Tuesday, 2 July 2024

 

 

 

 

দ্যাখা তবে কেমন দ্যাখা

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

সকল মানুষই দ্যাখেযাদের দৃষ্টিশক্তি আছে তারা দ্যাখে; আবার যাদের দৃষ্টিশক্তি নেই অর্থাৎ অন্ধ তারাও দ্যাখে। অন্ধদের দ্যাখাদৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষের দ্যাখা থেকে ভিন্ন; কিন্তু তারা দেখতে পায়। দেখতে পায় বলেই তো পথ চলে, পড়াশোনা করে, লেখে প্রতিদিনের নিত্যকর্ম সবই করতে পারে। মহাভারতের ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হয়েও রাজকার্য চালাতেন। অন্ধভিখারী গান গায়চোখে ছটা লাগল তোমার আয়না বসা কাঁচের চুড়িতে।

 

দ্যাখা মানে তো কোনো বস্তু সম্পর্কে জানানিজেকে গন্তব্যস্থলে উপনীত করা। এই দ্যাখাটা কেমন! এই দ্যাখাচোখে দ্যাখা মনে দ্যাখা জ্ঞানে দ্যাখা এবং বোধে দ্যাখা। আবার কানে দ্যাখা কথাটাকেও উপেক্ষা করা চলে না। সকল মানুষ দ্যাখে কিন্তু যেমন মানুষ তেমন তার দ্যাখা। দৃষ্টিবৈচিত্র্যের পরিমাপ ও মাত্রা এবং আকর্ষণ বিকর্ষণ ও প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে দ্যাখা বিষয়টি প্রাণের আধারে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে; তুমি কেমন আমি কেমন এবং জগৎ কেমনএই ধারণা সম্পর্কিত ব্যাস ও ব্যাসার্ধের ক্রমবিবর্তন সম্ভব হয়। দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষ নিজ নিজ চোখে দিনরাত্রির আলো-অন্ধকারময় জগৎকে দেখতে পায়। দিনের আলোতে চোখ খুললেই অরণ্য-পাহাড়-পর্বত নদী-সমুদ্র এবং পাখির কলকাকলি মানুষের চলাচল সবই দেখতে পায়। রাতের অন্ধকারে অথবা জ্যোৎস্নালোকে নক্ষত্রখচিত নীলনভোতলের জগৎকেও দেখতে পায়। স্থবির ও জঙ্গম জগতের সে এক প্রত্যক্ষ দ্রষ্টা। এইজন্য তাদের বক্তব্যযা দেখি তা সত্য; নিজের চোখে দ্যাখার মতো সত্য অপর কিছুতে হতে পারে না। যে বিষয় বা বস্তু চোখের সামনে বাস্তবে দ্যাখা যায়, অনুভব করা যায় তাই-ই সত্য এই সূত্রে নিসর্গ প্রকৃতির আকাশ-চাঁদ-সূর্য-নক্ষত্ররাজি থেকে অরণ্য-পাহাড়-পর্বত নদী-সমুদ্র এবং পাখির কলকাকলি মানুষের চলাচল সবই নিত্য আমাদের নজরে পড়ে; যেন চোখ ফেরালেই সবকিছু দ্যাখা যায় একই ভাবে কোনো তথ্য বা ঘটনা প্রসঙ্গে এও বলে থাকি যে বইতে লেখা আছে দেখেছি এতো সত্য কথা সত্য ঘটনা কাজেই যা জেনেছি দেখেছি এবং দেখছি তা সবই সত্য

     কিন্তু জড় ও প্রাণ সমন্বিত নিজের সীমাবদ্ধ জগৎ এবং অক্ষরচিহ্ন সমন্বিত স্থাপত্যকীর্তি বই দেখেযা জানা যায় দ্যাখা যায় তা কেমন সত্য! দিনে যে সূর্যকে আমরা দেখতে পাই রাতে তাকে আর দেখি না, তেমনি রাতের চাঁদকেও দিনে দেখতে পাই না রাতের বেলা গাছে গাছে কুঁড়ি ধরেছিল সকালে দেখা গেল সবকুঁড়ি ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে; পরের দিন বা কয়েকদিনের মধ্যে গাছের সেই ফুল সব ঝরে যায় এও তো আমাদের চোখের দ্যাখা একসময়ের মিথ্যা পরে সত্য এবং সেই সত্য আবার পরে মিথ্যা হয়ে ওঠে তখন কি মনে হয় না যে

একটি সত্যের জন্ম দিতে মিথ্যার মাতৃত্ব আর

একটি মিথ্যার জন্ম দিতে সত্যের স্বীকৃতি ছাড়া

বাস্তব পৃথিবীতে সত্য বলে কিছু নাই

তুমি আমি মুখোশের অন্তরালে মঞ্চগড়ি বারবার

 

     বাস্তবে চোখে দেখা সত্য যেমন সাময়িক তেমনি বইতে পড়া সত্যও ঠিক তাই সাধারণভাবে লেখক তাঁর সময়কাল পর্যন্ত প্রচলিত সত্যকে বইতে লিপিবদ্ধ করে রাখেন কিন্তু এমন কোনো কথা কী লেখা থাকে যার কোনো বিবর্তন বা পরিবর্তন হয় না? গণিতের ধারাপাত যে সময়ে লেখা হয়েছিল সেই সময়ের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কথা অনুসারেই ছয়ঋতুর বিভাজন করা হয় এখন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটেছে এখন আর ধারাপাতের সব সত্য কি সত্য হয়ে আছে!  আষাঢ় শ্রাবণের বৈশিষ্ট্য যেন এখন ভাদ্র আশ্বিনে উপনীত হয়েছে সৌরপরিক্রমনের যে অটল সিদ্ধান্তের কথা বৈজ্ঞানিক সত্য বলে বিজ্ঞান বইতে লেখা হয়েছে সেই সত্যের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিতর্কের অবসান কী কোনোদিন সম্ভব! সামাজিক দলিল বা ইতিহাসের নিদর্শন হলেও বইতো অক্ষরচিহ্নের স্থাপত্যকীর্তি বই পড়ে মানুষ জ্ঞানী বা পণ্ডিত হতে পারে; জীবনদর্শনের দার্শনিক হয়ে ওঠে না। কিন্তু বইয়ের বস্তুজগতের সঙ্গে চেতনার সত্তাযোগে মানুষ যখন নিজেই বই হয়ে ওঠে তখনই জীবনদর্শন ও দার্শনিকের জন্ম হয়। তখন সে সত্যের ভেতরের সত্যকে দেখতে পায়।

     আবার একই বিষয় বা বস্তু তুমি যা দেখছো আমি তা দেখছি না; আমি যা দেখছি তুমি তা দেখছো না যখন দুই ব্যক্তির মধ্যে মারামারির ঘটনা আমরা দেখিতখন কেউ দ্যাখে জয়ী ব্যক্তির বীরত্ব কেউ দ্যাখে পরাজিত ব্যক্তির মর্মাহত দৃশ্য; আবার কেউবা উভয়কেই দ্যাখেন পৃথিবী নামক গ্রহটিকে সকলেই দেখছে কিন্তু সময়ান্তরের দৃষ্টিভেদে তার আকারের ভিন্নতার কথা বলা হচ্ছে আসলে ব্যক্তিভেদে দ্যাখার ভিন্নতায় বস্তু বা ঘটনার স্বরূপ ভিন্নরূপে সত্য হয়ে ওঠে প্রকৃতপক্ষে চোখে দ্যাখার সমস্তকিছুই বাস্তব কিন্তু কোনোটাই সম্পূর্ণ সত্য নয় চোখে দ্যাখা সাময়িক দ্যাখা আংশিক দ্যাখা এবং বস্তুগত বা ঘটনাগত দ্যাখা কারণ, ‘সত্যসদা বিদ্যমানএবং অপরিবর্তনীয় স্থান-কাল-পাত্র অনুসারে দ্যাখার তারতম্য ঘটে জানার বিবর্তন হয় কিন্তু সত্যের কোনো তারতম্য ঘটা সম্ভব কী?

