Tuesday, 2 July 2024

 

 

 

 

দ্যাখা তবে কেমন দ্যাখা

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

সকল মানুষই দ্যাখেযাদের দৃষ্টিশক্তি আছে তারা দ্যাখে; আবার যাদের দৃষ্টিশক্তি নেই অর্থাৎ অন্ধ তারাও দ্যাখে। অন্ধদের দ্যাখাদৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষের দ্যাখা থেকে ভিন্ন; কিন্তু তারা দেখতে পায়। দেখতে পায় বলেই তো পথ চলে, পড়াশোনা করে, লেখে প্রতিদিনের নিত্যকর্ম সবই করতে পারে। মহাভারতের ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হয়েও রাজকার্য চালাতেন। অন্ধভিখারী গান গায়চোখে ছটা লাগল তোমার আয়না বসা কাঁচের চুড়িতে।

 

দ্যাখা মানে তো কোনো বস্তু সম্পর্কে জানানিজেকে গন্তব্যস্থলে উপনীত করা। এই দ্যাখাটা কেমন! এই দ্যাখাচোখে দ্যাখা মনে দ্যাখা জ্ঞানে দ্যাখা এবং বোধে দ্যাখা। আবার কানে দ্যাখা কথাটাকেও উপেক্ষা করা চলে না। সকল মানুষ দ্যাখে কিন্তু যেমন মানুষ তেমন তার দ্যাখা। দৃষ্টিবৈচিত্র্যের পরিমাপ ও মাত্রা এবং আকর্ষণ বিকর্ষণ ও প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে দ্যাখা বিষয়টি প্রাণের আধারে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে; তুমি কেমন আমি কেমন এবং জগৎ কেমনএই ধারণা সম্পর্কিত ব্যাস ও ব্যাসার্ধের ক্রমবিবর্তন সম্ভব হয়। দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষ নিজ নিজ চোখে দিনরাত্রির আলো-অন্ধকারময় জগৎকে দেখতে পায়। দিনের আলোতে চোখ খুললেই অরণ্য-পাহাড়-পর্বত নদী-সমুদ্র এবং পাখির কলকাকলি মানুষের চলাচল সবই দেখতে পায়। রাতের অন্ধকারে অথবা জ্যোৎস্নালোকে নক্ষত্রখচিত নীলনভোতলের জগৎকেও দেখতে পায়। স্থবির ও জঙ্গম জগতের সে এক প্রত্যক্ষ দ্রষ্টা। এইজন্য তাদের বক্তব্যযা দেখি তা সত্য; নিজের চোখে দ্যাখার মতো সত্য অপর কিছুতে হতে পারে না। যে বিষয় বা বস্তু চোখের সামনে বাস্তবে দ্যাখা যায়, অনুভব করা যায় তাই-ই সত্য এই সূত্রে নিসর্গ প্রকৃতির আকাশ-চাঁদ-সূর্য-নক্ষত্ররাজি থেকে অরণ্য-পাহাড়-পর্বত নদী-সমুদ্র এবং পাখির কলকাকলি মানুষের চলাচল সবই নিত্য আমাদের নজরে পড়ে; যেন চোখ ফেরালেই সবকিছু দ্যাখা যায় একই ভাবে কোনো তথ্য বা ঘটনা প্রসঙ্গে এও বলে থাকি যে বইতে লেখা আছে দেখেছি এতো সত্য কথা সত্য ঘটনা কাজেই যা জেনেছি দেখেছি এবং দেখছি তা সবই সত্য

     কিন্তু জড় ও প্রাণ সমন্বিত নিজের সীমাবদ্ধ জগৎ এবং অক্ষরচিহ্ন সমন্বিত স্থাপত্যকীর্তি বই দেখেযা জানা যায় দ্যাখা যায় তা কেমন সত্য! দিনে যে সূর্যকে আমরা দেখতে পাই রাতে তাকে আর দেখি না, তেমনি রাতের চাঁদকেও দিনে দেখতে পাই না রাতের বেলা গাছে গাছে কুঁড়ি ধরেছিল সকালে দেখা গেল সবকুঁড়ি ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে; পরের দিন বা কয়েকদিনের মধ্যে গাছের সেই ফুল সব ঝরে যায় এও তো আমাদের চোখের দ্যাখা একসময়ের মিথ্যা পরে সত্য এবং সেই সত্য আবার পরে মিথ্যা হয়ে ওঠে তখন কি মনে হয় না যে

