Thursday, 25 July 2024

 

তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ

পঞ্চম বর্ষপূর্তি সম্মেলন, ২০২৪

 

 

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় পঞ্চম স্মারক বক্তৃতা

জাতীয় আলোচনাচক্র

এবং স্বরচিত গল্প-কবিতা পাঠ

 

 

সম্পাদক এবং আহ্বায়কের প্রতিবেদন

. দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

 

 

২১ জুলাই ২০২৪

সকাল সাড়ে দশটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটে

বীরভূম সাহিত্য পরিষদ সভাকক্ষ

সিউড়ি, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মঞ্চে উপস্থিত

 

মাননীয় শ্রীযুক্ত বিপিন মুখোপাধ্যায়

অবসরপ্রাপ্ত জেলা বিচারক এবং

সভাপতিতারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ

 

. সঙ্গীতা সান্যাল

অধ্যাপিকাবাংলা বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ

 

. নবগোপাল রায়

অধ্যাপিকাবাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ

 

. দেবাশিস কর্মকার

অধ্যাপকসংস্কৃত বিভাগ, ওড়িশা কেন্দ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়, ওড়িশা

 

শ্রীমহাদেব দত্ত

ম্যানেজিং কমিটির সদস্যতারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সম্মাননীয় সুধীবৃন্দ

উপস্থিত সুধীবৃন্দ এবং মঞ্চে উপস্থিত সম্মাননীয় অতিথিবৃন্দমহোদয়েরা, আপনারা সকলেই তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ-এর পক্ষ থেকে বিনম্রচিত্তের শ্রদ্ধা আন্তরিক অভিনন্দন এবং যুক্তকরের সমবেত কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করবেনআজ গুরুপূর্ণিমা তিথির পরম পবিত্র দিনে সারস্বত গুরু এবং প্রতিদিনের প্রতিটি মুহূর্তে যাঁরা কোনো না কোনোভাবে আলোকের দিশা দিয়ে থাকেন সেইসব গুরুস্থানীয়দের ব্যক্তিগতভাবে এবং সংস্থার পক্ষ থেকে বিনম্রচিত্তের সমবেত প্রণামাঞ্জলি নিবেদন করছি প্রার্থনা জানাইআলোকশিখায় স্নাত করে বিনত কর হে নিত্য দিনে

     আজ ৫ই শ্রাবণ; তথাপি ঋতুর উদাসীন বৈরাগ্যলীলায় রিমিঝিমি শব্দে শ্রাবণের বরিষণধারা আমরা এবার পাইনিপেয়েছি কঠোর রৌদ্রের তীব্দ্র দাবদাহময় চিটচিটে আবহাওয়া কিন্তু এই রিক্ততার মধ্যেও বাঙালি বিস্মৃত হয়নি শ্রাবণের সারস্বত ঐতিহ্যকে স্মরণে রাখতেদুই চিরস্মরণীয় বাঙালি তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিরোভাব এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাবের মাস হিসেবে শ্রাবণের ঐতিহ্যকে মহাসমারোহে পালন করতে বঙ্গবাসী ব্যাকুলসেই ঐতিহ্য অনুসরণে আগামী ৮ই শ্রাবণ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন স্মরণে বঙ্গসরস্বরতীর সেবক হিসেবে তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজও তার অন্তরের নৈবেদ্য নিবেদনে তৎপর হয়েছেহে সারস্বত সমাজআজ আপনারা আমাদের এই নৈবেদ্য গ্রহণ করে আমাদের কৃতার্থ করুনধন্য করুনএকই সঙ্গে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একশো পঁচিশতম জন্মবছরইত্যাদি স্মরণীয় সময়গুলিকে সমবেতভাবে শ্রদ্ধায় স্মরণে রাখতেতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতার আয়োজনের সঙ্গে আধুনিক বাংলাসাহিত্যে প্রাচীন ভারতবিষয়ক আলোচনার আয়োজন করতে আমরা সচেষ্ট হতে চেয়েছি

 

অতিথিবৃন্দকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাতে গিয়ে জানাতে হচ্ছে যে, রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গৌতম মুখোপাধ্যায় শারীরিক অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে পারেননি; তবে ঝাড়খণ্ড বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতির রাজ্য সম্পাদক এবং বাংলা ও হিন্দি সংবাদপত্রের সাংবাদিক শ্রীগৌতম চট্টোপাধ্যায়কে আমরা পেয়েছি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয়া অধ্যাপিকা সঙ্গীতা সান্যাল মহাশয়া, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাননীয় নবগোপাল রায় মহাশয়; বঙ্গবহির্ভূত রাজ্য থেকে উপস্থিত ওড়িশার কেন্দ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় অধ্যাপক দেবাশিস কর্মকার এবং ঝাড়খণ্ড বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতির রাজ্য সম্পাদক মহাশয়দের প্রত্যেককে আজ আমরা বঙ্গীয় রীতিতে বীরভূমের গৈরিক মৃত্তিকার ভক্তিতিলকে অভিসিঞ্চিত করে নিতে চাই আপনারা তা গ্রহণ করে আন্তরিকতার স্পর্শে আমাদের ধন্য করুনআমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণে সাড়া দিয়ে আপনাদের এই উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে সমৃদ্ধতার সঙ্গে জাতীয় সম্মানে সম্মানিত করেছেবীরভূমবাসী তাঁর এই প্রাপ্তির সমৃদ্ধতা এবং আনন্দ জাতীয় সারস্বত সমাজের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে ধন্য হতে চায়বলতে আনন্দ অনুভব করছি যে আজকের দুই মুখ্য আলোচক নবগোপাল রায় এবং দেবাশিস কর্মকার উভয়েই তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ এর আপনজনআমাদের অভিভাবক এবং সদস্য সহ উপস্থিত অধ্যাপক, গবেষক এবং সারস্বত সমাজের সকলের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ভক্তির কৃতজ্ঞতা জানাই; এবং স্নেহপূর্ণ শুভেচ্ছা জানাই উদীয়মান ক্ষুদে সাহিত্যিক ও সাহিত্যপ্রেমীদেরআজ আমরা অনুষ্ঠান সঞ্চালনার জন্য পেয়েছি. তপন গোস্বামী মহাশয়কেতিনি হেতমপুর কৃষ্ণচন্দ্র কলেজ-এর বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং কবি প্রাবন্ধিক তিনি আমাদের সদস্যতাঁকে আমরা বিনত শ্রদ্ধা জানাই

     ওড়িশার কেন্দ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য . চক্রধর ত্রিপাঠী মহাশয় এবং জাপান থেকে মাননীয় অধ্যাপক মাসাইয়ুকি ওনিশি আমাদের অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেনতাঁদের উদ্দেশ্যে আমরা সারস্বত প্রণাম নিবেদন করিবলতে পারি তাঁদের শুভেচ্ছাবার্তা আজকের এই সারস্বত সম্মেলনকে জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিকার স্পর্শ অনুভবে সুরভিত করেছে

     তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ- পঞ্চম বর্ষ অতিক্রম করে ষষ্ঠ বৎসরে পদার্পণ করেছে ম্যানেজিং কমিটি সহ সদস্যদের অকুণ্ঠ সহযোগিতার অবদানে অত্যন্ত ধীর গতিতে হলেও সংস্থার বিকাশ যে সম্ভব হয়ে উঠছেএকথা প্রাণভরে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণার আনন্দ অনুভবে আমরা ঋদ্ধসংস্থার বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে ইংরেজি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এবারে তার বিলম্ব ঘটল অনিচ্ছাকৃত অনিবার্যতায় ম্যানেজিং কমিটি সহ সকল সদস্যদের কাছে সম্পাদক মার্জনা প্রার্থীবিলম্বে হলেও বর্ষপূর্তি অধিবেশনের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছেম্যানেজিং কমিটি এবং পরে সদস্যদের আন্তরিকতার সহযোগিতায় সংস্থা সকলের প্রতি বিনত কৃতজ্ঞতা জানায় ম্যানেজিং কমিটির শ্রীযুক্ত মহাদেব দত্ত তাঁর বৃদ্ধ বয়স এবং শিথিল শরীরকে উপেক্ষা করেও এক ঋজু স্তম্ভ স্বরূপ সক্রিয় সহযোগিতায় অবিচল আছেন তা আমাদের চরম প্রাপ্তিআর এক স্তম্ভ সংস্থার সভাপতি শ্রীযুক্ত বিপিন মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের চরম সহিষ্ণুতা এবং উদার সরলতা কত গভীর তা একান্ত অনুভবের বিষয়বিশেষ করে সংস্থার কোনো কোনো সঙ্কট মুহূর্তে সম্পাদকের ঔদ্ধত্যময় রূঢ় ভাষা সভাপতি মহাশয় যে স্নেহে সহ্য করেনতা কোনো মহৎ পিতৃহৃদয় ছাড়া সম্ভব নয় বলেই মনে করিসভামঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে তাঁকে ভক্তি নিবেদনে নিজেকে গ্লানিমুক্ত মনে হচ্ছেসহযোগিতায় যেমন কেউ রথের দড়ি ধরে টানছেন কেউ বা স্রোতোধারার পাশে শক্ত বাঁধের ন্যায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থেকে স্রোতোধারাকে গতিশীল করে চলেছেনসকলকেই আমাদের কৃতজ্ঞতা এবং প্রণাম জানাইসম্পাদকের ভূমিকা থেকে সাময়িক সরে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সংস্থার প্রত্যেক আপনজনের কাছে বিনীত অনুরোধ যে, সংস্থার সম্পাদকের যে কোনো পদক্ষেপে কোনো সংশয় অথবা কৌতূহল থাকলে রীতি নীতির বিধান অনুসারে তার আলোচনা এবং সংস্কারমূলক পদ্ধতির পথ আমাদের পাথেয় হোক কারণ, যে কোনো ক্ষেত্রেই নীতি বহির্ভূত রীতিব্যক্তির অহং সত্তাকে সঙ্কীর্ণ পথে চালিত করে বিশ্বাসের বন্ধনে সংশয়ের আশঙ্কা এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে আমরা জানি বর্জনের পথে নয় সংস্কারকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়সেই সূত্রে আমাদের প্রত্যেকের অহং সত্তার সংস্কারের অনুরোধ জানিয়ে সংস্থা মধুরের পথে আয়ত এবং নিত্য-নূতন আপনজনের প্রতীক্ষায় থাকবেআপনারা ভালোবেসে সেবকের ব্রতধর্ম অবলম্বনে বলুনতারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ আমার এবং আমাদের

 

তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ-এর উদ্দেশ্য বাংলাসাহিত্য সহ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্যচর্চা এবং তার বিকাশ আমরা যেমন নিয়মিত তারাশঙ্করচর্চা করে থাকি তেমনি বিকাশের ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে তার সফলতার অঙ্কুর উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে বিগত পাঁচ বছর যাবৎ যে উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি সেখানে বছর দুয়েক যাবৎ বঙ্গে এবং আসাম-ত্রিপুরা-ঝাড়খণ্ড রাজ্যগুলিতেও তারাশঙ্করচর্চার প্রকাশ ও  বিকাশ লক্ষ্য করা যায় আমাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রাঁচী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলা একাডেমি নামে একটি সংস্থা গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে প্রথম তারাশঙ্করের জন্মদিন পালন করেন ত্রিপুরার বাংলা একাডেমি নামে সংস্থার সভাপতি মাননীয় ভাস্কর বর্মন মহাশয় আমাদের জানিয়েছেনএবারেও তাঁরা উদ্যোগী হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে তারাশঙ্কর স্মরণ অনুষ্ঠান সহ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাধিপ্রাপ্তির জন্য তারাশঙ্কর গবেষণার বহর বৃদ্ধি পেয়েছে মঞ্চে উপস্থিত অধ্যাপিকা সঙ্গীতা সান্যাল মহাশয়া সেকথা আরও ভালো বলতে পারবেন বলেই মনে করি