     আসলে দ্যাখা আর অদ্যাখার মাঝে সত্যের স্বরূপ লুকিয়ে থাকে এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে এক ফরাসি শিল্পীর আঁকা একটি বিখ্যাত ছবির কথা ১৮৮৬ সালে বিখ্যাত ছবিটি এঁকেছিলেন ফরাসি চিত্রকর জিনলেওন জেরোম। একটি লোককথাকে ভিত্তি করে তিনি এই ছবি এঁকেছিলেন; যার মূল বক্তব্য বিষয় হলোবাস্তব সত্যের স্বরূপ উদ্ঘাটন। একটি বিষয় মীমাংসার জন্য একদিন সত্য ও মিথ্যা পরস্পরের সঙ্গে দেখা করল। হাঁটতে হাঁটতে তারা চলে গেল একটা কুয়োর পাশে। তারপর মিথ্যা বললদেখো, কুয়োতে কী স্বচ্ছ জল। চলো দুই বন্ধুতে স্নান করে নিই। সত্য তার সরলতা নিয়ে মিথ্যার কথায় বিশ্বাস করল এবং কুয়োর স্বচ্ছ জল দেখে স্নানেও রাজি হলো। দুজনে পোশাক খুলে রেখে কুয়োর জলে নামল। স্নানের মাঝপথেই মিথ্যা উঠে এলো এবং সত্যের পোশাক পড়ে পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর মিথ্যাকে ফিরে আসতে না দেখে সত্য জল থেকে উঠল। দেখল মিথ্যা তার পোশাক পরে পালিয়ে গেছে। সত্য কোনোভাবেই মিথ্যার পোশাক পরলো না; নগ্ন অবস্থায় মিথ্যার সন্ধানে বের হলো। সমাজের সভ্য মানুষ নগ্ন সত্যকে মেনে নিতে পারল না। ফলে সত্য আবার কুয়োর জলে আত্মগোপন করল আর মিথ্যা সত্যের পোশাক পরে সমাজে সত্য হয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো। সমাজ বুঝল তবু তার পোশাককে মান্যতা দিল। দার্শিক ডেমোক্রিটাস এর অনুবাদ করে বলেছেন—“Of truth we know nothing, for truth is in a well”.

     ভারতীয় দর্শন অনুসারে ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা ব্রহ্মসৃষ্ট প্রকৃতি এবং প্রকৃতির জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সবই সত্য এবং প্রকৃতির বুকে যে সচল প্রাণ তাও সত্য কিন্তু প্রাণী সত্য নয় এই জন্যই বলা হয় প্রাণীর বিনাশ হয় কিন্তু প্রাণের বিনাশ নেই প্রাণীকে দ্যাখা যায় কিন্তু প্রাণীর অভ্যন্তরে যে প্রাণ তাকে দ্যাখা যায় না জ্ঞানের আলোকে আর চেতনার দৃষ্টিতে তাকে দেখতে হয় প্রকৃতিগত সত্যের দর্শনে বলা হয়ওই শোনো! সত্যের বিজয়-ঝঙ্কার উঠছে, সত্যলোকের শুভ্রজ্যোতি দিঙ্মণ্ডল উদ্ভাসিত করছে, বায়ুমণ্ডল মুখরিত হচ্ছে, বসুন্ধরা প্রাণময় সত্যের অহ্বানে জড়ত্ব পরিত্যাগ করছে, জলরাশি সত্যনিনাদে উদ্বেলিত হচ্ছে এসবের অর্থ জগৎ সচ্চিদানন্দময় এই সৎ-চিৎ-আনন্দের—‘সৎকথার অর্থ সত্তা বা অস্তিত্বশীলতা; মানে কিছু একটা আছে দৃশ্যমান জগতের অন্তরালে কোনো একটি শক্তি সর্বদা সক্রিয় অবস্থায় বিদ্যমান তাঁর কারণেই জগৎ জঙ্গম এবং প্রাণময়

     যা দেখতে পাইনা তা অদ্যাখা বা অদৃশ্য। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে বৈচিত্র্যমণ্ডিত মায়াময় জগতের অন্তরালে সত্য লুকিয়ে থাকে। আমরা জগতের বস্তু দেখি কিন্তু বস্তুর অন্তরালে সত্য দেখি না। আবার জগৎ যে দেখি তাও নিজের সাধ্য অনুসারে নিজের মতো করে দেখি। তাই সামান্য দ্যাখা আর অসামান্য সবকিছু অদ্যাখা থেকে যায়। বস্তুজগতের সবটা দ্যাখা সম্ভব নয় কিন্তু যেটুকু দ্যাখা সম্ভব তার মধ্য দিয়েই অদ্যাখার কল্পনাটি মিলিয়ে নিতে হয়। দ্যাখার সূত্র ধরেদ্যাখা ও অদ্যাখার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অস্তিত্বকে যদি খুঁজে পাওয়া যায়তখনই দ্যাখার দৃষ্টিটা বাস্তব থেকে সত্যে উপনীত হয়। 

 

দ্রষ্টার বাস্তব দর্শন বা দ্যাখার বিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন কিরণসম্পাতে বিভিন্ন মাত্রায় উদ্ভাসিত ও বিকশিত হয়ে ওঠে। কাজেই বলতে হয় যে চোখে দ্যাখার এই বাস্তবতা সত্যের সম্পূর্ণ স্বরূপের প্রত্যক্ষগোচর নয়। চোখ দ্যাখার একটা মাধ্যম মাত্র; দ্যাখার মূলে রয়েছেমন বিবেক মনুষ্যত্ব এবং জ্ঞান ও বোধ তথা মানুষের চেতনা। কেবলমাত্র চোখ দিয়ে দ্যাখার পরেও প্রাণের বিবর্তনে প্রত্যক্ষগোচর বস্তুর অন্তরালে মন দিয়ে দ্যাখা এবং তারও অন্তরালে জ্ঞান ও বোধ দিয়ে দ্যাখা বিষয়গুলি অনিবার্যভাবে কার্যকরী হয়ে ওঠে। তবে এই ক্রিয়া সকল প্রাণে সক্রিয় নয়। এই সক্রিয়তায় প্রাণের আধারটি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। আর সেই সক্রিয়তার সূত্র থেকেই অশিক্ষিত-শিক্ষিত জ্ঞানী ও পণ্ডিত বোধে-বুদ্ধিমান ও দার্শনিকমাত্রাসমন্বিত কথাগুলি মানুষে মানুষে যুক্ত করা হয়। জড় ও প্রাণের অন্তরালে এক অনন্ত চিৎশক্তির সক্রিয় সত্তা বিদ্যমান কিন্তু তার প্রকাশ মায়াময়; যেন সত্যের স্বরূপে মিথ্যার প্রকাশ। মায়া মানে মনে হওয়া; জ্ঞানী সেই মনে হওয়াকে অতিক্রম করতে পারে।

      একটি বহুল প্রচলিত উদাহরণ এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। আর্ধেক জলপূর্ণ কাঁচের গ্লাসের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা একটি কাঠিকে বাঁকা দ্যাখায়। সেই দেখে অনেকেই বলবেন কাঠিটি বাঁকা; কিন্তু কাঠিটি বাঁকা নয়বাঁকা মনে হয়। চোখে দ্যাখার সাধারণ দৃষ্টিতে জ্ঞানের উৎস যুক্ত হলেই বাঁকা আর বাঁকা মনে হওয়া বিষয়টি স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। চাঁদ ও সূর্যকে চব্বিশঘণ্টা দেখতে না পাওয়ার কারণ জানার জন্য চোখে দ্যাখার বলয় থেকে আমাদের জ্ঞানের বলয়ে উপনীত হতে হয় এই দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের নাম জ্ঞানী এবং বিজ্ঞানী যতক্ষণ যতটুকু দ্যাখা যায় ততক্ষণ ততটুকুই সত্য; কিন্তু এই সত্য যখন বিবর্তনে বিলয় ঘটে তখনই তাকে সাময়িক সত্য বলে মেনে নিতে হয় বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর পূর্বকাল পর্যন্ত চোখের দ্যাখা এবং জ্ঞানের দ্যাখা মিলিয়ে গাছ সম্পর্কে যে কথা যা জানা যেত তাই সত্য ছিল জগদীশচন্দ্র বসু গাছের প্রাণের কথা বলার পরগাছ সম্পর্কে অবহিত সত্যস্বরূপের বদল ঘটল যুগোচিত সাময়িকতা যেমন সমকাল তেমনি মহাকালের পথপার্শ্বে চিরায়ত সত্যের দীপমালামানুষের অপেক্ষায় থাকে জগৎ তো মায়াময়; আর সেই মায়ার মাঝখানে বসেই সত্যকে সাধনা করতে হয় পার্থিব জগৎকে বাদ দিয়ে কিছু হয় না বলে মানুষ অথবা প্রকৃতি কোনো কিছুর অবলম্বন সেখানে নিতেই হয় তবে বাস্তব যে, বোধ ভিন্ন জাগতিক সত্য বড়ো আপেক্ষিক; সময়োচিত আবেগ বা অভিমত অথবা আনুমানিক প্রতিক্রিয়া

