বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাহ্মণের মূলস্থান বন্দ্যঘটী গ্রাম
দেবাশিস মুখোপাধ্যায় C@DM
রাজা আদিশূরের সময়ে কনৌজ বা কান্যকুব্জ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণের বঙ্গে আগমন ও বসবাসের কথা ইতিহাস হয়ে আছে। ওই পঞ্চ-ব্রাহ্মণের প্রত্যেক সন্তানকে বসবাসের জন্য রাজা ক্ষিতিশূর এক এক গ্রাম প্রদান করেন। ২ সেই সেই গ্রামের নাম অনুসারে, তাঁদের সন্তানপরম্পরা অমুকগ্রামীন বা অমুকগাঞি বা গাঁই বলে প্রসিদ্ধ হন। সেই সূত্রে শাণ্ডিল্যগোত্রে ভট্টনারায়ণবংশে ‘বন্দ্য’ আদি ষোলোটি গ্রামের কথা জানা যায়। ৩ ভট্টনারায়ণপুত্র বরাহকে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম দেওয়া হয়েছিল।
বলে নেওয়া দরকার, ‘বন্দ্য’ গ্রামকে বন্দ্যঘটী বা বন্দ্যঘাটি নামেও কোথাও কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামকে বলা হত গাঞি বা গাঁই। সেই সূত্রে বন্দ্যগাঞি বা বন্দ্যঘটী গ্রামের ব্রাহ্মণ—বন্দ্যঘটী বা বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ। বিখ্যাত ভবদেব ভট্টের মাতা সাঙ্গোকা ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ কন্যা। ‘টীকাসর্বস্ব’ গ্রন্থের রচয়িতা আর্তিহরণপুত্র সর্বানন্দ (১১৫৯-১১৬০) ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ, প্রসিদ্ধ কুলাচার্য দেবীবর মিশ্রও বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। বন্দ্যোপাধ্যায় পদবী-র উৎসও এই বন্দ্যঘটি গ্রাম থেকেই।
বন্দ্যঘটী গ্রাম ছিল বীরভূম জেলায়
বর্তমান ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটি’ নামে কোন গ্রামের সচল-অস্তিত্বের কথা জানা যায় না। কিন্তু ইতিহাস অনুসন্ধানে এবং ক্ষেত্রসমীক্ষায় জানা যায় একসময় বীরভূমে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ নামে একটি গ্রাম ছিল।
১. এ বিষয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেন বলেছেন—
রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের অধিকাংশ মূলস্থান(গাঁঞি) এই ভূভাগে—দক্ষিণপূর্ব বীরভূমে এবং উত্তর ও উত্তরপূর্ব বর্ধমানে অবস্থিত। ৪
রাজা ক্ষিতিশূর কনৌজ থেকে আগত পঞ্চব্রাহ্মণের সন্তানদের ছাপান্নটি গ্রাম দিয়েছিলেন। ভট্টনারায়ণের সন্তানদের যে ষোলোটি গ্রাম দেওয়া হয় তারমধ্যে বন্দ্য, গড়গড়, কড়ি, পারিহা, দুগ্ধবাটি, পিপলাই, ঘোষগ্রাম, দায়া—গ্রামগুলি বীরভূম ভূখণ্ডেই অবস্থিত। ‘গড়গড়’ গ্রামটি বর্তমানে সিউড়ি বোলপুর সড়ক পথের পাশে ‘গড়গড়ে’ নামে পরিচিত রয়েছে। ‘পারিহা’ সাঁইথিয়ার কাছে বর্তমানে ‘পরিহারপুর’, ‘ঘোষলী’ রামপুরহাটের কাছে ‘ঘোষগ্রাম’ নামে পরিচিত। সেই সূত্রেই আমাদের বক্তব্য বন্দ্য বা বন্দ্যঘটী গ্রাম বীরভূমে থাকাটা খুব স্বাভাবিক। রাঢ় গবেষক প্রভাতরঞ্জন সরকারের মতে বন্দ্যোপাধ্যায় পদবীধারী ব্রাহ্মণদের মূলস্থান বা গাঁঞি বীরভূমের বন্দ্যঘটী গ্রাম। ৫