     প্রসঙ্গক্রমে একটি কথার জবাবদিহি করতে সম্পাদক বাধ্য বলেই মনে করি কথা উঠেছিলতারাশঙ্করের সাহিত্যপ্রতিভা তো রবীন্দ্রনাথের মতো বিশাল নয়; তবে তাঁকে নিয়ে এতো মাতামাতি কেন? কথাটা যেখানে যেভাবেই আলোচিত হোক না কেনমাতামাতিকথাটি মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে পীড়াদায়ক সম্পাদক এবং একজন তারাশঙ্কর অনুরাগী হিসেবে আমাদের কথা তুলে ধরতে চাইবউপস্থিত সারস্বত সমাজ তার মূল্যায়ণ করবেন এই প্রসঙ্গে আমরা বলতে চাইবপ্রথমত, সমগ্র বঙ্গের মধ্যে বীরভূমসাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অন্যতম সাধনপীঠ সাহিত্যে ভবভূতি থেকে শুরু করে কবি জয়দেব চণ্ডীদাস রবীন্দ্রনাথ এবং কথাসাহিত্যে তারাশঙ্কর-শৈলজা-ফাল্গুনী-সজনীকান্ত প্রমুখের যে সারস্বত ধারা জাতীয় চেতনা এবং মনুষ্যত্বের জয়গানে বীরভূমের মহিমাকে বিশ্বসম্মুখে তুলে ধরেছেন এবং ধরতে চেয়েছেনআমরা সেই বীরভূমের মানুষ কুলজ সন্তান হিসেবে তাঁদের মহিমান্বিত আশীর্বাদী-সৌরভ ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্যকর্ম তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ সেই নৈতিক দায়বদ্ধতাকে জীবনের ব্রত করতে চেয়েছে মাত্রতারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন সাহিত্যচর্চা সেই ব্রতপালনের বিশেষ এক আধারমাত্র 

     তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বীরভূমের মানুষ হয়েও সাহিত্যমহিমায় তিনি সমগ্র ভারতবর্ষ এবং বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। বীরভূমের গ্রাম্যভাষা সহ একেবারে সম্পুর্ণ বাঙালিয়ানায় উপস্থাপিত তারাশঙ্করের গল্প-উপন্যাস বিশ্বের সারস্বত সমাজকে নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট করেছে আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি, তাঁর সমকাল থেকে একাল পর্যন্ত এশিয়া ইউরোপ আমেরিকা এবং অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশেরভারতবর্ষ বাংলাদেশ অষ্ট্রেলিয়া আমেরিকা চীন চেকোশ্লোভাকিয়া জাপান রাশিয়া সুইডেন কত কত দেশের সারস্বত সমাজঅনুবাদে গবেষণায় জার্নালে তারাশঙ্কর চর্চা করছেন তা জানলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয় সেই অনুসন্ধানের পথেই আমরা জানতে পারি সুদূর আমেরিকা এবং জাপান থেকে তারাশঙ্কর অনুসন্ধিৎসু গবেষক লাভপুরে এসে তারাশঙ্করের জন্মগ্রামের মাটি ছুঁয়ে তারাশঙ্কর অনুসন্ধান করেছেন এমন সংবাদ অভাবনীয় না হলেও যে বড়ো আনন্দের তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না পাশ্চাত্যলেখকের ইংরেজি এবং বাংলাভাষায় লেখা তারাশঙ্কর বিষয়ক রচনা আমরা পড়েছি এই সূত্রে আমেরিকা ও জাপানের দুই অধ্যাপক এবং এক অধ্যাপিকার সঙ্গে পত্রালাপে ও ফোনালাপে  তারাশঙ্কর বিষয়ক আলোচনায় সেই আনন্দ অনুভবের সুযোগও আমরা  পেয়েছিতাঁদের তারাশঙ্কর বিষয়ক বেশকিছু লেখা পড়ে স্বাভাবিকভাবেই জানা গেছে যে তাঁদের তারাশঙ্কর অনুসন্ধানের মূল কারণ তারাশঙ্করের সাহিত্যদর্শনযা ভারতভূগোলের গণ্ডিকে অতিক্রম করে বিশ্বমানবতার জীবনদর্শনে সমৃদ্ধ সাহিত্যে বিশ্বমানবতার আবেদন ছিল বলেই ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেলের জন্য বিখ্যাত সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস, আর্থার মিলার, বোর্হেসের মতো বিদেশের সাহিত্যিকদের সঙ্গে বাংলা সাহিত্য থেকে মনোনীত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর৫১ বছর পর সেই তথ্য প্রকাশ করেছেন নোবেল কমিটি। মৃত্যু পুরস্কার প্রাপ্তির পথে বাধা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সাহিত্যদর্শনের মহিমায় বিশ্বের সারস্বত সমাজে তারাশঙ্করের নাম উজ্জ্বল অক্ষরে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে এবং থাকবে।

     তারাশঙ্কর তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনাপর্ব থেকেই নিজেকে বিশ্বমানবতার সন্তান বলে মনে করতেন এবং বিশ্বচেতনার সুরেই যেন নিজের জীবনসাধনা এবং সাহিত্যসাধনার সুরটি বেঁধে নিতে চেয়েছিলেন। প্রথম উপন্যাসচৈতালী ঘূর্ণিথেকেই তার পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৩৮ সালে চল্লিশ বছর বয়সে প্রকাশিতধাত্রীদেবতাউপন্যাসে তিনি বলেছেন—“সমস্ত জীবের ধাত্রী যিনি ধরিত্রী; জাতির মধ্যে তিনিই তো দেশ মানুষের কাছে তিনি বাস্তুধরিত্রী তথা বিশ্বকে চেনার মধ্য দিয়ে তিনি যেমন তাঁর বাস্তু তথা জন্মভূমিকে চিনে নিতে চেয়েছিলেন তেমনি নিজের জন্মভূমি জন্মগ্রামের মানুষকে জানার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানুষকে জানতে চেয়েছিলেন তাঁর সাহিত্যে বিশ্বমানবের জীবনদর্শনের পরিচয় নিহিত রয়েছে বলেই একজন সাহিত্যিক হিসেবে আমন্ত্রিত তারাশঙ্কর পৃথিবীর বাংলাদেশ চীন রাশিয়া রেঙুন বিভিন্ন দেশে উপস্থিত হয়েছিলেন; এমনকি আমেরিকা থেকেও তাঁর আমন্ত্রণ এসেছিল

 

তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ বর্ষপূর্তি অধিবেশন উপলক্ষ্যে যে যে বিষয়গুলি আয়োজনের উদ্যোগ নিয়ে থাকেনতার একটি হলো তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা এবারে পঞ্চম স্মারক বক্তৃতা দেবেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের তারাশঙ্কর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপিকা মাননীয়া সঙ্গীতা সান্যাল মহাশয়াদুই পথিকের পথপরিক্রমণ: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ফণীশ্বরনাথরেণু’” এই বিষয়ে তিনি আজ আলোকপাত করবেন আমরা জানিঅসমীয়া, উর্দু, ওড়িয়া কন্নড়, গুজরাটি, তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবী, মারাঠী, মালয়ালম, সিন্ধি, হিন্দীএইসব ভারতীয় ভাষায় তারাশঙ্করের বিভিন্ন বই অনূদিত হয়েছে এছাড়া, ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে তারাশঙ্করের তুলনামূলক আলোচনা যেমন সঙ্গত তেমনি তারাশঙ্করের প্রভাব বিষয়টিও আলোচনাযোগ্যপ্রতিবেশী ভারতীয় সাহিত্য ও তারাশঙ্করবিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক বিপ্লব চক্রবর্তী মহাশয়ফণীশ্বরনাথ রেণু একজন হিন্দী সাহিত্যিক; তাঁর মূল উদ্দেশ্য গ্রামীণ চাষীদের শোষণমুক্তির কথা তুলে ধরা দুটি ভাষার ভারতীয় দুই সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সঙ্গীতা সান্যাল মহাশয়া যে বক্তব্য রাখতে চলেছেন তা শোনার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছি

    

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বাংলাসাহিত্যকে শ্রদ্ধা জানাতে--এবারে আমরা এক জাতীয় আলোচনাচক্রের আয়োজন করেছি আমরা জানি, আধুনিক বাংলাসাহিত্য বঙ্গভাবনা এবং জাতীয় চেতনায় সমগ্র বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে; বাঙালি হিসেবে বাংলাভাষার সারস্বত সমাজের সদস্য হিসেবে এ আমাদের অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় যুগোচিত আধারে পরিশোধিত হলেও বাংলাসাহিত্যের এমন উন্নত মস্তকের অস্তিত্বমূলে রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের রসধারাআধুনিক যুগে তথা ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে বঙ্কিমচন্দ্র বিবেকানন্দ রবীন্দ্রনাথ তারাশঙ্কর নজরুল সতেন্দ্রনাথ জীবনানন্দ সকলেই সেই রসধারায় স্নাত এবং সিক্ত বাংলাসাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাঁরা তাঁদের সমগ্র জীবন ধরে ভারতবর্ষকেই বিনির্মান করতে এবং ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শনকে তুলে ধরতে চেয়েছেন সেই বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেনদুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সম্মানীয় অধ্যাপক তাঁদের আলোচনা শোনার জন্যও আমরা অধীর অগ্রহে অপেক্ষায় আছি

     প্রসঙ্গক্রমে বলতে ইচ্ছে করছে যে, আধুনিক বঙ্গসাহিত্যের ন্যায় আধুনিক জীবন তথা ব্যক্তিত্ব বিনির্মানেও প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করতে হয় প্রাচীন ঐতিহ্যের অধ্যয়ণ অনুশীলন এবং সৌজন্য-শিষ্টাচারের উপাদানগুলি যুগোচিত আধারে শোধন করেই প্রকৃত ব্যক্তিত্বের বিকাশ সম্ভব বলে মনে করি আমিত্বের আমিকে ধ্বংস করেই তো ক্রমাগত আমিত্বের বিকাশ; আমিত্ব অর্জনই তো মনুষ্যত্ব্ এবং সেই আমিত্ব অর্জনের পথেই তো রত্নাকর থেকে বাল্মিকীর জন্ম; রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্ম-উপলব্ধিময় আমিত্বের বিকাশ, কবি নজরুলের বিদ্রোহ, জমিদার হয়েও সামন্ততন্ত্র থেকে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় তারাশঙ্করের সাধনা এই বৃহৎ আমিত্ব সমবেত আমিত্ব বোধই তো সমাজকল্যাণের আধার   তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ-এর প্রতিষ্ঠাতা সমবেতভাবে সেই প্রাচীন এবং চিরায়ত আমিত্ব পথের পথিক এবং সেই উপলব্ধি থেকেই সংস্থার লোগোটি নির্মাণ করা হয়েছে সংবেদনশীলতার অনুভবে নমনীয়তা থাকলেও সংস্থার যিনি প্রতিষ্ঠাতা--সমবেত আমিত্বের পথে তাঁর ঋজু এবং প্রাসঙ্গিক অনমনীয়তা অনিবার্য বলেই মনে করি

 

বার্ষিক অধিবেশনে তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ যে যে কর্মের উদ্যোগ নিয়ে থাকেতার একটি হলোঅরণ্য-অগ্নিনামে গবেষণাধর্মী একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ এবারে বিশেষ কারণে সেই প্রকাশনা সম্ভব হয়নি; তবে গত ২০২৩ সালে বীরভূম মহাবিদ্যালয়ের সহযোগিতা নিয়ে তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজতারাশঙ্কর বিষয়ে দুদিনের এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রের আয়োজন করেছিলেন সেখানে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলির সংকলন প্রকাশে  আভ্যন্তরীণ বিচিত্র জটিলতায় সম্পাদককে নাজেহাল হতে হয় অবশেষে আর্থিক অক্ষমতার ঝুঁকি আপাত নিজের কাঁধে নিয়েআন্তর্জাতিক মঞ্চে তারাশঙ্কর ভাবনানামে একটি সংকলন প্রকাশ সম্ভব হয়েছে আজ তার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘটবে; বইটি বিভিন্ন মাত্রায় অসম্পূর্ণ থাকার কারণেবইটির প্রকাশ ঘটলেও পরিবেশন সম্ভব হচ্ছে নাবিশ্বাস রাখি স্বল্প সময়ের মধ্যেই তার ত্রুটিহীন প্রকাশ সম্ভব হয়ে উঠবে কেবলমাত্র আজ এই অনুষ্ঠানের জন্য অসম্পূর্ণ দুটি বই আমাদের হাতে এসেছেএকটি উদ্বোধন এবং আর একটি প্রুফ সংশোধনের জন্যবইটি প্রকাশের জন্য সংস্থার সভাপতি মহাশয়কে অনুরোধ জানাব আর প্রুফ দেখার অনুরোধ জানাবহাওড়া বেলুড় মঠ, রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যাপক এবং আমাদের সদস্য . সপ্তর্ষি পাল মহাশয়কে