 

চোখ দিয়ে দ্যাখা সাধারণ দ্যাখা এবং মন দিয়ে দ্যাখা বস্তুনিষ্ঠ অথবা কল্পনিষ্ঠ হয়ে ওঠা। আবার জ্ঞানে দ্যাখা পণ্ডিতের দ্যাখা কিন্তু বোধের দৃষ্টিতে দ্যাখা বিজ্ঞানসম্মত দ্যাখা; এই বোধে দ্যাখার নাম দর্শন। বোধ ব্যতিরেকে দ্যাখার ভিন্নতায় যে সাময়িক বা আংশিক দ্যাখা তার বাস্তবতাকে সাধারণভাবে সমাজপ্রচলিত সত্য বলে মান্যতা দেওয়া হয়। এই দ্যাখার মধ্যে সত্যের সৎবিষয়টি ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হয়; স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন হয়ে ওঠে। চোখে দ্যাখা মনে দ্যাখা বা জ্ঞানে দ্যাখার বিষয়বিবাদ-বিতর্ক-বিসম্বাদের কারণ; সেখানে সত্যের সৌন্দর্য বা কল্যাণময়তা দূরে থাকে। দ্যাখার এমন অস্বাভাবিকতা নিয়েই আমাদের সমাজ-বাস্তবতার স্বাভাবিকতা। সবকালেই সমাজপ্রচলিত সত্যের বিপরীত মুখে চলা ব্যক্তি অসৎ বলে পরিচিত হয় যে পরিবারের যাজ্ঞিককর্মে বলিদান প্রথা সংস্কারে পরিণত হয়েছে সেই পরিবারের কোনো সদস্য তাকে না মানতে পারলে সে অসাধু অসৎ নাস্তিক বলে পরিচিত হয় ন্যায় করুক আর অন্যায় করুক সমাজপতিদের মান্যতা দেওয়া সমাজের প্রচলিত ধারা এই প্রচলিত ধারাকে অতিক্রম করে সমাজপতির অন্যায়ের প্রতিবাদী ব্যক্তি সবকালেই অসৎ ঘোষিত হয়ে থাকে অনেকের দ্যাখা অনেকের মান্যতা দেওয়া এবং অনেকের বলার মধ্যে একটা সামাজিক চলমানতার যূথবদ্ধ প্রকাশ থাকে এমন যূথবদ্ধ প্রকাশের বিরোধিতায় বিনষ্টি না করলেও চূড়ান্ত সত্যের স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে জ্ঞানের গরিমা থাকতে পারে কিন্তু বোধের বৌদ্ধিক পরিচয় থাকে কী? কারণ যা চোখে দ্যাখা যায় বইতে পড়া হয় এবং যা সাধারণে মান্যতা দেয় সেই বিষয়গুলিকে যদি অন্যভাবে দ্যাখা হয় অন্যভাবে বলা যায়তখন সত্যের স্বরূপ সন্ধানে সেই বিষয়টিকে তার আসন থেকে টেনে বিতর্কের মাঠে নামানোর অবকাশ অস্বীকার করা যায় না সমাজপতিকে মান্যতা দেওয়া সামাজিক সত্য কিন্তু তার অন্যায়ের প্রতিবাদী হওয়া অসতের পরিচয়ের বহন করে না এখানে সত্যের সঙ্গে ন্যায়ের প্রসঙ্গ যুক্ত হয়

     কানে দ্যাখা বিষয়টি বেশ বিচিত্র-জটিল রাজা ধৃতরাষ্ট্র কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ দেখেছিলেন কানে রাজাদের কানে দেখার একটি প্রবাদ আমাদের অজানা নয় চিরাচরিত সমাজে এমন মানুষের অভাব নেই কানে দ্যাখা গোয়েন্দাগিরির একটি সূত্র যিনি কানে দ্যাখেন তিনি কি বিষয় কেমনভাবে দেখবেনসেটা নির্ভর করে দ্যাখানো ব্যক্তিটির মানসিকতার উপর সেখানে সঞ্জয়ের পরিবর্তে দুর্জয় হলেই উল্টোপুরাণের সৃষ্টি হয় এই দ্যাখা অনেক ক্ষেত্রেই বস্তুকে বিকৃত করে অথবা অসত্যাকারে দ্যাখানো হয় সেক্ষেত্রে, দ্রষ্টা তরল চরিত্রের মানুষ হলেসিদ্ধান্তে সরলতার বুকে বন্দুক ঠেকে তখন বলতে হয় কানে দ্যাখা বড়ো ভয়ঙ্কর দ্যাখা; সে দ্যাখা না দ্যাখাই ভালো

    

সত্যকে না দেখতে জানা অসৎ বা অপরাধের কারণ নয় তবে চিন্তাশীল মানুষ সত্যসন্ধানী হবে এটাই স্বাভাবিক চিন্তাশীল মানুষ দ্যাখে খণ্ড খণ্ড জড় ও জীবের মধ্য দিয়ে এক অখণ্ড জাগতিক শক্তির লীলা আবর্তিত হচ্ছে আর সেই লীলাশক্তির সক্রিয়তার কারণেই দৃশ্যমান জগৎ সুন্দর সেই অখণ্ডশক্তি আমাদের অদ্যাখা অদৃশ্য; তাকে চোখে দ্যাখা যায় না; জ্ঞানে বোধে ও মনে দেখে নিতে হয় প্রত্যেক ব্যক্তি এবং বস্তু সেই অখণ্ডের খণ্ডরূপ খণ্ডকে অখণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারলে দ্যাখা যায়জগতের সঙ্গে মহাজাগতিক মিলন বাস্তব হয়ে উঠেছে

     চোখে দেখি দেবী কালিকাবর্ণে কালো; গলায় দোলে নরমুণ্ড মালা এ দ্যাখা জাগতিক দ্যাখা খণ্ড দ্যাখা কিন্তু যখন কালের কলন বা সববর্ণের হরণকারী বলে তিনি কালো দেখি তখন তাঁর জগদীশ্বরী মূর্তির মহাজাগতিক সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আমরা তো জানি তাঁর গলায় নরমুণ্ড মালার মুণ্ডগুলি সব অসুরের; কিন্তু সাধক কবি যখন প্রশ্ন করেনজগৎ যখন ছিল না তখন মুণ্ডমালা কোথায় পেলি; তখনই আদি বর্ণমালার বর্ণগুলি দেখতে হয় 