একটি সত্যের জন্ম দিতে মিথ্যার মাতৃত্ব আর

একটি মিথ্যার জন্ম দিতে সত্যের স্বীকৃতি ছাড়া

বাস্তব পৃথিবীতে সত্য বলে কিছু নাই

তুমি আমি মুখোশের অন্তরালে মঞ্চগড়ি বারবার

 

     বাস্তবে চোখে দেখা সত্য যেমন সাময়িক তেমনি বইতে পড়া সত্যও ঠিক তাই সাধারণভাবে লেখক তাঁর সময়কাল পর্যন্ত প্রচলিত সত্যকে বইতে লিপিবদ্ধ করে রাখেন কিন্তু এমন কোনো কথা কী লেখা থাকে যার কোনো বিবর্তন বা পরিবর্তন হয় না? গণিতের ধারাপাত যে সময়ে লেখা হয়েছিল সেই সময়ের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কথা অনুসারেই ছয়ঋতুর বিভাজন করা হয় এখন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন ঘটেছে এখন আর ধারাপাতের সব সত্য কি সত্য হয়ে আছে!  আষাঢ় শ্রাবণের বৈশিষ্ট্য যেন এখন ভাদ্র আশ্বিনে উপনীত হয়েছে সৌরপরিক্রমনের যে অটল সিদ্ধান্তের কথা বৈজ্ঞানিক সত্য বলে বিজ্ঞান বইতে লেখা হয়েছে সেই সত্যের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিতর্কের অবসান কী কোনোদিন সম্ভব! সামাজিক দলিল বা ইতিহাসের নিদর্শন হলেও বইতো অক্ষরচিহ্নের স্থাপত্যকীর্তি বই পড়ে মানুষ জ্ঞানী বা পণ্ডিত হতে পারে; জীবনদর্শনের দার্শনিক হয়ে ওঠে না। কিন্তু বইয়ের বস্তুজগতের সঙ্গে চেতনার সত্তাযোগে মানুষ যখন নিজেই বই হয়ে ওঠে তখনই জীবনদর্শন ও দার্শনিকের জন্ম হয়। তখন সে সত্যের ভেতরের সত্যকে দেখতে পায়।

     আবার একই বিষয় বা বস্তু তুমি যা দেখছো আমি তা দেখছি না; আমি যা দেখছি তুমি তা দেখছো না যখন দুই ব্যক্তির মধ্যে মারামারির ঘটনা আমরা দেখিতখন কেউ দ্যাখে জয়ী ব্যক্তির বীরত্ব কেউ দ্যাখে পরাজিত ব্যক্তির মর্মাহত দৃশ্য; আবার কেউবা উভয়কেই দ্যাখেন পৃথিবী নামক গ্রহটিকে সকলেই দেখছে কিন্তু সময়ান্তরের দৃষ্টিভেদে তার আকারের ভিন্নতার কথা বলা হচ্ছে আসলে ব্যক্তিভেদে দ্যাখার ভিন্নতায় বস্তু বা ঘটনার স্বরূপ ভিন্নরূপে সত্য হয়ে ওঠে প্রকৃতপক্ষে চোখে দ্যাখার সমস্তকিছুই বাস্তব কিন্তু কোনোটাই সম্পূর্ণ সত্য নয় চোখে দ্যাখা সাময়িক দ্যাখা আংশিক দ্যাখা এবং বস্তুগত বা ঘটনাগত দ্যাখা কারণ, ‘সত্যসদা বিদ্যমানএবং অপরিবর্তনীয় স্থান-কাল-পাত্র অনুসারে দ্যাখার তারতম্য ঘটে জানার বিবর্তন হয় কিন্তু সত্যের কোনো তারতম্য ঘটা সম্ভব কী?

