শৈলজানন্দ এবং তারাশঙ্কর : পথচন্দ্রিমার অন্দরমহল
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
কথাসাহিত্যিক
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়—জন্মসূত্রে দুজনেই ছিলেন
বীরভূম জেলার মানুষ। পরে দুজনেই হয়ে ওঠেন কলকাতার—নিকটবর্তী প্রতিবেশী। তারাশঙ্কর ছিলেন রাজনীতির পক্ষপাতী; সাহিত্য
রচনা তাঁর স্বদেশ সাধনার নামান্তর। স্বাধীনতার পূর্ববর্তীকালে রচিত তাঁর
উপন্যাসগুলিতে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর শৈলজানন্দ মনে করতেন—পৃথিবীর সব দেশেই
সব রাজনীতিই সাময়িক কিন্তু সাহিত্য চিরকালের। আবার এমন মত-পার্থক্য নিয়েও
তারাশঙ্কর বলেছেন—শৈলজানন্দ সাহিত্য জগতে না এলে, আমি হয়তো আসতামই না। ১৯৭১ সালের
১৪ সেপ্টেম্বর তারাশঙ্করের মৃত্যু হয়। এক অন্তরঙ্গতম বন্ধুর মৃত্যুর স্মরণে
শৈলজানন্দ স্মৃতিচারণা করেন, তার মৃতদেহ আমি দেখেছি। হাসি হাসি মুখ তার এতটুকু
ম্লান হয়নি। হাসতে হাসতে এসেছিল সেই আনন্দময় পুরুষ আবার হাসতে হাসতে আনন্দলোকে চলে
গেল। বলেছেন, তারাশঙ্করকে হারিয়ে বাংলাদেশ একজন সাহিত্যিককে হারালো, আর আমি
হারালাম আমার অকৃত্রিম সুহৃদকে। তারাশঙ্কর এবং শৈলজানন্দ—দুই সাহিত্যিক-জীবনের এক
বিস্ময়কর সম্পর্ক-মাধুর্যের পরিচয় পাওয়া যায়—উভয়ের স্মৃতিচারণায়।
প্রথমে বলি ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা, পরে উঠে আসুক সাহিত্য-সম্পর্কের বিষয়।
২
শৈলজানন্দের
সঙ্গে তারাশঙ্করের প্রথম পরিচয় লাভপুরে থাকতেই, ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকার সুবাদে। ‘পূর্ণিমা’র
লেখার জন্য মামাতো শ্যালক সত্যনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কয়েকজন সাহিত্যিকের
দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন সহ-সম্পাদক তারাশঙ্কর।
কালিদাস রায়, জগদীশ গুপ্ত, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এমন কয়েকজন সাহিত্যিকের নাম
‘আমার সাহিত্য জীবন’ বইতেই উল্লেখ করেছেন। পত্রিকাও
পাঠাতেন তাঁদের। তারাশঙ্করের বয়স তখন ত্রিশেরও কম।
প্রথম পরিচয় ১৯২৭ সালের শেষের দিকে। আষাঢ় ১৩৩৪
বঙ্গাব্দে ‘স্রোতের কুটো’ গল্পটি প্রকাশের কিছুদিন পর। শৈলজানন্দ তখন থাকতেন
কলকাতায় মাতামহের বাড়িতে। প্রথম দেখাতেই তারাশঙ্করের মনে হয়েছিল শৈলজানন্দ আলাপি
মানুষ। দেখেছিলেন প্রথমটাতে সত্যনারায়ণের সঙ্গে তাঁর ‘হিহি করে আলাপ’। বীরভূমের
লোক, রানিগঞ্জে অনেক কাল কাটিয়েছেন, কয়লার ব্যবসায়েও কিছুদিন শিক্ষানবিশ ছিলেন,
প্রসিদ্ধ কয়লা ব্যবসায়ী লাভপুরের বন্দ্যোপাধ্যায় বংশকে ভালো করেই জানতেন। তার উপর
নাট্যকার নির্মলশিব নতুন খ্যাতি বংশসম্পদ যোগ করেছেন সোনার গহনায় জহরতের মতো।
প্রাণ খুলে হাসতে পারেন শৈলজানন্দ। আরও একটি মহৎ গুণ সেদিন লক্ষ্য করেছিলেন,
নতুনকে ভালোকে তিনি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারেন, স্বীকার করেন অতি সহজে।
‘পূর্ণিমা’য় প্রকাশিত ‘স্রোতের কুটো’ গল্পের উল্লেখ করে বার বার বললেন—ভালো হয়েছে।
বেশ গল্প। চমৎকার। শৈলজানন্দকে সেইদিনই চিনেছিলেন তারাশঙ্কর।
‘পূর্ণিমা’য় নিজে গল্প দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। আরও
