Sunday, 12 September 2021

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রীচরণেষু

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

বাংলা সাহিত্য তথা ভারতীয়-সাহিত্যাচার্য ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তোমাকে প্রণাম জানাবার প্রবল ইচ্ছা কিন্তু প্রণামের মন্ত্র আমার জানা নেই। আসলে কি জানো, ঋষি, সাহিত্যাচার্য কি সাহিত্য-সম্রাট—যে মন্ত্রই উচ্চারণ করি না কেন, মনে হয় বুঝি ঠিক হ’ল না, তোমাকে বিশেষিত করতে কোথাও যেন অপূর্ণতা রয়ে যায় অনেকখানি। তাই তোমার দেওয়া  ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রেই তোমাকে প্রণাম জানাই, শ্রদ্ধা ও বিনম্রচিত্তের ভক্তি নিবেদন করি।

     বড় বিস্ময়ের বিষয় কি জানো বঙ্কিম, তোমাকে চোখে দেখিনি কোনোদিন, তোমার জন্মের সার্দ্ধশত বৎসরে—কলেজ জীবনে তোমার উপন্যাস পাঠের মধ্য দিয়ে তোমার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তোমার এক কাছের ভক্ত, যিনি তোমার জীবনী লিখেছেন সেই অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য মহাশয়ের কাছ থেকেই তোমাকে দেখার মতো দৃষ্টি পেয়েছিলাম প্রথম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গবেষণার প্রথম বিষয়ও ছিল তোমারই সাহিত্য। কিন্তু তা শেষ করতে পারিনি জানো—কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশেই সাঙ্গ করতে হয়েছিলতারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর তারাশঙ্করের প্রেমে পড়ে তোমার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল অনেক। আকস্মিকভাবেই সেই দূরত্ব কমিয়ে দিলেন ত্রিপুরা সরকার। ২০১৯ সালের জুন মাসে তোমার জন্মদিন স্মরণে তোমার আরতি করার দায়িত্ব দিলেন আমারই হাতে। ত্রিপুরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলি সেই কলেজ জীবন ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দৃষ্টি অতিক্রম করে অর্ধশত বৎসর বয়সের দৃষ্টি তোমাকে নতুনভাবে চিনিয়ে দিলো। তোমার উপন্যাস তোমার প্রবন্ধ গুলি নতুন করে পড়তে পড়তে বিষ্ময়ে অভিভূত হলাম। নতুন করে উপলব্ধি করছি তোমাকে। মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি জন্মের একশো একাশি বছর এবং মৃত্যুর একশো-পঁচিশ বছর অতিক্রম করেও তুমি আজও আমাদের স্মরণে-মননে এবং সংস্কৃতির আঙিনায় প্রদীপ্ত প্রদীপ-শিখার ন্যায় প্রজ্জ্বলিত রয়েছো। মনে করি কাল থেকে কালান্তরের পথে তোমার চেতনাপ্রবাহ আজও অনেকখানি অধরা রয়ে গেছে। তোমার জন্ম ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, সাহিত্য কর্ম ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আর একবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের পাঠক আমরা তোমার সাহিত্যপাঠে তৃপ্ত হই, বিস্মিত হই এবং কোথাও কোথাও আজও অনুপ্রাণিত হই আমরা। কি অপূর্ব গৌরবান্বিত মহিমা তোমার! তোমার স্মরণে তোমাকে প্রণাম জানাবার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে বার বার।

 

নিছক সাহিত্যসৃষ্টি নয়, মানবজাতির মঙ্গল সাধনের উদ্দেশ্য নিয়ে তুমি কলম ধরেছিলে, তোমার  সাহিত্যপাঠে আজও আমাদের সেই মঙ্গলময়তার প্রাপ্তি ঘটে। সেই যে তুমি বলেছো, “কাব্য-গ্রন্থ মনুষ্যজীবনের কঠিন সমস্যা সকলের ব্যাখ্যা মাত্র”। সার্ধশত বৎসরের অধিককাল পরেও তোমার এই কথা তোমার উপন্যাস আলোচনায় সত্য হয়ে ওঠে। সত্য হয়ে ওঠে একালের আধুনিক মনুষ্যজীবনের স্বরূপ সন্ধানে। প্রাজ্ঞ-চেতনায় তোমার দৃষ্টি বড় বিস্ময়কর ও রহস্যমণ্ডিত। দাম্পত্য জীবনের সমস্যা নিয়ে তুমি তোমার উপন্যাস ও প্রবন্ধে সেকালে যা বলেছো তা যেন একালের এক চরম সত্য। সেদিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে তুমি তোমার প্রজ্ঞাদৃষ্টিতে যেন দেখতে পেয়েছিলে বঙ্গীয় দাম্পত্য-জীবন-সম্পর্কের পরিণামকে। সেই কথা ভেবেই বোধ হয় লিখেছিলে ‘দাম্পত্য দণ্ডবিধির আইন’। তোমার এই লেখায় হাসির ছড়াছড়ি তথাপি এই হাসির অন্তরালে বঙ্গীয় বিবাহিত পুরুষ সমাজের যে অশ্রুধারা লুক্কায়িত তা আমাদের দৃষ্টির অগোচর থাকে না। তোমার ওই রচনাতে তুমি তো সেদিন বলেছিলে—স্বামী হল স্ত্রীর অধীন সচল অস্থাবর সম্পত্তি।  বলেছিলে, স্ত্রীর আজ্ঞা অনুসারে স্বামীর কোন কাজই অপরাধ নয়, স্ত্রীর আজ্ঞা বহির্ভূত কাজই অপরাধের। তোমার মনে আছে কি না জানি না, মনে করে দেখ, তুমি লিখেছিলে “হরমণি রামের মা। রাম কামিনীর স্বামী। কামিনী যেরূপে টাকা খরচ করিতে বলে, সেরূপে খরচ না করিয়া, রাম হরমণির পরামর্শে অন্য প্রকার খরচ করিল। স্ত্রীর অনভিমতে খরচ করা একটি দাম্পত্য অপরাধ। হরমণি তাহার সহায়তা করিয়াছে”। তোমার মসী প্রদত্ত এই দাম্পত্যনীতি আজকের সভ্য সমাজেও এক চরম সত্যের উদাহরণ। শুধু তাই নয় স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদ করা, কি বিবাদ করতে উদ্যোগী হওয়া অথবা সহায়তা করা এই দণ্ডবিধির অধীনে আসে। স্ত্রী ভিন্ন অন্য কোন যুবতী স্ত্রীলোকের প্রতি কিছুমাত্র দয়া বা অনুকম্পা দেখালেই তা লাম্পট্য বলে গণ্য হবে। তুমিই তো বলেছিলে বঙ্কিম—“নিষ্কারণে স্বামীদিগকে এ অপরাধে অপরাধী বিবেচনা করা, স্ত্রীলোকদিগের অধিকার রহিল। আমি এ অপরাধ করি নাই বলিয়া কোন স্বামী খালাস পাইতে পারিবে না। ‘অপরাধ করিয়াছে’ বলিলেই এ অপরাধ সপ্রমাণ হইয়াছে বিবেচনা করিতে হইবে”। পুরুষের দণ্ডবিধানের জন্য তোমার এই নীতি আজকের দিনের দাম্পত্যজীবনেও কতখানি সত্য তা ভারতীয় পীনাল কোডের ‘৪৯৮ক’ ধারা এবং ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ নামক আইন দুটি স্মরণ করলেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ৪৯৮ক ধারার সূচনা বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আর ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ আইনের সূচনা ২০০৫ এর সেপ্টেম্বর মাসে। বঙ্গীয় পুরুষ সমাজের সদস্য হিসেবে তোমার এই কথাগুলো আর ভুলি কিভাবে বল! আজ বেশি করে তোমাকেই মনে পড়ে গো বঙ্কিম। মনে হয় যদি তোমার কলম দিয়ে বিপরীত কিছু লিখে যেতে তা-ই হয়তো আজ সত্য হয়ে আমাদের অনেক উপকার করতো! কেন তা করলে না তুমি বলতো?

     হয়তো তুমি জেনেছিলে, দাম্পত্য-জীবনের সমস্যা সমাজের এক বড় সমস্যা। স্বামী অথবা স্ত্রী অথবা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই এই সমস্যার জন্য দায়ী হতে পারে। স্ত্রী শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে পালালে সমাজ পুরুষকে দোষারোপ করে, আদালতের আঙিনায় পুরুষের প্রায়শ্চিত্ত শুরু হয়। অথচ দাম্পত্য-জীবনের অন্দরমহলের গোপন রহস্য স্বামী-স্ত্রী ব্যতীত কেউ-ই জানতে পারে না। তুমি কিভাবে দেখেছিলে জানি না, মনে হয় যেন মনোবিজ্ঞানটা তুমি ভালোই পড়েছিলে, তাই মনসমীক্ষকের দৃষ্টিতে সেই রহস্য উদ্ঘাটন করে প্রকৃত সমস্যার স্বরূপ আমাদের সামনে তুলে ধরেছো তুমি তোমার সচল চিত্র মৃন্ময়ী, সূর্যমুখী, শৈবলিনী এবং ভ্রমর—এরা প্রত্যেকেই বিবাহিতা তথা গৃহবধূ কিন্তু শ্বশুরবাড়ি থেকে পলাতকা রমণী। ভাবতে অবাক লাগে, কিভাবে এইসব নারীমনের রহস্য উদ্ঘাটন করে দেখিয়েছো—কেন তারা শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।  কপালকুণ্ডলা সংসারশিক্ষা বিহীনা এবং প্রণয়হীনা, স্বামীর প্রতি অবিশ্বাসিনী এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্যা এক অবাধ্য মহিলা। শৈবলিনী গ্রন্থকীট স্বামী চন্দ্রশেখরের ভালোবাসা পায়নি একথা যেমন সত্য তেমনি পূর্বপ্রণয়ী প্রতাপের প্রতি ভালোবাসাও তার গৃহত্যাগের আর এক কারণ। শৈবলিনী প্রতাপকে বলেছে, “তুমি কি জান না, তোমারই রূপ ধ্যান করিয়া গৃহ আমার অরণ্য হইয়াছিল? তুমি কি জান না যে, তোমার সঙ্গে সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হইলে যদি কখনো তোমায় পাইতে পারি, সেই আশায় গৃহত্যাগিনী...” ভ্রমরের স্বামী গোবিন্দলাল ভালো মানুষ তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বড় মধুর। কিন্তু সাময়িকভাবে রোহিনীর প্রেমাসক্ত হয়। এর জন্য গোবিন্দলালের অনুশোচনা হয়েছে, ভ্রমরের ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজেকে সংশোধনে সচেষ্ট হয়েছে। তথাপি কেবলমাত্র লোকের কথায় বিশ্বাস করে ভ্রমর গোবিন্দলালকে বিবাহ-বিচ্ছেদের চরম পত্র লিখেছে। তারা যেমন গৃহাঙ্গনা হয়েও বীরাঙ্গনা, স্বামীর প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে নারী স্বাতন্ত্রের পরিচয় দিয়েছে তেমনি তাদের উদ্ধত আচরণের ধ্বংসাত্ম পদক্ষেপ একালের সমধর্মী যে কোন মহিলাকে হার মানায়। ধন্য তুমি বঙ্কিম! নারী চরিত্রের রহস্য-উদ্ঘাটনে তোমার তুলনা নাই আজও

     নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন সভ্যতার এক বিশেষ পরিচয় বহন করে। শ্রদ্ধাশীলতায় তুমি নারীসাম্যের পক্ষে ছিলে তথাপি সংসার-শিক্ষা বিহীনা অথবা প্রীতিশূন্যা রমণীকে সংসারে প্রতিষ্ঠা দিতে তুমি পার নি, বিবাহিতা রমণীর পূর্ব-প্রণয়ীকেও মানতে পার নি তুমি তোমার মনে আছে ঠিকই—তুমি যে সময় তোমার উপন্যাসগুলি রচনা করেছিলে সে সময় কলকাতায় ‘স্ত্রী স্বত্বরক্ষিণী সভা’ স্থাপিত হয়েছে। সেই নারী সম্মানের আনুষ্ঠানিক সূচনাপর্বেই তুমি বুঝেছিলে, যে নারীর আত্মমর্যাদাবোধ নেই, যে নারীর হৃদয়ে প্রেম নেই, যে নারী অন্যের কথায় স্বামীকে অবিশ্বাস করে এবং যে নারী হঠাৎ করেই স্বামীর বিরুদ্ধে পূর্বাপর ভাবনা বিহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে—দাম্পত্যজীবনে তার প্রতিষ্ঠা হয় না। দাম্পত্য জীবন ঘিরে নারী মনস্তত্বের এই রহস্য কেবল সেকালের নয়, এই সত্য একালের এবং আগামী কালেরও। সেদিনে কি করে বুঝেছিলে তুমি এই সব কথা! দাম্পত্যজীবনে  প্রগতিশীল পুরুষশ্রেষ্ঠ না হলে কালান্তরের কাহিনি তুমি লিখতে পারতে না। তোমার পরিবার তোমাকে কতটা বুঝেছিলো জানি না, একালের রসজ্ঞ পুরুষ সমাজ তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনতে পারছে।

 