বিশ্বাস রাখি স্বল্প সময়ের মধ্যেই তার ত্রুটিহীন প্রকাশ সম্ভব হয়ে উঠবে

 

আজকের এই অনুষ্ঠানে মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে আগত কয়েকজন অধ্যাপক, কয়েকজন গবেষক এবং সিউড়ি সদর হাসপাতালের এক খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁদের গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য বিষয় শিরোনাম আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন সকলকেই আমাদের সারস্বত অভিনন্দন জানাই এছাড়া কয়েকজন কবি, গল্পকার এবং বাচিক শিল্পীর সান্নিধ্য আমাদের বিশেষ প্রাপ্তি সিউড়ির গল্পকথা এবং অনতিদূরের শিল্পীদের সঙ্গে দুর্গাপুরেরস্বরবাকশিল্পীদের উপস্থিতি সহ সিউড়ি সরোজিনীদেবী সরস্বতী শিশু মন্দির-এর ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ এক ভিন্নমাত্রার সমৃদ্ধতা বলে মনে করি বিশেষ করে স্কুল পড়ুয়া ক্ষুদে উদীয়মান সাহিত্যিকদের কথায়পরিণামী বিশ্বাসের স্বপ্ন দেখিএকদিন এদেরই মধ্যে থেকে আর এক তারাশঙ্কর অথবা মহাশ্বেতা জন্মগ্রহণ করবেন সকালের সূর্যকিরণ অঙ্কুরিতদের নিত্য আশীর্বাদ করেন; আপনারাও ওদের আশীর্বাদ করুন এই আবেদন জানাই

 

 

 

 

 

 

 

Tuesday, 2 July 2024

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের নিবন্ধ --"শৈলজানন্দ এবং তারাশঙ্কর : পথচন্দ্রিমার অন্দরমহল"

 

শৈলজানন্দ এবং তারাশঙ্কর : পথচন্দ্রিমার অন্দরমহল

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

 

কথাসাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়—জন্মসূত্রে দুজনেই ছিলেন বীরভূম জেলার মানুষ। পরে দুজনেই হয়ে ওঠেন কলকাতার—নিকটবর্তী প্রতিবেশী।  তারাশঙ্কর ছিলেন রাজনীতির পক্ষপাতী; সাহিত্য রচনা তাঁর স্বদেশ সাধনার নামান্তর। স্বাধীনতার পূর্ববর্তীকালে রচিত তাঁর উপন্যাসগুলিতে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর শৈলজানন্দ মনে করতেন—পৃথিবীর সব দেশেই সব রাজনীতিই সাময়িক কিন্তু সাহিত্য চিরকালের। আবার এমন মত-পার্থক্য নিয়েও তারাশঙ্কর বলেছেন—শৈলজানন্দ সাহিত্য জগতে না এলে, আমি হয়তো আসতামই না। ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তারাশঙ্করের মৃত্যু হয়। এক অন্তরঙ্গতম বন্ধুর মৃত্যুর স্মরণে শৈলজানন্দ স্মৃতিচারণা করেন, তার মৃতদেহ আমি দেখেছি। হাসি হাসি মুখ তার এতটুকু ম্লান হয়নি। হাসতে হাসতে এসেছিল সেই আনন্দময় পুরুষ আবার হাসতে হাসতে আনন্দলোকে চলে গেল। বলেছেন, তারাশঙ্করকে হারিয়ে বাংলাদেশ একজন সাহিত্যিককে হারালো, আর আমি হারালাম আমার অকৃত্রিম সুহৃদকে। তারাশঙ্কর এবং শৈলজানন্দ—দুই সাহিত্যিক-জীবনের এক বিস্ময়কর সম্পর্ক-মাধুর্যের পরিচয় পাওয়া যায়—উভয়ের স্মৃতিচারণায় প্রথমে বলি ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা, পরে উঠে আসুক সাহিত্য-সম্পর্কের বিষয়।

 

শৈলজানন্দের সঙ্গে তারাশঙ্করের প্রথম পরিচয় লাভপুরে থাকতেই, ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকার সুবাদে। ‘পূর্ণিমা’র লেখার জন্য মামাতো শ্যালক সত্যনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কয়েকজন সাহিত্যিকের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন সহ-সম্পাদক তারাশঙ্কর কালিদাস রায়, জগদীশ গুপ্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এমন কয়েকজন সাহিত্যিকের নাম ‘আমার সাহিত্য জীবন’ বইতেই উল্লেখ করেছেনপত্রিকাও পাঠাতেন তাঁদের। তারাশঙ্করের বয়স তখন ত্রিশেরও কম।

   প্রথম পরিচয় ১৯২৭ সালের শেষের দিকে। আষাঢ় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে ‘স্রোতের কুটো’ গল্পটি প্রকাশের কিছুদিন পর। শৈলজানন্দ তখন থাকতেন কলকাতায় মাতামহের বাড়িতে। প্রথম দেখাতেই তারাশঙ্করের মনে হয়েছিল শৈলজানন্দ আলাপি মানুষ। দেখেছিলেন প্রথমটাতে সত্যনারায়ণের সঙ্গে তাঁর ‘হিহি করে আলাপ’বীরভূমের লোক, রানিগঞ্জে অনেক কাল কাটিয়েছেন, কয়লার ব্যবসায়েও কিছুদিন শিক্ষানবিশ ছিলেন, প্রসিদ্ধ কয়লা ব্যবসায়ী লাভপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় বংশকে ভালো করেই জানতেন। তার উপর নাট্যকার নির্মলশিব নতুন খ্যাতি বংশসম্পদ যোগ করেছেন সোনার গহনায় জহরতের মতো। প্রাণ খুলে হাসতে পারেন শৈলজানন্দ। আরও একটি মহৎ গুণ সেদিন লক্ষ্য করেছিলেন, নতুনকে ভালোকে তিনি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেন, স্বীকার করেন অতি সহজে। ‘পূর্ণিমা’য় প্রকাশিত ‘স্রোতের কুটো’ গল্পের উল্লেখ করে বার বার বললেন—ভালো হয়েছে। বেশ গল্প। চমৎকার। শৈলজানন্দকে সেইদিনই চিনেছিলেন তারাশঙ্কর ‘পূর্ণিমা’য় নিজে গল্প দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি আরও বলেছিলেন—প্রেমেনকে ধরা মুস্কিল। আমি বরং তাকে বলব ‘পূর্ণিমা’য় লিখবার জন্যে। তার সঙ্গে আমার খুব সম্প্রীতি আছে। অচিন্ত্যকে আপনারা ধরবেন। এম.সি. সরকারের দোকানে পাবেন। বসে থাকে। তবে সে কি কান দেবে? এই সাক্ষাৎ পরিচয়ের আগেই তাঁর ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের দুটি গল্প পড়ে তিনি ‘রসকলি’ গল্পটি লিখেছেন এবং তখন তা ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় বিবেচনাধীন ছিল। কয়েক মাস পরে ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে কলকাতায় কল্লোল অফিসে আবার দেখা হয় তাঁদের। তখন তাঁর ‘রসকলি’ প্রকাশিত হয়েছে। তারাশঙ্করকে সানন্দে আহ্বান জানিয়েছিলেন শৈলজা। দিনেশবাবু, পবিত্র, নৃপেন্দ্রবাবুর সঙ্গে—আলাপ করিয়ে দিতে উদ্যোগীও হয়েছিলেন।

   ১৯৩৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তারাশঙ্কর কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। তখন মাঝে মধ্যেই শৈলজার সঙ্গে তাঁর দেখা হতো। তারাশঙ্কর ‘রাজা, রানী ও প্রজা’ গল্পটি লিখে পকেটে করে নিয়ে শৈলজানন্দের বাড়ির পথে রওনা দেন। বিকাল বেলা, শৈলজা তখন বের হচ্ছেন। তারাশঙ্করকে দেখেই বললেন—একটু কাজে যাচ্ছি ভাই। তাঁর ‘যোগবিয়োগ’ উপন্যাসটি শৈলজানন্দের সাহায্যেই উপাসনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে তারাশঙ্করের জীবনে একটা বড় চাকরির সুযোগ এসেছিল বম্বে টকীজ থেকে। মাঝখানে ছিলেন অধ্যাপক দীনেশ্চন্দ্র সেন। একদিন সকাল দশটার দিকে তারাশঙ্কর দীনেশ সেনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। পথে পেয়েছিলেন শৈলজানন্দকে। তিনি উঠলেন শ্যামপুকুরের মোড়ে। যাচ্ছেন নিউ থিয়েটার্স স্টুডিয়োতে। ওখানে তিনি তখন চাকরি নিয়েছেন—গল্প ও সংলাপ লেখক হিসেবে। ট্রামে শৈলজানন্দ তাঁর স্টুডিয়ো-জীবনের গল্প শোনালেন। সে গল্প দুঃখ জনক, নিউ থিয়েটার্স তাঁকে দেড়শো –কি দুশো দেয় কিন্তু অনেক অবজ্ঞাও সহ্য করতে হয়। বম্বে টকীজের চাকরিটি নেন নি তারাশঙ্কর। মনে করি শৈলজানন্দের অভিজ্ঞতা তাঁকে আত্মসচেতন হওয়ার পথে কিছুটা হলেও সহযোগিতা করেছিল।

   এমন কতবার দেখা হয়েছে তাঁদের। উভয়ের উন্মুক্ত প্রাণের বিনিময়ে জমে উঠেছে নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কত অভিজ্ঞতা কত স্মৃতি সঞ্চিত ছিল উভয়ের মধ্যে—আমাদের তা অনেক কিছুই আজানা। তারাশঙ্করের জীবনের প্রথম পর্বের একটি ঘটনার স্মৃতি চারণা করে শৈলজানন্দ বলেন, তারাশঙ্কর ক্রমে ক্রমে রাজনীতির দ্বারা এমনি প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন যে, তার মুখে রাজনীতি ছাড়া অন্য কথা ছিল না। এর জন্য একবার কারাবরণ করতেও কুণ্ঠিত হন নি তিনি। তার কারাবরণের একটি কাহিনী আমি জানি। ১৯৩০ সাল, সিউড়ির এস.ডি.ও তখন মণি সেন তারাশঙ্করের ঘনিষ্ঠ পরিচিত মানুষ ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের অপরাধে ধরা পড়েছেন তারাশঙ্কর। সিউড়ি আদালতে তাঁর বিচার হবে। মণি সেন তারাশঙ্করকে বার বার বলেছিলেন, তারাশঙ্করবাবু, আপনি একবার শুধু বলুন, রাজনীতি আপনি ছেড়ে দেবেন। এ-সব নোংরা কাজ আর আপনি করবেন না। তাহলে আপনাকে আমি ছেড়ে দেব।

   তারাশঙ্কর মাথা উঁচু করে বলেছিলেন, দেশকে আমি ভালোবাসি। আপনি একে নোংরা কাজ বলছেন? ছি!—কারাবাস হয়েছিল তাঁর। বিচারালয়ে মহকুমা শাসকের সঙ্গে তারাশঙ্করের এই কথোপকথনের কথা শৈলজানন্দকে জানিয়েছিলেন তারাশঙ্কর নিজেই।