বলেছিলেন—প্রেমেনকে ধরা মুস্কিল। আমি বরং তাকে বলব ‘পূর্ণিমা’য় লিখবার জন্যে। তার
সঙ্গে আমার খুব সম্প্রীতি আছে। অচিন্ত্যকে আপনারা ধরবেন। এম.সি. সরকারের দোকানে
পাবেন। বসে থাকে। তবে সে কি কান দেবে? এই সাক্ষাৎ পরিচয়ের আগেই তাঁর ও প্রেমেন্দ্র
মিত্রের দুটি গল্প পড়ে তিনি ‘রসকলি’ গল্পটি লিখেছেন এবং তখন তা ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়
বিবেচনাধীন ছিল। কয়েক মাস পরে ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে কলকাতায় কল্লোল অফিসে
আবার দেখা হয় তাঁদের। তখন তাঁর ‘রসকলি’ প্রকাশিত হয়েছে। তারাশঙ্করকে সানন্দে আহ্বান
জানিয়েছিলেন শৈলজা। দিনেশবাবু, পবিত্র, নৃপেন্দ্রবাবুর সঙ্গে—আলাপ করিয়ে দিতে
উদ্যোগীও হয়েছিলেন।
১৯৩৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তারাশঙ্কর
কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। তখন মাঝে মধ্যেই শৈলজার সঙ্গে তাঁর দেখা হতো। তারাশঙ্কর
‘রাজা, রানী ও প্রজা’ গল্পটি লিখে পকেটে করে নিয়ে শৈলজানন্দের বাড়ির পথে রওনা দেন।
বিকাল বেলা, শৈলজা তখন বের হচ্ছেন। তারাশঙ্করকে দেখেই বললেন—একটু কাজে যাচ্ছি ভাই।
তাঁর ‘যোগবিয়োগ’ উপন্যাসটি শৈলজানন্দের সাহায্যেই উপাসনা পত্রিকায় প্রকাশিত
হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে তারাশঙ্করের জীবনে একটা বড় চাকরির সুযোগ এসেছিল বম্বে টকীজ
থেকে। মাঝখানে ছিলেন অধ্যাপক দীনেশ্চন্দ্র সেন। একদিন সকাল দশটার দিকে তারাশঙ্কর
দীনেশ সেনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। পথে পেয়েছিলেন শৈলজানন্দকে। তিনি উঠলেন
শ্যামপুকুরের মোড়ে। যাচ্ছেন নিউ থিয়েটার্স স্টুডিয়োতে। ওখানে তিনি তখন চাকরি
নিয়েছেন—গল্প ও সংলাপ লেখক হিসেবে। ট্রামে শৈলজানন্দ তাঁর স্টুডিয়ো-জীবনের গল্প
শোনালেন। সে গল্প দুঃখ জনক, নিউ থিয়েটার্স তাঁকে দেড়শো –কি দুশো দেয় কিন্তু অনেক
অবজ্ঞাও সহ্য করতে হয়। বম্বে টকীজের চাকরিটি নেন নি তারাশঙ্কর। মনে করি
শৈলজানন্দের অভিজ্ঞতা তাঁকে আত্মসচেতন হওয়ার পথে কিছুটা হলেও সহযোগিতা করেছিল।
এমন কতবার দেখা হয়েছে তাঁদের। উভয়ের উন্মুক্ত
প্রাণের বিনিময়ে জমে উঠেছে নিবিড় বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কত অভিজ্ঞতা কত স্মৃতি
সঞ্চিত ছিল উভয়ের মধ্যে—আমাদের তা অনেক কিছুই আজানা। তারাশঙ্করের জীবনের প্রথম
পর্বের একটি ঘটনার স্মৃতি চারণা করে শৈলজানন্দ বলেন, তারাশঙ্কর ক্রমে ক্রমে
রাজনীতির দ্বারা এমনি প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন যে, তার মুখে রাজনীতি ছাড়া অন্য কথা
ছিল না। এর জন্য একবার কারাবরণ করতেও কুণ্ঠিত হন নি তিনি। তার কারাবরণের একটি
কাহিনী আমি জানি। ১৯৩০ সাল, সিউড়ির এস.ডি.ও তখন মণি সেন তারাশঙ্করের ঘনিষ্ঠ পরিচিত
মানুষ ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের অপরাধে ধরা পড়েছেন তারাশঙ্কর। সিউড়ি আদালতে তাঁর
বিচার হবে। মণি সেন তারাশঙ্করকে বার বার বলেছিলেন, তারাশঙ্করবাবু, আপনি একবার শুধু
বলুন, রাজনীতি আপনি ছেড়ে দেবেন। এ-সব নোংরা কাজ আর আপনি করবেন না। তাহলে আপনাকে