     আসলে দ্যাখা আর অদ্যাখার মাঝে সত্যের স্বরূপ লুকিয়ে থাকে এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে এক ফরাসি শিল্পীর আঁকা একটি বিখ্যাত ছবির কথা ১৮৮৬ সালে বিখ্যাত ছবিটি এঁকেছিলেন ফরাসি চিত্রকর জিনলেওন জেরোম। একটি লোককথাকে ভিত্তি করে তিনি এই ছবি এঁকেছিলেন; যার মূল বক্তব্য বিষয় হলোবাস্তব সত্যের স্বরূপ উদ্ঘাটন। একটি বিষয় মীমাংসার জন্য একদিন সত্য ও মিথ্যা পরস্পরের সঙ্গে দেখা করল। হাঁটতে হাঁটতে তারা চলে গেল একটা কুয়োর পাশে। তারপর মিথ্যা বললদেখো, কুয়োতে কী স্বচ্ছ জল। চলো দুই বন্ধুতে স্নান করে নিই। সত্য তার সরলতা নিয়ে মিথ্যার কথায় বিশ্বাস করল এবং কুয়োর স্বচ্ছ জল দেখে স্নানেও রাজি হলো। দুজনে পোশাক খুলে রেখে কুয়োর জলে নামল। স্নানের মাঝপথেই মিথ্যা উঠে এলো এবং সত্যের পোশাক পড়ে পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর মিথ্যাকে ফিরে আসতে না দেখে সত্য জল থেকে উঠল। দেখল মিথ্যা তার পোশাক পরে পালিয়ে গেছে। সত্য কোনোভাবেই মিথ্যার পোশাক পরলো না; নগ্ন অবস্থায় মিথ্যার সন্ধানে বের হলো। সমাজের সভ্য মানুষ নগ্ন সত্যকে মেনে নিতে পারল না। ফলে সত্য আবার কুয়োর জলে আত্মগোপন করল আর মিথ্যা সত্যের পোশাক পরে সমাজে সত্য হয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো। সমাজ বুঝল তবু তার পোশাককে মান্যতা দিল। দার্শিক ডেমোক্রিটাস এর অনুবাদ করে বলেছেন—“Of truth we know nothing, for truth is in a well”.

     ভারতীয় দর্শন অনুসারে ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা ব্রহ্মসৃষ্ট প্রকৃতি এবং প্রকৃতির জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সবই সত্য এবং প্রকৃতির বুকে যে সচল প্রাণ তাও সত্য কিন্তু প্রাণী সত্য নয় এই জন্যই বলা হয় প্রাণীর বিনাশ হয় কিন্তু প্রাণের বিনাশ নেই প্রাণীকে দ্যাখা যায় কিন্তু প্রাণীর অভ্যন্তরে যে প্রাণ তাকে দ্যাখা যায় না জ্ঞানের আলোকে আর চেতনার দৃষ্টিতে তাকে দেখতে হয় প্রকৃতিগত সত্যের দর্শনে বলা হয়ওই শোনো! সত্যের বিজয়-ঝঙ্কার উঠছে, সত্যলোকের শুভ্রজ্যোতি দিঙ্মণ্ডল উদ্ভাসিত করছে, বায়ুমণ্ডল মুখরিত হচ্ছে, বসুন্ধরা প্রাণময় সত্যের অহ্বানে জড়ত্ব পরিত্যাগ করছে, জলরাশি সত্যনিনাদে উদ্বেলিত হচ্ছে এসবের অর্থ জগৎ সচ্চিদানন্দময় এই সৎ-চিৎ-আনন্দের—‘সৎকথার অর্থ সত্তা বা অস্তিত্বশীলতা; মানে কিছু একটা আছে দৃশ্যমান জগতের অন্তরালে কোনো একটি শক্তি সর্বদা সক্রিয় অবস্থায় বিদ্যমান তাঁর কারণেই জগৎ জঙ্গম এবং প্রাণময়

     যা দেখতে পাইনা তা অদ্যাখা বা অদৃশ্য। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে বৈচিত্র্যমণ্ডিত মায়াময় জগতের অন্তরালে সত্য লুকিয়ে থাকে। আমরা জগতের বস্তু দেখি কিন্তু বস্তুর অন্তরালে সত্য দেখি না। আবার জগৎ যে দেখি তাও নিজের সাধ্য অনুসারে নিজের মতো করে দেখি। তাই সামান্য দ্যাখা আর অসামান্য সবকিছু অদ্যাখা থেকে যায়। বস্তুজগতের সবটা দ্যাখা সম্ভব নয় কিন্তু যেটুকু দ্যাখা সম্ভব তার মধ্য দিয়েই অদ্যাখার কল্পনাটি মিলিয়ে নিতে হয়। দ্যাখার সূত্র ধরেদ্যাখা ও অদ্যাখার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অস্তিত্বকে যদি খুঁজে পাওয়া যায়তখনই দ্যাখার দৃষ্টিটা বাস্তব থেকে সত্যে উপনীত হয়। 

 

