেই মণ্ডলের প্রবেশ দ্বার বা ‘দ্বারমণ্ডল’। লাভপুরের প্রাচীন ইতিহাসের বিষয় নিয়ে তারাশঙ্করের ‘দ্বারমণ্ডল’ নামে একটি উপন্যাস রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,‘দ্বারমণ্ডল এই ভূখণ্ডের প্রবেশদ্বার’। এমন বিশেষ পথকে সংস্কৃতে বলা হয় ‘লাব’। ‘লাবপুরম’ এর বাংলা অর্থ হয় দ্বারমণ্ডল। কালান্তরে ‘লাবপুরম’ থেকে লাভপুর কথাটি এসেছে বলেও অনুমান করা যেতে পারে। এই ভূখণ্ডে তখন নদী তথা বন্দরঘাটের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বন্দরঘাটই ছিল এই ভূখণ্ডের প্রবেশদ্বার। সেই বন্দরঘাটের অবস্থান কোথায় ছিল? যদি এর অবস্থান হয়ে থাকে বন্দ্যগাঁয়ে তাহলে কোনো নৌযাত্রী বা অন্যপথিকের—বন্দ্যগাঁ কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় বন্দরঘাটই বন্দ্যগাঁ। এমন অর্থে বন্দ্যগাঁ একসময় বন্দ্যঘটি নামে পরিচিত হয়। বন্দরঘাট ও বন্দ্যঘটি শব্দ দুটির সহাবস্থানের কথা মনে করার অবকাশ থাকে (বন্দরঘাটই > বন্দরঘটি > বন্দ্যঘটী)।
৩. বন্দরঘাট-টি যে বন্দ্যগাঁয়েই ছিল এমন কথা বলার সপক্ষে আরও যুক্তি রয়েছে। লাভপুর অট্টহাস সংলগ্ন এলাকায় যেখানে একসময় বন্দরঘাট ছিল বর্তমানে সেই জায়গাটি একটা উচ্চ স্তূপ বা ভগ্নস্তূপ আকারে দেখা যায়। বর্তমান জায়গাটি ‘বন্দরঢিবি’ ১৩ নামে পরিচিত। স্থানটি দেখে মনে হয়, এইটি কোন গ্রামের ভগ্নস্তূপ। গ্রাম্য-ভাষায় ভিটি’কে ঢিবি বলা হয়ে থাকে। আমাদের মনে হয় ‘বন্দরঢিবি’ কথাটির মূলে ‘বন্দ্যঘটী’ কথার অস্তিত্ব রয়েছে; ‘ভিটি’ কালক্রমে ‘ঢিবি’তে পরিণত হয়েছে। যেমন: বন্দ্যগাঁয়ের-ভিটি বা বন্দ্যদেরভিটি > বন্দ্যরভিটি > বন্দরঢিবি—এইভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। হয়তো বা এক সময় এখানেই বন্দ্য বা বন্দ্যোপাধ্যায়দের বসতি বা বন্দ্যঘটী গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। কালান্তরে বন্দ্যঘটী গ্রাম ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়; যা আজ ‘বন্দরঢিবি’ নামে পরিচিত। আমাদের এমন অনুমান সত্য হলে বলতে পারি যে, বীরভূম জেলার লাভপুর অট্টহাস সংলগ্ন স্থানে একসময় বন্দ্য বা বন্দ্যঘটী গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। ভট্টনারায়ণ পুত্র বরাহ থেকে তাঁর বংশজদের কয়েকপুরুষ বন্দ্যগ্রামেই থাকতেন।

Tuesday, 26 November 2019


লাভপুর জনপদের ভৌগোলিক রূপরেখা

দেবাশিস মুখোপাধ্যায় 