আমি ছেড়ে দেব।
তারাশঙ্কর মাথা উঁচু করে বলেছিলেন, দেশকে আমি
ভালোবাসি। আপনি একে নোংরা কাজ বলছেন? ছি!—কারাবাস হয়েছিল তাঁর। বিচারালয়ে মহকুমা
শাসকের সঙ্গে তারাশঙ্করের এই কথোপকথনের কথা শৈলজানন্দকে জানিয়েছিলেন তারাশঙ্কর
নিজেই।
১৯৪৯ সাল থেকে তারাশঙ্কর কলকাতার টালাপর্কে
নিজের বাড়িতে বসবাস করতেন। শৈলজানন্দ তখন থাকতেন বাগবাজারে। তারাশঙ্কর সকালে যেতেন
বাগবাজারে আর শৈলজানন্দ বিকালে আসতেন টালাপার্কে। সেই সব পুরনো দিনের কথায়
শৈলজানন্দ বলেন, তার নিত্য-নৈমিত্তিক প্রোগ্রাম ছিল—প্রত্যহ সকালে আমার বাড়িতে
আসা। আমার বাড়ির এক পেয়ালা চা না-খেলে তার দিন নাকি ভালো চলতো না। তাই ঝড় জল
বৃষ্টি বাদল উপেক্ষা করে প্রত্যহ সে আসত আমার কাছে। কতদিন ধরে চলেছে এই যাওয়া আসা।
পরে শৈলজানন্দও টালাপর্কে বাড়ি করে চলে আসেন। শৈলজানন্দর বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি
পার্ক। সেই পার্কের ওপারেই তারাশঙ্করের
বাড়ি। পার্কের ভিতর দিয়ে তারাশঙ্কর যাতায়াত করতেন আর শৈলজানন্দ জানালায় বসে
দেখতেন—কত মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি।
একদিন তারাশঙ্কর শৈলজান্ন্দর বাড়ি গেছেন।
শৈলজার স্ত্রীর লীলাদেবীর মাথায় ঘোমটা ছিল না। তিনি ব্যস্ত হয়ে সরে যাচ্ছেন।
তারাশঙ্কর বললেন লীলা শোনো—এ বছর থেকে ভাইফোঁটার দিন তুমি আমাকে ফোঁটা দিও। তাহলে
আমি তোমার দাদা হয়ে গেলাম। তুমি হলে আমার ছোট বোন। তাহলে মাথায় ঘোমটা নিয়ে আর
ব্যস্ত হতে হবে না। তখন থেকে তারাশঙ্কর প্রত্যেক বছর শৈলজার স্ত্রী লীলাদেবীর কাছে
ভাই ফোঁটা নিতেন।
তারাশঙ্কর মারা যাওয়ার বছর খানেক আগের কথা।
শৈলজার বাড়ি গেছেন তিনি। শৈলজাকে দেখে বিস্মিত হলেন। মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন—দেখি
দেখি ভালো করে দেখি—মুখখানা এইদিকে ঘোরাও তো। তোমার মুখটা মনে হচ্ছে যেন একটুখানি
বেঁকে গেছে। কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। বলতে বলতেই ছুটলেন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার
জীতেন বোস। ওই একই পাড়ার প্রতিবেশী বন্ধু। ডেকে নিয়ে এলেন তাঁকে। চিকিৎসায় সুস্থ
হলেন শৈলজা কিন্তু একটা চোখ আর একটা পা আর সুস্থ হলো না। সেই মুহূর্তে তারাশঙ্কর
গিয়ে না পড়লে শৈলজার অপর চোখ আর পা—কি হতো তা ভাববার ছিল।
৩
বয়সে তিন বছরের ছোট হলেও সাহিত্য-ভূমিতে
শৈলজানন্দের আবির্ভাব তারাশঙ্করের আগে। তিনি তারাশঙ্করের অগ্রজ প্রতীম সাহিত্যপথিক।
গল্প-রচনার সূচনা পর্বে তারাশঙ্কর অগ্রজ সাহিত্যিক শৈলজানন্দের অনুসৃত পথেরই
অনুসরণকারী ছিলেন; একথা তিনি যেমন আমৃত্যু শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রেখেছিলেন তেমনি
সর্বসমক্ষে সগর্বে ঘোষণাও করে গেছেন তিনি নিজেই। বীরভূমে
অনুষ্ঠিত বীরভূম সাহিত্য সম্মেলনের ত্রিশতম অধিবেশনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাহিত্যিক
সমাবেশের সম্মুখে তারাশঙ্কর ঘোষণা করেন “আজ সানন্দে বলতে পারি যে শৈলজানন্দ যদি
তাঁর সাহিত্য নিয়ে আবির্ভূত না হতেন তাহলে তাঁর পথরেখা অনুসরণ করে আমি সাহিত্যের
অঙ্গনে উপস্থিত হতাম কিনা সন্দেহ”।
তারাশঙ্কর যেদিন বীরভূম জেলার সিউড়িতে দাঁড়িয়ে