২. বিখ্যাত ভবদেব ভট্টের ‘কুলপ্রশস্তি’তে ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রামের উল্লেখ করে বলা হয়েছে—
বন্দ্যাং বন্দ্যঘটীয়স্য ব্রহ্মণঃ প্রযতাং সুতাং
সাঙ্গোকামঙ্গদ রত্নং পত্নীং স পরিণী ভবান। ৬
আমরা জানি ভবদেব ভট্ট লাভপুরের সন্নিকট সিদ্ধল গ্রামের মানুষ ছিলেন। সেই গ্রামে তাঁদের সাতপুরুষের বাস ছিল। ভবদেবের মা ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ কন্যা সাঙ্গোকা।
৩. আজ থেকে শত বৎসরের অধিক কাল পূর্বে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় শ্রীনগেন্দ্রনাথ বসু বিরচিত ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস—ব্রাহ্মণ খণ্ড, প্রথমাংশ’ নামে একটি গ্রন্থ। অনেক অনুসন্ধান করে ‘গাঞিমালার’ অধিকাংশ গ্রামের বাস্তব অস্তিত্বের কথা ওই গ্রন্থে তিনি জানিয়েছেন। ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম সম্পর্কে তিনি বলেছেন—
সুপ্রাচীন ভবদেবভট্টের কুলপ্রশস্তিতে ‘বন্দ্যঘটীয়’ নাম থাকায় যেন সেই গ্রামের বন্দ্যঘট নামই ছিল বলিয়া বোধ হইতেছে। ... বন্দ্য বা বন্দিঘাট—বীরভূমের অন্তর্গত কাণানদীর নিকট। (অক্ষা ২৪০ ৫৫/ ৫১ // উঃ ও দ্রাঘি ৮৭০ ৫২/ ২৫ // পূঃ) ইহার নামানুসারে বন্দ্যগ্রামিগণ ‘বন্দিঘাটি’ নামেও পরিচিত।৭
উপর্যুক্ত তথ্যগত যুক্তির বিচারে—রাঢ়ের বীরভূম জেলায় বন্দ্যঘটী গ্রামের অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়ার অবকাশ থাকে।
বীরভূম জেলার লাভপুর-অট্টহাস অঞ্চলে বন্দ্যঘটী গ্রাম
বীরভূমের কোনস্থানে সেই ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম?
ভবদেব ভট্ট’র কুলপ্রশস্তিকা অনুসারে বলতে হয়—তাঁর নিবাস সিদ্ধলগ্রামের কাছাকাছি কোথাও। বীরভূমের সিদ্ধল গ্রাম লাভপুরের পূর্বদিকে। নগেন্দ্রনাথ বসুর নির্দেশ বীরভূমে ‘কাণানদীর নিকট’ বন্দ্যঘটী গ্রাম। ইতিপূর্বে সুকুমার সেনের বক্তব্য থেকে জানা গেছে রাঢ়ী ব্রাহ্মণদের মূল গাঞিস্থান বীরভূমের দক্ষিণপূর্ব অংশও রয়েছে। বীরভূমের দক্ষিণপূর্ব অংশে অট্টহাস বা লাভপুর নামে গ্রামটির কথা সহজেই ভাবা যায়। লাভপুরের পূর্বে নৌ-পথের নৌ-চলাচল এখন বন্ধ। শত বৎসরের অধিককাল পূর্বে নগেন্দ্রনাথ বসুর অনুসন্ধানের সময় তা ‘কাণানদী’ হওয়ারই কথা। তাছাড়া, বীরভূমে ময়ূরাক্ষী নদী-সংলগ্ন ‘ওলকুণ্ডার ঘাট’ নামে একটি নদীঘাট রয়েছে। এই ওলকুণ্ডা ঘাটের উত্তরে গঙ্গাগামী ময়ূরাক্ষীর শাখাকে কাণানদী বলা হয়। ময়ূরাক্ষীর উত্তরে কাণানদী আর দক্ষিণে অনতিদূরে ‘লাঘাট’ নামে নদীবন্দর অধ্যুষিত অট্টহাস অঞ্চল। আমাদের বিশ্বাস লাভপুরের এই এলাকার কোন এক স্থানে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম এক সময় ছিল।
