বিদ্রোহী কবির জাতীয়তাবাদী
কুঠার
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
“তুই নাগ, জন্ম তোর বেদনার দহে
কাঁটাকুঞ্জে বসে তুই গাঁথিবী মালিকা
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টিকা”
—নজরুল ইসলাম
কবি জীবনের বেদনা কখনও সুরের ধ্বনিতে আমাদের প্রাণ ও মনকে
মাতিয়ে তুলেছে, কখনও ভক্তিরসের সাগরসিক্ত হৃদয় অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে আবার কখনও বা
শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঝলসিত হয়ে উঠেছে জেহাদী তরবারির শাণিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
বেদনাসিদ্ধ শতদলে বসেই তিনি হয়ে উঠেছেন কবি; সাম্যবাদী, জাতীয়তাবাদী, মানবতাবাদী—এমন
অনেক অভিধায় অভিহিত হয়েছেন তিনি। বেদনাদৃপ্ত পৌরুষের লৌহকঠিন কুঠার হাতেই সমাজের
দেশের সঙ্কীর্ণতা এবং শোষণ ও শাসনকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে চেয়েছিলেন। বেদনাময়
কাঁটার মুকুটই তাঁর কবি-জীবনের অলঙ্কার এবং শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার। যেন এক নিষ্ঠুর
বেদনা-লগ্নেই জন্ম হয়েছিল নজরুল ইসলামের। পিতামাতার চার সন্তানের মৃত্যুর পর জন্ম
বলে নামও রাখা হয় দুখু মিঞা। এই নামের ব্যঞ্জনাটুকুতেই যেন তাঁর আমৃত্যু
বেদনাবাহী জীবন ইতিহাসের আসল অস্তিত্বকে উদ্ভাসিত করে তোলে। মাত্র আট বছর বয়সে
পিতার মৃত্যু এবং তার পরেই পরিবারে দারিদ্রতার নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে দুখু মিঞার জীবনে
নেমে আসে নিবিড় বেদনালিপ্ত দুঃখের কালোছায়া। এই কবিই এক সময় লেখেন—“যারা কেড়ে খায়
তেত্রিশ কোটির মুখের গ্রাস / যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।
পারিবারিক
দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনিতে যোগ দেন এবং
কবিতা লেখাও শুরু করেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে এসে সাহিত্যজগতে পরিচিত করে তোলেন
নিজেকে। সাহিত্য হয়ে ওঠে তাঁর আন্দোলনের হাতিয়ার। বাংলা সাহিত্যেসমাজে তখন
রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র থেকে মোহিতলাল, সত্যেন্দ্রনাথ—প্রমুখ উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজি
বিরাজিত। সেই সময়ের সারস্বত সমাজে নজরুল কঠিন কুঠারের শাণিত বাণীতে স্বমহিমায়
সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। বলে নেওয়া দরকার নজরুল নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিলেন
জাতীয় আন্দোলনের শরিক হতে। সাহিত্য ছিল তাঁর আন্দোলনের হাতিয়ার। নজরুলের নিজের কথা—“আমি
রাজনীতিকে সাহিত্যায়িত করবো, কবিতা লিখবো, প্রবন্ধ লিখবো যেমনভাবে দরকার। আমি গান
লিখবো, গান গাইব, মানুষকে গাইয়ে নিয়ে বেড়াব। চারণ হব আমি। ঘুমন্ত মানুষগুলোকে
জাগাতে হলে যত রকমের পথ আছে সব দিক দিয়ে প্রাণপনে চেষ্টা চালিয়ে যাব”। এই মানসিকতা
নিয়েই—মুজফফর আহমদ সহ কয়েকজন মিলে প্রকাশ করলেন ‘নবযুগ’ পত্রিকা। নবযুগে প্রকাশিত
রচনাগুলিতে কৃষক ও শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতির চরম প্রকাশ ঘটে। বিশেষ করে ‘ধর্মঘট’