একথা বলছিলেন শৈলজানন্দ তখন তাঁর কলকাতার বাড়িতে। সভা থেকে ফিরে গিয়ে সভাপতির মুদ্রিত
ভাষণটি শৈলজানন্দের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “পড়ে দ্যাখো কি লিখেছি”।
লজ্জিত হয়েছিলেন শৈলজানন্দ।
তারাশঙ্করের মতে—সাহিত্যিক সত্যের কমাণ্ডো। শৈলজানন্দকেও
সেদিন বলেছিলেন, ‘সত্য কথা লিখতে আমি কখনো ভয় পাই না’। তাঁর শৈলজানন্দ-অনুসরণের
সেই সত্যটুকু জানা আজ আমাদের একান্ত ইচ্ছা।
তারাশঙ্কর কবিতা খুব কম লিখেছেন; গল্প,
উপন্যাস এবং নাটক রচনা নিয়েই তাঁর সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা। তারমধ্যে ছোটগল্প
সাহিত্যের ইতিহাসে তারাশঙ্কর শৈলজানন্দের অনুসৃত পথের অনুসরণকারী। তারাশঙ্করের
ছোটগল্পের একটি বিশিষ্ট গুণ হল তার আঞ্চলিকতা। বীরভূম তথা রাঢ়বঙ্গের একটা সামগ্রিক
রূপ তাঁর গল্পে প্রতিফলিত। সেই আঞ্চলিকতার আস্বাদ তিনি প্রথম পেয়েছিলেন
রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে কিন্তু তার ভৌগোলিক রূপরেখা নির্মাণের চেতনা
পেয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং
শৈলজানন্দের দুটি গল্প পাঠে। ‘রসকলি’ গল্প থেকেই তার প্রকাশ। এর আগে কবিতা, নাটক,
কিছু রম্যরচনা এবং দুটি উপন্যাস লিখলেও তারাশঙ্করের গল্প বলতে কেবল—‘স্রোতের কুটো’। গল্পটি
আষাঢ় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে ‘পূর্ণিমা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গল্পটি লিখে খুশি হতে পারেন
নি তিনি। নতুন পথের সন্ধান করছিলেন—হয় ‘পূর্ণিমা’ থেকে বেরিয়ে আসবেন, না হয় নিজেকে
যুগোপযোগী করে তুলবেন। এই সময় ‘কালিকলম’ পত্রিকায় প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং শৈলজানন্দ
মুখোপাধ্যায়—দুই গল্পকারের দুটি গল্প পড়ে তিনি গল্প লেখার নতুন পথের সন্ধান
পেয়েছিলেন। অগ্রহায়ণ ১৩৭৫ বঙ্গাব্দে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আমি কি
করে লেখক হলাম’ নিবন্ধে তারাশঙ্কর নিজেই বলেছেন—“গল্প দুটি পড়ে পেয়েছিলাম নতুন
স্বাদ, নতুন গন্ধ, নতুন স্পর্শ, যাকে নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়া বলে তাই হয়ে গিয়েছিলাম
এবং স্থির করেছিলাম, দেখি এমন গল্প লিখতে পারি কিনা। বাড়ি ফিরে এসে একটি গল্পও
লিখেছিলাম। নাম দিয়েছিলাম রসকলি।”
‘প্রবাসী’র দপ্তরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকার পর
‘রসকলি’ প্রকাশিত হয় ফাল্গুন ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। গল্পটি প্রকাশের
পর কলকাতার সারস্বত সমাজে তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় প্রকাশ পায়। সম্পাদক
পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনি এতদিন চুপ করিয়া ছিলেন কেন?’ কলকাতায়
রসকলি’র যথেষ্ট প্রশংসা হয় এবং ‘কল্লোল’ পত্রিকার জন্য গল্প লেখার আমন্ত্রণ পান।
এখন আমাদের কৌতূহল—তারাশঙ্কর কোন কোন গল্প পড়ে রসকলি রচনার পাথেয় পেয়েছিলেন?
প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় দুজনের গল্প পড়ে রসকলি লিখলেন—অথচ
তিনি শৈলজানন্দ অনুসরণকারী হিসেবে পরিচিত হলেন; এর রহস্য কোথায়?