১. ‘পশ্চিমবঙ্গের ভূগোল ও সংস্কৃতি’ নামক রচনায় বিনয় ঘোষ বলেছেন, ‘লোকচলাচলের পথ ধরে গ্রামনির্ণয়ের রীতি আজও প্রচলিত’।৮ বন্দ্যনীয় গ্রাম বন্দ্যগ্রাম এমন কথাও বলার অবকাশ রয়েছে। আমরা জানি লাভপুর একটি প্রাচীন ভূখণ্ড। একান্নপীঠের এক পীঠ অট্টহাস মহাপীঠ সেই প্রাচীনতার পরিচয় বহন করছে। ৯ পাল রাজাদের সময়ে লাভপুর অঞ্চল অট্টহাস নামেই পরিচিত ছিল। অট্টহাসকে কেন্দ্র করে জনবসতির কথাও আমরা সহজেই বলতে পারি। অট্টহাস রাজাদেরও বন্দ্যনীয় ছিল। পাল রাজত্বে মহারাজ ধর্মপাল যে পঞ্চাশটি বিহার নির্মাণ করেন তার মধ্যে ‘ফুল্লহরি বিহার’ অট্টহাসে নির্মিত হয়েছিল বলেই মনে করতে হয়। ১০ পাল রাজত্বেই রাজা নয়পালদেব অট্টহাস মন্দির সংস্কার করে মন্দিরশীর্ষে স্বর্ণকলস স্থাপন করেন। ১১ পাল রাজত্বের সময় হয়তো বা আরও পূর্ব থেকেই অট্টহাস বন্দ্যনীয় ছিল। ১২ বন্দ্যনীয় বলেই বোধ হয় অট্টহাস অঞ্চল বন্দ্যগ্রাম নামে পরিচিত হয়।
২. আমাদের ধারণা কালান্তরে একসময় ‘বন্দ্যগ্রাম’ ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম’ নামে পরিচিত হয়। ‘বন্দ্যগ্রামটি’ কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে যদি বলা হয়ে থাকে বন্দ্যগ্রাম বন্দরঘাটের গায়ে; আবার বন্দরঘাট যদি বন্দ্যগ্রামের মধ্যেই অবস্থিত হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয়—বন্দরঘাটই তো বন্দ্যগ্রাম। এমন প্রসঙ্গ উত্থাপনের মতো সঙ্গত যুক্তি রয়েছে।
জরিপ মানচিত্র অঙ্কিত হওয়ার পূর্ববর্তীকালে লাভপুরের অনুমান নির্ভর একটি ভৌগোলিক রেখাচিত্রের কথা আমরা ভাবতে পারি। আমরা জানি, প্রাচীনকালে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল জলপথ। নদীবিধৌত সমভূমি জুড়ে গড়ে উঠত মানবসভ্যতা। লাভপুর ভূখণ্ড তেমনই এক সমভূমি। এই ভূখণ্ডের দুপাশে দুই নদী—কোপাই ও ময়ূরাক্ষী সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। কালাতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিক্ষয়ের কারণে নদীর নাব্যতাশক্তি এখন হ্রাস পেয়েছে সত্য কিন্তু এক-কালে এই দুই নদীই ছিল মানব-সভ্যতার সঙ্গে এই এলাকার মানুষের যোগসূত্রের প্রবেশ-দ্বার। সেন রাজাদের সময়ে শাসনকার্যের ও রাজস্ব-আদায়ের জন্য দেশ-বিভাগ পর পর এই রকম ছিল—ভুক্তি, বিষয়, মণ্ডল, বীথী, চতুরক, গ্রাম। ময়ূরাক্ষী