   ১৯৪৯ সাল থেকে তারাশঙ্কর কলকাতার টালাপর্কে নিজের বাড়িতে বসবাস করতেন। শৈলজানন্দ তখন থাকতেন বাগবাজারে। তারাশঙ্কর সকালে যেতেন বাগবাজারে আর শৈলজানন্দ বিকালে আসতেন টালাপার্কে। সেই সব পুরনো দিনের কথায় শৈলজানন্দ বলেন, তার নিত্য-নৈমিত্তিক প্রোগ্রাম ছিল—প্রত্যহ সকালে আমার বাড়িতে আসা। আমার বাড়ির এক পেয়ালা চা না-খেলে তার দিন নাকি ভালো চলতো না। তাই ঝড় জল বৃষ্টি বাদল উপেক্ষা করে প্রত্যহ সে আসত আমার কাছে। কতদিন ধরে চলেছে এই যাওয়া আসা। পরে শৈলজানন্দও টালাপর্কে বাড়ি করে চলে আসেন। শৈলজানন্দর বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি পার্কসেই পার্কের ওপারেই তারাশঙ্করের বাড়ি। পার্কের ভিতর দিয়ে তারাশঙ্কর যাতায়াত করতেন আর শৈলজানন্দ জানালায় বসে দেখতেন—কত মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি।

   একদিন তারাশঙ্কর শৈলজান্ন্দর বাড়ি গেছেন। শৈলজার স্ত্রীর লীলাদেবীর মাথায় ঘোমটা ছিল না। তিনি ব্যস্ত হয়ে সরে যাচ্ছেন। তারাশঙ্কর বললেন লীলা শোনো—এ বছর থেকে ভাইফোঁটার দিন তুমি আমাকে ফোঁটা দিও। তাহলে আমি তোমার দাদা হয়ে গেলাম। তুমি হলে আমার ছোট বোন। তাহলে মাথায় ঘোমটা নিয়ে আর ব্যস্ত হতে হবে না। তখন থেকে তারাশঙ্কর প্রত্যেক বছর শৈলজার স্ত্রী লীলাদেবীর কাছে ভাই ফোঁটা নিতেন।

   তারাশঙ্কর মারা যাওয়ার বছর খানেক আগের কথা। শৈলজার বাড়ি গেছেন তিনি। শৈলজাকে দেখে বিস্মিত হলেন। মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন—দেখি দেখি ভালো করে দেখি—মুখখানা এইদিকে ঘোরাও তো। তোমার মুখটা মনে হচ্ছে যেন একটুখানি বেঁকে গেছে। কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। বলতে বলতেই ছুটলেন ডাক্তারের কাছেডাক্তার জীতেন বোস। ওই একই পাড়ার প্রতিবেশী বন্ধু। ডেকে নিয়ে এলেন তাঁকে। চিকিৎসায় সুস্থ হলেন শৈলজা কিন্তু একটা চোখ আর একটা পা আর সুস্থ হলো না। সেই মুহূর্তে তারাশঙ্কর গিয়ে না পড়লে শৈলজার অপর চোখ আর পা—কি হতো তা ভাববার ছিল

 

   বয়সে তিন বছরের ছোট হলেও সাহিত্য-ভূমিতে শৈলজানন্দের আবির্ভাব তারাশঙ্করের আগে। তিনি তারাশঙ্করের অগ্রজ প্রতীম সাহিত্যপথিক। গল্প-রচনার সূচনা পর্বে তারাশঙ্কর অগ্রজ সাহিত্যিক শৈলজানন্দের অনুসৃত পথেরই অনুসরণকারী ছিলেন; একথা তিনি যেমন আমৃত্যু শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রেখেছিলেন তেমনি সর্বসমক্ষে সগর্বে ঘোষণাও করে গেছেন তিনি নিজেই বীরভূমে অনুষ্ঠিত বীরভূম সাহিত্য সম্মেলনের ত্রিশতম অধিবেশনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাহিত্যিক সমাবেশের সম্মুখে তারাশঙ্কর ঘোষণা করেন “আজ সানন্দে বলতে পারি যে শৈলজানন্দ যদি তাঁর সাহিত্য নিয়ে আবির্ভূত না হতেন তাহলে তাঁর পথরেখা অনুসরণ করে আমি সাহিত্যের অঙ্গনে উপস্থিত হতাম কিনা সন্দেহ”।

   তারাশঙ্কর যেদিন বীরভূম জেলার সিউড়িতে দাঁড়িয়ে একথা বলছিলেন শৈলজানন্দ তখন তাঁর কলকাতার বাড়িতে। সভা থেকে ফিরে গিয়ে সভাপতির মুদ্রিত ভাষণটি শৈলজানন্দের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “পড়ে দ্যাখো কি লিখেছি”।

   লজ্জিত হয়েছিলেন শৈলজানন্দ।

   তারাশঙ্করের মতে—সাহিত্যিক সত্যের কমাণ্ডো। শৈলজানন্দকেও সেদিন বলেছিলেন, ‘সত্য কথা লিখতে আমি কখনো ভয় পাই না’। তাঁর শৈলজানন্দ-অনুসরণের সেই সত্যটুকু জানা আজ আমাদের একান্ত ইচ্ছা।

   তারাশঙ্কর কবিতা খুব কম লিখেছেন; গল্প, উপন্যাস এবং নাটক রচনা নিয়েই তাঁর সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা। তারমধ্যে ছোটগল্প সাহিত্যের ইতিহাসে তারাশঙ্কর শৈলজানন্দের অনুসৃত পথের অনুসরণকারী। তারাশঙ্করের ছোটগল্পের একটি বিশিষ্ট গুণ হল তার আঞ্চলিকতা। বীরভূম তথা রাঢ়বঙ্গের একটা সামগ্রিক রূপ তাঁর গল্পে প্রতিফলিত। সেই আঞ্চলিকতার আস্বাদ তিনি প্রথম পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে কিন্তু তার ভৌগোলিক রূপরেখা নির্মাণের চেতনা পেয়েছিলেন  প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং শৈলজানন্দের দুটি গল্প পাঠে। ‘রসকলি’ গল্প থেকেই তার প্রকাশ। এর আগে কবিতা, নাটক, কিছু রম্যরচনা এবং দুটি উপন্যাস লিখলেও তারাশঙ্করের গল্প বলতে কেবল—‘স্রোতের কুটো’ গল্পটি আষাঢ় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গল্পটি লিখে খুশি হতে পারেন নি তিনি। নতুন পথের সন্ধান করছিলেন—হয় ‘পূর্ণিমা’ থেকে বেরিয়ে আসবেন, না হয় নিজেকে যুগোপযোগী করে তুলবেন। এই সময় ‘কালিকলম’ পত্রিকায় প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়—দুই গল্পকারের দুটি গল্প পড়ে তিনি গল্প লেখার নতুন পথের সন্ধান পেয়েছিলেন। অগ্রহায়ণ ১৩৭৫ বঙ্গাব্দে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আমি কি করে লেখক হলাম’ নিবন্ধে তারাশঙ্কর নিজেই বলেছেন—“গল্প দুটি পড়ে পেয়েছিলাম নতুন স্বাদ, নতুন গন্ধ, নতুন স্পর্শ, যাকে নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়া বলে তাই হয়ে গিয়েছিলাম এবং স্থির করেছিলাম, দেখি এমন গল্প লিখতে পারি কিনা। বাড়ি ফিরে এসে একটি গল্পও লিখেছিলাম। নাম দিয়েছিলাম রসকলি।”

   ‘প্রবাসী’র দপ্তরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকার পর ‘রসকলি’ প্রকাশিত হয় ফাল্গুন ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। গল্পটি প্রকাশের পর কলকাতার সারস্বত সমাজে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় প্রকাশ পায় সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনি এতদিন চুপ করিয়া ছিলেন কেন?’ কলকাতায় রসকলি’র যথেষ্ট প্রশংসা হয় এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার জন্য গল্প লেখার আমন্ত্রণ পান। এখন আমাদের কৌতূহল—তারাশঙ্কর কোন কোন গল্প পড়ে রসকলি রচনার পাথেয় পেয়েছিলেন? প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় দুজনের গল্প পড়ে রসকলি লিখলেন—অথচ তিনি শৈলজানন্দ অনুসরণকারী হিসেবে পরিচিত হলেন; এর রহস্য কোথায়?

  ‘আমার সাহিত্য জীবন’ বই থেকে জানা যায়, ইংরেজি ১৯২৭ সালের মাঝামাঝি প্রায়, বাংলা ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ-ভাদ্র; রাজনীতির বিষয় নিয়ে তারাশঙ্কর উপস্থিত হয়েছিলেন জেলার সদর শহর সিউড়িতে—সম্ভবতঃ গোপিকাবিলাস সেনগুপ্ত নামে এক নেতার বাড়িতে। পেশায় উকিল সেই নেতার বাড়িতেই রাত্রি কাটাতে হয় তাঁকে। উকিলের বাড়িতে শুয়ে আছেন তারাশঙ্কর কিন্তু মশার কামড়ে ঘুম আসে না। রাত জেগে বসে থাকেন—বিড়ি টানেন আর গুন গুন করে সুর ভাঁজেন। তাঁর শয়নকক্ষে এখানে ওখানে কাগজের গাদা স্তূপীকৃত ছিল। সময় কাটাবার ভালো উপায়—বই-ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টানো। তারাশঙ্করও তাই করলেন। হঠাৎ হাতড়ে মিলল একখানা মলাট-ছেঁড়া ‘কালিকলম’ পত্রিকা। হ্যারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে দিলেনচোখে পড়ল অদ্ভুত নামের একটা লেখা এবং লেখকের নামটা অদ্ভুত না হলেও বিচিত্র। ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’, লেখক শ্রীপ্রেমেন্দ্র মিত্র। পড়ে ফেললেন গল্পটিবিচিত্র বিস্ময়পূর্ণ রসমাদকতায় মন মদির হয়ে গেল। মশকের গানে বা দংশনেও কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারলে না তাঁর আবার পাতা ওল্টালেন। পেলেন আর একটি গল্প। তারাশঙ্করের নিজের কথা, “গল্পটির নাম মনে নেই। লেখক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়”গল্পটির কথা না জানিয়ে তারাশঙ্কর সাহিত্য জীবনের পাতায় একটা রহস্যের মোড়ক রেখে গেলেন—অথচ ঘোষণা করলেন,  “অদ্ভুত! বীরভূমকে এমনি করে কলমের ডগায় অক্ষরে অক্ষরে সাজিয়ে রূপ দেওয়া যায়!” গল্পে বীরভূমের রূপচিত্রণে বিস্মিত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর। মন্তব্য প্রকাশে বিস্ময়সূচক চিহ্নও ব্যবহার করেছেন। সেদিন সেই রাত্রেই তাঁর ইচ্ছে হয় ‘এমনি গল্প লিখব’ সেই ইচ্ছা হওয়ার পর তাঁর প্রথম গল্প ‘রসকলি’নিজের জমিদারি মহল বেলেড়া গ্রামের নিজের চোখে দেখা কমলিনীকে নিয়ে লিখলেন এই গল্পটি। তখন থেকেই তিনি গল্প লেখার সোনার কাঠির স্পর্শ পেলেন।

   অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘কালিকলম’ পত্রিকায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ গল্পটি ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের জৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। আর সেই সংখ্যাতেই শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘বেনামী বন্দর: জনি টনি’ নামেও একটি গল্প প্রকাশিত হয়। তারাশঙ্কর প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ গল্পটির কথা বলেছেন; কিন্তু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কথা বললেও তাঁর কোন গল্পটি পড়েছিলেন—সে বিষয়ে কোনো কথা বলেন নি। তারাশঙ্কর অনুসন্ধানকারী সারস্বত সমাজ পত্রিকার ওই সংখ্যাটিকেই গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের অভিমত আরোপ করে বলেছেন—“প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘বেনামী বন্দর : জনি ও টনি’ গল্প পড়ে তিনি আধুনিক যুগের ছোটগল্পের রূপ ও রীতির পরিচয় পান।” কিন্তু বড় বিস্ময়ের বিষয়, ওই গল্প দুটি পড়ে বীরভূমকে কলমের ডগায় অক্ষরে অক্ষরে সাজিয়ে রূপ দেওয়ার কথা তারাশঙ্কর কেন ভেবেছিলেন তার কোনো ব্যাখ্যা তাঁরা দেন নি। এ বিষয়ে ‘বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প ও গল্পকার’ বইতে ভূদেব চৌধুরী বলেছেন—