‘আমার সাহিত্য
জীবন’ বই থেকে জানা যায়, ইংরেজি ১৯২৭ সালের মাঝামাঝি প্রায়, বাংলা ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের
শ্রাবণ-ভাদ্র; রাজনীতির বিষয় নিয়ে তারাশঙ্কর উপস্থিত হয়েছিলেন জেলার সদর শহর
সিউড়িতে—সম্ভবতঃ গোপিকাবিলাস সেনগুপ্ত নামে এক নেতার বাড়িতে। পেশায় উকিল সেই নেতার
বাড়িতেই রাত্রি কাটাতে হয় তাঁকে। উকিলের বাড়িতে শুয়ে আছেন তারাশঙ্কর কিন্তু মশার
কামড়ে ঘুম আসে না। রাত জেগে বসে থাকেন—বিড়ি টানেন আর গুন গুন করে
সুর ভাঁজেন। তাঁর শয়নকক্ষে এখানে ওখানে কাগজের গাদা স্তূপীকৃত ছিল। সময় কাটাবার
ভালো উপায়—বই-ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টানো। তারাশঙ্করও তাই করলেন। হঠাৎ হাতড়ে মিলল
একখানা মলাট-ছেঁড়া ‘কালিকলম’ পত্রিকা। হ্যারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে দিলেন। চোখে
পড়ল অদ্ভুত নামের একটা লেখা এবং লেখকের নামটা অদ্ভুত না হলেও বিচিত্র। ‘পোনাঘাট
পেরিয়ে’, লেখক শ্রীপ্রেমেন্দ্র মিত্র। পড়ে ফেললেন গল্পটি। বিচিত্র
বিস্ময়পূর্ণ রসমাদকতায় মন মদির হয়ে গেল। মশকের গানে বা দংশনেও কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে
পারলে না তাঁর। আবার পাতা ওল্টালেন। পেলেন আর একটি গল্প।
তারাশঙ্করের নিজের কথা, “গল্পটির নাম মনে নেই। লেখক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়”। গল্পটির
কথা না জানিয়ে তারাশঙ্কর সাহিত্য জীবনের পাতায় একটা রহস্যের মোড়ক রেখে গেলেন—অথচ
ঘোষণা করলেন, “অদ্ভুত!
বীরভূমকে এমনি করে কলমের ডগায় অক্ষরে অক্ষরে সাজিয়ে রূপ দেওয়া যায়!” গল্পে
বীরভূমের রূপচিত্রণে বিস্মিত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর। মন্তব্য প্রকাশে বিস্ময়সূচক
চিহ্নও ব্যবহার করেছেন। সেদিন সেই রাত্রেই তাঁর ইচ্ছে হয় ‘এমনি গল্প লিখব’। সেই
ইচ্ছা হওয়ার পর তাঁর প্রথম গল্প ‘রসকলি’। নিজের
জমিদারি মহল বেলেড়া গ্রামের নিজের চোখে দেখা কমলিনীকে নিয়ে লিখলেন এই গল্পটি। তখন
থেকেই তিনি গল্প লেখার সোনার কাঠির স্পর্শ পেলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘কালিকলম’ পত্রিকায়
প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ গল্পটি ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের জৈষ্ঠ সংখ্যায়
প্রকাশিত হয়। আর সেই সংখ্যাতেই শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘বেনামী বন্দর: জনি টনি’
নামেও একটি গল্প প্রকাশিত হয়। তারাশঙ্কর প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’
গল্পটির কথা বলেছেন; কিন্তু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কথা বললেও তাঁর কোন গল্পটি
পড়েছিলেন—সে বিষয়ে কোনো কথা বলেন নি। তারাশঙ্কর অনুসন্ধানকারী সারস্বত সমাজ
পত্রিকার ওই সংখ্যাটিকেই গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের অভিমত আরোপ করে বলেছেন—“প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ এবং
শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘বেনামী বন্দর : জনি ও টনি’ গল্প পড়ে তিনি আধুনিক যুগের
ছোটগল্পের রূপ ও রীতির পরিচয় পান।” কিন্তু বড় বিস্ময়ের বিষয়, ওই গল্প দুটি
পড়ে বীরভূমকে কলমের ডগায় অক্ষরে অক্ষরে সাজিয়ে রূপ দেওয়ার কথা তারাশঙ্কর কেন
ভেবেছিলেন তার কোনো ব্যাখ্যা তাঁরা দেন নি। এ বিষয়ে ‘বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প ও