প্রবন্ধ প্রকাশের পর তা রাজরোষে বাজেয়াপ্ত হয়। নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের
‘মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ি কে’ নামক প্রবন্ধটির জন্য সরকার কবির প্রতি সবচেয়ে
বেশি রুষ্ট হয়েছিলেন বলেই জানা যায়।
১৯২১ সালে
‘বিজলি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা-যে কবিতা বাংলার সারস্বত সমাজে
নজরুল ইসলামকে স্বতন্ত্র আসনে চিহ্নিত করেছিল। স্মরণ করতে হয়, গান্ধজীর স্বদেশী
আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ক্ষণকালের জন্য হলেও জাতীয় জীবনে নেমে আসে
হতাশার অন্ধকার। এই সময় নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা—বিপ্লবীদের
হতাশাপূর্ণ প্রাণে প্রাণশক্তি যুগিয়ে জীবনের ডাক দিয়েছিল। এক নব চেতনায় আলোড়িত হয়ে
উঠেছিল বাংলা। এক সপ্তাহে প্রায় ঊনত্রিশ হাজার কপি কবিতা বিক্রি হয়েছিল। ১৯২১
সালেই ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতে্ কবি লিখলেন—“যুগে যুগে আমি আসয়াছি, পুনঃ
মহাবিপ্লব হেতু/ এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধুমকেতু”। প্রথম সংখ্যাতেই নজরুল লিখলেন,
“সর্বপ্রথম ধুমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়”। ইংরেজ শাসনের যে সময় ভারতের
পূর্ণ স্বাধীনতার কল্পনাও ছিল স্বপ্নাতীত, মহাত্মার মতো নেতাও ‘ডোমিনিয়ন স্টাটাসের’
কথা ভেবেছিলেন, এমনকি জাতীয় কংগ্রেসেরও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী ছিল আনেক পরে, যে
সময় পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলে বিখ্যাত উর্দু কবি ফজলুল হাসান হসরত মোহানী কারাদণ্ড
ভোগ করেন—সেই চরনতম ভয়ঙ্কর সময়েও সমস্ত ভয়কে তুচ্ছ করে নজরুল ভারতের পূর্ণ
স্বাধীনতার দাবী করেন।
সাহিত্যকে
হাতিয়ার করে জাতীয় আন্দোলনে সামিল হলেন নজরুল। তাঁর কঠিন কুঠারাঘাতে মানবতার রুদ্ধ
কপাট ভেঙে যেমন জাতীয় প্রাণের জাগরণ ঘটে তেমনি রাস্ট্রীয় রোষানলে পড়তে হয় কবিকে।
কবির এক একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় আর ইংরেজ সরকার তা বাজেয়াপ্ত করেন। কারাবাসও করতে হয় কবিকে। এমন ঘটনার কিছু নমুনা এখানে তুলে
ধরা গেল। শিশির
কর রচিত ‘নিষিদ্ধ নজরুল’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়—কবি নজরুল ইসলামের—(‘যুগবাণী’,
‘বিষের বাঁশী’, ‘শিকল ভাঙ্গার গান’, ‘প্রলয়শিখা’ এবং ‘চন্দ্রবিন্দু’) পাঁচখানি
কাব্য বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। এছাড়াও ‘অগ্নিবীণা’, ‘সঞ্চিতা’, ‘ফণিমনসা’, ‘সর্বহারা’,
এবং ‘রুদ্রমঙ্গল’ কাব্যগুলিও নিষিদ্ধ তালিকায় ছিল কিন্তু নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয়
নাই।
১৯২২ সালে
যুগবাণী নিষিদ্ধ, ১৯২৪ সালে বিষের বাঁশী নিষিদ্ধ /১৯৩০ সালে প্রলয়শিখা নিষিদ্ধ হয়
এবং কবিকে ছয় মাসের জন্য সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। হাইকোর্টে আপীল করে
মুক্তি পান। ১৯৩১ সালে চন্দ্রবিন্দু নিষিদ্ধ হয় কিন্তু ইংরেজ শাসনামলেই নষেধাজ্ঞা
উঠে যায়। ধুমকেতুতে প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতাটির জন্য কবিকে ভারতীয়