দ্রষ্টার বাস্তব দর্শন বা দ্যাখার বিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন কিরণসম্পাতে বিভিন্ন মাত্রায় উদ্ভাসিত ও বিকশিত হয়ে ওঠে। কাজেই বলতে হয় যে চোখে দ্যাখার এই বাস্তবতা সত্যের সম্পূর্ণ স্বরূপের প্রত্যক্ষগোচর নয়। চোখ দ্যাখার একটা মাধ্যম মাত্র; দ্যাখার মূলে রয়েছেমন বিবেক মনুষ্যত্ব এবং জ্ঞান ও বোধ তথা মানুষের চেতনা। কেবলমাত্র চোখ দিয়ে দ্যাখার পরেও প্রাণের বিবর্তনে প্রত্যক্ষগোচর বস্তুর অন্তরালে মন দিয়ে দ্যাখা এবং তারও অন্তরালে জ্ঞান ও বোধ দিয়ে দ্যাখা বিষয়গুলি অনিবার্যভাবে কার্যকরী হয়ে ওঠে। তবে এই ক্রিয়া সকল প্রাণে সক্রিয় নয়। এই সক্রিয়তায় প্রাণের আধারটি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। আর সেই সক্রিয়তার সূত্র থেকেই অশিক্ষিত-শিক্ষিত জ্ঞানী ও পণ্ডিত বোধে-বুদ্ধিমান ও দার্শনিকমাত্রাসমন্বিত কথাগুলি মানুষে মানুষে যুক্ত করা হয়। জড় ও প্রাণের অন্তরালে এক অনন্ত চিৎশক্তির সক্রিয় সত্তা বিদ্যমান কিন্তু তার প্রকাশ মায়াময়; যেন সত্যের স্বরূপে মিথ্যার প্রকাশ। মায়া মানে মনে হওয়া; জ্ঞানী সেই মনে হওয়াকে অতিক্রম করতে পারে।

      একটি বহুল প্রচলিত উদাহরণ এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। আর্ধেক জলপূর্ণ কাঁচের গ্লাসের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা একটি কাঠিকে বাঁকা দ্যাখায়। সেই দেখে অনেকেই বলবেন কাঠিটি বাঁকা; কিন্তু কাঠিটি বাঁকা নয়বাঁকা মনে হয়। চোখে দ্যাখার সাধারণ দৃষ্টিতে জ্ঞানের উৎস যুক্ত হলেই বাঁকা আর বাঁকা মনে হওয়া বিষয়টি স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। চাঁদ ও সূর্যকে চব্বিশঘণ্টা দেখতে না পাওয়ার কারণ জানার জন্য চোখে দ্যাখার বলয় থেকে আমাদের জ্ঞানের বলয়ে উপনীত হতে হয় এই দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের নাম জ্ঞানী এবং বিজ্ঞানী যতক্ষণ যতটুকু দ্যাখা যায় ততক্ষণ ততটুকুই সত্য; কিন্তু এই সত্য যখন বিবর্তনে বিলয় ঘটে তখনই তাকে সাময়িক সত্য বলে মেনে নিতে হয় বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর পূর্বকাল পর্যন্ত চোখের দ্যাখা এবং জ্ঞানের দ্যাখা মিলিয়ে গাছ সম্পর্কে যে কথা যা জানা যেত তাই সত্য ছিল জগদীশচন্দ্র বসু গাছের প্রাণের কথা বলার পরগাছ সম্পর্কে অবহিত সত্যস্বরূপের বদল ঘটল যুগোচিত সাময়িকতা যেমন সমকাল তেমনি মহাকালের পথপার্শ্বে চিরায়ত সত্যের দীপমালামানুষের অপেক্ষায় থাকে জগৎ তো মায়াময়; আর সেই মায়ার মাঝখানে বসেই সত্যকে সাধনা করতে হয় পার্থিব জগৎকে বাদ দিয়ে কিছু হয় না বলে মানুষ অথবা প্রকৃতি কোনো কিছুর অবলম্বন সেখানে নিতেই হয় তবে বাস্তব যে, বোধ ভিন্ন জাগতিক সত্য বড়ো আপেক্ষিক; সময়োচিত আবেগ বা অভিমত অথবা আনুমানিক প্রতিক্রিয়া

 