গল্পকার’ বইতে ভূদেব চৌধুরী বলেছেন—
“তারাশঙ্করের উপলব্ধি অযথার্থ নয়। স্রস্টা
যেমন আপন মনের মাধুরী মিশায়ে বাস্তব জীবনকে শিল্প-রূপায়িত করেন, রসিক পাঠকও তেমনি
তাকে আস্বাদন করেন আপনার চিত্তবৃত্তির আনুকূল্যে, নিভৃত চিত্ত-বাসনার সুরভিতে মদির
করে। তারাশঙ্কর কেবল রসিক সাহিত্য-পাঠক নন,—সিদ্ধকাম সৃষ্টির প্রেরণা তাঁর অধিগত
সহজ শক্তি। আর সেই সৃজনী-স্বভাবে মনে-প্রাণে তিনি ‘দক্ষিণপূর্ব বীরভূমের’ আঞ্চলিক
জীবন-শিল্পী। শৈলজানন্দের গল্প-দেহের মুকুরে সেদিন নিজের আত্মপ্রতিকৃতিকে প্রথম
আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন তারাশঙ্কর—এ ঘটনাও উপেক্ষণীয় নয়।”
প্রণম্য অধ্যাপক স্বর্গীয় ভূদেব চৌধুরি
মহাশয় আমার কয়েকদিনের শিক্ষক। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়কালে তিনি অবসর
প্রাপ্ত; তথাপি পরে কলেজজীবনে আমার শিক্ষকতার সূচনাপর্বে আমি তাঁর কাছে একটি দিন
পাঠ গ্রহণে ধন্য হয়েছিলাম। অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা ‘পথে প্রবাসে’ বইটির কোনো
‘রেফারেন্স বুক’ তখন বাজারে পাইনি। সেই বইয়ের পাঠ নিয়েছিলাম অধ্যাপক ভুদেব চৌধুরির
বাড়িতে গিয়ে। তাঁর স্নেহ-সিঞ্চনে ‘পথে প্রবাসে’ আমার কাছে প্রাঞ্জল হয়ে আছে আজও।
পরে আমার ব্যক্তিগত জীবন-জিজ্ঞাসায় কয়েকখানি চিঠিও লিখেছিলেন আমাকে—যা আজও আমার
কাছে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।
তাঁর প্রতি আমার ভক্তি-চিত্তের শ্রদ্ধা আছে, তথাপি
তারাশঙ্করের শৈলজানন্দ পাঠ সম্পর্কে তাঁর ওই অভিমত বিষয়ে আমাদের দ্বিমত রয়েছে। শৈলজানন্দের
গল্পে তারাশঙ্করের আত্মপ্রতিকৃতি আবিষ্কারের কোন রহস্যকে উদ্ঘাটিত হতে তিনি
দেখেছিলেন—সেকথাও তিনি বলেন নি।
৪
সাহিত্য পথে আত্মপ্রতিষ্ঠার আকুল আকাঙ্ক্ষা
তারাশঙ্করের ছিল; কিন্তু কেবলমাত্র ১৯২০ থেকে রসকলি লেখার পূর্ব পর্যন্ত সময়ের
সমীক্ষায় বলা যায়, এই সময় তারাশঙ্কর জমিদার হয়েও অহিংসাপন্থী এবং সাম্যবাদী এক
সমাজসেবী মানুষ। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি সমাজ সেবা করে বেড়ান। গান্ধী আদর্শে আসার
আগে কমরেড লেনিন ছিলেন তাঁর স্বপ্নে দেখা নায়ক। তারাশঙ্করের মনে ও মস্তিষ্কে তখন
লাভপুর তথা বীরভূম ভূগোলের মানচিত্র অঙ্কিত ছিল। বীরভূমের ত্রিশ-চল্লিশখানি গ্রামে
তখন তিনি ঘুরেছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আপনজন হয়ে মিশেছেন; বঙ্গীয়
সাহিত্য-সম্মিলনের অনুষ্ঠানে কবিতার আখরে বীরভূমের মানচিত্রকেই তুলে ধরেছেন। প্রেমেন্দ্র
মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ পড়ে বিস্ময়ে চমকে উঠেছিলেন, কারণ—সেখানে তিনি পেয়েছিলেন—
মাটির অতি সাধারণ মানুষকে, যে মানুষ তার অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সংগ্রাম
করে চলেছে অবিরাম। ‘রসকলি’ গল্পটি সম্পূর্ণ করার পর তাঁর মনে হয়েছিল “আমার মনে যে
মানুষগুলি আছে তাদের বাইরে এনে জীবন্ময় করে জীবনের হাটে মুক্তি দেওয়ার সোনার কাঠি
পেয়েছি”। সেই পর্বে তারাশঙ্করের অন্তরের অন্তস্থলে উপস্থিত মানুষগুলির শিল্পিত
চিত্রকে দেখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পে। কিন্তু কুকুর ও কুক্কুরীকে নিয়ে
লেখা ‘জনি ও টনি’ গল্পটিতে—জৈবজীবনের একটি বাস্তবনিষ্ঠ চিত্র ভিন্ন তারাশঙ্কর আর
কিছু পেয়েছিলেন বলে মনে করার কোনো অবকাশ নেই। এখানে তারাশঙ্করের উপলব্ধির মহিমা