     আমি যখন তেমন কোনোকিছু দেখতে চাইতখন রাতের মুক্ত আকাশে আমার বাড়ির নিরালা ছাদটি সকল সাধ্যের সাধনসঙ্গিনীর মতো হয়ে ওঠে আমার একান্ত আপনজন রাতের নীরবতায় অন্ধকারের শূন্য কায়ার সঙ্গে আত্মরোমন্থনে স্পন্দিত হয়ে ওঠে আমার একশো আট নাড়ীর শিহরণ মনের কৌতূহল বা নাকড়াধ্বনি যখন বুকের দরজায় বেল বাজায় তখন অন্দরমহলের সিংহাসন কেঁপে ওঠেরাতের ঘুম কেড়ে নেয় তখনই গভীর রাতের শূন্য কায়াকে শব করে অন্তরপ্রদাহী যাজ্ঞিক চিতায় শুরু হয় অনুসন্ধানের আহূতি দেখি, স্মৃতির জানলায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বইঘরের শত শত পৃষ্ঠার চলচ্ছবি, পিছন থেকে উঠে আসে বাস্তব অভিজ্ঞতার অনুরণিততালবেতালি কত নৃত্যছন্দ; সৃষ্টিবিলাসী উপমা রঙিন কল্পনাসুন্দরের বাতাসে রঞ্জিত হয়ে ওঠে আমিত্ব এই আমিত্ব ঠিক অহং নয়; এই আমিত্ব অহং ভঙ্গকারী আমিকে বিনির্মানের আধার এইজন্য বলা হয়আমিত্ব অর্জনই মনুষ্যত্ব বিনির্মানের সূচনাকালে আমিত্ব মনে করে সত্যের প্রত্যাশিত পথে নিরন্তর সূক্ষ্মতার গতি ধরে বিনির্মানের যে নিত্য বিড়ম্বনা দ্যাখা যায় সে তো জ্ঞানাবধি অভিজ্ঞতার পঞ্চতপা কাহিনিমাত্র মনে হয় সত্য তবে হৃদয়ছেঁড়া কথায় নিঙরানো জীবনের নব নব নির্যাস

     কিন্তু বিনির্মানের একটা সময়ে আমিত্বের বিলয়লগ্নে উপলব্ধি হয় যে, পৃথিবী আমাকে ধরে আছেন এই সত্যের অন্তরালে পৃথিবীকে ধরে আছেন যে মহান শক্তি তিনিই সত্য। সেই সত্য আমার মধ্যেও বিকশিত। তিনিই আমার অন্তরে ও বাইরে সত্য হয়ে আছেন বলে তাঁর দৃষ্টি দিয়ে আমরা তাঁকেই নানারূপে নানানভাবে দেখছি।

================

 

 দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি,বীরভূম—৭৩১১০২।

পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ। মোবাইল—৯২৩৩১২৪৭১৮।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Sunday, 30 June 2024

 

 

 

 

তারাশঙ্করের উপন্যাসের নরনারী : যাদের দেখেছি

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

সামাজিক উপন্যাসের চরিত্রচ্ছায়া—সে তো ধূলিমলিন বাস্তবের কায়ার অনুরূপ; রক্তমাংস-সম্ভূত মানুষের পরিমার্জিত প্রতিবিম্ব—এবং সেই সত্য সামাজিক শিল্পীর যেন চিরায়ত অবলম্বনসামাজিক ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কথা তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলির অধিকাংশই তাঁর নিজের চোখে দেখা এবং কথা বলা পরিচিত মানুষ। দেখেছি পুস্তকাকারে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালী ঘূর্ণী’ থেকে শুরু করে মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘১৯৭১’ নামক উপন্যাস অবধি কমবেশি একথা স্মরণীয়। অনুসন্ধান করে এমন অনেক মানুষের নাম-ঠিকানা সহ বাস্তব পরিচয় জানাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে; এমনকি তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে মুখোমুখি বসে আলাপচারিতার সুযোগও আমরা পেয়েছি। তারাশঙ্করের সাতটি উপন্যাস এবং প্রসঙ্গতঃ বিশেষ একটি গল্প থেকে এমন দশজন নরনারীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হলো। বড়ো আনন্দের বিষয় যে তাঁদের একজন দু’জন শতবর্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজও আমাদের মধ্যে রয়েছেন।

 

বীরভূমের লাভপুরে তারাশঙ্করের বন্ধুপুত্র ডাঃ সুকুমারচন্দ্র চন্দ্র ওরফে বিশু ডাক্তার  শতবর্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজও চিকিৎসাপথে মানুষের সেবা করে চলেছেন। লাভপুরের এই বিশু ডাক্তার তারাশঙ্করের গল্পে এবং উপন্যাসে স্বনামে এবং অন্যনামে একজন চিকিৎসক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত। আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের স্মৃতিচারণায় ডাক্তারবাবু নিজেই সে কথা জানিয়েছেন।

     ১৯৯৮ সাল, তারাশঙ্করের সাহিত্যের চরিত্রগুলির বাস্তব পরিচয়ের অনুসন্ধানে ক্ষেত্রসমীক্ষা শুরু করেছি। লাভপুর অঞ্চলের অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। সেই সময় ডাক্তারবাবুর সঙ্গেও পরিচয় হয়। আমার ডায়রিতে লেখা রয়েছে তারাশঙ্কর অনুসন্ধানে ডাক্তারবাবুর কাছে প্রথম গিয়েছিলাম ১৯৯৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারিতখন তিনি সত্তর বছরের প্রবীণ ডাক্তার। সেই যোগাযোগ আমাদের এখনো রয়েছে। মনে পড়ে ২০১৫ সালে মায়ের চিকিৎসা করতে আমাদের সিউড়ির বাড়িতেও তিনি এসেছিলেনফিজ তো দূরের কথা, গাড়িভাড়াটুকুও ধরাতে পারিনি; বরং আমার কন্যার জন্য বিবিধ রকমের বিস্কুট এবং চকোলেট নিয়ে এসেছিলেন। দীর্ঘদিন পর আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, রাত্রি সাড়ে ন’টার সময় এই প্রবন্ধ লিখতে বসে তাঁর সঙ্গে আবার ফোনে কথা বললাম। মনে পড়ল প্রথম সাক্ষাৎ-সময়ের কয়েকটি দিনের কথা। একদিন স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছিলেন—

     তারাশঙ্করবাবু তো আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। আমাকে ছেলের মতোই ভালোবাসতেন। আমি তখন কলকাতার আর. জি. কর. মেডিকেল কলেজে পড়ি। হোস্টেলে থাকি। মাঝে মধ্যেই ফোন করতেন—একবার এসো। নির্দেশ মনে করে তাঁর কলকাতার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হতাম। তিনিও হোষ্টেলে গিয়ে দেখা করতেন। ডাক্তারি পাশ করার পর নির্দেশ দিলেন—গ্রামে বসে মানুষের সেবা কর। আমি আজও তাঁর সেই নির্দেশ পালন করছি।

     তারাশঙ্করের ‘এ মেয়ে কেমন মেয়ে’ গল্পে বিশু ডাক্তার নামে একটি চরিত্র রয়েছে। একদিনের এক সাক্ষাৎকারে সে কথা বলতেই ডাক্তারবাবু উত্তর দিলেন—তুমি ঠিকই ধরেছো দেবাশিস। ওটা আমারই কথা বলেছেন তিনি। এছাড়াও ‘জগন্নাথের রথ’ গল্পে এবং ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসেও আমার কথা বলে গেছেন তারাশঙ্করবাবু। ওই গল্প এবং উপন্যাস দুটোই আমার পড়া ছিল। ‘জগন্নাথের রথ’ গল্পে বিশু ডাক্তারের কথা সরাসরি উল্লেখ রয়েছে কিন্তু উপন্যাসে তো পাইনি!