কেবল মাত্র বঙ্গীয়-সমাজের পরিবার জীবনেই নয়, সারস্বত সমাজ-জীবনেও তোমার সাহিত্য আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সাহিত্যতত্ত্ব আলোচনায় ও ইতিহাস পর্যালোচনায় বাংলার সারস্বত সমাজের কাছে আজও তুমি ঐতিহ্য অনুসরণের আদর্শ। সাহিত্যতত্ত্বের আলোচনায় তুলনামূলক পদ্ধতি ও ঐতিহাসিক পদ্ধতি ব্যবহারে আজও তোমার উত্তরাধিকার সূত্রকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। তুমি তো ঐতিহাসিক ছিলে না, ইতিহাসের কোন বইও তুমি লেখ নি; কিন্তু জাতির গৌরব উদ্ধারে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের যে পথ তুমি দেখিয়েছো তা একালের ইতিহাসবিদদেরও স্মরণ করতে হয়। বেশ মনে পড়ে তোমার কথা,বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালী কখনও মানুষ হইবে না”। শুধু তাই নয়,  ইতিহাস অনুসন্ধানের পথ-নির্দেশে তোমার পরামর্শ ছিল, “কোন দেশের ইতিহাস লিখিতে গেলে সেই দেশের ইতিহাসের প্রকৃত যে ধ্যান, তাহা হৃদয়ঙ্গম করা চাই। এই দেশ কি ছিল? আর এখন এদেশ যে অবস্থায় দাঁড়াইয়াছে, কি প্রকারে—কিসের বলে এ অবস্থার প্রাপ্তি, ইহা আগে না বুঝিয়া ইতিহাস লিখিতে বসা অনর্থক কালহরণ মাত্র”তুমি ইতিহাস না লিখেও ঐতিহাসিক এবং বিশেষ ঐতিহাসিক পথরেখার পথপ্রদর্শক 

     শুধু তাই নয়, আর্থসামাজিক সমাজভাবনায় বর্তমানকালের সর্বাপেক্ষা প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রধান অগ্রদূত তুমিতোমার দেশপ্রীতির মূল উদ্দেশ্য লোকপ্রীতি। শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের তুমিই প্রথম ও প্রধান নেতা। সাধারণ প্রজার সুখই তোমার কাছে মুখ্য অবলম্বন ও প্রতিপাদ্য ছিল। বাংলায় তুমি শিক্ষা ও সম্পদ দাবি করেছিলে শ্রমিক এবং কৃষির ও কৃষকের জন্য—হাসিম শেখ, রামা কৈবর্ত্ত ও রামধন পোদের জন্য। তুমি বলেছিলে ভূমিতে প্রজার অধিকার শাশ্বত; দাবি করেছিলে জমিদার ও ধনীর সঙ্গে কৃষক ও প্রজার সমান অধিকার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে তুমি বঙ্গের চিরস্থায়ী কলঙ্ক বলে মনে করতে বঙ্কিম এবং এর উচ্ছেদ না হলে যে দেশের উন্নতি হতে পারে না এই মত উমি অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা করেছিলে। ভারতীয় সংবিধানেও তোমার কথাই সত্যে পরিণত হয়েছে। তোমার প্রবন্ধগুলি পড়লে আর নতুন করে সাম্যবাদ বা মার্কসবাদ পড়তে হয় না। তুমি যে সাম্যবাদী সমাজ-গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলে আজকের রাস্ট্রবিদরা  সেই স্বপ্নকে সফল করার চেষ্টায় কত ব্যাখ্যা অপব্যাখ্যা শ্লোগান ও হিংসায় এই সমাজ এই দেশকে রক্তিম করে তুলেছে তার হিসাব তোমাকে কেউ দেয়নি। তোমার কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি কেউ। আসলে তুমি যে সাম্যবাদের জাতীয় নেতা, নব্যভারতের সাম্যচিন্তার প্রথম পথপ্রদর্শক সে কথা আজকের শিক্ষিত নেতারা জানে না, আর জানলেও বোধ হয় কালাপানির নেশায় বলতে লজ্জা পায়। যারা তোমার এই সত্যকে অস্বীকার করে তারা ভারতে থেকেও কতটা ভারতবাসী তা ভাবতে হয় আমাদের। এ আমাদের জাতীয় লজ্জা বঙ্কিম, তোমাকে না জানা বা জেনেও না মানা আমাদের জাতীয় লজ্জা। তোমার রচনা যতই পড়ি ততই কোন গভীরে হারিয়ে যাই জানো! মনে হয়  তুমি একাধারে যেমন মনোবিজ্ঞানী-মনোসমীক্ষক তেমনি সাম্যবাদ ও জাতীয়তাবাদের আদর্শ নেতা এক অন্যতম রাস্ট্রনায়ক। ইংরেজ আমলের মানুষ হয়ে ইংরেজের অধীনে চাকরি করেও তুমি এক অখণ্ড স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলে, স্বাধীনতাকামী তামাম ভারতবাসীর হৃদয়ে অখণ্ড দেশপ্রেমের জোয়ার এনে দিয়েছিলে।

 

বঙ্কিমচন্দ্র তুমি সাহিত্য সম্রাট—সাহিত্যের আধারে তুমি দেশ গঠনের কারিগর, ভারত-ভাবনার বড় বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। যে গভীর প্রজ্ঞাদৃষ্টিতে সাহিত্যসম্রাট, তুমি তোমার সাহিত্যে ভারত-ভাবনার পরিচয় রেখে গেছো, তাতে আমাদের মনে হয় তুমি যেন একবিংশ শতাব্দীর ভারতের এক অদ্বিতীয় রাজনীতিবিদ এবং সমাজতান্ত্রিক এক মহান  দার্শনিক—তুমি ভারত সাধক একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একজন ভারতবাসী হিসেবে ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে যেসব প্রধান প্রধান সমস্যার কথা আজ আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, উত্তর সন্ধানে সচেষ্ট হই; ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রচিত তোমার সাহিত্যপাঠে সেই সব সমস্যার সমাধান-সূত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে আমাদের সামনে ভারতীয় ঐক্য বা সংহতি চিন্তা যেমন এক বড় চিন্তা, তেমনি অনেক সময় প্রাদেশিক কোন জয়ী দলের জয়োল্লাসের ভয়ঙ্কর রূপ আমাদের বিভ্রান্ত করে, আতঙ্কিত করে, আবার কোন কোন প্রাদেশিক বা সর্বভারতীয় নেতার আচরণ আমাদের অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলে অথচ সর্বসম্মত উত্তরের আশায় হতাশ হতে হয়। এই সব সমস্যার সমাধান-সূত্র অনুসন্ধানে তোমার সাহিত্য পর্যালোচনা আজ আমাদের একান্ত অপরিহার্য বলেই মনে করি।

     স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর আগত প্রায়, দেশের উন্নতিও অনেক হয়েছে তথাপি সর্বভারতীয় ঐক্যবোধের চিন্তায় আজও আমরা আশঙ্কিত। কখনও ভাষা, কখনও ধর্ম, কখনও প্রাদেশিকতা আমাদের এই আশঙ্কাকে ক্রমাগত ঘনীভূত করে তুলেছে। জাতীয় জীবনে আজ আমাদের বড় সমস্যা সংহতি সমস্যা। প্রায় দেড়শত বৎসর পূর্বে ১২৭৯ বঙ্গাব্দে আমাদের এই জাতীয় সমস্যার চিন্তায় চিন্তিত হয়েছিলে তুমিভারতের ইতিহাস অনুসন্ধানে ‘ভারত কলঙ্ক’ নামক প্রবন্ধে তুমি সেদিন লিখেছিলে—

এই ভারতবর্ষে নানা জাতি। বাসস্থানের প্রভেদে, ভাষার প্রভেদে, বংশের প্রভেদে, ধর্ম্মের প্রভেদে নানা জাতি। বাঙ্গালি, পাঞ্জাবি, তৈলঙ্গী, মহারাষ্ট্রী, রাজপুত, জাঠ, হিন্দু, মুসলমান ইহার মধ্যে কে কাহার সঙ্গে একতাযুক্ত হইবে। ধর্ম্মগত ঐক্য থাকিলে বংশগত ঐক্য নাই, বংশগত ঐক্য থাকিলে ভাষাগত ঐক্য নাই। রাজপুত, জাঠ, এক ধর্ম্মাবলম্বী হইলে, ভিন্নবংশীয় বলিয়া ভিন্ন জাতি; বাঙ্গালি বেহারী একবংশীয় হইলে, ভাষাভেদে ভিন্ন জাতি; মৈথিলী কনৌজী একভাষী হইলে, নিবাসভেদে ভিন্ন জাতিকেবল ইহাই নহে। ভারতবর্ষের এমনই অদৃষ্ট, যেখানে কোন প্রদেশীয় লোক সর্ব্বাংশে এক; যাহাদের এক ধর্ম্ম, এক ভাষা, এক জাতি, এক দেশ, তাহাদের মধ্যেও জাতির একতা জ্ঞান নাই 

 

     ভারতবর্ষের এমন খণ্ড খণ্ড রূপের অখণ্ডতায় তুমি জাতীয় ঐক্য বা জাতীয়তাবাদের চিন্তায় কলম ধরেছিলে সেদিন ১২৭৯ বঙ্গাব্দের এই চিন্তা মাথায় রেখে এর দু’বছরের মাথায় ‘আমার দুর্গোৎসব’ (কার্তিক ১২৮১) প্রবন্ধে তুমি জন্মভূমির মাতৃরূপ দর্শন করেছিলেতোমার কমলাকান্ত তাঁর সেই মাতৃভূমির কথায় বলেছিল—

চিনিলাম, এই আমার জননী জন্মভূমি, এই মৃন্ময়ী মৃত্তিকারূপিণী—অনন্তরত্নভূষিতা—এক্ষণে কালগর্ভে নিহিতা। রত্নমণ্ডিত দশভুজ—দশ দিকে প্রসারিত; তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানাশক্তি শোভিত; পদতলে শত্রুবিমর্দিত—পদাশ্রিত বীরজনকেশরী শত্রুনিপীড়নে নিযুক্ত। এ মূর্তি কালস্রোতে পার না হইলে দেখিব না—এখন দেখিব না—আজি দেখিব না—কাল দেখিব না—কিন্তু একদিন দেখিব দিগভুজা, নানাপ্রহারিণী শত্রুবিমর্দিনী, বীরেন্দ্রপৃষ্ঠবিহারিণী—দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরূপিণী, বামে বাণী বিদ্যাবিজ্ঞানমূর্তিময়ীসঙ্গে বলরূপী কার্তিকেয়, কার্যসিদ্ধিরূপী গণেশ, আমি সেই কালস্রোতোমধ্যে দেখিলাম এই সুবর্ণময়ী প্রতিমা।

 

    ‘আমার দুর্গোৎসব’ রচনার স্বল্পকাল পরেই ‘বন্দেমাতরম’  নামে বিখ্যাত সঙ্গীতটি রচনা করেছিলে এবং পরে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ব্যবহৃত ‘বন্দেমাতরম’ গানেও সেই মাতৃরূপের কল্পনা করেছিলে তুমি ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতে ভারতমাতৃকার সুজলা-সুফলা-মলয়জশীতলা—শস্যশ্যামলা মায়ের বন্দনা গেয়েছিলে, ভবিষ্যতে মায়ের বীর্য, ঐশ্বর্য, বিদ্যা, বল, সিদ্ধির মোহিনী প্রতিমা কল্পনা নেত্রে দেখে বিস্ময়ে মুগ্ধ ও উৎসাহে স্ফীত হয়ে উঠেছিলে যেমন; তোমার আনন্দমঠের সত্যানন্দ ঠাকুরও তেমনি সেই একই মূর্তি দেখেছিলেন। তিনি জগদ্ধাত্রী, কালী ও দুর্গা এই তিন প্রতিমায় বাংলার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মূর্তি দেখেছিলেন। তাঁর ধারণায় জগদ্ধাত্রী মূর্তি বঙ্গের সুদূর অতীত অবস্থার চিত্রঅতীতে অরণ্যময় প্রদেশে হিন্দু ঔপনিবেশিকগণের প্রথম বসতি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে দেশের স্বাভাবিক আর্থিক ঐশ্বর্যময় রূপ এই জগদ্ধাত্রী। তারপর মুসলমান রাজত্বের অন্তিম দশায় দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশের প্রতিরূপ তিনি কালীমূর্তিতে দেখেছেন। আর পুনরুন্নত ও সমৃদ্ধ বঙ্গের প্রতিকৃতি দেখেছেন দুর্গা প্রতিমার মধ্যে। মনে রাখতে হবে দুর্গা-প্রতিমার প্রতীকে কল্পিত এই মা কেবল হিন্দুর দেবী নন—ইনি সুবর্ণময়ী বঙ্গপ্রতিমা, সোনার বাংলা—ইনিই ভারতমাতৃকা।  স্বপ্নময় দেশের ভবিষ্যৎ কল্পনায় আর্থিক উন্নতি, জ্ঞানের উম্মতি, সামরিক তথা প্রতিরক্ষার উন্নতি এবং গণজাগরণের  সিদ্ধিতে তার  জগদ্ব্যাপিনী প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলে তুমি। আজও তো আমাদের ভারত-ভাবনায় এমন উন্নয়নের কথা পাথেয় হয়ে রয়েছে।

     বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দেশের স্বাধীনতার চিন্তায় এবং স্বাধীনতার পরবর্তীকালের ভারত ভাবনায় কেউ কেউ রাশিয়া বিপ্লবের আদর্শে মার্কসবাদ, লেনিনবাদের পথে চলেন, কেউ কেউ অসহযোগ আন্দোলনের ধারায় গান্ধীবাদের পথে চলেন, কেউ কেউ বিবেকানন্দের শূদ্রজাগরণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেনকিন্তু এই সব পথ ও পাথেয় তো দূরের কথা, ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে স্বাধীনতাও তখন কল্পনাতীত। সেই সময়ে সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা ভারতবর্ষের জন্য অন্তর্দেশীয় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে—দেশের প্রান্তবাসী সাধারণ মানুষদের নিয়ে গণজাগরণের পথে অগ্রসর হয়েছিলে তুমিতোমার ধ্যানের ভারতের কথায় তুমি  বলেছিলে, “যবে মার সকল সন্তান মাকে মা বলিয়া ডাকিবে”—অর্থাৎ দেশের সকল মানুষের মধ্যে দেশাত্মবোধ জেগে উঠলে তবেই মায়ের ওই রূপ দেখা সম্ভব হবে। ভক্তিনত চিত্তে তুমি বলেছিলে—“ছয় কোটি মুণ্ড তোমার পদপ্রান্তে লুণ্ঠন করিব, এই ছয় কোটি কণ্ঠে তোমার নাম ধরিয়া ডাকিব—না পারি, এই দ্বাদশ কোটি চক্ষে তোমার জন্য কাঁদিব”। যোগী-পুরুষের ন্যায় তোমার সঙ্কল্প ছিল—“এবার আপনা ভুলিব, ভ্রাতৃবৎসল হইব, পরের মঙ্গল সাধিব, অধর্ম আলস্য ইন্দ্রিয়ভক্তি ত্যাগ করিব”। উদাত্ত আহ্বানে ডাক দিয়েছিলে—“এস, আমরা দ্বাদশ কোটি ভুজে ঐ প্রতিমা তুলিয়া ছয় কোটি মাথায় বহিয়া ঘরে আনি”। হিন্দু নবজাগরণের যুগে ভক্তিভাব চিত্তে  যে কল্পনা যে সঙ্কল্প তুমি করেছিলে তাতে হিন্দু কল্পনার ভাবাধিক্য থাকলেও ছয় কোটি মানুষের মধ্যে থেকে কোনো সম্প্রদায়কে বাদ দাও নি তুমি এই ছয়কোটি মানুষের মধ্যে হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্ত্তের মত সাধারণ মানুষের কথাও বলেছিলেবর্তমান ভারতবর্ষ সেই দেশাত্মবোধের ভাবনাতেই প্রতিষ্ঠিত তথাপি তোমার মতো অসাম্প্রাদায়িক মনোভাব এই প্রগতিশীল সভ্যতার বুকে যেন আজও বড় বিরল

     দেশজননীকে কেমন করে ভালোবাসতে হয়—বঙ্গদেশে বঙ্গভাষায় বঙ্গবাসী তথা ভারতবাসীকে সে-মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলে তুমি। তোমার কাছ থেকেই বাঙালী শিখেছে জাতীয়তা কি, স্বদেশপ্রেম কাকে বলে, আর পেয়েছে সেই শিহরণজাগা বন্দেমাতরম সঙ্গীত—যে মন্ত্র সমগ্র মানবজাতিকে শিখিয়েছে জননী ও জন্মভূমির মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। আমরা জানি, ‘বন্দেমাতরম’ হিন্দুস্থানের মর্মসঙ্গীত ও হৃদয়ের গানবন্দেমাতরম জাতীয়তাবাদী চেতনার গান—এর ধর্ম ভারতধর্ম—এর উদ্দেশ্য দেশের ঐক্য। বন্দেমাতরম শুধু একটি গান নয়, একটি মন্ত্র—মহামন্ত্র, যে মহামন্ত্রের ধ্বনি কানের ভিতর দিয়ে মর্মে প্রবেশ করে সুপ্ত ভারতবর্ষকে জাগিয়ে তুলেছিল, আসমুদ্র হিমাচল ব্যাপ্ত এই বিশাল দেশ ভারতবর্ষের সকল জাতির সকল ভাষাভাষীর মনে দেশাত্মবোধ জন্মেছিল, সকল মানুষ এককণ্ঠে মাতৃবন্দনায় উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। সূচনাপর্বে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি ছ’কোটি মানুষের কণ্ঠধ্বনি ছিল, ‘আনন্দমঠ’এ তা সপ্তকোটিকণ্ঠের জীবনসঙ্গীত, আর ধীরে ধীরে তা সারা ভারতের জাতীয় সঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়। সময় ও কালের প্রেক্ষাপটে সংহতি চিন্তায় তোমার রচিত ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র প্রাসঙ্গিকতায় ও তাৎপর্যে আজও ব্যাখ্যাতীত। দেশের একপ্রান্তে ধ্বনিত এই ধ্বনির প্রতিধ্বনি যদি অন্যপ্রান্তে ধ্বনিত করতে পারি, সমস্ত কুসংস্কার বা সঙ্কীর্ণতাকে অতিক্রম করে যদি সমস্ত ভারতবাসী ‘বন্দেমাতরম’ মহামন্ত্রে দীক্ষিত হতে পারি  তবেই আজ তোমার জন্মদিন স্মরণ সার্থক হয়। কিন্তু অনেক আক্ষেপ হয় জানো, বড় বড় মঞ্চ গড়ে তোমার জন্মদিনের পুরোহিত সেজে মন্ত্রোচ্চারণের স্রোতোধারায় তোমাকে স্তব্ধ করে দিই, তোমাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিতে চাই—তোমার উত্তরসুরি, তোমার শিষ্য হতে চাই না আমরা। অন্তরালে যেন এমন জাতীয় কলঙ্ক নিয়েই তোমার জন্মদিনের ঢাক পেটা্‌ই।

   জানো বঙ্কিম, যখন তোমাকে এই চিঠি লিখি সেই সময় আমার এক অধ্যাপক বন্ধু বসেছিলেন, চিঠিখানা শুনে তিনি মন্তব্য করলেন—রবীন্দ্রনাথের জনগণমনঅধিনায়ক গানটি জাতীয় সঙ্গীতের সাংবিধানিক মর্যাদা পেয়েছে, এটি ভালো কবিতা কিন্তু এর মধ্যে ‘বন্দেমাতরম’এর উদ্দীপনা নেই, এই কবিতায় দেশের উর্ধে দেশ-নায়কের জয়গান গাওয়া হয়েছে। বন্দেমাতরম মন্ত্রে দেশের বন্দনা গান গাওয়া হয়েছে। বন্দেমাতরম সঙ্গীত অনেক গভীর অনেক উদাত্ত অনেক প্রসারিত। তোমার চিঠির প্রতি মনোনিবেশ নষ্ট হবে বলে আমি আর কোনো কথা তুলি নি। তোমার কথাটি পাঠক বলবেন বলে প্রসঙ্গ উপেক্ষা করেছি। আমাকে তুমি মার্জনা কর বঙ্কিম। তবে এখানে তোমার কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে বঙ্কিম। তোমার আগে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি গান লিখেছিলেন—“মিলে সব ভারত সন্তান / এক তান মন প্রাণ / গাও ভারতের যশোগান”ইত্যাদি। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান কি তোমাকে বন্দেমাতরম সঙ্গীত রচনায় অনুপ্রাণিত করেছিলো?

   আনন্দমঠ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার প্রাসঙ্গিক নিবন্ধগুলিও পড়েছি। দেখেছি তোমার লেখায় দেশমাতৃকার রূপ-কল্পনায় হিন্দুর দেবদেবীর উল্লেখ আছে কিন্তু তা কোনো সঙ্কীর্ণ মানসিকতায় তাদের কথা তুমি বলোনি‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতে কাব্যের অর্থ প্রতীকের সাহায্যে মূর্ত করতে শিল্পশৈলী বা ভাষার অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দান করতেই এমন প্রতীকের ব্যবহার করেছো বলেই মনে হয়েছে আমারবিখ্যাত মুসলমান কবি ইকবালও তো তাঁর ‘হিন্দুস্থান হামারা’ কবিতায় স্বর্ণসম্ভবা স্রোতস্বিনী গঙ্গা তথা পৃথিবীর নদীকে স্বর্গের সঙ্গে যুক্ত করে এবং অনাদি, অনন্ত সত্তায় আবিষ্কার করে তাকে এক অপার্থিব মহিমায় মণ্ডিত করেছেন। এই প্রতীকধর্ম্মিতা তো কাব্যের অবিচ্ছেদ্য লক্ষণ।

    তোমার ‘বন্দেমাতরম’ এর মা ভারতমাতা। সকল ভারতীয়ের মা তিনি। সংস্কারে ভিন্ন হলেও মায়ের কাছে সন্তানের জাত-পরিচয় বড় নয়। এর ভুল ব্যাখ্যা অনেক সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতের সঙ্কীর্ণ ব্যাখ্যা দেশের অনেক ক্ষতি করেছে। জানো তোমার বন্দেমাতরম মন্ত্রের এমন অপব্যাখ্যার কথা শুনে মনে পড়ে তোমার এক যোগ্য উত্তরসুরি কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কথা। এক সময় রাজ্যসভার সাংসদ এবং জ্ঞানপীঠ পুরষ্কার প্রাপ্ত এই কথাসাহিত্যিক কি বলেছেন জানো! বলেছেন—

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতেই হয়েছিল ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদের উদ্বোধন; ‘আনন্দমঠে’র কল্পনাই ছিল পরবর্তীকালে বাংলাদেশ এবং সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস রচনার ভূমিকালিপি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের সাধনায় বঙ্কিমচন্দ্র যে আদর্শকে আমাদের মনোজগতে রূপায়িত করেছেন, সে আদর্শকে দেশের কর্মনায়কেরা বাস্তবে রূপায়িত করতে সক্ষম হন নাই বলেই পরাধীনতামুক্তির শুভলগ্নে ক্ষোভ ও আক্রোশ হতে উদ্ভুত দুই জাতিত্ত্বের ভ্রান্ত উপলব্ধিকে সত্যের মর্য্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছে ভাররতবর্ষ। তাই ভারতবর্ষ আজ দ্বিধাবিভক্ত।

 

     যে মাটিতে আমাদের জন্ম, যার জল, হাওয়া ও শস্যদানায় আমাদের জীবন ও জীবিকা এবং যে মাটিতেই আমাদের পরিণতি ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রে তুমি সেই মাটির বন্দনা করেছো বঙ্কিমভারতবর্ষ—প্রতিটি ভারতবাসীরই মা। তোমার রচিত মন্ত্রে ভারতমাতারই জয়গান গেয়েছো তুমি। আমরা যে প্রান্তবাসী বা যে ভাষাভাষীই হই না কেন দেশকে ভালোবাসলে, দেশকে পুজো করতে হলে বন্দেমাতরম আমাদের বলতেই হবে। বন্দেমাতরম কেবল ভারতবর্ষ কেন—বিশ্বের সকল দেশের দেশভক্তির মন্ত্র। তোমার এই মন্ত্র বাংলা ভাষায় রচিত হলেও তা আজ জাতীয় মন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক ভাবনার বিকাশ। দেশ ও মানবজাতির মঙ্গলের কথায় তুমি এক সময় বলেছিলে, “সকল ধর্মের উপর স্বদেশপ্রীতি” এবং “পরিবারই প্রথম প্রীতির শিক্ষার স্থল”। জাতির উদ্দেশ্যে যেদিন এই কথা তুমি বলেছিলে সেদিনই তুমি কালের সীমা অতিক্রম করে জাতি ও জাতির জাতীয় জীবনে সর্বকালের হয়ে উঠেছো তোমার নিজেরই অগোচরে তা আজও আমরা অনুভব করছি।

 

 

 

 

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কি জানো বঙ্কিম, তোমার সাহিত্যপাঠে তোমার অনেক পাঠক তোমাকে সাম্প্রদায়িক বলে অভিযুক্ত করেছে এবং আজও করে। মনে হয় তারা তোমার লেখা ঠিকমতো হজম করতে পারেনি অথবা ঠিকমতো পড়েনি। তাছাড়া এমন অভিযোগ তোমার উপর খাড়া করার কোনো কারণ থাকে না। এইখানেই আমাদের ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার জাতীয়তাবাদী চিন্তায়, হিন্দুত্বের ব্যাখ্যায় তোমার যথার্থ স্বরূপ কি ছিল? সেই সব পাঠকেরা জানে না তুমি যদি সাম্প্রদায়িক মনোভাবের দ্বারা আক্রান্ত হতে তাহলে হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠার মধ্যেই তোমার আনন্দমঠের পরিসমাপ্তি ঘটত। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস প্রকাশের ন’বছর পূর্বে ১২৮০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং পরাধীনতা’ প্রবন্ধে তুমি জানিয়েছিলে, “যে দেশের রাজা প্রজাপীড়ক, সেই রাজা স্বজাতীয় হোন আর পরজাতীয়ই হোন—সে দেশ পরাধীন”। সেই মানসিকতা নিয়েই তো তুমি  আকবর শাসিত ভারতবর্ষকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বলেছো

     সন্তান সম্প্রদায় জয়ী হলেও তাদের হাতে দেশ শাসনের অধিকার ছেড়ে দাও নি কারণ, হিন্দু সন্তান সম্প্রদায়ের আচরণে হিন্দুত্ব ছিল না, তারা তখনও জ্ঞানবান ও গুণবান হয়ে ওঠে নি তোমার শেষ উপন্যাস ‘সীতারাম’। সেখানে শাসক চরিত্র হিন্দু রাজা সীতারাম। এই উপন্যাসে মুসলমান ফকির চাঁদশাহের মুখ দিয়ে সীতারামের উদ্দেশ্যে তুমি জানিয়েছো—

ফকির বলিল, বাবা! শুনিতে পাই, তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ, কিন্তু অত দেশাচারে বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দুরাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে। সেই একজনেই হিন্দু মুসলমানকে সৃষ্টি করিয়াছেন; যাহাকে হিন্দু করিয়াছেন, তিনিই করিয়াছেন, যাহাকে মুসলমান করিয়াছেন, সেও তিনিই করিয়াছেন। উভয়ের তাহার সন্তান; উভয়েই তোমার প্রজা হইবে। অতএব দেশাচারে বশীভূত হইয়া প্রভেদ করিও না। প্রজায় প্রজায় প্রভেদ পাপ। পাপের রাজ্য থাকে না।

 

   রাজসিংহ’ উপন্যাসের উপসংহারে ‘গ্রন্থকারের নিবেদন’ অংশে তুমি যে কথা বলেছিলে সে-কথা আনন্দমঠ উপন্যাস সম্পর্কেও গভীরভাবে সত্য। তুমি বলেছো—