দণ্ডবিধির ১২৪ এ ধারা অনুসারে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ‘রাজবন্দীর
জবানবন্দী’তে বিচারককে কবি বলেছিলেন, “একধারে রাজার মুকুট; আর ধারে ধুমকেতুর শিখা।
একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আর জন সত্য হাতে ন্যায় দণ্ড। রাজার পক্ষে নিযুক্ত
রাজবেতনভোগী রাজ-কর্মচারী। আমার পক্ষে সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি
অনন্তকাল ধরে সত্য—জাগ্রত ভগবান। ... রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে রুদ্র।
রাজার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য স্বার্থ, লাভ, অর্থ; আমার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য
সত্য, লাভ পরমানন্দ। ... যা অন্যায় বলে বুঝেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি,
মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি...”।
কবিকে প্রথমে প্রেসিডেন্সি জেলে এবং পরে
আলিপুর সেণ্ট্রাল জেলে বন্দ করে রাখা হয়। এই জেলে থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর
বসন্ত নাটকটি কবি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। আলিপুর জেল থেকে কবিকে হুগলীর জেলে
স্থানান্তরিত করা হয়। জেলের অবিচার এবং উৎপীড়নের কারণে কবি অনশন শুরু করেন। কবিকে
মুক্তি দেওয়ার জন্য সমগ্র বাংলা জুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। রবীন্দ্রনাথ কবিকে চিঠি
লেখেন ‘আওয়ার লিটারেচার ক্লেমস ইউ’। শেষ পর্যন্ত কবির মাতৃস্থানীয়া বিরজাসুন্দরীর
অনুরোধে ২৯ দিন পর কবির অনশন ভাঙে। নজরুলকে শিকল পরিয়ে বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত
করা হয়। কবি লেখেন ‘শিকল ভাঙ্গার গান’ –‘কারার ঐ লৌহকপাট/ ভেঙে ফেল, কররে লোপাট
/--কবির এই রচনা বাংলার বিপ্লবীদের উন্মত্ত করে তুলেছিল। বিপ্লবীদের মুখে মুখে,
সভা সমিতিতে এই গান গাওয়া হত।
আনন্দময়ী কবিতা—“আর
কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?/স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি
চাঁড়াল/ দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি/ ভূ-ভারত আজ কসাইখানা,
আসবি কখন সর্বনাশী?”
মনে রাখতে হবে ফেসবুকের এমন এক পরিসরে কবি
নজরুলের জাতীয়তাবাদ নিয়ে অধিক আলোচনার অবকাশ নেই। তবে এইটুকু বলতে হয় যে কবি নজরুল—সত্যবাদী,
সাম্যবাদী, জাতীয়তাবাদী এবং সর্বোপরি মানবতাবাদী। তিনি তাঁর কলমের কঠোর কুঠারাঘাতে
মানবতা বিরোধী কঠিন কপাটকে যেমন ভেঙে চূড়মার করতে চেয়েছিলেন তেমনি ইংরেজ শাসনের
লৌহদণ্ড এবং লৌহশৃঙ্খলকেও ভাঙতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাব্যকুঠার কতটা কি ভাঙতে সক্ষম
হয়েছিল তার হিসাবের থেকেও বড় কথা সমকালের বিপ্লবী বুকে বিপ্লবের অগ্নিশিখা
জ্বালিয়ে দিতে পেরেছিলেন। একদিকে যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ আর দিকে তেমনি
নজরুলের কাব্যমালা সমকালীন জাতীয় আন্দোলনের উজ্জ্বল অগ্নিশিখা সম প্রজ্জ্বলিত ছিল।
...।
No comments:
Post a Comment
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। সময়মতো উত্তর পাবেন।