     ডাক্তারবাবু হাসতে হাসতে বললেন—তাঁর আদরের বিশু তখন ডাক্তার আশুবাবু হয়ে গেছে। বললেন, তারাশঙ্কর কলকাতা থেকে গ্রামের বাড়িতে এলে অনেক মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। আমিও যেতাম। একদিন দেখা করতে গেছি—উনি যেন একেবারে চিৎকার করেই বলে উঠলেন—এসো ডাক্তার আশুবাবু এসো। বিস্ময়ের দৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকালাম—শেষকালে আমার নামটাও কি ভুলে গেলেন! আমার নীরবতা দেখে উনি বোধ হয় আমার মনের ভাব বুঝতে পারলেন। সঙ্গে সঙ্গেই বললেন—ডাক্তার বিশুবাবু এখন থেকে আমার কাছে আশুবাবু। সেদিন এর অর্থ বুঝতে পারিনি; কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসও হয়নিপরে যখন ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসটি পড়ি তখন তাঁর কথার অর্থ আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপন্যাসে ডাক্তার আশু সিংহীর চেম্বারের যে ভৌগোলিক পরিচয় দেওয়া হয়েছে—বাস্তবে সেটাও তো আমারই ঠিকানা।

     ডাক্তারবাবুর কথা যত শুনছি ততই বিস্ময়ে যেন নিজেকে অজানা কোনো এক রোমাঞ্চের মধ্যে হারিয়ে ফেলছি। কত কিছু জানার কৌতূহল জাগছে। আলাপচারিতায় জানতে পারি উভয়ের মধ্যে পত্রবিনিময়ের কথা। বলেছেন—চিঠি তো অনেক লিখেছেন। আমিও লিখেছি। তবে কলকাতা থেকে যত না চিঠি লিখতেন তার থেকে গ্রামে এলে আমার কাছে তাঁর হাতচিঠি আসত অনেক। ছোট্টো টুকরো কাগজে দু’লাইন লেখা—ডাক্তার একে একটু দেখে দিও। ওষুধপথ্যের ব্যবস্থা করে দিও। জানাতেন খরচপত্র তিনি দেবেন। কত দুঃস্থ মানুষ তাঁর চিঠি নিয়ে আসত—আমি তাদের যথাসাধ্য করতাম। তখন থেকেই আমি বিনা পয়সায় দুঃস্থদের সেবা করার তাগিদ অনুভব করি। একদিন জানতে চেয়েছিলাম—চিকিৎসা বিষয় নিয়ে লেখা তারাশঙ্করের ‘আরোগ্য নিকেতন’ এর কথা। বলেছিলেন—‘আরোগ নিকেতন’ উপন্যাসের মূল বিষয়টি আমার পিতৃদেব স্বর্গীয় শরৎচন্দ্র একটি খাতায় লিখে তারাশঙ্করকে দিয়েছিলেন। আর আধুনিক চিকিৎসার বিষয়ে তিনি কয়েকবার্‌ই আমার সঙ্গে অনেক কথা আলোচনা করেন।

 

একদিনের আলাপচারিতায় ডাক্তারবাবু  বলেছিলেন,  ‘জগন্নাথের রথ’ গল্পের জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসের সীমা—এই দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে তারাশঙ্কর বাস্তবের দুই ব্যক্তির কথা বলেছেন। জগন্নাথকে আমরা জগা বলি। ‘জগন্নাথের রথ’ গল্পের জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে চরিত্রটিকে তারাশঙ্কর লাভপুরের মাটি থেকে সরাসরি স্বনামেই গল্প উপস্থাপিত করেছেন। জগন্নাথ বাস্তবিক লাভপুর বালিকা বিদ্যালয়ে, বিশু ডাক্তারের চেম্বারে, লাভপুর স্টেশনে—নিজের খেয়ালে স্বেচ্ছায় নিয়মিত দায়িত্ব পালনের মতো অনেক কাজ করতো। গল্পে তারাশঙ্কর তাঁর সেই সব দায়িত্ব পালনের বিষয়টি এক রকম হুবহু তুলে ধরেছেন। আমরা লাভপুর রেলস্টেশন এবং বালিকা বিদ্যালয়ে গিয়েও জগন্নাথের খবর নিয়েছিলাম। লাভপুর গার্লস স্কুলে জগন্নাথ যে সময় স্বেচ্ছাশ্রমে আত্মনিয়োগ করেছিলেন—সেই সময়ের দিদিমণিরা—কল্যাণী দেবনাথ, ঝর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা সেন সকলেই সেদিন জগন্নাথের কথায় খুশিতে ভরে উঠেছিলেন। এইসব দিদিমণিরাও গল্পে এক এক নামে উপস্থাপিত হয়েছেন। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জগন্নাথবাবুর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে মুখোমুখি বসে কথা বলিজানতে পারি আটচল্লিশ বছর বয়সী জগন্নাথবাবু একজন রেলকর্মী, মল্লারপুর স্টেশনে পোস্টিং; আমোদপুরে ১১/এ নম্বর রেল-কোয়াটার্সে বাস করছেন। বাকশক্তির জড়তাপূর্ণ স্মৃতিচারণায় তিনি তাঁর অতীতের কথা বলে গেলেন। চাকরির কথায় বলেছিলেন লাভপুরে বালিকা বিদ্যালয়ের দিদিমণি সুনীতি গোস্বামী তাঁকে বাসায় নিয়ে গিয়ে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভালো লাগেনি। তখন থেকেই তিনি লাভপুর ছেড়ে আমোদপুর স্টেশনে চলে আসেন। সেখানেও তাঁর স্বচ্ছাশ্রমে খুশি হয়ে কোনো এক ‘রেলবাবু’ তাঁকে এই চাকরিটি করে দেন।

     গল্পে জগন্নাথবাবুর চাকরিজীবনের কথা নেই; সুনীতি দিদিমণির মমতা এবং স্নেহ উপেক্ষা করে তাঁর চলে যাওয়ার কথা রয়েছে। সুনীতিদেবীর স্বামী জনার্দন গোস্বামী যিনি গল্পে নারায়ণবাবু, তিনি বলেছেন—“জগন্নাথের রথ যে শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবনের পথে ছোটে সুমতি। বোকা জগন্নাথের রথ ছোটে উঁচু থেকে নীচু পথে দুর্দান্তবেগে জগন্নাথের উল্লাস সেই রথেই বেশী”। তাঁর বাসায় গিয়ে দেখেছিলাম—জগন্নাথের রথ তখনো ছুটছে; যৌবন অতিক্রম করে প্রজন্মের পথে ছুটছে; তিনি তখন সরকারি চাকরি এবং স্ত্রী-কন্যা নিয়ে সুখ-স্বর্গের বাসিন্দা।

 

তারাশঙ্করের ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসের নায়িকা সীমা এক বিস্ময়কর চরিত্রসেদিনের সমাজে—একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ হয়েও সাইকেলে চড়ে স্কুলে আসত এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতায় স্বনির্ভরশীল হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতো। চাকরি তাঁর জীবনের স্বপ্ন; বিবাহ বিষয়ে—জাত-ধর্ম-মন্ত্র ব্যতিরেকে সে ‘ম্যারেজ কণ্ট্র্যাক্ট’ এ ইচ্ছুক। সেদিনের সমাজ—সীমার এই মানসিকতাকে সমর্থন না করে জোরপূর্বক বিয়ের ব্যবস্থা করলে—অধিবাসের দিন সে পালিয়ে গিয়ে আইনের আশ্রয় নেয়। সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে বি. এ. পাশ করে বি. টি.-তে ভর্তি হয়।

     ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসের সীমা বাংলা কথাসাহিত্যে নারীচরিত্রের এক স্বতন্ত্র দৃষ্টান্ত। ব্যক্তিত্বপরায়ণা নারীচরিত্র সৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত একটি বিশেষ ধারার পরিচয় পাওয়া যায়; সেই ধারায় তারাশঙ্কর আরও অনেক বেশি প্রগতিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন—সীমা চরিত্রের মধ্য দিয়ে। ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসের এই সীমা বাস্তবিক লাভপুরের সন্নিকট কুনেড়া গ্রামের দুর্গা পাল 

     ১৯৯৮ সালে আমরা দুর্গা পালের বাড়িতে গিয়ে কথা বলি। তখন তিনি সিউড়িতে ডাক্তার নির্মল পালের স্ত্রী হয়ে সুখে সংসার করছেন। স্মৃতিচারণায় জানিয়েছিলেন—আমাদের সময় গ্রামের মেয়েরা সাইকেলিং করতো না; মেয়েদের আলাদা স্কুলও ছিল না। সেই সময় সাইকেলিং করে ছেলেদের স্কুলে পড়তে যেতাম। তার জন্য অনেক টিটকারী এবং অবজ্ঞা আমাকে সহ্য করতে হয়েছিল। একটি মেয়ে আমাকে নিয়ে ভাদুগান লিখে পাড়ায় পাড়ায় গেয়ে বেড়াতো। আরও বলেছিলেন—তারাশঙ্করবাবু আমাকে খুব ভালোবাসতেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে আমাদের স্কুলে তারাশঙ্করবাবুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনুষ্ঠানের দিন উনি আমাকে কাছে ডেকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। দিদিমণিদের বলেছিলেন—এরাই তো আমার সম্বল—লেখার উপাদান। দুর্গাদেবী যখন লাভপুর যাদবলাল হাইস্কুলে পড়তেন—সেই সময় ওই স্কুলের শিক্ষিকাদের মধ্যে—শ্যামলীদি, রমাদি, কল্যাণীদি—স্কুল সেক্রেটারি সত্যনারায়ণ ব্যানার্জীর একটি বাড়িতে থাকতেন। একবার পরীক্ষার আগে দুর্গাদেবী তাঁদের কাছে কয়েকদিন ছিলেন। বাস্তবে দুর্গাদেবীর স্কুলজীবনের ঘটনাগুলি উপন্যাসে সীমা চরিত্রেও রয়েছে।