গ্রন্থকারের বিনীত নিবেদন এই যে, কোন পাঠক না মনে করেন যে, হিন্দু মুসলমানের কোনপ্রকার তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। হিন্দু হইলেই ভাল হয় না, মুসলমান হইলেই মন্দ হয় না, অথবা হিন্দু হইলেই মন্দ হয় না, মুসলমান হইলেই ভাল হয় না। ভালমন্দ উভয়ের মধ্যেই তুল্যরূপে আছে। ...অনেক স্থলে মুসলমানরাই হিন্দুর অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অনেক স্থলে হিন্দু রাজা মুসলমান অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণের সহিত যাহার ধর্ম আছে—হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, সেই শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণ থাকিতেও যাহার ধর্ম নাই—হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, সেই নিকৃষ্ট।

 

বঙ্গদর্শন, ভাদ্র ১২৭৯ বঙ্গাব্দে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় দেশের কৃষকদের কথায় তুমি বলেছো “দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয়জন? আর এই কৃষিজীবি কয়জন? ... যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই, সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই”। এই কৃষক তো হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্ত্তরা। আবার চৈত্র সংখ্যায় রাজনারায়ণ বসুর ‘হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা’ গ্রন্থটির সমালোচনা প্রসঙ্গে তুমি তো উচ্চকণ্ঠে জানিয়েছো  “আমরা হিন্দু, কোন সম্প্রদায়ভুক্ত নহি”। হিন্দু ও মুসলমান প্রসঙ্গে ‘কাফের’ ও ‘নেড়ে’ শব্দগুলি ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এসেছে তোমার সাহিত্যে—এর মধ্যে তোমার কোনো সঙ্কীর্ণতা আমরা দেখি না। আসলে যারা তোমাকে সাম্প্রদায়িক বলে অভিযুক্ত করে তারা ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে জানে না অথবা জেনেও পক্ষপাতিত্ব করে তোমার প্রতি অবিচার করে। এই অবিচার সত্যের প্রতি অবিচার, দেশের প্রতি সঙ্কীর্ণ মনোভাবের প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়।

   আমরা দেখেছি এবং খুব ভালো করে দেখেছি বঙ্কিম, ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দেশপ্রেমের প্রেরণায় সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলেছো তুমি কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদকে  মেনে নিতে পার নি কোনোভাবেইএই উপন্যাসের যে মূল ঘটনা—সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তা তো তুমি ইতিহাসের পাতা থেকেই সংগ্রহ করেছিলেযে সময়ের কাহিনী এই উপন্যাসে বিবৃত করেছ সেই সময়ের ঐতিহাসিক পরিবেশটুকু রক্ষা করতে চেয়েছিলে এই গ্রন্থে। আমরা জানি সে যুগে মুঘল রাজশক্তির দ্বারা বঙ্গদেশ নানাভাবে পীড়িত হয়েছিল—একথাও যেমন ঐতিহাসিক সত্য, তেমনি এই বঙ্গদেশে সেকালে বহু দরিদ্র মুসলমান যে হিন্দু জমিদার কর্তৃক অত্যাচারিত হয়েছিল—এও তেমনি ঐতিহাসিক সত্যতোমার আমন্ত্রিত সন্ন্যাসীদের সংগ্রাম দেশের বহিঃশত্রুর সঙ্গে। তারা বঙ্গদেশ থেকে রাজশক্তিরূপে মুসলমান এবং ইংরেজ উভয়কেই বিতাড়িত করে স্বাধীন হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। আসলে আনন্দমঠ লেখার আগে থেকেই তো তুমি জেনেছিলে যে এই বঙ্গভূমিতে যত সংখ্যক বঙ্গভাষী বাঙালী বাস করে তার অর্ধেক মুসলমান। তাই তোমার সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ তার স্বদেশবাসীর বিরুদ্ধে নয়, অত্যাচারী এবং প্রজাপালনে অক্ষম শাসক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেউপন্যাসে ভবানন্দের বর্ণনায় অত্যাচারী রাজার যে অত্যাচারের বিবরণ দিয়েছ তা যেমন নৃশংস তেমনি মর্মান্তিক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির তীব্র বিরূপতা—অনাবৃষ্টি—মন্বন্তর। এই পরিবেশ ও পরিমণ্ডলের হাত থেকে মুক্তি নেই কারও—না হিন্দু না মুসলমানের। যে রাজা দেশের মানুষের রক্ষণাবেক্ষণ করে না আনন্দমঠের সন্ন্যাসীরা সেই রাজার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমেছে। তাদের যুদ্ধ শুধু মুসলমান রাজশক্তির সঙ্গেই নয়, ইংরেজ বাহুবলের সঙ্গেও তাদের যুদ্ধ। যুদ্ধে মুসলমান ও ইংরেজ একই সঙ্গে পরাজিত হয়েছে, জয় হয়েছে সন্তান সম্প্রদায়ের। কিন্তু জয়োল্লাসের পরিণাম হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর। সেই জয়োল্লাসের ভয়ঙ্কর চিত্র অঙ্কন করে তুমি  বলেছ—

সেই রজনীতে হরিধ্বনিতে বীরভূমি পরিপূর্ণা হইল। সন্তানেরা দলে দলে যেখানে সেখানে উচ্চৈঃস্বরে কেহ ‘বন্দে মাতরং’ কেহ ‘জগদীশ হরে’ বলিয়া গাইয়া বেড়াইতে লাগিল... কেহ গ্রামাভিমুখে, নগরাভিমুখে ধাবমান হইল, পথিক বা গৃহস্থকে ধরিয়া বলে ‘বল বন্দে মাতরং নহিলে মারিয়া ফেলিব’। কেহ ময়রার দোকান লুটিয়া খায়, কেহ গোয়ালার বাড়ি গিয়া হাঁড়ি পাড়িয়া দধিতে চুমুক মারে, কেহ বলে ‘আমরা ব্রজগোপ আসিয়াছি, গোপিনী কই?’ সেই এক রাত্রের মধ্যে গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে মহাকোলাহল পড়িয়া গেল। সকলে বলিল, ‘ইংরেজ মুসলমান একত্রে পরাভূত হইয়াছে, দেশ আবার হিন্দুর হইয়াছে। সকলে একবার মুক্তকণ্ঠে হরি হরি বল’। গ্রাম্য লোকেরা মুসলমান দেখিলেই তাড়াইয়া মারিতে যায়। কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুটিয়া লইতে লাগিল। অনেক যবন নিহত হইল, অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল, জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল, ‘মুই হেঁদু’।

 

     বোধ করি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ঘটনার এই অনিবার্যতাকে তুমি জোর করে বাধা দাও নি। স্বাভাবিকতাকে গুরুত্ব দিতেই তোমার এই চিত্ররূপ। ঠিক কি না বল!

     ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পুস্তকাকারে প্রকাশিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে জয়ী সন্তান-সম্প্রদায়ের জয়োল্লাসের যে ভয়ঙ্কর চিত্র তুমি চিত্রিত করেছিলে দেড়শত বৎসর পরে ২০২০ সালেও তা কতখানি বাস্তব তা আমরা সকলেই নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করছি বঙ্কিম অনুভব করতে পারছি তুমি কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলে, কেন তোমাকে ঋষি আখ্যা দেওয়া হয়েছিলো! আমরা দেখছি বর্তমানে এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে স্বীকার করে রাজনৈতিক অস্তিত্বের বলিষ্ঠতা জাহির করা হচ্ছে। এ আমাদের বড় দুর্ভাগ্য। কিন্তু তুমি দেশের এই দুর্ভাগ্যকে প্রতিষ্ঠিত কর নি। আনন্দমঠে হিন্দুর জয় হল বটে, কিন্তু দেশে হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠা তুমি দিলে না। সন্তাগণের দেশাত্মবোধ জাগরণ বলতে তুমি অজ্ঞানে আত্মদান বা জীবনবিসর্জনের মধ্যেই থেমে থাক নি। দেশভক্তিতে সন্তানগণের জীবনসর্বস্ব পণের সঙ্গে ভক্তিকে যোগ করেছো তোমার দেশভক্তির কথায় সেই ভক্তিবাদের চিত্র তুমি তোমার আনন্দমঠ উপন্যাসে চিত্রিত করেছো। সত্যানন্দের মুখ দিয়ে দেশপ্রিয় সন্তানকে বলিয়েছো—‘জীবন তুচ্ছ সকলেই ত্যাগ করিতে পারে চায় ভক্তি।” সন্তানগণের দেশাত্মবোধ জাগরণে সেই ভক্তিযোগের কথাই তো তুমি বলেছো বঙ্কিমসন্তানগণের মধ্যে ভক্তিযোগ জাগরণের কারণেই দেশমাতৃকাকে তুমি দেবত্বে আরোপিত করেছেো একথা আর বলার অপেক্ষা থাকে না। ভারতভাবনার এই আদর্শবোধে তুমি বর্তমান ভারতবর্ষ থেকেও কয়েকশো বছর প্রাগ্রসর হয়ে রয়েছো হিন্দু সন্তান সম্প্রদায়ের আচরণে হিন্দুত্ব ছিল না, তারা তখনও জ্ঞানবান ও গুণবান হয়ে ওঠে নি তাই সন্তান সম্প্রদায় জয়ী হলেও তাদের হাতে দেশ শাসনের অধিকার তুমি ছেড়ে দাও নিধন্য তোমার দেশ ভাবনা। আজকের ভারতভাবুকেরা তোমার ভাবনায় ভাবিত হলো কৈ!—আমাদের এই আক্ষেপ নিবেদনেই বলি, তুমি তাদের করুণা করে উপেক্ষা করো না বঙ্কিম, তুমি তাদের আশীর্বাদ কর। বল—হে জ্ঞানবান ভারতীয় রাজনীতিবিদ তোমাদের হৃদয়ে ভক্তি জাগ্রত হোক, তোমারা চৈতন্যপ্রাপ্ত হও। তোমার অনুশীলনের পথে আহ্বান করে তুমি তাদের দেশপ্রেমের দীক্ষা দাও। তুমি যেমন ভেবেছিলে প্রশিক্ষণহীন সন্তান-সম্প্রদায়কে দেশাত্মবোধে জাগ্রত হলেও তাদের অনুশীলনের দ্বারা মার্জিত ও বিশুদ্ধ করতে হবে, শিক্ষক হিসেবে ভবানী পাঠকের মতো মহানকে শিক্ষককে উপস্থিত করেছিলে—তেমনি করে কোনো এক শিক্ষকের সামনে আজকের নেতাদের দাঁড় করিয়ে দাও। তুমি বল—দল বড় নয়, দেশ বড়। দেশের জন্য বলিপ্রদত্ত হও দল সহজেই তোমার আপন হবে।

   মনে পড়ছে বঙ্কিম, ভারতবর্ষের অতীত ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেশের উপযুক্ত নেতার উদাহরণ হিসেবে তুমি মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণকে উপস্থিত করেছো। বলেছো—

শ্রীকৃষ্ণ অদ্বিতীয় রাজনীতিবিদ—সাম্রাজ্যের গঠন বিশ্লেষণে বিধাতৃতুল্য কৃতকার্য—সেইজন্য ঈশ্বরাবতার বলিয়া কথিত। ... যে অবধি ইনি মহাভারতে দেখা দিলেন, সেই অবধি এই মহেতিহাসের মূল গ্রন্থিরজ্জু ইঁহার হাতে—প্রকাশ্যে কেবল পরামর্শদাতা—কৌশলে সর্বকর্তা। ইঁহার মর্ম কেহ বুঝিতে পারে না, কেহ অন্ত পায় না, সে অনন্ত চক্রে কেহ প্রবেশ করিতে পারে না। ... কেবল পাণ্ডবগণকে একেশ্বর করাও তাঁর অভীষ্ট নহে। ভারতবর্ষের ঐক্য তাঁহার উদ্দেশ্য।

 

     ‘কৃষ্ণচরিত্র’ গ্রন্থে আবৃতভাবে এবং ‘ধর্ম্মতত্ত্ব’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে দেশপ্রীতির কথা তুমি বলেছআদর্শ মনুষ্যত্বের স্থাপনকর্তা হিসাবে শ্রীকৃষ্ণ দেশপ্রীতির শ্রেয়রূপে প্রবর্তক। তুমি বার বার বলেছো, নির্গুণ ঈশ্বর নিয়ে ধর্ম হয় না। গুণময় ঈশ্বরকে চায় ধর্মের জন্য এবং তিনি অশরীরী থাকলে সেই ধর্মসত্য মানবগোচর হবেও না, তাই ইশ্বরের অবতার। ঈশ্বর অবতীর্ণ হন পূর্ণ মনুষ্যত্বের আদর্শ স্থাপনের জন্য। আর পূর্ণ মনুষ্যত্বই হল ধর্ম। কিভাবে পূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটবে ধর্ম্মতত্ত্ব গ্রন্থে তার পথনির্দেশও করেছো তুমিমানুষের বিভিন্ন বৃত্তিকে—শারীরিকী, জ্ঞানার্জনী, কার্যকারিণী এবং চিত্তরঞ্জিনী এই চারভাগে বিভক্ত করেছো দেখিয়েছো তুমিমানবজীবনে এই বৃত্তিগুলির সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশেই পূর্ণ মনুষ্যত্ব। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বিচার করে তুমি দেখাতে চেয়েছো—বুদ্ধ নন, খ্রিস্ট নন, শ্রীচৈতন্যদেবও নন, একমাত্র কৃষ্ণের মধ্যেই বৃত্তিগুলির সর্বাঙ্গীন সামঞ্জস্যময় বিকাশ ঘটেছিল। এই বৃত্তিসমূহের সামঞ্জস্য বিধানের পদ্ধতির নাম দিয়েছো তুমি ‘অনুশীলন ধর্ম’, এবং বলেছো এই অনুশীলন ধর্ম’ গীতানির্ভর।  এক্ষেত্রে তুমি অন্যধর্মের তুলনায় হিন্দুধর্ম এবং হিন্দুধর্মের অন্যান্য ধর্মাচার্যদের তুলনায় শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠত্বের কথা জানিয়ে বলেছো—