   “তারাশঙ্করের উপলব্ধি অযথার্থ নয়। স্রস্টা যেমন আপন মনের মাধুরী মিশায়ে বাস্তব জীবনকে শিল্প-রূপায়িত করেন, রসিক পাঠকও তেমনি তাকে আস্বাদন করেন আপনার চিত্তবৃত্তির আনুকূল্যে, নিভৃত চিত্ত-বাসনার সুরভিতে মদির করে। তারাশঙ্কর কেবল রসিক সাহিত্য-পাঠক নন,—সিদ্ধকাম সৃষ্টির প্রেরণা তাঁর অধিগত সহজ শক্তি। আর সেই সৃজনী-স্বভাবে মনে-প্রাণে তিনি ‘দক্ষিণপূর্ব বীরভূমের’ আঞ্চলিক জীবন-শিল্পী। শৈলজানন্দের গল্প-দেহের মুকুরে সেদিন নিজের আত্মপ্রতিকৃতিকে প্রথম আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন তারাশঙ্কর—এ ঘটনাও উপেক্ষণীয় নয়।”

     প্রণম্য অধ্যাপক স্বর্গীয় ভূদেব চৌধুরি মহাশয় আমার কয়েকদিনের শিক্ষক। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়কালে তিনি অবসর প্রাপ্ত; তথাপি পরে কলেজজীবনে আমার শিক্ষকতার সূচনাপর্বে আমি তাঁর কাছে একটি দিন পাঠ গ্রহণে ধন্য হয়েছিলাম। অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা ‘পথে প্রবাসে’ বইটির কোনো ‘রেফারেন্স বুক’ তখন বাজারে পাইনি। সেই বইয়ের পাঠ নিয়েছিলাম অধ্যাপক ভুদেব চৌধুরির বাড়িতে গিয়ে। তাঁর স্নেহ-সিঞ্চনে ‘পথে প্রবাসে’ আমার কাছে প্রাঞ্জল হয়ে আছে আজও। পরে আমার ব্যক্তিগত জীবন-জিজ্ঞাসায় কয়েকখানি চিঠিও লিখেছিলেন আমাকে—যা আজও আমার কাছে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে  তাঁর প্রতি আমার ভক্তি-চিত্তের শ্রদ্ধা আছে, তথাপি তারাশঙ্করের শৈলজানন্দ পাঠ সম্পর্কে তাঁর ওই অভিমত বিষয়ে আমাদের দ্বিমত রয়েছে। শৈলজানন্দের গল্পে তারাশঙ্করের আত্মপ্রতিকৃতি আবিষ্কারের কোন রহস্যকে উদ্ঘাটিত হতে তিনি দেখেছিলেন—সেকথাও তিনি বলেন নি।

   

   সাহিত্য পথে আত্মপ্রতিষ্ঠার আকুল আকাঙ্ক্ষা তারাশঙ্করের ছিল; কিন্তু কেবলমাত্র ১৯২০ থেকে রসকলি লেখার পূর্ব পর্যন্ত সময়ের সমীক্ষায় বলা যায়, এই সময় তারাশঙ্কর জমিদার হয়েও অহিংসাপন্থী এবং সাম্যবাদী এক সমাজসেবী মানুষ। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি সমাজ সেবা করে বেড়ান। গান্ধী আদর্শে আসার আগে কমরেড লেনিন ছিলেন তাঁর স্বপ্নে দেখা নায়ক। তারাশঙ্করের মনে ও মস্তিষ্কে তখন লাভপুর তথা বীরভূম ভূগোলের মানচিত্র অঙ্কিত ছিল। বীরভূমের ত্রিশ-চল্লিশখানি গ্রামে তখন তিনি ঘুরেছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আপনজন হয়ে মিশেছেন; বঙ্গীয় সাহিত্য-সম্মিলনের অনুষ্ঠানে কবিতার আখরে বীরভূমের মানচিত্রকেই তুলে ধরেছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ পড়ে বিস্ময়ে চমকে উঠেছিলেন, কারণ—সেখানে তিনি পেয়েছিলেন— মাটির অতি সাধারণ মানুষকে, যে মানুষ তার অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম করে চলেছে অবিরাম। ‘রসকলি’ গল্পটি সম্পূর্ণ করার পর তাঁর মনে হয়েছিল “আমার মনে যে মানুষগুলি আছে তাদের বাইরে এনে জীবন্ময় করে জীবনের হাটে মুক্তি দেওয়ার সোনার কাঠি পেয়েছি”। সেই পর্বে তারাশঙ্করের অন্তরের অন্তস্থলে উপস্থিত মানুষগুলির শিল্পিত চিত্রকে দেখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পে। কিন্তু কুকুর ও কুক্কুরীকে নিয়ে লেখা ‘জনি ও টনি’ গল্পটিতে—জৈবজীবনের একটি বাস্তবনিষ্ঠ চিত্র ভিন্ন তারাশঙ্কর আর কিছু পেয়েছিলেন বলে মনে করার কোনো অবকাশ নেই। এখানে তারাশঙ্করের উপলব্ধির মহিমা ঘোষণার মধ্যে কষ্টকল্পিত ব্যাখ্যা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মাত্র।

   আমরা দেখেছি, মলাট-ছেঁড়া কালিকলম-র কথা বলেছেন তিনি। কালিকলম-র সদ্য প্রকাশিত সংখ্যাটির মলাট ছেঁড়া অস্বাভাবিক নয়, আবার বছর খানেক পূর্বে প্রকাশিত সংখ্যাটি মলাট ছেঁড়া হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তেমন কথাই তারাশঙ্কর জানিয়েছিলেন কালিকলম পত্রিকার সম্পাদক মুরলীধর বসুকে। মুরলীধর বসু এক সাক্ষাৎকারে হরপ্রসাদ মিত্রকে বলেছিলেন—

তারাশঙ্কর সে সময়ে একবার সিউড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে ‘কালিকলম’ এর ছেঁড়া পৃষ্ঠায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ এবং শৈলজানন্দের ‘জোহান-এর বিহা’ গল্প দুটি তাঁর চোখে পড়েছিল বলে শুনেছি।

 

    ১৯২৮ সাল থেকে তারাশঙ্করের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন এই মুরলীধর বসু গল্প প্রকাশ, গল্পের আলোচনা, বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো—সব দিক থেকেই সেই নিবিড় একাত্মতার পরিচয় পাওয়া যায়। উভয়ের মধ্যে পত্রবিনিময়ও শুরু হয় তখন থেকেই।

   ‘জোহানের বিহা’ বৈশাখ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে, ‘কালিকলম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়গল্পে আছে—আদিবাসী জীবনের চিত্র, ‘বাহা’ পরবের বর্ণনা; অজয়নদ পেরিয়ে ‘বীরভুঁই’এর লালমাটির পথে মানুষের আনন্দময় চলাচলবীরভূমের এই পটচিত্রে বোধ হয় তারাশঙ্কর দেখে থাকবেন তাঁর মন ও মানসিকতার চিন্ময়-চিত্রকে। সাহিত্যপথের নব-পথানুসন্ধানী তারাশঙ্করের অন্তরাত্মায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সেই ছবি। তখনই তিনি ‘অদ্ভুত’ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে—‘বীরভূমকে এমনি করে’ সাজিয়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন—এমন কথাই ভাবতে পারি ‘কল্লোলযুগ’ গ্রন্থে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত লিখলেন, “পৃষ্ঠা ওল্টাতে পেল সে আর একটা গল্প—শৈলজানন্দের লেখা। গল্পের পটভূমি বীরভূম, তারাশঙ্করের নিজের দেশ।... বাংলাসাহিত্যে নবীন জীবনের আভাস আস্বাদ পেয়ে জেগে উঠল তারাশঙ্কর”। তারাশঙ্করের গল্পসাহিত্যে বীরভূম ভূগোলের যে মানচিত্র অঙ্কিত হয়েছে—তার উৎসমূলে মনে করি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের পাণ্ডু-রেখাঙ্কনই অনুসৃত হয়েছে। এখানে কথিত দুই গল্পের কুশীলব অন্ত্যজ জীবন থেকে তুলে আনা। তারাশঙ্কর সেই অন্ত্যজ জীবন-চিত্রের কথা ভাবলেন কিন্তু কেবলমাত্র গল্প লিখতেই চাইলেন না; তিনি চাইলেন কলমের ডগায় বীরভূমকে সাজিয়ে তুলতে। সেইজন্যই বোধকরি শৈলজানন্দের ‘জোহানের বিহা’ গল্পে আদিবাসী জীবনচিত্র সহ বীরভূমের মানচিত্র তারাশঙ্করকে আকর্ষণ করেছিল অধিক সাহিত্যিক শৈলজানন্দ এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প-ভাবনাকে অনুসরণ করে তারাশঙ্করের সাহিত্য পথের নতুন যাত্রা শুরু;  তথাপি প্রেমেন্দ্র মিত্র নয়, গল্প-সাহিত্যে তারাশঙ্কর শৈলজানন্দের অনুসৃত-পথের অনুসরণকারী এর রহস্যও বোধকরি এখানেই নিহিত।

 

 

   তারাশঙ্কর শৈলজানন্দের অনুসরণকারী কিন্তু অনুকরণকারী নন। শৈলজানন্দ তাঁর গল্পসাহিত্যে যে আঞ্চলিকতাকে গ্রহণ করেছেন, সেই পথ ধরেই গল্পকার তারাশঙ্করের পথ চলা। তথাপি তারাশঙ্করের গল্পের ভূগোল আরও অনেক পিনদ্ধ এবং তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার যেন অশেষ অন্তহীন। শুধু তাই-ই নয়, সেই বিনিদ্র রজনীতে গল্প পাঠের সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ-বর্জনের হিসাব-নিকাশে নিজস্ব পথরেখাটিও নির্ণীত করে নিয়েছিলেন তিনি। ‘আমার সাহিত্য জীবন’ বইতে নিজেই সে কথার উল্লেখ করে বলেছেন—

   “সেদিন রাত্রে দেখলাম ওই লেখাগুলির সঙ্গে আমার স্রোতের কুটোর ঢং-এর বেশ মিল আছে। তবু একটা কথা মনে হয়েছিল—মনে হয়েছিল গল্পগুলির আত্মা যেন জৈবিক বেগের প্রাবল্যে বেশি অভিভূত;—পরাভূত হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হয় না। এমনকী ওই আবেগের সঙ্গে যে-দ্বন্দ্ব তার স্বাভাবিক ধর্ম, তারও অভাব রয়েছে বলে মনে হল। জীবদেহ আশ্রয় করেই জীবনের বাস। কিন্তু সে তো তাকে অতিক্রম করার চেষ্টার মধ্যেই মানবধর্মকে খুঁজে পেয়েছে! সেইখানেই তো নিজেকে পশুর সঙ্গে পৃথক বলে জেনেছে। ইচ্ছে হল এমনি গল্প লিখব। সত্যকারের রক্তমাংসের জীবদেহে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা—তার কামনার ধারার সঙ্গে মিশেই চলেছে। জীবন চলেছে একটি স্বতন্ত্র ধারায়। কোথাও জিতেছে কোথাও হারছে।”

   তারাশঙ্কর সাহিত্যে আঞ্চলিকতার আস্বাদটি প্রথম পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের গল্প পাঠে, উপস্থাপনা-আধারের আয়তনিক আকারটিকে শিল্পরূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখলেন শৈলজানন্দের গল্প পাঠে। আর নিজের পরিচিত ও মেলামেশার মানুষগুলিকে নিয়ে যে গল্প লেখা যায়—তার যেন বাস্তবিক প্রমাণ পেলেন প্রেমেন্দ্র ও শৈলজার গল্প পাঠে অনুসরণের পথে এই পটভূমি ও পুতুলের ধারণা বাদে বাকিটুকু তাঁর নিজস্ব। মৃন্ময়ীকে প্রাণসঞ্চারে চিন্ময়ী করার পন্থায় নিজ-নির্মিত পথে ও নিজস্ব রীতিতে তাদের চক্ষুদান করলেন তারাশঙ্কররসকলি গল্প লিখে তাঁর মনে হয়েছিল—“কেমন করে আচম্বিতে পৃথিবীর মায়াপুরীতে এটা-ওটা নাড়তে নাড়তে সোনার কাঠি কুড়িয়ে পেলামযার স্পর্শে অসাড় মানুষ ঘুম ভেঙে ফুটে ওঠে ফুলের মতো।” কমলিনী বৈষ্ণবীকে জৈবরসের দিঘীতে ডুবতে দিলেন না, বিকশিত শতদলের মতো জলের উপরে ভাসিয়ে রাখলেন তাকে। এইখানেই প্রেমেন্দ্র ও শৈলজানন্দকে অনুসরণ করেও তাঁদের পথ থেকে সরে এক স্বতন্ত্র পথের পথিক হয়ে উঠলেন তারাশঙ্কর। আমরা জানি সাহিত্যসৃষ্টিতে প্রতিমার চক্ষুদানই শিল্পীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। সেই চক্ষুদানের ক্ষমতা যদি না থাকত, তাহলে রাঢ়দেশ নিয়ে তারাশঙ্কর সারাজীবনে যতকিছু লিখে গেছেন তা একটি বিশেষ অঞ্চল আর সময়ের দলিলধর্মী বিবরণের বেশী মূল্য ভাবীকাল পেত না। শিল্প-প্রতিমায় চক্ষুদান প্রসঙ্গে তারাশঙ্করের এই কৃতিত্বের কথা বলে গেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র স্বয়ং।