জরিপ মানচিত্র অঙ্কিত হওয়ার পূর্ববর্তীকালে লাভপুরের অনুমান নির্ভর একটি ভৌগোলিক রেখাচিত্রের কথা আমরা ভাবতে পারি আমরা জানি, প্রাচীনকালে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল জলপথ নদীবিধৌত সমভূমি জুড়ে গড়ে উঠত মানবসভ্যতা লাভপুর ভূখণ্ড তেমনই এক সমভূমি এই ভূখণ্ডের দুপাশে দুই নদীকোপাই ময়ূরাক্ষী সেই ইতি হাসের সাক্ষ্য বহন করছে কালাতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি ক্ষয়ের কারণে নদীর নাব্যতাশক্তি এখন হ্রাস পেয়েছে সত্য কিন্তু এককালে এই দুই নদীই ছিল মানব-সভ্যতার সঙ্গে এই এলাকার মানুষের যোগসূত্রের প্রবেশ-দ্বার এই চিত্র ময়ূরাক্ষী কোপাইএই দুই নদীর মধ্যবর্তী এক ভৌগোলিক চিত্র; যা এক সময়মণ্ডল ভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বর্তমান লাভপুর ছিল সেই মণ্ডলের প্রবেশ দ্বার বা দ্বারমণ্ডল কয়েকটি ‘গ্রাম’ নিয়ে ছিল একটি ‘বীথি’ এবং কয়েকটি ‘বীথি’ নিয়ে ছিল একটি ‘মণ্ডল’। বাংলায় শাসন-বিভাগীয় এই স্তর বিভাজন গুপ্ত আমল থেকে শুরু হয় এবং সেন শাসনের আমলেও তার অস্তিত্ত্ব ছিল। পরবর্তীকালে আর দিকে সীমায়িত করেছে আগয়া নদী।   
    প্রাচীন লাভপুরের ভৌগোলিক মানচিত্র সঠিকভাবে জানার কোন সুযোগ আজ অমাদের হাতে নেই; কিন্তু অনুমান নির্ভর করে যে মানচিত্রকে আমরা অবলম্বন করতে চেয়েছি তা একদিকে যেমন লাভপুর গ্রাম তেমনি একই সঙ্গে বর্তমানে লাভপুর থানার মানচিত্রসহ তৎসংলগ্ন কিছু অংশ অবলম্বনে আমরা এই পথে অগ্রসর হতে চেয়েছি এই চিত্র ময়ূরাক্ষী, কোপাই ও আগয়া—এই তিন নদীর মধ্যবর্তী এক ভৌগোলিক চিত্র
গ্রাম’ ‘বীথিএবংমণ্ডলবাংলায় শাসন-বি ভাগীয় এই স্তর বিভাজন গুপ্ত আমল থেকে শুরু হয় এবং সেন শাসনামলেও তার অস্তিত্ত্ব ছিল সেন শাসনামলে বীরভূম রাঢ়বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয় অনুমান যে এই এলাকা এক সময় বন্দ্য বা বন্দ্যঘটী গ্রামন নামে পরিচিত ছিল। পাল ও বর্মন রাজত্বে লাভপুরের অস্তিত্ব ছিল মূলত অট্টহাস কেন্দ্রিক বর্মন রাজত্বে এই এলাকা সামলাবাদ নামে পরিচিত ছিল সামলাবাদের রাজধানী ছিল বর্তমান ওপার বাংলার বি ক্রমপুর সামলাবাদ নামের অস্তি ত্ব সম্ভবত চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত তার অনেক পরে, শেরশাহের আমলে তথা ১৫৮২ খ্রি স্টাব্দে রাজা টোডর মল্ল বাঙলাদেশকে ১৯টি সরকার এবং ৬৮২ টি পরগণায় বি ভক্ত করেন সেই সময় বীরভূমের অধি কাংশ অংশমাদারুণ সরকার অধীন ছিল বাকি বীরভূমের দক্ষিণ পূর্বাংশ বর্ধমান ছিলসরি ফাবাদসরকারের অধীন লাভপুর সরিফাবাদ সরকারের অধীন ছিল বলেই মনে করি সপ্তদশ শতাব্দীতে সাধক কৃষ্ণানন্দ গিরির সাধনায় সিদ্ধি লাভের সময় থেকেই সম্ভবত এই জনপদলাভপুরনামে পরিচিত হয়ে থাকবে তখন এই অঞ্চল জঙ্গলপূর্ণ ছিল