মনুষ্যের সকল বৃত্তিগুলির সম্পূর্ণ স্ফূর্তি ও সামঞ্জস্যে মনুষত্বযাঁহাতে সে সকলের চরম স্ফূর্তি ও সামঞ্জস্য পাইয়াছে, তিনিই আদর্শ মনুষ্যখ্রীস্টে তাহা নাই—শ্রীকৃষ্ণে তাহা আছে। যিশুকে যদি রোমক সম্রাট য়িহুদার শাসনকর্তৃত্বে নিযুক্ত করিতেন, তবে কি তিনি সুশাসন করিতে পারিতেন? তাহা পারিতেন না। যদি য়িহুদীরা রোমকের অত্যাচারপীড়িত হইয়া, স্বাধীনতার জন্য উত্থিত হইয়া, যীশুকে সেনাপতিত্বে বরণ করিত, যীশু কী করিতেন? যুদ্ধে তাঁহার শক্তিও ছিল না, প্রবৃত্তিও ছিল না। ... কৃষ্ণও যুদ্ধে প্রবৃত্তিশূন্য, কিন্তু ধর্ম্মার্থ যুদ্ধ হইলে অগত্যা প্রবৃত্ত হইতেন। যীশু অশিক্ষিত, কৃষ্ণ সর্বশাস্ত্রবিৎ। আদর্শ মনুষ্য সকল শ্রেণীরই আদর্শ হওয়া উচিতএইজন্য শ্রীকৃষ্ণের শাক্যসিংহ যীশু বা চৈতন্যের ন্যায় সন্ন্যাস গ্রহণ-পূর্বক ধর্মপ্রচার ব্যবসায় স্বরূপ অবলম্বন করা অসম্ভব। কৃষ্ণ সংসারী গৃহী, রাজনীতিজ্ঞ, যোদ্ধা, দণ্ডপ্রণেতা, তপস্বী, ধর্মপ্রচারক, সংসারী ও গৃহীদিগের, রাজাদিগের, যোদ্ধাদিগের, রাজপুরুষদিগের, তপস্বীদিগের, ধর্মবেত্তাদিগের এবং একাধারে সর্বাঙ্গীন মনুষ্যত্বের আদর্শ

 

     দেখেছি আনন্দমঠে সরাসরি কৃষ্ণ নেই। তবে সুদর্শনধারী চতুর্ভুজ বিষ্ণু আছেন, ‘হরে মুরারে গান’ আছে, এবং সেই বিষ্ণুকোলে স্থাপিতা দেশমাতৃকা। আর আছেন সন্ন্যাসী সম্প্রদায়, লোকহিত যাঁদের ব্রত, যাঁরা কৃষ্ণের অস্পষ্ট ছায়াবাহী সত্যানন্দের প্রেরণায় নব কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ বাধিয়েছেন। সত্যানন্দ খাঁটি কৃষ্ণ নন বলে পরাভূত হয়েছেন। আর সন্তানদলের মধ্যে অনুশীলন ধর্মের উপলব্ধির অভাব হেতু জয়োল্লাসে তাঁরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছেন। সীতারামের পরাজয়ও সেই একই কারণেই। আর দেবী চৌধুরাণীতে অনুশীলন ধর্ম দক্ষ প্রফুল্ল হয়ে উঠেছেন ‘নারী কৃষ্ণ’। দেশ ও মানবজাতির মঙ্গলের কথায় তুমি এক সময় বলেছিলে, “সকল ধর্মের উপর স্বদেশপ্রীতি” এবং “পরিবারই প্রথম প্রীতির শিক্ষার স্থল”। জাতির উদ্দেশ্যে যেদিন এই কথা তুমি বলেছিলে সেদিনই তুমি কালের সীমা অতিক্রম করে জাতি ও জাতির জাতীয় জীবনে সর্বকালের হয়ে উঠেছো তোমার নিজেরই অগোচরে তা আজও আমরা অনুভব করছি। রাষ্ট্র-গঠনের আগে পরিবার গঠনের দরকার। রাষ্ট্র পরিবারের সমষ্টি, আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের আগে আদর্শ পরিবার গঠন প্রয়োজন। আনন্দমঠ লেখার পর রাষ্ট্রের সঙ্গে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্মরণ করে তুমি দেবী চৌধুরাণী রচনা করেছো‘দেবী চৌধুরাণী’ এবং ‘সীতারাম’ উপন্যাসের মূল বিষয় চরিত্র গঠন। চরিত্র গঠনে বীরত্বের সঙ্গে পূর্ণ মনুষ্যত্বের অনুশীলনের কথা বলেছো তুমি। এমন এক চিরন্তন সমাজবাস্তবতা নিয়েই তোমার প্রফুল্ল গৃহাঙ্গনা হয়েও বীরাঙ্গনা হয়ে উঠেছে।

   বঙ্গীয় পরিবার জীবন, সমাজ জীবন এবং ভারতের জাতীয় জীবনে তোমার সাহিত্য যেমন আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, ‘দুর্গেশনন্দিনী’ থেকে শুরু করে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ও ‘বিষবৃক্ষ’ পর্যন্ত উপন্যাসগুলিতে বঙ্গীয় মধ্যবিত্ত সমাজ যেমন তার আত্মদর্শনের সুযোগ পায়, সাহিত্যতত্ত্ব আলোচনায় ও ইতিহাস পর্যালোচনায় বাংলার সারস্বত সমাজের কাছে তুমি যেমন  আজও ঐতিহ্য অনুসরণের আদর্শ, কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের উৎস অনুসরণের ইতিহাস নিহিত তোমারই রচনায়।; তেমনি জাতীয় জীবনে তোমার অবদান আরও ব্যাপক ও বৃহৎ। জাতীয় সংহতি সাধন ও দেশগঠনের পথে আজও তুমি আমাদের পথ প্রদর্শক। এখানে তোমার ভূমিকা যেন মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ অনুসরণমহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ যেমন অর্জুনের রথের সারথী হয়ে অর্জুনকে দেশের কাজে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছিলেন, তাঁকে উদ্বোধিত করতে এক বিশেষ দর্শনের উপস্থাপন করেছিলেন তুমিও তেমনি দেশের দেশপ্রেমিকদের তোমার সাহিত্য রথে চড়িয়ে জাতীয়তার যুদ্ধে প্রবৃত্ত করতে চেয়েছিলে বলেই মনে করি তোমার ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র আজও আমাদের জাতীয় সংহতি সাধনের শঙ্খনাদ একথা একজন ভারতবাসী হিসেবে সগৌরবে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে আনন্দ অনুভব করি।  শুধু তাই নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পরাধীনতার মাটিতে দাঁড়িয়েও তুমি যে নূতন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলে, একবিংশ শতাব্দীর স্বাধীন ভারতবর্ষ কি তোমাকে তোমার স্বপ্নের সেই ভারতবর্ষ উপহার দিতে পেরেছেন—আজ আমাদের এমন কথা ভাববারও অবকাশ রয়েছে। তোমাকে জাতীয়তার সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার না করে তোমার আদর্শপথ অনুসরণে আমাদের আশীর্বাদ কর তুমি। আশীর্বাদ কর ভারতবর্ষের বুকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর যেন সেই কৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। শঙ্খধ্বনি দিয়ে আমরা তাঁকে আহ্বান জানাব, বরণ করে নেব। ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রে তোমাকে পুনরায় প্রণাম জানিয়ে আজকের চিঠি এখানেই শেষ করলাম।

 

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি, বীরভূম—৭৩১১০২।

Debashismukherjee67@gmail.com

9233124718.

Saturday, 30 May 2020

মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে রামায়ণ পর্যালোচনা : প্রতিবাদে তারাশঙ্কর



মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে রামায়ণ পর্যালোচনা : প্রতিবাদে তারাশঙ্কর
দেবাশিস্ মুখোপাধ্যায়

রামায়ণ মহাকাব্যের রাম, রাবণ এবং সীতা এই তিন চরিত্রই আমাদের কাছে সর্বাধিক আলোচিত এবং সমালোচিত হয়ে থাকে। তার মধ্যে সীতা কিম্বদন্তীমূলক পঞ্চসতীর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আর বহুগুণের অধিকারী হয়েও রাবণ আমাদের কাছে এক আতঙ্কের আধার হিসেবেই পরিচিত। লঙ্কেশ্বর রাবণ যেন ভারতীয় সংস্কৃতির এক বিখ্যাত খল নায়ক। বহু বিবাহিত পুরুষ হয়েও নারী হরণ ও ধর্ষণ যেন তাঁর নিত্য কর্ম হিসেবেই সর্বজন-বিদিত। সেই জন্যই বোধ হয় সীতাকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার সময়ে রাবণের কথায় মধুকবির কথা—‘কার ঘর আঁধারিলি এবে নিবাইয়া প্রেমদীপ / এই তোর নিত্য কর্ম জানি’। রামায়ণের রাবণ এবং সীতা সম্পর্কে এমন ধারণা মানুষের কল্পনা প্রসূত নয়; মহাকবি বাল্মিকীর চরিত্র-চিত্রণের সূত্র ধরেই আমাদের এমন ধারণা সম্ভব হয়ে উঠেছে। সেই সূত্র থেকেই যুগ যুগ ধরে প্রচলিত হয়ে রয়েছে—ধরিত্রী কন্যা সীতা—সর্বংসহা, সীতা অপহৃতা হয়েও সতী। মহাকবি বাল্মিকী ভারতীয় নারী ঐতিহ্যের আদর্শকেই সীতা চরিত্রে মহিমান্বিত করেছেন। এমন প্রবাদ প্রতীম প্রামাণিক সত্যকে বিকৃত ব্যাখ্যায় কলঙ্কিত করতে চেয়েছিলেন কিছু বস্তুতান্ত্রিক পণ্ডিত। ভারতীয় সংস্কৃতির এক সাধক এবং পরবর্তীকালে জ্ঞানপীঠ পুরষ্কারপ্রাপ্ত মহান কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজরে এসেছিল তেমন এক কলঙ্কিত আলোচনা। তিনি তাঁর তীব্র প্রতিবাদে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেই বিকৃত আলোচনাকে। ‘আমার কথা’ নামক আত্মজীবনীর পাতায় তারাশঙ্কর তাঁর জীবনের তেমন এক চরম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছেন—
মার্কসবাদীদের অনেকগুলি কাগজ তখন ছিল—তার মধ্যে প্রধান একখানি মাসিক পত্রের পৃষ্ঠায় প্রথম প্রবন্ধ হিসেবে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল—যাঁর লেখক একজন ইংরেজি সাহিত্যের খ্যাতনামা অধ্যাপক। প্রবন্ধটিতে রামায়ণ কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রে মহাকবি বাল্মীকি এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের তুলনামূক সমালোচনা করেছিলেন। তাতে একস্থানে বলেছিলেন বাল্মীকি আশ্চর্যভাবে মধুসূদন অপেক্ষা অধিকতর মার্কসবাদী।
একটু বাহ্য। তিনি এতে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে অরণ্যকাণ্ডে রাবণ যখন সীতাকে হরণ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন লঙ্কার দিকে, তখন পথে বিহঙ্গরাজ জটায়ুর সঙ্গে যুদ্ধের পরই তিনি বনমধ্যে সীতাকে ধর্ষণ অর্থাৎ দেহগতভাবে তাকে ভোগ করেছিলেন।
মূল বাল্মীকি-রামায়ণের অরণ্যকাণ্ড ৫২ সর্গ থেকে কয়েকটি শ্লোকও তিনি উদ্ধৃত করে তাঁর এই চমকপ্রদ গবেষণাকে অকাট্য ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন।
              
     তারাশঙ্কর রামায়ণের এক একনিষ্ঠ নিবিড় পাঠক ছিলেন। বালক বয়সেই তিনি তাঁর পিতার পুস্তকভাণ্ডার থেকে কৃত্তিবাসী রামায়ণ প্রায় মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। সংস্কৃত রামায়ণ পাঠ করেছিলেন অনেক পরে। তারাশঙ্করের মতে ভারতীয় সাহিত্যের এক মহান সৃষ্টি মহামুনি বাল্মিকী বিরচিত রামায়ণ মহাকাব্য অখণ্ড ভারতের সমাজ-সংস্কৃতি থেকে ধর্ম-দর্শন-আধ্যাত্মিকতা সমস্ত কিছুরই এক অক্ষয় ভাণ্ডার—এবং সর্বকালের সর্বমানবের এক অবিস্মরণীয় গ্রন্থ। এই গ্রন্থের কোনোরূপ বিকৃত ব্যাখ্যা ভারতীয় ঐতিহ্যের অপমান বলেই মনে করতেন তিনি। এই মানসিকতা থেকেই ইংরেজি সাহিত্যের ওই অধ্যাপকের ওই প্রবন্ধ পাঠে শিউরে উঠেছিলেন এবং তাঁকে এই বিষয়ে এক দীর্ঘ চিঠিও লিখেছিলেন তারাশঙ্কর। অধ্যাপক প্রাবন্ধিক সহস্র বৎসর পরে অভিনব সত্যকে আবিষ্কার করার গৌরবে খুব সপ্রতিভ অহঙ্কারে উত্তর দিয়েছিলেন তারাশঙ্করকে। বিষয়টি নিয়ে তারাশঙ্কর বিধানসভাতেও আলোকপাত করেন। ফলে ওই অধ্যাপক তাঁর সেই প্রবন্ধটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। এই নিয়ে কমিউনিষ্ট পার্টির সঙ্গে তারাশঙ্করের মতবিরোধও হয়। বিধানসভা সংক্রান্ত ঘটনাটির কথা জানতে পারি তারাশঙ্কর পৌত্র অমলশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কাছে।
     ওই প্রাবন্ধিকের অভিনব আবিষ্কারের অভিমতগুলি বাল্মিকী রামায়ণ পাঠেই ভ্রান্ত প্রমাণ করেছিলেন তারাশঙ্কর। তিনি নিজেই জানিয়েছেন—
আমি মূল সংস্কৃত রামায়ণ দেখবার জন্য ব্যগ্র হয়ে ঠিক সেই রামায়ণখানিই সংগ্রহ করেছিলাম যেখানি এই অধ্যাপক মহাশয় পড়েছিলেন এবং যা থেকে তিনি এই সত্য আবিষ্কার করেছিলেন।
 