চোখ দিয়ে দ্যাখা সাধারণ দ্যাখা এবং মন দিয়ে দ্যাখা বস্তুনিষ্ঠ অথবা কল্পনিষ্ঠ হয়ে ওঠা। আবার জ্ঞানে দ্যাখা পণ্ডিতের দ্যাখা কিন্তু বোধের দৃষ্টিতে দ্যাখা বিজ্ঞানসম্মত দ্যাখা; এই বোধে দ্যাখার নাম দর্শন। বোধ ব্যতিরেকে দ্যাখার ভিন্নতায় যে সাময়িক বা আংশিক দ্যাখা তার বাস্তবতাকে সাধারণভাবে সমাজপ্রচলিত সত্য বলে মান্যতা দেওয়া হয়। এই দ্যাখার মধ্যে সত্যের সৎবিষয়টি ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হয়; স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্ন হয়ে ওঠে। চোখে দ্যাখা মনে দ্যাখা বা জ্ঞানে দ্যাখার বিষয়বিবাদ-বিতর্ক-বিসম্বাদের কারণ; সেখানে সত্যের সৌন্দর্য বা কল্যাণময়তা দূরে থাকে। দ্যাখার এমন অস্বাভাবিকতা নিয়েই আমাদের সমাজ-বাস্তবতার স্বাভাবিকতা। সবকালেই সমাজপ্রচলিত সত্যের বিপরীত মুখে চলা ব্যক্তি অসৎ বলে পরিচিত হয় যে পরিবারের যাজ্ঞিককর্মে বলিদান প্রথা সংস্কারে পরিণত হয়েছে সেই পরিবারের কোনো সদস্য তাকে না মানতে পারলে সে অসাধু অসৎ নাস্তিক বলে পরিচিত হয় ন্যায় করুক আর অন্যায় করুক সমাজপতিদের মান্যতা দেওয়া সমাজের প্রচলিত ধারা এই প্রচলিত ধারাকে অতিক্রম করে সমাজপতির অন্যায়ের প্রতিবাদী ব্যক্তি সবকালেই অসৎ ঘোষিত হয়ে থাকে অনেকের দ্যাখা অনেকের মান্যতা দেওয়া এবং অনেকের বলার মধ্যে একটা সামাজিক চলমানতার যূথবদ্ধ প্রকাশ থাকে এমন যূথবদ্ধ প্রকাশের বিরোধিতায় বিনষ্টি না করলেও চূড়ান্ত সত্যের স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে জ্ঞানের গরিমা থাকতে পারে কিন্তু বোধের বৌদ্ধিক পরিচয় থাকে কী? কারণ যা চোখে দ্যাখা যায় বইতে পড়া হয় এবং যা সাধারণে মান্যতা দেয় সেই বিষয়গুলিকে যদি অন্যভাবে দ্যাখা হয় অন্যভাবে বলা যায়তখন সত্যের স্বরূপ সন্ধানে সেই বিষয়টিকে তার আসন থেকে টেনে বিতর্কের মাঠে নামানোর অবকাশ অস্বীকার করা যায় না সমাজপতিকে মান্যতা দেওয়া সামাজিক সত্য কিন্তু তার অন্যায়ের প্রতিবাদী হওয়া অসতের পরিচয়ের বহন করে না এখানে সত্যের সঙ্গে ন্যায়ের প্রসঙ্গ যুক্ত হয়

     কানে দ্যাখা বিষয়টি বেশ বিচিত্র-জটিল রাজা ধৃতরাষ্ট্র কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ দেখেছিলেন কানে রাজাদের কানে দেখার একটি প্রবাদ আমাদের অজানা নয় চিরাচরিত সমাজে এমন মানুষের অভাব নেই কানে দ্যাখা গোয়েন্দাগিরির একটি সূত্র যিনি কানে দ্যাখেন তিনি কি বিষয় কেমনভাবে দেখবেনসেটা নির্ভর করে দ্যাখানো ব্যক্তিটির মানসিকতার উপর সেখানে সঞ্জয়ের পরিবর্তে দুর্জয় হলেই উল্টোপুরাণের সৃষ্টি হয় এই দ্যাখা অনেক ক্ষেত্রেই বস্তুকে বিকৃত করে অথবা অসত্যাকারে দ্যাখানো হয় সেক্ষেত্রে, দ্রষ্টা তরল চরিত্রের মানুষ হলেসিদ্ধান্তে সরলতার বুকে বন্দুক ঠেকে তখন বলতে হয় কানে দ্যাখা বড়ো ভয়ঙ্কর দ্যাখা; সে দ্যাখা না দ্যাখাই ভালো

    