ঘোষণার মধ্যে কষ্টকল্পিত ব্যাখ্যা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মাত্র।
আমরা দেখেছি, মলাট-ছেঁড়া কালিকলম-র কথা বলেছেন
তিনি। কালিকলম-র সদ্য প্রকাশিত সংখ্যাটির মলাট ছেঁড়া অস্বাভাবিক নয়, আবার বছর
খানেক পূর্বে প্রকাশিত সংখ্যাটি মলাট ছেঁড়া হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তেমন কথাই
তারাশঙ্কর জানিয়েছিলেন কালিকলম পত্রিকার সম্পাদক মুরলীধর বসুকে। মুরলীধর বসু এক
সাক্ষাৎকারে হরপ্রসাদ মিত্রকে বলেছিলেন—
তারাশঙ্কর
সে সময়ে একবার সিউড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে ‘কালিকলম’ এর ছেঁড়া
পৃষ্ঠায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ এবং শৈলজানন্দের ‘জোহান-এর বিহা’
গল্প দুটি তাঁর চোখে পড়েছিল বলে শুনেছি।
১৯২৮ সাল থেকে তারাশঙ্করের অত্যন্ত
কাছের মানুষ ছিলেন এই মুরলীধর বসু। গল্প
প্রকাশ, গল্পের আলোচনা, বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো—সব দিক থেকেই সেই নিবিড়
একাত্মতার পরিচয় পাওয়া যায়। উভয়ের মধ্যে পত্রবিনিময়ও শুরু হয় তখন থেকেই।
‘জোহানের বিহা’ বৈশাখ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে,
‘কালিকলম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গল্পে আছে—আদিবাসী
জীবনের চিত্র, ‘বাহা’ পরবের বর্ণনা; অজয়নদ পেরিয়ে ‘বীরভুঁই’এর লালমাটির পথে
মানুষের আনন্দময় চলাচল। বীরভূমের এই পটচিত্রে বোধ হয়
তারাশঙ্কর দেখে থাকবেন তাঁর মন ও মানসিকতার চিন্ময়-চিত্রকে। সাহিত্যপথের
নব-পথানুসন্ধানী তারাশঙ্করের অন্তরাত্মায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সেই ছবি। তখনই তিনি
‘অদ্ভুত’ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে—‘বীরভূমকে এমনি করে’ সাজিয়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন—এমন
কথাই ভাবতে পারি। ‘কল্লোলযুগ’ গ্রন্থে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
লিখলেন, “পৃষ্ঠা ওল্টাতে পেল সে আর একটা গল্প—শৈলজানন্দের লেখা। গল্পের পটভূমি
বীরভূম, তারাশঙ্করের নিজের দেশ।... বাংলাসাহিত্যে নবীন জীবনের আভাস আস্বাদ পেয়ে
জেগে উঠল তারাশঙ্কর”। তারাশঙ্করের গল্পসাহিত্যে বীরভূম ভূগোলের যে মানচিত্র অঙ্কিত
হয়েছে—তার উৎসমূলে মনে করি শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের পাণ্ডু-রেখাঙ্কনই অনুসৃত
হয়েছে। এখানে কথিত দুই গল্পের কুশীলব অন্ত্যজ জীবন থেকে তুলে আনা। তারাশঙ্কর সেই
অন্ত্যজ জীবন-চিত্রের কথা ভাবলেন কিন্তু কেবলমাত্র গল্প লিখতেই চাইলেন না; তিনি
চাইলেন কলমের ডগায় বীরভূমকে সাজিয়ে তুলতে। সেইজন্যই বোধকরি শৈলজানন্দের ‘জোহানের
বিহা’ গল্পে আদিবাসী জীবনচিত্র সহ বীরভূমের মানচিত্র তারাশঙ্করকে আকর্ষণ করেছিল
অধিক। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ এবং প্রেমেন্দ্র
মিত্রের গল্প-ভাবনাকে অনুসরণ করে তারাশঙ্করের সাহিত্য পথের নতুন যাত্রা শুরু; তথাপি প্রেমেন্দ্র মিত্র নয়, গল্প-সাহিত্যে
তারাশঙ্কর শৈলজানন্দের অনুসৃত-পথের অনুসরণকারী। এর
রহস্যও বোধকরি এখানেই নিহিত।
৫
তারাশঙ্কর শৈলজানন্দের অনুসরণকারী কিন্তু
অনুকরণকারী নন। শৈলজানন্দ তাঁর গল্পসাহিত্যে যে আঞ্চলিকতাকে গ্রহণ করেছেন, সেই পথ
ধরেই গল্পকার তারাশঙ্করের পথ চলা। তথাপি তারাশঙ্করের গল্পের ভূগোল আরও অনেক পিনদ্ধ