    এর আগে তারাশঙ্কর রামায়ণের কেবলমাত্র একজন তত্ত্বদর্শী পাঠক ছিলেন।  রামায়ণে দস্যু রত্নাকরের বাল্মীকি হয়ে ওঠার তত্ত্বটি তিনি তাঁর ‘কবি’ উপন্যাস ও ‘যুগবিপ্লব’ নাটকে—নায়ক-চরিত্রের উত্তরণে প্রয়োগ করেছেন। আর এই ঘটনার সময় থেকে তিনি হয়ে উঠলেন তথ্য-অনুসন্ধানী এক গবেষক। একেবারে তথ্যনিষ্ঠ দৃষ্টিতে বাল্মিকীর কবিত্ব এবং সীতা সম্পর্কে মহাকবির অভিমত উদ্ঘাটনই তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী পাওয়ার জন্য নয়, বিকৃত ব্যাখ্যার হাত থেকে ভারতীয় আদর্শের ঐতিহ্যকে অম্লান রাখতেই তারাশঙ্কর রামায়ণ গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। একজন গবেষকের ন্যায় অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে মহামুনি বাল্মীকি বিরচিত সুবিশাল সংস্কৃত রামায়ণের প্রতিটি পঙক্তি একেবারে শব্দ ধরে ধরে সমগ্র  রামায়ণটি একবার কি দু’বার নয় একেবারে তিন তিন বার পাঠ করেন তারাশঙ্কর। কেবলমাত্র ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই তারাশঙ্করের রামায়ণ পাঠের এই দৃষ্টান্ত আমাদের কাছে অবিস্মরণীয়।
     প্রথমবার রামায়ণ অনুসন্ধানে তারাশঙ্কর দেখেন অরণ্যকাণ্ডের ৫১ সর্গে জটায়ুর মৃত্যুর পর ৫২ সর্গের শুরুতেই বাল্মিকী বলেছেন—‘রাবণ সীতার দিকে তাকালেন এবার’। দেখলেন জটায়ুর মৃত্যুতে সীতা বিলাপ করছেন। রাবণ সীতাকে পুনরায় আয়ত্ত করার জন্য অগ্রসর হলেন। আর সীতা বনের মধ্যে গাছের আড়ালে আত্মরক্ষার জন্য চেষ্টা করছিলেন। তখন রাবণ তাঁকে জোর করে গাছের আড়াল থেকে টেনে আনেন। সেই সময় বাল্মিকী একটি শ্লোকে বলেছেন—‘প্রধর্ষিতায়াং বৈদেহ্যাং বভুব সচরাচরম্’। তারাশঙ্করের মন্তব্য—এই ‘প্রধর্ষিতা বৈদেহী’ শব্দ দুটিতেই ব্যাখ্যার যত জটিলতা। এই শব্দদুটির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেই ব্যাখ্যাকার এই ব্যাখ্যা করেন যে—সীতাকে রাবণ বনমধ্যে দেহগতভাবে ধর্ষণ করেছেন, এই কথাই বাল্মিকী লিখেছেন। তার সঙ্গে লিখেছেন—এখানেই মার্কসবাদীদের দৃষ্টিতে বাল্মিকী চরম প্রগতিশীল। মার্কসবাদীর তত্ত্ব এর মধ্যে পরিস্ফুট। প্রথমবার রামায়ণ পাঠে তারাশঙ্কর দেখেন অধ্যাপক মহাশয় উদ্ধৃতি উদ্ধারে কোনো ভুল করেন নি। তাই তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের কোনো সূত্র তিনি পান নি—অথচ মহামুনি বাল্মিকী সীতা সম্পর্কে এমন কথা লিখতে পারেন বলে বিশ্বাসও করতে পারলেন না। তাই, তিনি কেবলমাত্র অরণ্যকাণ্ডের উপর নির্ভর করে নিশ্চিত হতে পারলেন না; সমগ্র রামায়ণের নিরিখে ওই শ্লোক ও শ্লোকের শব্দগত তাৎপর্য অনুসন্ধানে সচেষ্ট হলেন।
     দ্বিতীয়বারে সত্যানুসন্ধিৎসু পাঠক তারাশঙ্কর গভীর নিষ্ঠা সহ সযত্মে সমগ্র রামায়ণখানির প্রতি-শ্লোকের প্রতি-ছত্রের পাঠ গ্রহণ করলেন। পড়তে পড়তে তিনি দেখেন—‘কর্মণা মনসা বাচা’ ইত্যাদি শ্লোকে সীতার অগ্নি-পরীক্ষার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। তারপর লঙ্কাকাণ্ডের ১১৮ সর্গের একটি শ্লোকে তিনি আরও পড়েন—‘পরাধীনেষু গাত্রেষু কিং করিষ্যাম্যনীশ্বরা’ ইত্যাদি। যেখানে সীতা বলেছেন পরাধীন দেহের উপর তাঁর কোনো হাত ছিল না। প্রথমবারের পাঠে তারাশঙ্কর বিস্মিত ও স্তম্ভিত হয়েছিলেন আর দ্বিতীয়বারের পাঠে পেলেন আঘাত। তথাপি তখনও পর্যন্ত তিনি অধ্যাপক মহাশয়কৃত রামায়ণের সহজ ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারলেন না। আরও অগ্রসর হলেন তিনি। লঙ্কাকাণ্ড বা যুদ্ধকাণ্ডের ১২শ ও ১৩শ সর্গে দেখলেন, রাবণ সভা ডেকে পারিষদবর্গকে সীতা হরণের বৃত্তান্ত প্রকাশ করছেন।
   বলেছেন, ‘দণ্ডকারণ্য থেকে আমি তাকে হরণ করে এনেছি কিন্তু সে আজও আমার শয্যাভাগিনী হয়নি’। বলেছেন, “এই নারীর জন্য আমি কামার্ততায় বহ্নিজ্বালার মতো দাহ অনুভব করছি সর্বদেহে সর্বক্ষণ। সে আমার কাছে এক বৎসর সময় প্রার্থনা করেছে। সে প্রতীক্ষা করছে রামের”। অন্য এক জায়গায় সীতাকে ভয় দেখিয়ে তিনি বলেছেন—“বৎসরান্তে আমার অনুগামিনী না হলে তোমাকে কেটে তোমার মাংস আমি প্রাতঃরাশের সঙ্গে গ্রহণ করব”। ১৩শ সর্গে মহাপার্শ্ব নামক পারিষদ রাবণকে অনুযোগ করে বলেছেন, “বলপূর্বক কুক্কুটেরা যেমন রমণ করে—সেই ভাবে ‘প্রবর্ত্তস্ব মহাবল’। সীতাকে বার বার আক্রমণ করে ‘ভুঙ্ক্ষ্ব চ রমস্ব চ’।” তাছাড়া, সীতাকে হরণ করে দেহগতভাবে বলপূর্বক ভোগ না করা—নিজের মূর্খতা বলেই জানিয়েছেন রাবণ।
   কৌতূহল জাগে তাহলে কি ধীশক্তি তথা চারিত্রিক স্থিতিশীলতার গুনেই রাবণের পক্ষে এমন ধৈর্যধারণ সম্ভব হয়েছিল! একেবারে উদাহরণ উদ্ধার করে তারাশঙ্কর জানিয়েছেন, সীতার সামনে রাবণের এই স্থিতিশীলতা রাবণ চরিত্রের কোনো মহত্ব নয়, এ এক চরম অভিশাপের ভয়। পূর্বে একদিন রাবণ পুঞ্জিকস্থলী নামে এক অপসরাকে আকাশলোকে জোরপূর্বক ভোগ করেন। এই ঘটনার জন্য ব্রহ্মা তাঁকে অভিশাপ দেন যে—রাবণ বলপূর্বক কোনো নারীকে ভোগ করলে তাঁর দশমুণ্ড একশত ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। সেই শাপের ভয়ে রাবণ সীতার উপর বলপ্রয়োগ করেন নি। আর সীতার যে কথা, ‘দেহ আমার পরাধীন ছিল’—তার অর্থ এই যে,  বলপূর্বক অপহরণকালে রাবণ তাঁর হাত ধরেছিল, জটায়ুর সঙ্গে যুদ্ধকালে রথ চূর্ণ হলে রাবণ সীতাকে বাঁ কাঁধের উপর ফেলে ডান হাতে যুদ্ধ করেছিল।–এখানে এই অঙ্গস্পর্শের কথাই বলা হয়েছে।
     এখানেও ক্ষান্ত হননি তিনি, এরপর আরও কী আছে এবং ‘প্রধর্ষিতায়াং’ ও ‘বৈদেহী’ শব্দদুটিকে মহাকবি কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা জানার জন্য তারাশঙ্কর আবার নব-উদ্যমে নব-নিরিখে রামায়ণ পাঠে মনোনিবেশ করেন। তৃতীয়বার রামায়ণ পাঠ প্রসঙ্গে তারাশঙ্কর জানিয়েছেন—
গোটা রামায়ণখানির প্রতি পঙক্তি খুঁজে দেখছিলাম কোথায় ধর্ষিত, ধর্ষণ শব্দ আছে।  এবং কী অর্থে ব্যবহার করেছেন মহাকবি।–বলপূর্বক নারীদেহ ভোগের কথা কয়েকবারই আছে, সেখানে একস্থানেও বাল্মিকী ‘ধর্ষণ’ শব্দ ব্যবহার করেননি সেটি আমার চোখে পড়েছিল। রম্ ধাতু এবং ভুঙ ধাতুর ব্যবহার দেখেছি। কুক্কুটবৃত্তেন ভুঙ্ক্ষচ রমশ্চ’। রাবণ পুঞ্জিকস্থলী প্রসঙ্গে বলেছেন—‘ময়াভুক্তা’। রাবণকে অভিশাপ প্রসঙ্গে ব্রহ্মা একবার বলেন, ‘বলান্নারী গমিষ্যসি’। ধর্ষণ শব্দই নেই। আমার সন্দেহ হয়েছিল বাল্মিকী ধর্ষণ শব্দ এই অর্থে ব্যবহারই করেন নি। তাই কোথায় কোন পঙক্তিতে ধর্ষণ শব্দ আছে খুঁজে বের করে একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিলাম। দেখেছিলাম, আমার এ অনুমানই সত্য। শতাধিকবার (বোধ হয় ১২৭ বার) ধর্ষণ শব্দের ব্যবহার আছে রামায়ণে। সর্বত্রই এক অর্থ—সে অর্থ জোরপূর্ব্বক বিপর্যস্ত বা লাঞ্ছিত করা। রাবণ স্বর্গজয় করেছে, হনুমান লঙ্কা দগ্ধ করেছে, বানরকটক সুগ্রীবের মধুবন লণ্ডভণ্ড করেছে—সবই ‘ধর্ষিত’ হয়েছে; এবং এই অর্থেই ধর্ষণ শব্দ ব্যবহার হয়েছে রামায়ণে। দেহভোগ অর্থে রম্ এবং ভুঙ ধাতু ব্যবহার করা হয়েছে।                  

   আমরা জানি সীতার অগ্নি পরীক্ষা এর আর এক অকাট্য যুক্তি। বর্তমান কালের মতো সেযুগে চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নত হলে প্রজানুরঞ্জনের জন্য স্বয়ং রামচন্দ্রও হয়তো বা সীতার সতীত্ব পরীক্ষায় সে পথও অবলম্বন করতেন। কিন্তু স্মরণীয় যে ডাক্তারি পরীক্ষা অপেক্ষাও অগ্নি পরীক্ষার ন্যায় এক ভয়ঙ্করতম পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল সীতাকে। সীতার অগ্নিপরীক্ষা রামচন্দ্রের চরিত্রকে কিছুটা কলুষিত করলেও—সীতা যে রাবণ কর্তৃক ধর্ষিত হন নি সে কথা মহাকবি বাল্মিকী কেবলমাত্র রাবণের কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখেন নি। লঙ্কার অরণ্যের অন্ধকারে লোক চক্ষুর অগোচরে রাবণের মতো ভয়ঙ্কর মানুষের কবলেও যে সীতা চরিত্র নিষ্কলুষতায় অম্লান আলোকে উজ্জ্বল ছিল—সে কথা অযোধ্যায় সর্বজন সমক্ষে প্রমাণ করতেই সীতার অগ্নি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। মহাকবির বর্ণনা থেকেই আমরা জানি—
   সীতা অগ্নিতে প্রবেশ করলেন। সীতার নিষ্পাপ দেহের বিন্দুমাত্রও দগ্ধ করতে পারলেন না; বরং অগ্নিদেব তাঁকে কোলে করে নিয়ে উঠে আসেন এবং সেই জনসমক্ষেই চিরায়ত নারী আদর্শ সীতাকে রামের হাতে তুলে দেন। অগ্নিদেব রামচন্দ্রকে বলেন—
রাম তোমার সীতাকে তুমি গ্রহণ কর। সীতা মনে-প্রাণে পাপহীনা বিশুদ্ধচিত্তের নারী। তাঁর অন্তরে ক্ষণিকের জন্যও রাম ভিন্ন রাবণের কথা অঙ্কুরিত হয়নি। সীতাকে বিন্দুমাত্র পাপস্পর্শ সম্ভব হয়নি। সীতা অনলেও নির্মল।