ও কোপাই—এই দুই নদীর মধ্যবর্তী এক ভৌগোলিক চিত্র; যা এক সময় ‘মণ্ডল ভুক্তি’র অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বর্তমান লাভপুর ছিল সেই মণ্ডলের প্রবেশ দ্বার বা ‘দ্বারমণ্ডল’। লাভপুরের প্রাচীন ইতিহাসের বিষয় নিয়ে তারাশঙ্করের ‘দ্বারমণ্ডল’ নামে একটি উপন্যাস রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,‘দ্বারমণ্ডল এই ভূখণ্ডের প্রবেশদ্বার’। এমন বিশেষ পথকে সংস্কৃতে বলা হয় ‘লাব’। ‘লাবপুরম’ এর বাংলা অর্থ হয় দ্বারমণ্ডল। কালান্তরে ‘লাবপুরম’ থেকে লাভপুর কথাটি এসেছে বলেও অনুমান করা যেতে পারে। এই ভূখণ্ডে তখন নদী তথা বন্দরঘাটের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বন্দরঘাটই ছিল এই ভূখণ্ডের প্রবেশদ্বার। সেই বন্দরঘাটের অবস্থান কোথায় ছিল? যদি এর অবস্থান হয়ে থাকে বন্দ্যগাঁয়ে তাহলে কোনো নৌযাত্রী বা অন্যপথিকের—বন্দ্যগাঁ কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় বন্দরঘাটই বন্দ্যগাঁ। এমন অর্থে বন্দ্যগাঁ একসময় বন্দ্যঘটি নামে পরিচিত হয়। বন্দরঘাট ও বন্দ্যঘটি শব্দ দুটির সহাবস্থানের কথা মনে করার অবকাশ থাকে (বন্দরঘাটই > বন্দরঘটি > বন্দ্যঘটী)।
৩. বন্দরঘাট-টি যে বন্দ্যগাঁয়েই ছিল এমন কথা বলার সপক্ষে আরও যুক্তি রয়েছে। লাভপুর অট্টহাস সংলগ্ন এলাকায় যেখানে একসময় বন্দরঘাট ছিল বর্তমানে সেই জায়গাটি একটা উচ্চ স্তূপ বা ভগ্নস্তূপ আকারে দেখা যায়। বর্তমান জায়গাটি ‘বন্দরঢিবি’ ১৩ নামে পরিচিত। স্থানটি দেখে মনে হয়, এইটি কোন গ্রামের ভগ্নস্তূপ। গ্রাম্য-ভাষায় ভিটি’কে ঢিবি বলা হয়ে থাকে। আমাদের মনে হয় ‘বন্দরঢিবি’ কথাটির মূলে ‘বন্দ্যঘটী’ কথার অস্তিত্ব রয়েছে; ‘ভিটি’ কালক্রমে ‘ঢিবি’তে পরিণত হয়েছে। যেমন: বন্দ্যগাঁয়ের-ভিটি বা বন্দ্যদেরভিটি > বন্দ্যরভিটি > বন্দরঢিবি—এইভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। হয়তো বা এক সময় এখানেই বন্দ্য বা বন্দ্যোপাধ্যায়দের বসতি বা বন্দ্যঘটী গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। কালান্তরে বন্দ্যঘটী গ্রাম ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়; যা আজ ‘বন্দরঢিবি’ নামে পরিচিত। আমাদের এমন অনুমান সত্য হলে বলতে পারি যে, বীরভূম জেলার লাভপুর অট্টহাস সংলগ্ন স্থানে একসময় বন্দ্য বা বন্দ্যঘটী গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। ভট্টনারায়ণ পুত্র বরাহ থেকে তাঁর বংশজদের কয়েকপুরুষ বন্দ্যগ্রামেই থাকতেন।

No comments:
Post a Comment
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। সময়মতো উত্তর পাবেন।