   পাত্র-পাত্রীর জীবনের সঙ্গে শিল্পীচিত্তের তন্ময়তাযোগে জীবনকে দেখার এই দৃষ্টি তারাশঙ্করের নিজস্ব। মোহিতলাল মজুমদারের ভাষায় তারাশঙ্করের এই দৃষ্টি—‘বৈজ্ঞানিক তান্ত্রিকের দৃষ্টি’ আসলে তারাশঙ্কর মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ‘এক কল্যাণ-স্নিগ্ধ সত্য-সুন্দর জীবন-পরিণামকে’। তাই পুতুল প্রতিমার চক্ষুদানে সেই সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন প্রথমাবধি। সাহিত্যে শৈলজা-অনুসরণের স্বীকারোক্তিতেও শিল্পী-ব্যক্তিত্ব সেই একই মহিমাকে মহিমান্বিত করেছেন।

-------------------

 

 

 

 

 

 

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের নিবন্ধ --"তাঁর জননী তাঁর দীক্ষাগুরু"

 

 

তাঁর জননী তাঁর দীক্ষাগুরু

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

দীক্ষা মানে মন্ত্রগ্রহণে দেহের সূচিতা নয়; তাঁর মতে—“জীবনে বিশেষ একটি মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন করাটাই দীক্ষাগ্রহণ এবং সেই মতবাদসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবন ও জগৎকে দেখা, বুঝতে পারা এবং সেই মতবাদ অনুমোদিত পন্থায় নিজের জীবনযাত্রা নির্বাহ করাই হল জীবন সাধনা”

     নিজের দীক্ষা সম্পর্কে এমন অভিমত দিয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়অনেক ব্যাকুলতা নিয়ে অনেক মন্ত্রগুরুর কাছে আবেদনের পর ১৮৫৪ সালে ছাপান্ন বছর বয়সে তারাশঙ্কর তাঁর জননী প্রভাবতীদেবীকে গুরুর আসনে বসিয়ে প্রচলিত প্রথায় দীক্ষামন্ত্র গ্রহণ করেন। তাঁর জননী তাঁর দীক্ষাগুরু পিতা ও মাতা শ্রেষ্ঠ গুরু এমন কথা আমরা মুখে বলি কিন্তু তারাশঙ্কর বাস্তবিক নিজের জীবনে তা প্রমাণ করে দেখিয়ে গেছেন। প্রায় বৃদ্ধ বয়সে সারস্বত সাধনার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত তারাশঙ্করের দীক্ষা গ্রহণের এই দৃষ্টান্ত—দীক্ষা পথে বিশ্বাসী বঙ্গের তথা ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের কাছে তুলে ধরার মতো এক উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা বলেই মনে করতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, সরাসরি কোনো আকস্মিক আবেগে তারাশঙ্কর তাঁর অন্তর্জীবন গঠনের এমন গুরুত্বপূর্ণ মৌল সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেননি। জননীর কাছে দীক্ষা গ্রহণের সময় পর্যন্ত তারাশঙ্করের গুরু অনুসন্ধানের ধারাবাহিক একটা চিত্র রয়েছে। সেই চিত্র দর্শনে জানা যায়, বাস্তবিক অনুসন্ধানের একাধিক পারাবার পার হয়ে এমন শুচিসিদ্ধ মানস সরোবরে স্নাত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর।

 

১৯২৯ সালের আষাঢ় মাস, তারাশঙ্করের বয়স একত্রিশ বছর; জাতীয় আন্দোলনে তখন তিনি তাঁর অঞ্চলের এক অন্যতম নেতা। সেই সময়কালে সংঘটিত আকস্মিক এক তন্ময়তার সূত্র ধরে তারাশঙ্কর তাঁর জীবনে প্রথম গুরুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন একদিন একজন আত্মগোপনকারী রাজনৈতিক কর্মী তাঁর সঙ্গে গোপনে দেখা করতে আসার কথা জানিয়েছিলেন। সন্ধ্যার ট্রেনে নামবেন। আষাঢ় মাসে কৃষ্ণপক্ষের রাত্রে আগন্তুকের অপেক্ষায় তারাশঙ্কর ধ্যানমগ্ন হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ট্রেন চলে যাওয়ার পর অনেক রাত্রে সর্বাঙ্গ আবৃত কোনো ব্যক্তিকে আসতে দেখেন তিনি। আগন্তুক তারাশঙ্করের সামনে মুহূর্তমাত্র দাঁড়িয়ে আবার চলতে শুরু করেন। তাঁকে অনুসরণ করে এক নিবিড় তন্ময়তায় তারাশঙ্করও চলতে থাকেন। বর্ষার গভীর অন্ধকার রাত্রি—শেয়াকুল কাঁটার জঙ্গল, নেকড়ে এবং ভয়ানক সাপের ভয়কে তুচ্ছ করে আগন্তুকের সঙ্গলাভ তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্যপথে হঠাৎ করে শেয়াকুল কাঁটায় আটকে তাঁর তন্ময়তা ভঙ্গ হয়। দেখেন ধারেপাশে কেউ তো নেই। নিজেকে প্রশ্ন করেন—কাকে দেখলাম? কি দেখলাম? পরে জানতে পারেন যাঁর আসার কথা ছিল তিনি আসেননি। তারপর কতদিন সন্ধ্যায় সেই স্থানে গিয়ে তাঁর প্রতীক্ষা করেছেন তারাশঙ্কর কিন্তু তাঁর দেখা পাননি। দেখা না পেলেও তারাশঙ্কর বলেছেন, “তার কিছু ফল সে আমাকে দিয়ে গিয়েছে। সে ফল ‘তন্ময়তা’ যোগ। তার আস্বাদ আমি পেয়েছি। আমার সাহিত্যজীবনে সাধনকর্মে সে-ই আমার সবচেয়ে বড় সম্বল”। পরে ঘটনার কথা শুনে তারাশঙ্করকে তাঁদের গুরুবংশের সতীশ ভট্টাচার্য বলেছিলেন—“তোমার জীবনে সেদিন একটি পরম লগ্ন এসেছিল। তোমার দীক্ষা হয়ে থাকলে তুমি সেদিন পরমবস্তু পেতে পারতে”।

     সেই তন্ময়তার সূত্রেই বোধ হয় দীক্ষার কথা ভেবেছিলেন তারাশঙ্করতাঁদের পারিবারিক কুলগুরুর শেষপুরুষ সতীশ ভট্টাচার্য ছিলেন তন্ত্রপথের মানুষ এবং কালীকুলের সাধকতাঁর কাছেই প্রথম দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই কুলগুরুর তল্পি বহন করেছেন, তারাপীঠ শ্মশানে তাঁর চক্রাসনের যোগাড় করে দিয়েছেনসতীশ ভট্টাচার্য তাঁকে বলেছিলেন—শক্তিমন্ত্রে তোমাকে দীক্ষা নিতে হলে ‘তারা’ মন্ত্রে নিতে হবে। শক্তিমন্ত্রে তারাই হলেন সরস্বতী। তারার অপর নাম হল—নীল সরস্বতী। কালী হলেন মহালক্ষ্মী। কুলগুরুর এই কথা মেনে নিয়েছিলেন তারাশঙ্করমনে করেছিলেন—‘শক্তিমন্ত্রে দীক্ষাই যদি নিই, তবে এই মন্ত্র ছাড়া আর কোন মন্ত্র আমি নিতে পারি?’ কিন্তু সতীশ ভট্টাচার্য তারাশঙ্করকে ‘তারা’ মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণের কথা বললেও দীক্ষা তাঁকে দেননি। বলেছিলেন—‘এ-পথে তোমার তৃপ্তি হবে না বাবা’। তারাশঙ্কর তখন সাহিত্যচর্চা করলেও রাজনীতির দিকেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। এই জন্যই বোধ হয় তিনি জানিয়েছিলেন—

তোমার মন ছুটেছে আলাদা সড়ক ধরে। তার দুধারে বাড়ি, কাতারে কাতারে লোক। এ পথ যে জনমানবহীন পথ। আর দশজন যেমন, তোমার ধাত তেমন হলে আমি ‘না’ করতাম না। দিতাম কানে ফুঁ। ব্যবসা, তেজারতি, চাষ, মামলা—দেওয়ানি ফৌজদারি করে ঘরে ফিরে কাপড় ছেড়ে আসনে বসে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বীজমন্ত্রটি স্মরণে এনে জপে বসে যেতে ; কারণের বোতল পেলেই ‘কালী কালী বল মন’, ‘জয় তারা’ বলে অকারণে চক্রের নামে কুচক্রে বসে যেতে। বাবা, আমরা তান্ত্রিক বামুন পণ্ডিত লোক, ইংরেজি মত বুঝি না, মনে করি—ওতে ইহলোকের খুব ভালো মন্ত্র আছে। একশোটা ধনদা-কবচ ধারণ করলে যা না-হবে, ওই মতে দীক্ষা নিলে তাই হবে। তবে ও মন্ত্রে তার পর এগিয়ে যাওয়া বড়ো কঠিনযারা চেষ্টা করে, তারা প্রায় দেখি নাস্তিক হয়ে যায়, তুমি বাবা সেই পথ ধরেছ। খানিকটা না এগুলে তোমার যে কী মতি হবে, তা তো বুঝতে পারছি না। যারা একপা এ-পথে, একপা ও-পথে ফেলে চলে, ইহকালের জন্যে ইংরিজি মত আর পরকালের জন্যে দেশি মত ধরে, তাদের ধরণের মানুষ তুমি নও। কাজেই মন্ত্রদীক্ষা এখন তোমার নেওয়াও উচিত নয়; আমার দেওয়াও উচিত নয়আগে তোমার মন স্থির হোক।

 

     কুলগুরুর উপদেশ তারাশঙ্করের মনে রেখাপাত করেছিল। সাময়িক নীরব হয়েছিলেন তিনি।

 

১৯৩২ সালে তারাশঙ্করের ছ-বছরের একটি কন্যা মারা যায়। কন্যাশোকের ব্যাকুলতা তারাশঙ্করকে বিভ্রান্ত করে তোলে। বিদীর্ণচিত্ত তারাশঙ্কর আত্মার শান্তি কামনায় আবার গুরুর সন্ধান করেছিলেন। তখন সদ্য আলাপ হয়েছিল তন্ত্রমার্গের বিজ্ঞ মানুষ কবি মোহিতলাল মজুমদারের সঙ্গে। দু-একবার ঢাকার বাড়িতে গিয়েও মোহিতলালের সাধনার আসন দেখে এসেছিলেন তারাশঙ্করতাঁর চরিত্র, তাঁর সাধনার নিষ্ঠা, জীবন ও জগৎ-রহস্য উদ্ঘাটন করে তার লীলা প্রত্যক্ষ করার বিচিত্রদৃষ্টিতে তারাশঙ্কর এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে মোহিতলালের কাছে দীক্ষা নেওয়ার বাসনা জাগে তাঁর। চিঠিতে লিখেছিলেন—আমি দীক্ষা গ্রহণের জন্য গুরু অনুসন্ধান করছি। আপনি কি আমাকে দীক্ষা দিতে পারেন?