   এ সম্পর্কে তারাশঙ্করের অভিমত—সীতা ভারত সংস্কৃতির যজ্ঞকুণ্ডু থেকে যজ্ঞফলের মতো উত্থিতা এক নারী আদর্শ—নারী মহিমা। তিনি অম্লান দীপ্তিময়ী, যার মহিমার কাছে দেবীমহিমাও ম্লান হয়। সেই সীতার দেহ রাবণের দ্বারা কলুষিত হলে তিনি তৎক্ষণাৎ বিগতজীবন হয়ে লুটিয়ে পড়তেন এবং রামের সম্মুখীন হয়ে কলুষিত দেহ ভস্মীভূত হওয়ার আবেদন জানাতেন। ওই অধ্যাপক সমালোচক বা প্রাবন্ধিকের গবেষণালব্ধ তথ্যকে প্রামাণিক তথ্য দ্বারা ভ্রান্ত প্রমাণ করে তারাশঙ্কর জানিয়েছেন, যে সীতা সহস্র সহস্র বৎসর ধরে দু-দু’বার মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অনুপম স্ফটিক প্রতিমার মতো কোটি কোটি মানুষের অন্তর্লোকে মণিবেদীর উপর অধিষ্ঠিতা রয়েছেন, মহাকবি বাল্মিকী যাঁকে কলুষহীন প্রদীপ্ত বহ্নির মতো নির্মাণ করেছেন তাঁকে অপব্যাখ্যায় কলুষিত করা সঙ্গত নয়। 
-------------------
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
হাটজনবাজার, সিউড়ি, বীরভূম-৭৩১১০২।
মোবাইল-৯২৩৩১২৪৭১৮।


বিদ্রোহী কবির জাতীয়তাবাদী কুঠার




বিদ্রোহী কবির জাতীয়তাবাদী কুঠার
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

“তুই নাগ, জন্ম তোর বেদনার দহে
কাঁটাকুঞ্জে বসে তুই গাঁথিবী মালিকা
দিয়া গেনু ভালে তোর বেদনার টিকা”
—নজরুল ইসলাম

কবি জীবনের বেদনা কখনও সুরের ধ্বনিতে আমাদের প্রাণ ও মনকে মাতিয়ে তুলেছে, কখনও ভক্তিরসের সাগরসিক্ত হৃদয় অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে আবার কখনও বা শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঝলসিত হয়ে উঠেছে জেহাদী তরবারির শাণিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। বেদনাসিদ্ধ শতদলে বসেই তিনি হয়ে উঠেছেন কবি; সাম্যবাদী, জাতীয়তাবাদী, মানবতাবাদী—এমন অনেক অভিধায় অভিহিত হয়েছেন তিনি। বেদনাদৃপ্ত পৌরুষের লৌহকঠিন কুঠার হাতেই সমাজের দেশের সঙ্কীর্ণতা এবং শোষণ ও শাসনকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে চেয়েছিলেন। বেদনাময় কাঁটার মুকুটই তাঁর কবি-জীবনের অলঙ্কার এবং শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার। যেন এক নিষ্ঠুর বেদনা-লগ্নেই জন্ম হয়েছিল নজরুল ইসলামের। পিতামাতার চার সন্তানের মৃত্যুর পর জন্ম বলে নামও রাখা হয় দুখু মিঞা। এই নামের ব্যঞ্জনাটুকুতেই যেন তাঁর আমৃত্যু বেদনাবাহী জীবন ইতিহাসের আসল অস্তিত্বকে উদ্ভাসিত করে তোলে। মাত্র আট বছর বয়সে পিতার মৃত্যু এবং তার পরেই পরিবারে দারিদ্রতার নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে দুখু মিঞার জীবনে নেমে আসে নিবিড় বেদনালিপ্ত দুঃখের কালোছায়া। এই কবিই এক সময় লেখেন—“যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটির মুখের গ্রাস / যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।
   পারিবারিক দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনিতে যোগ দেন এবং কবিতা লেখাও শুরু করেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে এসে সাহিত্যজগতে পরিচিত করে তোলেন নিজেকে। সাহিত্য হয়ে ওঠে তাঁর আন্দোলনের হাতিয়ার। বাংলা সাহিত্যেসমাজে তখন রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র থেকে মোহিতলাল, সত্যেন্দ্রনাথ—প্রমুখ উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজি বিরাজিত। সেই সময়ের সারস্বত সমাজে নজরুল কঠিন কুঠারের শাণিত বাণীতে স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। বলে নেওয়া দরকার নজরুল নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিলেন জাতীয় আন্দোলনের শরিক হতে। সাহিত্য ছিল তাঁর আন্দোলনের হাতিয়ার। নজরুলের নিজের কথা—“আমি রাজনীতিকে সাহিত্যায়িত করবো, কবিতা লিখবো, প্রবন্ধ লিখবো যেমনভাবে দরকার। আমি গান লিখবো, গান গাইব, মানুষকে গাইয়ে নিয়ে বেড়াব। চারণ হব আমি। ঘুমন্ত মানুষগুলোকে জাগাতে হলে যত রকমের পথ আছে সব দিক দিয়ে প্রাণপনে চেষ্টা চালিয়ে যাব”। এই মানসিকতা নিয়েই—মুজফফর আহমদ সহ কয়েকজন মিলে প্রকাশ করলেন ‘নবযুগ’ পত্রিকা। নবযুগে প্রকাশিত রচনাগুলিতে কৃষক ও শ্রমিকের প্রতি সহানুভূতির চরম প্রকাশ ঘটে। বিশেষ করে ‘ধর্মঘট’ প্রবন্ধ প্রকাশের পর তা রাজরোষে বাজেয়াপ্ত হয়। নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের ‘মুহাজিরিন হত্যার জন্য দায়ি কে’ নামক প্রবন্ধটির জন্য সরকার কবির প্রতি সবচেয়ে বেশি রুষ্ট হয়েছিলেন বলেই জানা যায়।
   ১৯২১ সালে ‘বিজলি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা-যে কবিতা বাংলার সারস্বত সমাজে নজরুল ইসলামকে স্বতন্ত্র আসনে চিহ্নিত করেছিল। স্মরণ করতে হয়, গান্ধজীর স্বদেশী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ক্ষণকালের জন্য হলেও জাতীয় জীবনে নেমে আসে হতাশার অন্ধকারএই সময় নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা—বিপ্লবীদের হতাশাপূর্ণ প্রাণে প্রাণশক্তি যুগিয়ে জীবনের ডাক দিয়েছিল। এক নব চেতনায় আলোড়িত হয়ে উঠেছিল বাংলা। এক সপ্তাহে প্রায় ঊনত্রিশ হাজার কপি কবিতা বিক্রি হয়েছিল। ১৯২১ সালেই ‘ধুমকেতু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতে্ কবি লিখলেন—“যুগে যুগে আমি আসয়াছি, পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু/ এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধুমকেতু”। প্রথম সংখ্যাতেই নজরুল লিখলেন, “সর্বপ্রথম ধুমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়”। ইংরেজ শাসনের যে সময় ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার কল্পনাও ছিল স্বপ্নাতীত, মহাত্মার মতো নেতাও ‘ডোমিনিয়ন স্টাটাসের’ কথা ভেবেছিলেন, এমনকি জাতীয় কংগ্রেসেরও পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী ছিল আনেক পরে, যে সময় পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলে বিখ্যাত উর্দু কবি ফজলুল হাসান হসরত মোহানী কারাদণ্ড ভোগ করেন—সেই চরনতম ভয়ঙ্কর সময়েও সমস্ত ভয়কে তুচ্ছ করে নজরুল ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী করেন।   
   সাহিত্যকে হাতিয়ার করে জাতীয় আন্দোলনে সামিল হলেন নজরুল। তাঁর কঠিন কুঠারাঘাতে মানবতার রুদ্ধ কপাট ভেঙে যেমন জাতীয় প্রাণের জাগরণ ঘটে তেমনি রাস্ট্রীয় রোষানলে পড়তে হয় কবিকে। কবির এক একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় আর ইংরেজ সরকার তা বাজেয়াপ্ত করেন। কারাবাসও করতে হয় কবিকে। এমন ঘটনার কিছু নমুনা এখানে তুলে ধরা গেল শিশির কর রচিত ‘নিষিদ্ধ নজরুল’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়—কবি নজরুল ইসলামের—(‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘শিকল ভাঙ্গার গান’, ‘প্রলয়শিখা’ এবং ‘চন্দ্রবিন্দু’) পাঁচখানি কাব্য বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। এছাড়াও ‘অগ্নিবীণা’, ‘সঞ্চিতা’, ‘ফণিমনসা’, ‘সর্বহারা’, এবং ‘রুদ্রমঙ্গল’ কাব্যগুলিও নিষিদ্ধ তালিকায় ছিল কিন্তু নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয় নাই।
১৯২২ সালে যুগবাণী নিষিদ্ধ, ১৯২৪ সালে বিষের বাঁশী নিষিদ্ধ /১৯৩০ সালে প্রলয়শিখা নিষিদ্ধ হয় এবং কবিকে ছয় মাসের জন্য সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। হাইকোর্টে আপীল করে মুক্তি পান। ১৯৩১ সালে চন্দ্রবিন্দু নিষিদ্ধ হয় কিন্তু ইংরেজ শাসনামলেই নষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ধুমকেতুতে প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতাটির জন্য কবিকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ এ ধারা অনুসারে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে বিচারককে কবি বলেছিলেন, “একধারে রাজার মুকুট; আর ধারে ধুমকেতুর শিখা। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আর জন সত্য হাতে ন্যায় দণ্ড। রাজার পক্ষে নিযুক্ত রাজবেতনভোগী রাজ-কর্মচারী। আমার পক্ষে সকল রাজার রাজা, সকল বিচারকের বিচারক, আদি অনন্তকাল ধরে সত্য—জাগ্রত ভগবান। ... রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে রুদ্র। রাজার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য স্বার্থ, লাভ, অর্থ; আমার পক্ষে যিনি, তাঁর লক্ষ্য সত্য, লাভ পরমানন্দ। ... যা অন্যায় বলে বুঝেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি...”।
   কবিকে প্রথমে প্রেসিডেন্সি জেলে এবং পরে আলিপুর সেণ্ট্রাল জেলে বন্দ করে রাখা হয়। এই জেলে থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত নাটকটি কবি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। আলিপুর জেল থেকে কবিকে হুগলীর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। জেলের অবিচার এবং উৎপীড়নের কারণে কবি অনশন শুরু করেন। কবিকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সমগ্র বাংলা জুড়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ। রবীন্দ্রনাথ কবিকে চিঠি লেখেন ‘আওয়ার লিটারেচার ক্লেমস ইউ’। শেষ পর্যন্ত কবির মাতৃস্থানীয়া বিরজাসুন্দরীর অনুরোধে ২৯ দিন পর কবির অনশন ভাঙে। নজরুলকে শিকল পরিয়ে বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। কবি লেখেন ‘শিকল ভাঙ্গার গান’ –‘কারার ঐ লৌহকপাট/ ভেঙে ফেল, কররে লোপাট /--কবির এই রচনা বাংলার বিপ্লবীদের উন্মত্ত করে তুলেছিল। বিপ্লবীদের মুখে মুখে, সভা সমিতিতে এই গান গাওয়া হত।
আনন্দময়ী কবিতা—“আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?/স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল/ দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি/ ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?”
   মনে রাখতে হবে ফেসবুকের এমন এক পরিসরে কবি নজরুলের জাতীয়তাবাদ নিয়ে অধিক আলোচনার অবকাশ নেই। তবে এইটুকু বলতে হয় যে কবি নজরুল—সত্যবাদী, সাম্যবাদী, জাতীয়তাবাদী এবং সর্বোপরি মানবতাবাদী। তিনি তাঁর কলমের কঠোর কুঠারাঘাতে মানবতা বিরোধী কঠিন কপাটকে যেমন ভেঙে চূড়মার করতে চেয়েছিলেন তেমনি ইংরেজ শাসনের লৌহদণ্ড এবং লৌহশৃঙ্খলকেও ভাঙতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাব্যকুঠার কতটা কি ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল তার হিসাবের থেকেও বড় কথা সমকালের বিপ্লবী বুকে বিপ্লবের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিতে পেরেছিলেন। একদিকে যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ আর দিকে তেমনি নজরুলের কাব্যমালা সমকালীন জাতীয় আন্দোলনের উজ্জ্বল অগ্নিশিখা সম প্রজ্জ্বলিত ছিল। ...।


Sunday, 8 December 2019

বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাহ্মণের মূলস্থান বন্দ্যঘটী গ্রাম