 

বিখ্যাত ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসের এক মুখ্য চরিত্র করালী কাহার দুর্দান্ত সাহসী এবং আচার-আচরণে এক স্বতন্ত্র চরিত্রযেমন তার মনের জোর তেমনি শারীরিক শক্তি। বাস্তবে করালী মণ্ডল নামে এমন এক ব্যক্তিকে তারাশঙ্কর জানতেন; এবং পরে একসময় তাঁর ব্যক্তিগত ড্রাইভার ছিলেন। জানা যায় বাস্তবের করালী মণ্ডল তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসের করালী কাহার 

     বীরভূমের মহুটার গ্রামে করালী মণ্ডলের বাড়ি। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন আমরা উপস্থিত হয়েছিলাম—মহুটার গ্রামে, সত্তর বছরের প্রবীণ করালী মণ্ডলের বাড়িতেমুখোমুখি বসে কথা বলার সময় দোহারা স্বাস্থ্যের লম্বা মানুষটিকে দেখেই বিস্ময়ে চমকে উঠেছিলামতিনি প্রবীণ তবু তাঁর দিকে তাকাতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উপন্যাসে তরুণ করালীর বর্ণনায় তারাশঙ্করের কথা—“লম্বা দীঘল চেহারা, সাধারণ হাতের চারহাত খাড়াই...সরু কোমর, চওড়া বুক, গোলালো পেশীবহুল হাত, সোজা পা-দুখানি, লম্বা আমের মত মুখ, বড় বড় চোখ..”

     আমার বিস্ময়ের কথা শুনে করালী বলেছিলেন—মিলবে না কেন! ওটা তো আমাকে নিয়েই লেখা। স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, পরে তারাশঙ্করবাবুর কলকাতার বাড়িতে আমি ড্রাইভারী করতাম। কিন্তু তার আগে বাবুর তখন নিজের গাড়ি ছিল না। কলকাতা থেকে ট্রেনে আসতেন আমোদপুর। সত্যনারাণবাবুদের গাড়িতে করে আমি তাঁকে লাভপুরে নিয়ে যেতাম। একদিন অনেক রাতে বাবু আমোদপুরে নেমেছেন। সুঁদীপুরের জঙ্গল পেরিয়েছি। বাবু বললেন—তোর তো খুব সাহস! তোর সাহসের কথা আমি লিখব। কি লিখেছেন আমি পড়িনি তবে সিনেমাটা দেখেছি। আমি তো ধূতি পড়ি কিন্তু সিনেমাতে আমাকে ফুলপ্যাণ্ট পরিয়েছেন বাবু।

     মনে মনে ভাবলাম—বাস্তবের এই করালী মণ্ডল যার সামনে বসে কথা বলছি সেই তো উপন্যাসে করালী কাহার‘মনের আয়না’ বইতেও তারাশঙ্কর বলেছেন—“করালী বলিষ্ঠ; করালী সাহসী; দুঃসাহসী” কলকাতার বাড়ির ড্রাইভার করালীকে তারাশঙ্কর খুব ভরসা করতেন তাই কামাই করলে রাগারাগি করে যা খুশি বলতেন।  ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে কলকাতা থেকে করালীকে লেখা একটি চিঠিতে তারাশঙ্কর বলেছেন—“এখানে আমার আর লোক ভিন্ন চলছে না। তুমি চারদিনের মধ্যে না এলে আমি স্থায়ী লোক বহাল করব”

 

বিখ্যাত ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের স্বর্ণ এক মুখ্য মহিলা চরিত্র। চরিত্রটির মধ্য দিয়ে তারাশঙ্কর উপন্যাসে নারীসাম্য—নারী স্বাধীনতার কথা ভেবেছিলেন। উপন্যাসের অন্যতম মুখ্য চরিত্র দেবু ঘোষ—স্বর্ণকে কেন্দ্র করেই নতুন জীবন ও নতুন জগতের স্বপ্ন দেখেছে। ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের এই স্বর্ণ বাস্তবিক তারাশঙ্করের জন্মগ্রাম লাভপুরের—অন্নপূর্ণা পাল। গ্রামে তিনি অন্নদি নামে সুপরিচিতা ছিলেন। আমরা অন্নদির সঙ্গে যোগাযোগ করে একদিন তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলাম। তখন তিনি সত্তর পার করেছেন; পথ চলতে লাঠির সহযোগিতা নিয়েছেন। স্মৃতিচারণায় জানিয়েছিলেন—

     তারাশঙ্করকে আমি তো কাকা ডাকতাম। কাকা আমার গান শুনতে ভালোবাসতেন। যখন লাভপুরে আসতেন—আমাদের বাড়ির বাইরে থেকেই—অন্ন অন্ন বলে চিৎকার করে ডাকতেন। আমি দেখা করে প্রণাম করতাম; খোঁজ-খবর নিতেন—আমিও নিতাম। আমাকে নিয়ে কাকা যে বই লিখেছেন তা আমি জানতাম না। বছর কুড়ি [১৯৯৮] বাইশ আগে একদিন সাহিত্যিক আশাপূর্ণাদেবী এসেছিলেন লাভপুরে। আমার দিকে হাত দেখিয়ে কাকা আশাপূর্ণাদেবীকে বললেন—এই আমার পঞ্চগ্রামের স্বর্ণ। পরে বইটি পড়ে দেখি—কাকা স্বর্ণ নাম দিয়ে আমার কথাই লিখেছেন। বললেন, বিয়ের বয়স থেকে বৈধব্যের বয়স এবং গ্রামের স্কুল থেকে সিউড়ির স্কুলের পড়াশোনা—সবই তো আমার জীবনের ঘটনা। তবে দ্বিতীয়বার বিয়ে আমি করিনি। ওটা কাকা বাড়িয়ে লিখেছেন।

 

তারাশঙ্করের ‘না’ উপন্যাসের কাহিনি বীরভূমের কীর্ণাহারের দুই পরিবারের ঘটনা নিয়ে লেখা; ঘটনাটি আজও লাভপুর অঞ্চলে মানুষের মুখে মুখে রয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্র অনন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক তরুণ—দাম্পত্যজীবনের জটিলতায় কালীনাথ নামে এক পিসতুতো ভাইকে গুলি করে হত্যা করে। উপন্যাসে অনন্ত চরিত্রের সততা, মহত্ব এবং করুণ পরিণতি আমাদের বিস্মিত করে বেদনায় আপ্লুত করে। অনন্তর জীবনের বিস্ময়কর ঘটনার মতো একটি ঘটনা বীরভূমের কীর্ণাহার গ্রামে অনাদিনাথ সরকার নামে এক তরুণের জীবনেও ঘটেছিল। অনাদিনাথ গ্রামে খোকাবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। হত হওয়া কালীনাথের প্রকৃত  নাম ছিল—জগন্নাথ ব্যানার্জী; আর ব্রজরানী ছিলেন নন্দরানি। আত্মীয়তা সূত্রে তারাশঙ্কর তাঁদের জানতেন।

     কীর্ণাহার গ্রামে ওই দুই পরিবারে আমরা একদিন হাজির হয়েছিলাম। একানব্বই বছরের [১৯৯৮]প্রবীণ ব্যক্তি এবং অনাদিনাথের খুড়তুতো ভাই উমাশঙ্কর সরকার বলেন—আমাদের দুই পরিবারের দুই কুলাঙ্গারকে নিয়ে তারাশঙ্কর তাঁর ‘না’ উপন্যাস লিখেছেন। বললেন, অনাদিনাথের জীবনে এই বিপর্যয়ের সময় আমার বয়স কুড়ি বছর। সবকিছু আমার মনে আছে। উপন্যাসে দেখবেন অনন্ত নামটি পাল্টে অনাদিনাথ করেছেন তারাশঙ্কর। শুনেছিলাম—তারাশঙ্কর একবার কি দুবার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন এবং ওদের বাড়িতেও গিয়েছিলেন