বলেই জানা যায় ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে RICHARD SMITH অঙ্কিত একটি মানচিত্র আমরা দেখেছি সেখানে বীরভূম The Jungle Terry District হিসাবে পরিচিত ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা টোডরমল্ল সরকার পরগণা বি ভাগের সংস্কার করেন ১৭২২ খ্রি স্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ রাজস্ব আদায়ের সুবি দার্থে বাঙলাকে তেরোটি চাকলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এর একশো বছর পর লাভপুর তালুক বা থানার মানচিত্র ধরে একটি মৌজার কথা আমরা প্রথম জানতে পারি সেই চিত্র সি . এস. মানচিত্র ইংরেজি ১৯৫৪ সালে অঙ্কি সরকারীভাবে সি . এস. মানচিত্র আমরা দেখেছি ; সেখানে বড় বড় বাংলা হরফে লেখা রয়েছেলাভপুর থানা, মৌজার প্রকাশ্য নাম-রাজারামপুর মৌজা এই মানচি ত্রের বহির্ভূত চারদিকে রয়েছে সুঁদীপুর, ফরিদপুর, বাবনা, ধোয়াডাঙা, কুসুমডিহি, কৃষ্ণপুর, উধা-প্রভৃতি জনপদগুলি সম্ভবতঃ রাজারামপুর মৌজার নাম অনুসারেই গুগুল মানচিত্রে আমোদপুর কীর্ণাহারগামী সড়কটিকে বলা হয়েছে-রামজীবনপুর রোড বর্তমান যে লাভপুর, তার ভৌগোলিক মানচিত্রটিতে দেখতে পাই-পূর্বে অট্টহাস থেকে পশ্চিমে ষষ্টীনগর, উত্তরে ছোটগোগা মহুগ্রামের শেষাংশ থেকে দক্ষিণে লাভপুর শম্ভুনাথ কলেজ তারামায়ের ডাঙা জুড়ে এর অবস্থান এখানে লাভপুর মূলম মৌজার সঙ্গে ছোটো গোগা, মহুগ্রাম, চৌহাট্টা ও মহিস্থলী মৌজা মিলে-মিশে লাভপুরের পরিচিত ভূগোল তৈরি হয়েছেবা বিভাগে ভাগ করেন তারমধ্যে বীরভূম ছিলমুর্শিদাবাদ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত তখন দেওঘর, সাঁওতাল পরগণার অধিকাংশ এবং বিষ্ণুপুর জমিদারী (বাঁকুড়া), বীরভূম জমিদারীর অধীন ছিল তৎকালে বিষ্ণুপুর জমিদারী বাদ দিলেও, বীরভূমের আয়তন ছিল ৩৮৫৮ বর্গমাইল ১৭৮৭ খ্রি স্টাব্দে বাঙলার প্রদেশ আবার নতুনভাবে-গঠিত হয় তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিস-মুর্শি দাবাদকে বিচ্ছিন্ন করে বাঁকুড়া বীরভূমকে এক করে রাখেন ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দেবোর্ড অব রেভেনিউ আদেশ মতো বীরভূম থেকে বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের জমিদারি বর্ধমান বিভাগে নিয়ে আসেন ১৮৪৯-৫২ খ্রিস্টাব্দে ডেপুটি সার্ভেয়ার জেনারেল ক্যাপটেন শের উইন বীরভূম জেলা জরিপ করে একটি মানচিত্র অঙ্কিত করেন তখন বীরভূম ৩৮ টি পরগণায় বিভক্ত ছিল তারমধ্যে লাভপুর সম্ভবত আকবরসাহীপরগণার অধীন ছিল ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতাল পরগণাকে বীরভূম