    মোহিতলাল জেনেছিলেন তারাশঙ্করের শক্তিতন্ত্রের উপাসক বংশের সন্তান। সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন—‘আপনি নিজে তন্ত্রসাধনা করেছেন?’

    তারাশঙ্কর উত্তর দিয়েছিলেন—‘দীক্ষা হয়নি, তবে গুরুর তল্পি বয়ে বেড়িয়েছি’।

    তারাশঙ্করের রাজনৈতিক জীবনের কথা শুনে অপ্রসন্ন মোহিতলাল বলেছিলেন, “এ-পথে চলতে হলে ও-সংস্রব চলবে না। ধর্ম নইলে মানুষ বাঁচে না, প্রতিটি মানুষেরই একটা-না-একটা ধর্ম আছে, কিন্তু যারা ধর্মপ্রচারক হয় তারা নিজেরাই ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট, ধর্মকে প্রতিষ্ঠা দিতে হয়—নিজের অন্তরে দাও। অন্যের অন্তরে তাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার চেষ্টা যখনই করবে তখনই হবে অধর্ম! তাছাড়া, রাজনীতি হল সাময়িক—কালে কালে পাল্টায়, কিন্তু সাহিত্যধর্ম শাশ্বত।” 

     একবার জানতে চেয়েছিলেন—‘কারণ করেছেন কখনও?

     তারাশঙ্কর জানিয়েছিলেন—না। সে করিনি। আমাদের কুলগুরু আমার মানসিক গতি দেখে নিষেধ করে বলেছিলেন, সে-মন তোমার নয়। মনের গতির পরিবর্তন না হলে এ-পথে পা দিয়ো না। তারাপীঠে চক্রাসনের কথা বলেছিলেন তারাশঙ্কর। বলেছিলেন চক্রের পাশে বসে চক্রের উপকরণ জুগিয়েছি। চক্র দেখেছি। তারাপীঠের সাধকদের চক্রের কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন মোহিতলাল। বলেছিলেন—‘অদ্ভূত ব্যাপার’। পরে ঢাকা থেকে চিঠিতে তারাশঙ্করকে লিখেছিলেন—আপনার উপর প্রত্যাশা রাখি, তাই চিন্তাও হয়। যে সর্বনাশা ছোঁয়াচ একবার আপনার লেগেছিল তা সহজে মানুষকে রেহাই দেয় না। বার বার সাবধানবাণী উচ্চারণ করছি সেই কারণে

     সামাজিক ভাবে মোহিতলাল ছিলেন বৈদ্য।  ব্রাহ্মণ সন্তানের বৈদ্যগুরুর কাছে দীক্ষা নিতে চাওয়া সামাজিকতায় অবৈধ। একমাত্র সন্ন্যাসী গুরুর ক্ষেত্রে সেই বাধা থাকে না। কারণ, সন্ন্যাসীর জাতি নেই, বর্ণ নেই, ইহলোক-পরলোক কিছুই নেই—আছে শুধু তপ এবং সাধনা। সেই তপ এবং সাধনা তাঁর কাছে সকলেই গ্রহণ করতে পারে, তিনিও বিতরণ করতে পারেন। বিকৃত বর্ণাশ্রম ধর্মের গণ্ডিকে লঙ্ঘন করার মতো সাহস ও ইচ্ছা তারাশঙ্করের ছিল। আবার জ্ঞানযোগে মোহিতলালের দৃষ্টির গভীরতা, ধ্যানযোগের মতো সাহিত্যতন্ময়তা, নিজের মতের দৃঢ়তা, জগৎ ও জীবন ব্যাখ্যায় সূচিতা ও অসূচিতার ঊর্দ্ধস্তরের অনুভূতি অথচ তার প্রকাশে জ্যোতির্ময় পবিত্রতার ধারণা, সাধনফল সম্পর্কে নির্লোভ অনাসক্তি দেখে মোহিতলালকে একজন গৃহী সন্ন্যাসী বলেই মনে হয়েছিল তারাশঙ্করের। সেই ভেবে মোহিতলাল মজুমদারের কাছেই দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন তারাশঙ্কর। মোহিতলাল সম্মত হননি। চিঠিতে লিখেছিলেন—দীক্ষা নিয়ে কী করবেন? দীক্ষায় আমার নিজের কোনও বিশ্বাস নাই। আমার দীক্ষা সাহিত্যের দীক্ষা, সে মন্ত্র আপনি স্ফুরিত হয়। অন্তরে বীজ থাকলে সাধনার উত্তাপে নিষ্ঠার অভিসিঞ্চনে সে বীজ আপনি উপ্ত হবে, মন্ত্র-চৈতন্য আপনি ঘটবে। বিষণ্ণ তারাশঙ্কর দীক্ষার বিষয়ে মোহিতলালকে আর কখনও কিছু লেখেননি।

     তন্ত্রে বিজ্ঞ মোহিতলাল মূলতঃ সাহিত্যিক। মোহিতলালের কাছে তারাশঙ্কর সারস্বত-তন্ত্রমতে দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন এই রীতি ভারতবর্ষের প্রাচীন রীতিমহাকবি বাল্মীকি এবং মহর্ষি বেদব্যাসের জীবন থেকে তার আভাস পেয়েছিলেন তারাশঙ্করএ বিষয়ে তাঁর অভিমত—“তাঁদের জীবনে যে-পরিশুদ্ধতা, যে-প্রসন্নতা, যে-শান্ত কাঠিন্য আমরা দেখতে পাই, তাঁদের যে মহর্ষিত্ব স্বীকারে কোনো সংশয় জাগে না, তার একটি সাধনপন্থা নিশ্চয় আছে। সে পথ ও সে-তন্ত্র পরবর্তীকালে যেন হারিয়ে গেছে  কালিদাস মহাকবি, কিন্তু মহর্ষি আখ্যা পাননি। অথচ নতুনকালে রবীন্দ্রনাথ ঋষিত্ব অর্জন করলেন আমাদের চোখের সামনে”দীক্ষা সম্পর্কে তারাশঙ্করের এই  অভিমত জ্ঞানযোগের পথে পরিশুদ্ধ। মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে ভক্তত্ব অর্জনের সাধনা ছিল কিন্তু ‘খাঁটি সরস্বতী-তন্ত্রমতে সাধনা তাঁদের মূল সাধনা ছিল না’। বাংলাদেশে নবজাগরণের সময় সারস্বত-তন্ত্রের পুনরুত্থান হয়েছে। সেই পথ অবলম্বনেই বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঋষিত্ব অর্জনের স্বীকৃতি পেয়েছেন। সেই পথের প্রত্যাশা নিয়ে তারাশঙ্কর সেই সারস্বত-তন্ত্রের পথই অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন দীক্ষার পথে তিনি জানতে চেয়েছিলেন জন্ম-মৃত্যুর রহস্যকে—বায়োলজি এবং মেডিকেল সায়েন্সের পরও যা আছে তাকে অনুভব করতে চেয়েছিলেন তিনিঅন্তত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চিত্তের আনন্দ অনুভবের শক্তি অর্জন করতে চেয়েছিলেনজ্ঞানযোগে দীক্ষার এই পথ, মানব-জীবনের মধ্যে থেকেই ঋষিত্ব অর্জনের পথসারস্বত পথে তারাশঙ্করের সময়কালে রবীন্দ্রনাথ তো স্বমহিমায় বিরাজমান ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে যাওয়ার মতো সাহস তাঁর হয়নি।

 

কন্যা-বিয়োগের ফলে যে-নিদারুণ আঘাত তারাশঙ্কর পেয়েছিলেন তাতে তাঁর মনের গতির কাঁটা উদভ্রান্তের মতো পাক খাচ্ছিল। মনে তখন দারুণ তৃষ্ণা জেগেছিল পরলোকতত্ত্ব জানাবার। প্রায় নিত্যই গ্রামের শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেনএকদিন সন্ধ্যায় শ্মশান থেকে ফিরে আসার পথে গ্রামের অট্টহাস মন্দিরে সীতারাম নামে এক সন্ন্যাসীর দেখা পেয়ে তারাশঙ্কর তাঁর কাছেও দীক্ষার আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি তান্ত্রিক নন, বৈষ্ণব নন, খাঁটি যোগী—এবং সাগ্নিক তপস্বী। সন্ন্যাস গ্রহণের দিনে যে হোমকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করে দীক্ষা নিয়েছিলেন সেই অগ্নিকে তিনি একমাত্র স্নান, আহার ইত্যাদি জৈব-কৃত্যের সময় ছাড়া, অহরহই স্পর্শ করে থাকেন। তারাশঙ্কর দেখেছিলেন—“একখানা পাথরের উপর পা রেখে সেই জ্বলন্ত কাঠখানি হাতে সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আছেন, অধীরতা নেই একবিন্দু, চেয়ে রয়েছেন রক্তিম আকাশের দিকে।” এই সন্ন্যাসীকে দেখে তারাশঙ্করের মনে দীক্ষা গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা আবার প্রবল হয়ে ওঠেতাঁকে প্রার্থনা জানান, বাবা, আমার চিত্ত বড় অশান্ত, দীক্ষার জন্য আমি ব্যাকুলতা আনুভব করি। আপনি আমাকে দীক্ষা দেবেন?  

     সন্ন্যাসী সরব উত্তর না দিয়ে ঠোঁট দুটি নেড়ে বুঝিয়ে ছিলেন—সুধা রাখতে হলে স্বর্ণপাত্র চাই বাবা, মৃৎপাত্রে হয় না।  সন্ন্যাসীর কথায় আহত হয়েছিলেন তারাশঙ্করনিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন—

কি হবে আমার সেই সুধায় যে সুধা স্বর্ণপাত্র ব্যতীত ক্ষয় হয়, দূষিত হয়? যে অমৃত মৃৎপাত্রকে অক্ষয় এবং সূচি করতে না পারে, সে আবার অমৃত কিসে?

আর আমিই বা মৃৎপাত্র কিসে?

রক্তমাংসের এই জরা-মরণশীল দেহের আধারে আমার আত্মা যে তপস্যার হোমাগ্নি জ্বেলেছে তার স্বরূপ তো আমি জানি। সে সম্পদ চায়নি, সে তো স্বার্থ চায়নি, সুখ চায়নি, সে হোমাগ্নি আমার জীবনকে দহন করছে, সুতরাং আমি মৃৎপাত্র কিসে? কেন?       