     সরকার পরিবার থেকে গিয়েছিলাম জগন্নাথ ব্যানার্জীর পরিবারে। জগন্নাথবাবু গ্রামে জগনবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পঁচাশি বছরের [১৯৯৮] প্রবীণ পুত্র প্রিয়নাথবাবুর সঙ্গে কথা হয়। পিতার স্মৃতিচারণায় তিনি জানালেন—বাবা জগন্নাথ আমাদের গ্রামের হাইস্কুলে ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। খোকাবাবু তো বাবার মামাতো ভাই ছিলেন। উভয়ের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল কিন্তু খোকাবাবুর বিয়ের পর কিছু জটিলতা নিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দিনটি ছিল—বাংলা ১৩৩৬ সালের অঘ্রাণ মাস; বাবার বয়স তখন বত্রিশ বছর।

     আরও বলেন—আমি তখন বছর পাঁচেকের ছেলেমানুষ।  ঘটনার কথা ঘরে-বাইরে এত শুনেছি যে মনে হয় সবই যেন নিজের চোখে দেখেছি উপন্যাসে দেখবেন ব্রজরানী নামে একটি চরিত্র আছে। উনিই আমার মা। নামটা পাল্টে দিয়েছেন। আমার মায়ের নাম নন্দরানি। বলেছিলেন—ঘটনার পর খোকাবাবু তো গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ছ’মাস পরে তিব্বত বর্ডারে রামলিং নামে একটি জায়গাতে ধরা পড়ে। তখন উন্মাদ প্রায়। রাঁচির পাগলা গারদেও কিছুদিন ছিল। দীর্ঘদিন ধরে বিচার হয় সিউড়ি কোর্টে। আমি তখন বড়ো হয়েছি। রায়ঘোষণার দিনটি আমার বেশ মনে পড়ে। কোর্ট ময়দানে মেলার মতো ভিড়। কোর্টের ভিতরে একদিকে চুলদাড়ি নিয়ে খাঁচাবন্দি খোকাবাবু আর একদিকে সাদা থান পরে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মা—পাথরের মতো নিশ্চল। তারাশঙ্কর লিখেছিলেন বলে—মানুষ সেই দুর্ঘটনার কথা এখনো জানতে পারছে।

 

‘বিচারক’ উপন্যাসে রয়েছে—ষাট বছর বয়সী বৃদ্ধ বাপকে খুন করার অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিল পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের জোয়ান ছেলে। গভীর রাতে কুড়ুল দিয়ে দু-দুটো কোপ বসিয়ে বাবাকে খুন করে। পালিয়ে যাওয়ার সময়—মা ছেলেকে চিনেছিল। উপন্যাসে ছেলের নাম বলাই দাস। উপন্যাসের এই বলাই দাস—বাস্তবিক বীরভূম জেলার বাকুল গ্রামের নন্দদুলাল দাস; তারাশঙ্করের লেখা এবং ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার থেকে এমন অনুমানের কথা বলতে পারি।  

     ‘বিচারক’ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। এর কিছুদিন আগে ১৯৫২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ওই বাকুল গ্রামের তেমন একটি খুনের ঘটনার কথা তারাশঙ্কর তাঁর ‘মনের আয়না’ বইতে লিখে গেছেন। পুলিশের কাছে শুনে তিনি লিখেছেন, বাকুল গ্রামের নন্দদুলাল দাস—বাবা রাজকৃষ্ণ দাসকে খুন করার অপরাধে আইনে অভিযুক্ত হন। ঘটনাটি মর্মান্তিক বেদনাদায়ক কিন্তু সিনেমার মতো রোমহর্ষক।

     করালী এবং নন্দদুলাল নামে দুই ব্যক্তি কাজের লোক এবং ড্রাইভার হিসেবে তারাশঙ্করের কলকাতার বাড়িতে একই সঙ্গে থাকতেন। খুনের দিন করালীর সঙ্গে ঝগড়া করে দুলাল গ্রামে এসে সেই কর্ম করেন এবং পরের দিন বিকেলে তারাশঙ্করের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন। ১২ সেপ্টেম্বর দুলাল তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। ১৫ সেপ্টেম্বর তারাশঙ্কর অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে সিউড়ি আসেন এবং জানতে পারেন তাঁর এক ভাইপো জলে ডুবে মারা গেছে। সেই সূত্রে তিনি লাভপুরের বাড়িতেও আসেন। তাঁর বাড়িতে তখন থানার দারোগাবাবু। পুলিশের কাছেই তারাশঙ্কর নন্দদুলালের পিতৃহত্যার ঘটনার কথা জেনেছিলেন।

     তারাশঙ্করের ‘বিচারক’ এবং ‘মনের আয়না’ বই দুটি পড়ার পর একদিন বাকুল গ্রামে নন্দদুলালের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। বৃদ্ধ নন্দদুলাল সাক্ষাৎকারে আমাদের কথা উপেক্ষা করে বলেছিলেন—মানুষের জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে; উনি কোথাও কিছু লিখেছেন, কেউ বলেছিল কিন্তু আমি জানি না। তবে তারাশঙ্করবাবুর বাড়িতে আমি বছর দেড়েক ছিলাম। গাঁয়ের লোকের কার মুখে হাত দেবেন। আপনি যা জেনেছেন লিখবেন। মানা করলে তো শুনবেন না, কিন্তু পুরনো কথা টেনে আর কী হবে? আমার তো মৃত্যুর বয়স হয়েছে

 

তারাশঙ্করের ‘বসন্তরাগ’—এক শান্ত এবং স্নিগ্ধ প্রেমের উপন্যাস বলে পরিচিত। উপন্যাসে রয়েছে ব্রাহ্মণ সঙ্গীতসাধক রঙ্গনাথন—লল্লা নামে এক শবরকন্যার প্রেমে মুগ্ধ হন এবং দেবতা সাক্ষী করে তাকে বিয়ে করেন। উপন্যাসের পটভূমি দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ অঞ্চলের; কিন্তু নায়িকা লল্লা তারাশঙ্করের অতি কাছের এক বঙ্গকন্যা বলে আমরা মনে করি। উপন্যাসে রঙ্গনাথন এবং লল্লার ঐশ্বরিক প্রেমের ন্যায় তারাশঙ্করের ব্যক্তিজীবনেও এক ঐশ্বরিক প্রেমের কাহিনি ছিল। তারাশঙ্করের ব্যক্তিজীবনে প্রাণের রাধার বিরহ—যেন উপন্যাসে রঙ্গনাথনের জীবনে লল্লাবিরহে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।

     ‘আমার কথা’ বইতে তারাশঙ্কর লিখেছেন—“আমার ছবি আঁকার কথা আমার গোপন প্রেমের কথার মতো গোপনে রাখতে চেয়েছি বরাবর”। অন্যত্র আরও বলেছেন—“মনের সাতমহলার কোন গোপন মহলে কোন এক মেয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে যাকে পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি, পাওয়া হয়নি”। কে সেই প্রেয়সী! লিলি সাহা নামে কলকাতা নিবাসিনী এক বিদূষী বঙ্গনারীর সঙ্গে তারাশঙ্করের পারস্পরিক দেখাসাক্ষাতের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তারাশঙ্করের এক গুচ্ছ চিঠি পড়ে মনে হয়েছে—লিলি সাহা তারাশঙ্করের প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধজীবনে ঐশ্বরিক প্রেমের প্রেয়সী। ১৯৬৩ সালের ২০ জানুয়ারি লিলির এক পত্রোত্তরে তারাশঙ্কর লেখেন—“তোমার সঙ্গে স্নেহের সম্পর্ক নামহীন একটি ফুলের মত। জীবনের কোন দেবতার পায়ে তার স্থান তার বিধান খুঁজে পাইনি। হয়তো সব দেবতার পায়েই তার স্থান আছে।... সময় সময় মনে হয় খুব স্পষ্ট—মানুষের সঙ্গে মানুষের পরম সম্পর্ক”বৃদ্ধ বয়সে লিলিকে নিয়েই তাঁর বিরহ। ১৯৬৪ সালে জগদীশ ভট্টাচার্যকে তারাশঙ্কর লেখেন—“একটি ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপ্ত করা বিরহের মধ্যে আমার বেঁচে থাকা। সাধনা আমার সাহিত্যের নয়—সাধনা আমার জীবনের—সেটা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে করে থাকি। সম্বল আমার কাউকে ভালবাসার। একটা গানের লাইন—কেমন করে ভুলব আমি পাইনি তোমারে। অথবা প্রাণের রাধার কোন ঠিকানা”।