সত্যকে না দেখতে জানা অসৎ বা অপরাধের কারণ নয় তবে চিন্তাশীল মানুষ সত্যসন্ধানী হবে এটাই স্বাভাবিক চিন্তাশীল মানুষ দ্যাখে খণ্ড খণ্ড জড় ও জীবের মধ্য দিয়ে এক অখণ্ড জাগতিক শক্তির লীলা আবর্তিত হচ্ছে আর সেই লীলাশক্তির সক্রিয়তার কারণেই দৃশ্যমান জগৎ সুন্দর সেই অখণ্ডশক্তি আমাদের অদ্যাখা অদৃশ্য; তাকে চোখে দ্যাখা যায় না; জ্ঞানে বোধে ও মনে দেখে নিতে হয় প্রত্যেক ব্যক্তি এবং বস্তু সেই অখণ্ডের খণ্ডরূপ খণ্ডকে অখণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারলে দ্যাখা যায়জগতের সঙ্গে মহাজাগতিক মিলন বাস্তব হয়ে উঠেছে

     চোখে দেখি দেবী কালিকাবর্ণে কালো; গলায় দোলে নরমুণ্ড মালা এ দ্যাখা জাগতিক দ্যাখা খণ্ড দ্যাখা কিন্তু যখন কালের কলন বা সববর্ণের হরণকারী বলে তিনি কালো দেখি তখন তাঁর জগদীশ্বরী মূর্তির মহাজাগতিক সৌন্দর্য উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আমরা তো জানি তাঁর গলায় নরমুণ্ড মালার মুণ্ডগুলি সব অসুরের; কিন্তু সাধক কবি যখন প্রশ্ন করেনজগৎ যখন ছিল না তখন মুণ্ডমালা কোথায় পেলি; তখনই আদি বর্ণমালার বর্ণগুলি দেখতে হয় 

     আমি যখন তেমন কোনোকিছু দেখতে চাইতখন রাতের মুক্ত আকাশে আমার বাড়ির নিরালা ছাদটি সকল সাধ্যের সাধনসঙ্গিনীর মতো হয়ে ওঠে আমার একান্ত আপনজন রাতের নীরবতায় অন্ধকারের শূন্য কায়ার সঙ্গে আত্মরোমন্থনে স্পন্দিত হয়ে ওঠে আমার একশো আট নাড়ীর শিহরণ মনের কৌতূহল বা নাকড়াধ্বনি যখন বুকের দরজায় বেল বাজায় তখন অন্দরমহলের সিংহাসন কেঁপে ওঠেরাতের ঘুম কেড়ে নেয় তখনই গভীর রাতের শূন্য কায়াকে শব করে অন্তরপ্রদাহী যাজ্ঞিক চিতায় শুরু হয় অনুসন্ধানের আহূতি দেখি, স্মৃতির জানলায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বইঘরের শত শত পৃষ্ঠার চলচ্ছবি, পিছন থেকে উঠে আসে বাস্তব অভিজ্ঞতার অনুরণিততালবেতালি কত নৃত্যছন্দ; সৃষ্টিবিলাসী উপমা রঙিন কল্পনাসুন্দরের বাতাসে রঞ্জিত হয়ে ওঠে আমিত্ব এই আমিত্ব ঠিক অহং নয়; এই আমিত্ব অহং ভঙ্গকারী আমিকে বিনির্মানের আধার এইজন্য বলা হয়আমিত্ব অর্জনই মনুষ্যত্ব বিনির্মানের সূচনাকালে আমিত্ব মনে করে সত্যের প্রত্যাশিত পথে নিরন্তর সূক্ষ্মতার গতি ধরে বিনির্মানের যে নিত্য বিড়ম্বনা দ্যাখা যায় সে তো জ্ঞানাবধি অভিজ্ঞতার পঞ্চতপা কাহিনিমাত্র মনে হয় সত্য তবে হৃদয়ছেঁড়া কথায় নিঙরানো জীবনের নব নব নির্যাস

     কিন্তু বিনির্মানের একটা সময়ে আমিত্বের বিলয়লগ্নে উপলব্ধি হয় যে, পৃথিবী আমাকে ধরে আছেন এই সত্যের অন্তরালে পৃথিবীকে ধরে আছেন যে মহান শক্তি তিনিই সত্য। সেই সত্য আমার মধ্যেও বিকশিত। তিনিই আমার অন্তরে ও বাইরে সত্য হয়ে আছেন বলে তাঁর দৃষ্টি দিয়ে আমরা তাঁকেই নানারূপে নানানভাবে দেখছি।

================

 

 দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি,বীরভূম—৭৩১১০২।

পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ। মোবাইল—৯২৩৩১২৪৭১৮।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

No comments:

Post a Comment

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। সময়মতো উত্তর পাবেন।