 

     এই ঘটনার কয়েক মাস পর অসুস্থ সন্ন্যাসীকে সুস্থ করে তোলার জন্য গোপালদাসী নামে তাঁর এক মহিলা ভক্ত তাঁদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় সন্ন্যাসী খোঁজ করেছিলেন তারাশঙ্করের। অনিচ্ছুক তারাশঙ্করকে তাঁর মা সঙ্গে করে গোপালদাসীর ঘরে সন্ন্যাসীর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে প্রদীপ জ্বালছে গোপালদাসী। তারাশঙ্করের উপস্থিতির কথা শুনে প্রসন্ন কণ্ঠে সন্ন্যাসী বলেছিলেনন—এসেছ? বলেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে অগ্রসর হয়ে আসেন এবং তাঁর দীর্ঘ দুই হাত বাড়িয়ে তারাশঙ্করের দক্ষিণ হাতখানি টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলেন—তোমার কাছে আমার অপরাধ জমা হয়ে আছে। তুমি আমাকে মার্জনা কর।  সন্ন্যাসীর কথা শুনে  গোপালদাসীর হাতে থেকে সদ্যজ্বালা প্রদীপটি মেঝেতে পড়ে নিভে যায়। ঘরখানা অন্ধকারে ভরে ওঠেসন্ন্যাসীর কথার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ঘরখানা স্তব্ধতায় যেন স্তম্ভিত হয়ে যায় সেই মাহেন্দ্রলগ্নে পরম প্রাপ্তির স্মৃতিচারণায় তারাশঙ্কর বলেছেন—

আমি যেন মুহূর্তে মুহূর্তে হারিয়ে ফেলছি আমাকে। আমার অন্তরের মধ্যে প্রচণ্ড কম্পনে সব যেন ভেঙেচূড়ে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘকায় অশীতিপর সন্ন্যাসীর মাথা যেন ঊর্ধ্বলোক থেকে সস্নেহে আনত হয়ে আমার মস্তক আঘ্রাণ করছেন বলে মনে হল।

বোধ হয় মিনিট খানেক, তার বেশি নয়, কিন্তু আমার স্মৃতিতে সে যেন একটা কাল মনে হয়েছিল, যেন জন্ম-জন্মান্তরের তপস্যার সিদ্ধিফল আমার হাত ধরে এসে দাঁড়িয়েছিল।

সন্ন্যাসী নিজে আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বিচিত্রভাবে আমাকে পরাজিত করলেন। সে-পরাজয়ে যে-আনন্দ, তার আস্বাদ আজও  আমার অন্তরলোকে অমৃতের মতোই অক্ষয় হয়ে আছে। তাঁর প্রসঙ্গ আমার জীবনকে ধন্য করে দিয়েছে। সে অমৃতে সেদিন আমার সকল অশান্তির দাহ জুড়িয়ে গিয়েছিল

তিনি আমাকে দীক্ষার কথায় বলেছিলেন, দীক্ষার জন্য অধীর হয়ো না। জীবনে যার সাধনা থাকে, তার গুরু আপনি আসেন। তোমার গুরু আসবেন। তোমার সাধনা তুমি করে যাও। শুনেছি, তুমি জ্ঞানের সাধনা কর। তার সঙ্গে এই রকম কর্মের সাধনা করো। নইলে পূর্ণ হবে না সাধনা। আমি তখনকার মতো গুরুর সন্ধানে বিরত হলাম। রত হলাম সাহিত্যসাধনায়।      

 

    গোপালদাসী পুনরায় প্রদীপ জ্বালালোসন্ন্যাসী স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তারাশঙ্করকে বললেন—সেদিন তোমাকে দীক্ষা দিলে আমি ভুল করতাম। না হত তোমার প্রকৃতিগত পথে সাধনায় সিদ্ধি না হত মন্ত্রজপে পরিতৃপ্তি। দীক্ষা তোমার হয়ে গিয়েছে। যদি কোনোদিন এ দীক্ষায় সাধন তোমার অসাধ্য হয়, সেদিন গুরু তোমার কাছে আপনি আসবে। বিগলিত হলেন তারাশঙ্কর। জীবনে তাঁর যেন অমৃত প্রাপ্তি ঘটল। রাত্রে নিশ্চিন্তে ঘুমালেন। পরের দিন সকালের স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছেন—

সকালে উঠলাম। মনে হয় এমন প্রসন্ন জীবন দীর্ঘকাল আমি পাইনিজীবনের ক্ষোভ অভিমান শোক শান্ত হয়ে গেছে, মিলিয়ে গেছে, জুড়িয়ে গেছে। বুলু যেন হারায়নি। কেউ যেন কখনও আমাকে দুঃখ দেয়নি। এমনি প্রসন্ন জীবন ফুলেভরা বাগানের মতো আনন্দে তৃপ্তিতে ঝলমল মনএমন পাওয়া কখনও আমি পাইনি   ...        

আমার যে কন্যার শোকে আমি প্রায় উদাসী হয়ে উঠেছিলাম, মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব এবং রহস্য অনুসন্ধানের অভিপ্রায়ে সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা শ্মশানে কাটিয়ে এসেছি অথচ কোনো সন্ধানই পাইনি, যে অবস্থাটা বলতে পারি শোকাচ্ছন্নতা শাস্ত্রমতে যা নাকি মূঢ়তার সামিল—তাই থেকে মুক্তি পেলাম—এক পূর্ণিমা রাত্রের অমৃত আস্বাদনে।

 

    এই সাগ্নিক সন্ন্যাসী কন্যাশোকে বিদীর্ণচিত্ত তারাশঙ্করের জীবনে এক আলোকবর্তিকা। এই সন্ন্যাসীর কাছেই তারাশঙ্কর শুনেছিলেন তন্ত্রসাধনার মূল রহস্যের কথা।

 

ওই ঘটনার পর কুড়ি-বাইশ বছর তখন কেটে গেছে। প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতির তুঙ্গে অবস্থানকারী তারাশঙ্করের মন তখন আবার নিয়ত অশান্তির অনলে দগ্ধ হয়। পুজোপাঠে শান্তি আসে না। মনে হয়—

কি চাই? কে আমি? জীবনের উদ্দেশ্যটা কি? মনে হয় আত্মমগ্নতায় আনন্দ নেই—তন্ময়তায় আছে। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন তন্ময়তার সেই তৎটি কি?

 

     নিরন্তর এই যন্ত্রণায় উদভ্রান্ত তারাশঙ্কর বুঝেছিলেন—তাঁর উদ্বোধিত চৈতন্যলোকে মেধার কোনো মূল্য নাই; বুদ্ধির অতিরিক্ত একমাত্র বোধ ও বোধির দ্বারা সেখানে অনুপ্রবেশ সম্ভব। তখন অন্তরে এক ‘তুমি’র অস্তিত্ব উপলব্ধি করেছেন তিনি। সেই সময় তাঁর জীবনে ঘটেছে এক অলৌকিক ঘটনা।  মুর্শিদাবাদে কাঁদির রাজবাড়িতে আমন্ত্রিত তারাশঙ্কর দেবালয় প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে নিজের কানে শুনেছেন—দেববিগ্রহ রাধামাধব তাঁর নাম ধরে ডাকছেন। এই ঘটনা তাঁর অন্তরের অন্তপুরে এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব এনে দেয়। সেই সময়ে নিজের মানসিকতার কথা জানিয়ে তারাশঙ্কর বলেছেন—

মন তখন এত অধীর, এত চঞ্চল, এত তৃষ্ণার্ত যে কোথায় আমার জীবনের প্রশ্নের উত্তর, কোথায় কিসে আমার তৃপ্তি সেই চিন্তায় আমি এত একক, এত উদভ্রান্ত যে সমস্ত সংসারের সঙ্গে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিগোটা সংসার ভাবছেন আমি থেকেও নেই, আমি পর হয়ে গেছি। গোটা সংসারের প্রতিনিধি হিসেবে আমার পত্নী আমাকে প্রচণ্ড ব্যাকুলতায় আঁকড়ে ধরতে চাইলেন। শত প্রশ্ন তাঁর।–কেন এমন হয়ে গেলে তুমি? কি চাও তুমি? কি ভাব তুমি? আমি কি উত্তর দেব? যে উত্তরহীন প্রশ্ন আমাকে এমনভাবে অধীর অস্থির একান্ত বিচ্ছিন্ন একক করেছে সে প্রশ্নের কথা উত্তর হিসেবে বললেও সে উত্তর তো উত্তর নয়। সে প্রশ্নই।

সুখ চাই বললে, প্রশ্ন করেন—সুখ কিসে? শান্তি চাই বললে প্রশ্ন করেন—তাই বা কোথায়? এর উত্তর আমি খুঁজছি, আমি জানি না, সুতরাং কি উত্তর দেব?

নিজের জীবনের অশান্তি অসুখে সারা সংসারটাই অশান্তি এবং অ-সুখে ভরে গেল। আমার অসহ্য হয়ে উঠল।

 

     মনের গভীর শূন্যতার কারণে সংসারের সকলের মাঝে থেকেও তারাশঙ্কর একা হয়ে পড়েন। নীরবে জল ভরা চোখে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। লেখাও প্রায় ছেড়ে দেন। মনের এই ব্যাকুলতা নিয়ে তিনি একবার কাশী চলে গিয়েছিলেন। পূর্ব-পরিচিত এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর সেই অশান্ত হৃদয়কে শান্ত করতে, জীবনে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে তারাশঙ্কর--বাড়িতে না জানিয়ে ১৯৫৪ সালের ০৬ জুলাই কাশী যাত্রা করেন। সেই তাঁর প্রথম কাশী যাত্রা। কিন্তু বড় উদ্বেগের বিষয়, যে সন্ন্যাসীর সন্ধানের উদ্দেশ্যে নিয়েই তাঁর কাশী যাত্রা, নৌকা করে মণি-কর্ণিকা থেকে রাজা হরিশ্চন্দ্রের ঘাট পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে তাঁর সন্ধান করে ফিরেছিলেন তবু কোথাও তাঁর সন্ধান পাননি তিনিসেখানে ডাক্তার মৈত্র এবং প্রবোধ চট্টোপাধ্যায় নামে দুই বাঙালি ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাঁর। ডাক্তার মৈত্র’র চেম্বারে গিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। ডাক্তার মৈত্র বলেছিলেন—দেখুন, এ পথ যখন টানছে তখন দীক্ষার দরকার। বাড়ি ফিরে গিয়ে দীক্ষা নিন। বলেছিলেন—সন্ন্যাসী চেনা বড় কঠিন তারাশঙ্করবাবু। হাজার ছদ্মবেশির মধ্যে একজন খাঁটি প্রকৃত সন্ন্যাসীর সন্ধান মানে গিলটির হাটে খাঁটি সোনার সন্ধান। তার থেকে গৃহী গুরু ভালো। ডাক্তার মৈত্র’র সঙ্গে কথা বলে তারাশঙ্করের জীবন-যন্ত্রণা অনেকখানি প্রশমিত হয়েছিল। আর প্রবোধ চট্টোপাধ্যায়কে তারাশঙ্কর বলেছিলেন—দুঃখ কি পেয়েছি জানি না; তবু অনন্ত দুঃখ আমার। একটা কিছু ধরতে চেয়ে ধরতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন আশেপাশে লুকোচুরির মতো খেলা খেলে আমাকে হয়রান করছে। সেটা কি, কেমন করে তাঁকে ছোঁয়া যায়, ধরা যায়, তার পথ কি তার জন্য আমার অশান্তির শেষ নাই। অ-সুখের অন্ত নাই। প্রবোধবাবু বলেছিলেন—আপনি স্থির হোন, সাহিত্যের আসনকে জীবনের সাধনার আসন করুন

     ডাক্তার মৈত্র এবং প্রবোধ চট্টোপাধ্যায় উভয়ের উপদেশ তাঁর জীবনের সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিল। যে মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন করে তারাশঙ্কর জীবন ও জগৎকে দেখেছিলেন এবং নিজের জীবন নির্বাহ করেছিলেন—সেই মতবাদের উৎসমূল তো নিহিত তাঁর জননীর মনোভূমিতে। প্রায় সমকালে রচিত ‘আমার কালের কথা’ বইতে তারাশঙ্কর লেখেন—“আমার জীবনে মা-ই আমার সত্যসত্যই ধরিত্রী, তাঁর মনোভূমিতেই আমার জীবনের মূল নিহিত, শুধু সেখান থেকে রস গ্রহণ করেনি, তাঁকে আঁকড়েই দাঁড়িয়ে আছেওই ভূমিই আমাকে রস দিয়ে বাঁচিয়ে প্রেরণা  দিয়ে বলেছে, ‘আকাশলোকে বেড়ে চল, সূর্য-আরাধনায় যাত্রা করতুলে ধর তোমার জীবনপুষ্প দিয়ে সূর্যার্ঘ্য” সেই মানসিকতায়, কাশী থেকে ফিরে এসে তারাশঙ্কর জননীকে গুরু করে তাঁর কাছেই দীক্ষা নিয়েছিলেন। দীক্ষাকর্মে শাস্ত্রসম্মত ক্রিয়াগুলি করে দিয়েছিলেন শ্রীগৌরীনাথ শাস্ত্রীর এক আত্মীয়১৩৬১ বঙ্গাব্দের ০৭ শ্রাবণ ছাপান্ন বছর বয়সে জননী প্রভাবতীদেবীর কাছে কালীমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। দীক্ষান্তে বলেছিলেন—“এবার জীবন আমার একটা সোজা পথ ধরল”।

-------------------

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি

বীরভূম-৭৩১১০২।

মোবাইল নম্বর-৯২৩৩১২৪৭১৮

ইমেইল আইডি—debashismukherjee67@gmail.com

 

  তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় : দেশভক্তি এবং দেশভাবনা দেবাশিস মুখোপাধ্যায়   স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত তারাশঙ্কর...