বন্দ্যোপাধ্যায় ব্রাহ্মণের মূলস্থান বন্দ্যঘটী গ্রাম
দেবাশিস মুখোপাধ্যায় C@DM
রাজা আদিশূরের সময়ে কনৌজ বা কান্যকুব্জ থেকে পাঁচজন ব্রাহ্মণের বঙ্গে আগমন ও বসবাসের কথা ইতিহাস হয়ে আছে। ওই পঞ্চ-ব্রাহ্মণের প্রত্যেক সন্তানকে বসবাসের জন্য রাজা ক্ষিতিশূর এক এক গ্রাম প্রদান করেন। ২ সেই সেই গ্রামের নাম অনুসারে, তাঁদের সন্তানপরম্পরা অমুকগ্রামীন বা অমুকগাঞি বা গাঁই বলে প্রসিদ্ধ হন। সেই সূত্রে শাণ্ডিল্যগোত্রে ভট্টনারায়ণবংশে ‘বন্দ্য’ আদি ষোলোটি গ্রামের কথা জানা যায়। ৩ ভট্টনারায়ণপুত্র বরাহকে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম দেওয়া হয়েছিল।
বলে নেওয়া দরকার, ‘বন্দ্য’ গ্রামকে বন্দ্যঘটী বা বন্দ্যঘাটি নামেও কোথাও কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গ্রামকে বলা হত গাঞি বা গাঁই। সেই সূত্রে বন্দ্যগাঞি বা বন্দ্যঘটী গ্রামের ব্রাহ্মণ—বন্দ্যঘটী বা বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ। বিখ্যাত ভবদেব ভট্টের মাতা সাঙ্গোকা ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ কন্যা। ‘টীকাসর্বস্ব’ গ্রন্থের রচয়িতা আর্তিহরণপুত্র সর্বানন্দ (১১৫৯-১১৬০) ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ, প্রসিদ্ধ কুলাচার্য দেবীবর মিশ্রও বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। বন্দ্যোপাধ্যায় পদবী-র উৎসও এই বন্দ্যঘটি গ্রাম থেকেই।
বন্দ্যঘটী গ্রাম ছিল বীরভূম জেলায়
বর্তমান ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটি’ নামে কোন গ্রামের সচল-অস্তিত্বের কথা জানা যায় না। কিন্তু ইতিহাস অনুসন্ধানে এবং ক্ষেত্রসমীক্ষায় জানা যায় একসময় বীরভূমে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ নামে একটি গ্রাম ছিল।
১. এ বিষয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেন বলেছেন—
রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের অধিকাংশ মূলস্থান(গাঁঞি) এই ভূভাগে—দক্ষিণপূর্ব বীরভূমে এবং উত্তর ও উত্তরপূর্ব বর্ধমানে অবস্থিত। ৪
রাজা ক্ষিতিশূর কনৌজ থেকে আগত পঞ্চব্রাহ্মণের সন্তানদের ছাপান্নটি গ্রাম দিয়েছিলেন। ভট্টনারায়ণের সন্তানদের যে ষোলোটি গ্রাম দেওয়া হয় তারমধ্যে বন্দ্য, গড়গড়, কড়ি, পারিহা, দুগ্ধবাটি, পিপলাই, ঘোষগ্রাম, দায়া—গ্রামগুলি বীরভূম ভূখণ্ডেই অবস্থিত। ‘গড়গড়’ গ্রামটি বর্তমানে সিউড়ি বোলপুর সড়ক পথের পাশে ‘গড়গড়ে’ নামে পরিচিত রয়েছে। ‘পারিহা’ সাঁইথিয়ার কাছে বর্তমানে ‘পরিহারপুর’, ‘ঘোষলী’ রামপুরহাটের কাছে ‘ঘোষগ্রাম’ নামে পরিচিত। সেই সূত্রেই আমাদের বক্তব্য বন্দ্য বা বন্দ্যঘটী গ্রাম বীরভূমে থাকাটা খুব স্বাভাবিক। রাঢ় গবেষক প্রভাতরঞ্জন সরকারের মতে বন্দ্যোপাধ্যায় পদবীধারী ব্রাহ্মণদের মূলস্থান বা গাঁঞি বীরভূমের বন্দ্যঘটী গ্রাম। ৫
২. বিখ্যাত ভবদেব ভট্টের ‘কুলপ্রশস্তি’তে ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রামের উল্লেখ করে বলা হয়েছে—
বন্দ্যাং বন্দ্যঘটীয়স্য ব্রহ্মণঃ প্রযতাং সুতাং
সাঙ্গোকামঙ্গদ রত্নং পত্নীং স পরিণী ভবান। ৬
আমরা জানি ভবদেব ভট্ট লাভপুরের সন্নিকট সিদ্ধল গ্রামের মানুষ ছিলেন। সেই গ্রামে তাঁদের সাতপুরুষের বাস ছিল। ভবদেবের মা ছিলেন বন্দ্যঘটীয় ব্রাহ্মণ কন্যা সাঙ্গোকা।
৩. আজ থেকে শত বৎসরের অধিক কাল পূর্বে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় শ্রীনগেন্দ্রনাথ বসু বিরচিত ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস—ব্রাহ্মণ খণ্ড, প্রথমাংশ’ নামে একটি গ্রন্থ। অনেক অনুসন্ধান করে ‘গাঞিমালার’ অধিকাংশ গ্রামের বাস্তব অস্তিত্বের কথা ওই গ্রন্থে তিনি জানিয়েছেন। ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম সম্পর্কে তিনি বলেছেন—
সুপ্রাচীন ভবদেবভট্টের কুলপ্রশস্তিতে ‘বন্দ্যঘটীয়’ নাম থাকায় যেন সেই গ্রামের বন্দ্যঘট নামই ছিল বলিয়া বোধ হইতেছে। ... বন্দ্য বা বন্দিঘাট—বীরভূমের অন্তর্গত কাণানদীর নিকট। (অক্ষা ২৪০ ৫৫/ ৫১ // উঃ ও দ্রাঘি ৮৭০ ৫২/ ২৫ // পূঃ) ইহার নামানুসারে বন্দ্যগ্রামিগণ ‘বন্দিঘাটি’ নামেও পরিচিত।৭
উপর্যুক্ত তথ্যগত যুক্তির বিচারে—রাঢ়ের বীরভূম জেলায় বন্দ্যঘটী গ্রামের অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়ার অবকাশ থাকে।
বীরভূম জেলার লাভপুর-অট্টহাস অঞ্চলে বন্দ্যঘটী গ্রাম
বীরভূমের কোনস্থানে সেই ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম?
ভবদেব ভট্ট’র কুলপ্রশস্তিকা অনুসারে বলতে হয়—তাঁর নিবাস সিদ্ধলগ্রামের কাছাকাছি কোথাও। বীরভূমের সিদ্ধল গ্রাম লাভপুরের পূর্বদিকে। নগেন্দ্রনাথ বসুর নির্দেশ বীরভূমে ‘কাণানদীর নিকট’ বন্দ্যঘটী গ্রাম। ইতিপূর্বে সুকুমার সেনের বক্তব্য থেকে জানা গেছে রাঢ়ী ব্রাহ্মণদের মূল গাঞিস্থান বীরভূমের দক্ষিণপূর্ব অংশও রয়েছে। বীরভূমের দক্ষিণপূর্ব অংশে অট্টহাস বা লাভপুর নামে গ্রামটির কথা সহজেই ভাবা যায়। লাভপুরের পূর্বে নৌ-পথের নৌ-চলাচল এখন বন্ধ। শত বৎসরের অধিককাল পূর্বে নগেন্দ্রনাথ বসুর অনুসন্ধানের সময় তা ‘কাণানদী’ হওয়ারই কথা। তাছাড়া, বীরভূমে ময়ূরাক্ষী নদী-সংলগ্ন ‘ওলকুণ্ডার ঘাট’ নামে একটি নদীঘাট রয়েছে। এই ওলকুণ্ডা ঘাটের উত্তরে গঙ্গাগামী ময়ূরাক্ষীর শাখাকে কাণানদী বলা হয়। ময়ূরাক্ষীর উত্তরে কাণানদী আর দক্ষিণে অনতিদূরে ‘লাঘাট’ নামে নদীবন্দর অধ্যুষিত অট্টহাস অঞ্চল। আমাদের বিশ্বাস লাভপুরের এই এলাকার কোন এক স্থানে ‘বন্দ্য’ বা ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম এক সময় ছিল।
১. ‘পশ্চিমবঙ্গের ভূগোল ও সংস্কৃতি’ নামক রচনায় বিনয় ঘোষ বলেছেন, ‘লোকচলাচলের পথ ধরে গ্রামনির্ণয়ের রীতি আজও প্রচলিত’।৮ বন্দ্যনীয় গ্রাম বন্দ্যগ্রাম এমন কথাও বলার অবকাশ রয়েছে। আমরা জানি লাভপুর একটি প্রাচীন ভূখণ্ড। একান্নপীঠের এক পীঠ অট্টহাস মহাপীঠ সেই প্রাচীনতার পরিচয় বহন করছে। ৯ পাল রাজাদের সময়ে লাভপুর অঞ্চল অট্টহাস নামেই পরিচিত ছিল। অট্টহাসকে কেন্দ্র করে জনবসতির কথাও আমরা সহজেই বলতে পারি। অট্টহাস রাজাদেরও বন্দ্যনীয় ছিল। পাল রাজত্বে মহারাজ ধর্মপাল যে পঞ্চাশটি বিহার নির্মাণ করেন তার মধ্যে ‘ফুল্লহরি বিহার’ অট্টহাসে নির্মিত হয়েছিল বলেই মনে করতে হয়। ১০ পাল রাজত্বেই রাজা নয়পালদেব অট্টহাস মন্দির সংস্কার করে মন্দিরশীর্ষে স্বর্ণকলস স্থাপন করেন। ১১ পাল রাজত্বের সময় হয়তো বা আরও পূর্ব থেকেই অট্টহাস বন্দ্যনীয় ছিল। ১২ বন্দ্যনীয় বলেই বোধ হয় অট্টহাস অঞ্চল বন্দ্যগ্রাম নামে পরিচিত হয়।
২. আমাদের ধারণা কালান্তরে একসময় ‘বন্দ্যগ্রাম’ ‘বন্দ্যঘটী’ গ্রাম’ নামে পরিচিত হয়। ‘বন্দ্যগ্রামটি’ কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে যদি বলা হয়ে থাকে বন্দ্যগ্রাম বন্দরঘাটের গায়ে; আবার বন্দরঘাট যদি বন্দ্যগ্রামের মধ্যেই অবস্থিত হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয়—বন্দরঘাটই তো বন্দ্যগ্রাম। এমন প্রসঙ্গ উত্থাপনের মতো সঙ্গত যুক্তি রয়েছে।
জরিপ মানচিত্র অঙ্কিত হওয়ার পূর্ববর্তীকালে লাভপুরের অনুমান নির্ভর একটি ভৌগোলিক রেখাচিত্রের কথা আমরা ভাবতে পারি। আমরা জানি, প্রাচীনকালে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল জলপথ। নদীবিধৌত সমভূমি জুড়ে গড়ে উঠত মানবসভ্যতা। লাভপুর ভূখণ্ড তেমনই এক সমভূমি। এই ভূখণ্ডের দুপাশে দুই নদী—কোপাই ও ময়ূরাক্ষী সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। কালাতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিক্ষয়ের কারণে নদীর নাব্যতাশক্তি এখন হ্রাস পেয়েছে সত্য কিন্তু এক-কালে এই দুই নদীই ছিল মানব-সভ্যতার সঙ্গে এই এলাকার মানুষের যোগসূত্রের প্রবেশ-দ্বার। সেন রাজাদের সময়ে শাসনকার্যের ও রাজস্ব-আদায়ের জন্য দেশ-বিভাগ পর পর এই রকম ছিল—ভুক্তি, বিষয়, মণ্ডল, বীথী, চতুরক, গ্রাম। ময়ূরাক্ষী ও কোপাই—এই দুই নদীর মধ্যবর্তী এক ভৌগোলিক চিত্র; যা এক সময় ‘মণ্ডল ভুক্তি’র অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বর্তমান লাভপুর ছিল সেই মণ্ডলের প্রবেশ দ্বার বা ‘দ্বারমণ্ডল’। লাভপুরের প্রাচীন ইতিহাসের বিষয় নিয়ে তারাশঙ্করের ‘দ্বারমণ্ডল’ নামে একটি উপন্যাস রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,‘দ্বারমণ্ডল এই ভূখণ্ডের প্রবেশদ্বার’। এমন বিশেষ পথকে সংস্কৃতে বলা হয় ‘লাব’। ‘লাবপুরম’ এর বাংলা অর্থ হয় দ্বারমণ্ডল। কালান্তরে ‘লাবপুরম’ থেকে লাভপুর কথাটি এসেছে বলেও অনুমান করা যেতে পারে। এই ভূখণ্ডে তখন নদী তথা বন্দরঘাটের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বন্দরঘাটই ছিল এই ভূখণ্ডের প্রবেশদ্বার। সেই বন্দরঘাটের অবস্থান কোথায় ছিল? যদি এর অবস্থান হয়ে থাকে বন্দ্যগাঁয়ে তাহলে কোনো নৌযাত্রী বা অন্যপথিকের—বন্দ্যগাঁ কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় বন্দরঘাটই বন্দ্যগাঁ। এমন অর্থে বন্দ্যগাঁ একসময় বন্দ্যঘটি নামে পরিচিত হয়। বন্দরঘাট ও বন্দ্যঘটি শব্দ দুটির সহাবস্থানের কথা মনে করার অবকাশ থাকে (বন্দরঘাটই > বন্দরঘটি > বন্দ্যঘটী)।
৩. বন্দরঘাট-টি যে বন্দ্যগাঁয়েই ছিল এমন কথা বলার সপক্ষে আরও যুক্তি রয়েছে। লাভপুর অট্টহাস সংলগ্ন এলাকায় যেখানে একসময় বন্দরঘাট ছিল বর্তমানে সেই জায়গাটি একটা উচ্চ স্তূপ বা ভগ্নস্তূপ আকারে দেখা যায়। বর্তমান জায়গাটি ‘বন্দরঢিবি’ ১৩ নামে পরিচিত। স্থানটি দেখে মনে হয়, এইটি কোন গ্রামের ভগ্নস্তূপ। গ্রাম্য-ভাষায় ভিটি’কে ঢিবি বলা হয়ে থাকে। আমাদের মনে হয় ‘বন্দরঢিবি’ কথাটির মূলে ‘বন্দ্যঘটী’ কথার অস্তিত্ব রয়েছে; ‘ভিটি’ কালক্রমে ‘ঢিবি’তে পরিণত হয়েছে। যেমন: বন্দ্যগাঁয়ের-ভিটি বা বন্দ্যদেরভিটি > বন্দ্যরভিটি > বন্দরঢিবি—এইভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। হয়তো বা এক সময় এখানেই বন্দ্য বা বন্দ্যোপাধ্যায়দের বসতি বা বন্দ্যঘটী গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। কালান্তরে বন্দ্যঘটী গ্রাম ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়; যা আজ ‘বন্দরঢিবি’ নামে পরিচিত। আমাদের এমন অনুমান সত্য হলে বলতে পারি যে, বীরভূম জেলার লাভপুর অট্টহাস সংলগ্ন স্থানে একসময় বন্দ্য বা বন্দ্যঘটী গ্রামের অস্তিত্ব ছিল। ভট্টনারায়ণ পুত্র বরাহ থেকে তাঁর বংশজদের কয়েকপুরুষ বন্দ্যগ্রামেই থাকতেন।