এবং তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার যেন অশেষ অন্তহীন। শুধু তাই-ই নয়, সেই বিনিদ্র রজনীতে
গল্প পাঠের সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ-বর্জনের হিসাব-নিকাশে নিজস্ব পথরেখাটিও নির্ণীত করে
নিয়েছিলেন তিনি। ‘আমার সাহিত্য জীবন’ বইতে নিজেই সে কথার উল্লেখ করে বলেছেন—
“সেদিন রাত্রে দেখলাম ওই লেখাগুলির সঙ্গে আমার
স্রোতের কুটোর ঢং-এর বেশ মিল আছে। তবু একটা কথা মনে হয়েছিল—মনে হয়েছিল গল্পগুলির
আত্মা যেন জৈবিক বেগের প্রাবল্যে বেশি অভিভূত;—পরাভূত হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হয়
না। এমনকী ওই আবেগের সঙ্গে যে-দ্বন্দ্ব তার স্বাভাবিক ধর্ম, তারও অভাব রয়েছে বলে
মনে হল। জীবদেহ আশ্রয় করেই জীবনের বাস। কিন্তু সে তো তাকে অতিক্রম করার চেষ্টার
মধ্যেই মানবধর্মকে খুঁজে পেয়েছে! সেইখানেই তো নিজেকে পশুর সঙ্গে পৃথক বলে জেনেছে।
ইচ্ছে হল এমনি গল্প লিখব। সত্যকারের রক্তমাংসের জীবদেহে ক্ষুধা আর তৃষ্ণা—তার
কামনার ধারার সঙ্গে মিশেই চলেছে। জীবন চলেছে একটি স্বতন্ত্র ধারায়। কোথাও জিতেছে
কোথাও হারছে।”
তারাশঙ্কর সাহিত্যে আঞ্চলিকতার আস্বাদটি প্রথম
পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের গল্প পাঠে, উপস্থাপনা-আধারের আয়তনিক আকারটিকে শিল্পরূপ
দেওয়ার স্বপ্ন দেখলেন শৈলজানন্দের গল্প পাঠে। আর নিজের পরিচিত ও মেলামেশার
মানুষগুলিকে নিয়ে যে গল্প লেখা যায়—তার যেন বাস্তবিক প্রমাণ পেলেন প্রেমেন্দ্র ও
শৈলজার গল্প পাঠে। অনুসরণের পথে এই পটভূমি ও পুতুলের ধারণা বাদে
বাকিটুকু তাঁর নিজস্ব। মৃন্ময়ীকে প্রাণসঞ্চারে চিন্ময়ী করার পন্থায় নিজ-নির্মিত
পথে ও নিজস্ব রীতিতে তাদের চক্ষুদান করলেন তারাশঙ্কর। রসকলি
গল্প লিখে তাঁর মনে হয়েছিল—“কেমন করে আচম্বিতে পৃথিবীর মায়াপুরীতে এটা-ওটা নাড়তে
নাড়তে সোনার কাঠি কুড়িয়ে পেলাম। যার স্পর্শে
অসাড় মানুষ ঘুম ভেঙে ফুটে ওঠে ফুলের মতো।” কমলিনী বৈষ্ণবীকে জৈবরসের দিঘীতে ডুবতে
দিলেন না, বিকশিত শতদলের মতো জলের উপরে ভাসিয়ে রাখলেন তাকে। এইখানেই প্রেমেন্দ্র ও
শৈলজানন্দকে অনুসরণ করেও তাঁদের পথ থেকে সরে এক স্বতন্ত্র পথের পথিক হয়ে উঠলেন
তারাশঙ্কর। আমরা জানি সাহিত্যসৃষ্টিতে প্রতিমার চক্ষুদানই শিল্পীর সবচেয়ে বড়
কৃতিত্ব। সেই চক্ষুদানের ক্ষমতা যদি না থাকত, তাহলে রাঢ়দেশ নিয়ে তারাশঙ্কর
সারাজীবনে যতকিছু লিখে গেছেন তা একটি বিশেষ অঞ্চল আর সময়ের দলিলধর্মী বিবরণের বেশী
মূল্য ভাবীকাল পেত না। শিল্প-প্রতিমায় চক্ষুদান প্রসঙ্গে তারাশঙ্করের এই কৃতিত্বের
কথা বলে গেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র স্বয়ং।
পাত্র-পাত্রীর জীবনের সঙ্গে শিল্পীচিত্তের
তন্ময়তাযোগে জীবনকে দেখার এই দৃষ্টি তারাশঙ্করের নিজস্ব। মোহিতলাল মজুমদারের ভাষায়
তারাশঙ্করের এই দৃষ্টি—‘বৈজ্ঞানিক তান্ত্রিকের দৃষ্টি’।
আসলে তারাশঙ্কর মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ‘এক কল্যাণ-স্নিগ্ধ সত্য-সুন্দর
জীবন-পরিণামকে’। তাই পুতুল প্রতিমার চক্ষুদানে সেই সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠা
দিয়েছেন প্রথমাবধি। সাহিত্যে শৈলজা-অনুসরণের স্বীকারোক্তিতেও শিল্পী-ব্যক্তিত্ব
সেই একই মহিমাকে মহিমান্বিত করেছেন।
-------------------
No comments:
Post a Comment
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। সময়মতো উত্তর পাবেন।