      লিলিকে আমরা পাইনি কিন্তু কলকাতার কসবা’র বাড়িতে গিয়ে লিলি সাহার ভাইপো সুপ্রকাশ সাহার সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম। আলাপচারিতায় তারাশঙ্করের সঙ্গে তাঁর পিসির দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্কের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন—‘বসন্তরাগ’ নামে  উপন্যাসটির কথাও

     বাস্তবে লিলিকেন্দ্রিক তারাশঙ্করের বিরহীজীবনের চিত্ররূপ তাঁর ‘বসন্তরাগ’ উপন্যাস এবং নায়িকা লল্লা বাস্তবে কলকাতার লিলি সাহা বলেই মনে করি। সাহিত্য জীবনের সূচনাপর্বে তারাশঙ্কর কমলিনী বৈষ্ণবীকে সামনে রেখেসাহিত্যশিল্পে সোনার-কাঠির স্পর্শ পেয়েছিলেন; আর এই বৃদ্ধ বয়সে বঙ্গনারী লিলির মধ্যে পেয়েছিলেন তাঁর বিরহীজীবনের প্রেমগায়ত্রী। স্মরণীয় যে ‘বসন্তরাগ’ উপন্যাসটি প্রকাশের পর লিলিকে পড়ে দেখার কথা জানিয়েছিলেন তারাশঙ্কর।

 

তারাশঙ্করের ‘১৯৭১’ নামে উপন্যাসে বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে লেখা একটি কাহিনি—‘একটি কালো মেয়ের কথা’। কাহিনির কেন্দ্রিয় নারী চরিত্র নাজমা নামে একটি কালো মেয়ে। এই নাজমা চরিত্রের অন্তরালে জড়িয়ে রয়েছে—তারাশঙ্কর-সাহিত্যানুরাগিনী বাংলাদেশের কল্পনা দত্ত নামে এক ফর্সা মহিলার আত্মকথা। মুক্তিযুদ্ধের আগে বাংলাদেশের নারীজীবনের সঙ্কটকালে কল্পনা দত্ত কলকাতার বাসিন্দা হয়েছিলেন; পরে মধ্যমগ্রামে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। তারাশঙ্করের চিঠি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ৯ এপ্রিল ২০১৩ আমি তাঁর বাসায় হাজির হয়েছিলাম। মুখোমুখি বসে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় মনে হয় এই কল্পনাদেবীর কথা নিয়েই তারাশঙ্কর তাঁর নাজমা চরিত্রটি নির্মাণ করেন। স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালে, বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনুসারে—মেয়েদের বারো বছর পার হলেই আতঙ্কিত অভিভাবকেরা আত্মীয় সূত্র ধরে এদেশে পাঠিয়ে দিতেন। কল্পনাদেবীকেও কোলকাতায় আত্মীয় বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। দেশ ছেড়ে আসার স্মৃতি তিনি ভুলতে পারেননি। সাহিত্যিক তারাশঙ্করকে চিঠি দিয়ে তাঁর বেদনার কথা লিপিবদ্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেনপত্রোত্তরে ১৯৬৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কল্পনাদেবীকে তারাশঙ্কর লেখেন—

তোমার পত্র পেয়েছি। তোমার জীবনে বেদনা আছে ক্ষোভ আছে—তার আভাস তোমার পত্র থেকে আগুনের উত্তাপের মত ছোঁয়া দিয়ে যায়। তার স্পর্শে আমি দুঃখ অনুভব করেছি।...

আমি লেখক—আমি সকল মানুষের সব সুখ-দুঃখেরই ভাগ নিতে চাই। বিশেষত দুঃখ যার তার সমব্যথী হওয়াই লেখকের শ্রেষ্ঠ ধর্ম্ম ও কর্ত্তব্য বলেই আমি মনে করে এসেছি এবং দুঃখের উপকরণেই সাহিত্যের নৈবেদ্য সাজাতে চেয়েছি।

তোমার কয়েকটি ছত্র আমার ভারী ভাল লাগল। লিখেছ—“আমার বলা কথা আপনি লেখকের মনোভঙ্গি নিয়ে লিখতে পারলে যে অস্বস্তির মধ্যে আমি আছি—তার প্রতিকার হবে”। বেশ তো, যে সত্য তোমার বুকের মধ্যে খাঁচার পাখির মত বদ্ধ হয়ে মাথা কুটছে—তাকে আমার প্রকাশের মধ্যে মুক্তি দিয়ো তুমি। আমি চেষ্টা করব এই পর্যন্ত বলতে পারবো। সব থেকে ভাল হয় যদি ভেবে চিন্তে নিজে গুছিয়ে একটা খসড়া মত করে আনো।

 

     কল্পনাদেবী আমাকে জানিয়েছিলেন—তিনি তাঁর জীবনের বেদনা এবং ক্ষোভের কথা একটি খাতায় লিপিবদ্ধ করে নিজে গিয়ে তারাশঙ্করের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কাছে বসে বলেছিলেন—সে তো শুধু তাঁর একার বেদনা নয়; সমগ্র বাংলাদেশের নারীদের বেদনা। সেই ঘটনার পর—বাংলাদেশের অগ্নিময় এক অখণ্ড জীবনচিত্র নিয়ে রচিত হয়েছে তারাশঙ্করের ‘একটি কালো মেয়ের কথা’ নামক কাহিনিটি। সাক্ষাৎকারের পরে কোনো একদিন ফোনে ‘১৯৭১’ নামক উপন্যাসটির কথা বলে ওই কাহিনি পড়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। পরে তিনি ফোনে জানিয়েছিলেন—তারাশঙ্কর তো এখানে আমার কথাগুলোই লিখেছেনআমি নাজমা নই কিন্তু নাজমার মধ্যে নিজেকে অনুভব করেছি আনেক; তবে যা চেয়েছিলাম তার সবটা পাইনি। আমাদের বিশ্বাস কল্পনাদেবীর লিপিবদ্ধ করা কাহিনির সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বাস্তবতাকে মিলিয়ে তারাশঙ্কর নাজমা চরিত্রটি নির্মাণ করেন। মনে করি ‘একটি কালো মেয়ের কথা’ নামে কাহিনিতে নাজমা চরিত্রের উৎসমূলে রয়েছেন মধ্যমগ্রামের এই কল্পনা দত্ত।

     সামাজিক উপন্যাসে ছায়ারূপে বিবৃত নরনারীর উৎসমূল—রক্তমাংস সম্ভূত কায়ারূপের—মুখোমুখি আলাপচারিতা বেশ বিস্ময়ের; যেন এক রোমাঞ্চকর ঘটনা। সমাজে যারা বিখ্যাত এবং অখ্যাত কুখ্যাত সাধারণভাবে তারা অনেকটাই একক এবং সময়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ কিন্তু সাহিত্যের পাতায় উপস্থাপিত হলে তারা দেশ ও কালের গণ্ডী পেরিয়ে হয়ে ওঠে অনেকের আনন্দের আধার। তারাশঙ্কর অনুসন্ধানে এমন অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি প্রাপ্তির সুযোগ আমাদের হয়েছে।

===============

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি, বীরভূম—৭৩১১০২,

পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ।

মোবাইল—৯২৩৩১২৪৭২১৮।

ইমেইল debashismukherjee67@gmail.com