Tuesday, 2 July 2024

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের নিবন্ধ --"তাঁর জননী তাঁর দীক্ষাগুরু"

 

 

তাঁর জননী তাঁর দীক্ষাগুরু

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

দীক্ষা মানে মন্ত্রগ্রহণে দেহের সূচিতা নয়; তাঁর মতে—“জীবনে বিশেষ একটি মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন করাটাই দীক্ষাগ্রহণ এবং সেই মতবাদসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবন ও জগৎকে দেখা, বুঝতে পারা এবং সেই মতবাদ অনুমোদিত পন্থায় নিজের জীবনযাত্রা নির্বাহ করাই হল জীবন সাধনা”

     নিজের দীক্ষা সম্পর্কে এমন অভিমত দিয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়অনেক ব্যাকুলতা নিয়ে অনেক মন্ত্রগুরুর কাছে আবেদনের পর ১৮৫৪ সালে ছাপান্ন বছর বয়সে তারাশঙ্কর তাঁর জননী প্রভাবতীদেবীকে গুরুর আসনে বসিয়ে প্রচলিত প্রথায় দীক্ষামন্ত্র গ্রহণ করেন। তাঁর জননী তাঁর দীক্ষাগুরু পিতা ও মাতা শ্রেষ্ঠ গুরু এমন কথা আমরা মুখে বলি কিন্তু তারাশঙ্কর বাস্তবিক নিজের জীবনে তা প্রমাণ করে দেখিয়ে গেছেন। প্রায় বৃদ্ধ বয়সে সারস্বত সাধনার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত তারাশঙ্করের দীক্ষা গ্রহণের এই দৃষ্টান্ত—দীক্ষা পথে বিশ্বাসী বঙ্গের তথা ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের কাছে তুলে ধরার মতো এক উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা বলেই মনে করতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, সরাসরি কোনো আকস্মিক আবেগে তারাশঙ্কর তাঁর অন্তর্জীবন গঠনের এমন গুরুত্বপূর্ণ মৌল সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেননি। জননীর কাছে দীক্ষা গ্রহণের সময় পর্যন্ত তারাশঙ্করের গুরু অনুসন্ধানের ধারাবাহিক একটা চিত্র রয়েছে। সেই চিত্র দর্শনে জানা যায়, বাস্তবিক অনুসন্ধানের একাধিক পারাবার পার হয়ে এমন শুচিসিদ্ধ মানস সরোবরে স্নাত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর।

 

১৯২৯ সালের আষাঢ় মাস, তারাশঙ্করের বয়স একত্রিশ বছর; জাতীয় আন্দোলনে তখন তিনি তাঁর অঞ্চলের এক অন্যতম নেতা। সেই সময়কালে সংঘটিত আকস্মিক এক তন্ময়তার সূত্র ধরে তারাশঙ্কর তাঁর জীবনে প্রথম গুরুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন একদিন একজন আত্মগোপনকারী রাজনৈতিক কর্মী তাঁর সঙ্গে গোপনে দেখা করতে আসার কথা জানিয়েছিলেন। সন্ধ্যার ট্রেনে নামবেন। আষাঢ় মাসে কৃষ্ণপক্ষের রাত্রে আগন্তুকের অপেক্ষায় তারাশঙ্কর ধ্যানমগ্ন হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ট্রেন চলে যাওয়ার পর অনেক রাত্রে সর্বাঙ্গ আবৃত কোনো ব্যক্তিকে আসতে দেখেন তিনি। আগন্তুক তারাশঙ্করের সামনে মুহূর্তমাত্র দাঁড়িয়ে আবার চলতে শুরু করেন। তাঁকে অনুসরণ করে এক নিবিড় তন্ময়তায় তারাশঙ্করও চলতে থাকেন। বর্ষার গভীর অন্ধকার রাত্রি—শেয়াকুল কাঁটার জঙ্গল, নেকড়ে এবং ভয়ানক সাপের ভয়কে তুচ্ছ করে আগন্তুকের সঙ্গলাভ তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্যপথে হঠাৎ করে শেয়াকুল কাঁটায় আটকে তাঁর তন্ময়তা ভঙ্গ হয়। দেখেন ধারেপাশে কেউ তো নেই। নিজেকে প্রশ্ন করেন—কাকে দেখলাম? কি দেখলাম? পরে জানতে পারেন যাঁর আসার কথা ছিল তিনি আসেননি। তারপর কতদিন সন্ধ্যায় সেই স্থানে গিয়ে তাঁর প্রতীক্ষা করেছেন তারাশঙ্কর কিন্তু তাঁর দেখা পাননি। দেখা না পেলেও তারাশঙ্কর বলেছেন, “তার কিছু ফল সে আমাকে দিয়ে গিয়েছে। সে ফল ‘তন্ময়তা’ যোগ। তার আস্বাদ আমি পেয়েছি। আমার সাহিত্যজীবনে সাধনকর্মে সে-ই আমার সবচেয়ে বড় সম্বল”। পরে ঘটনার কথা শুনে তারাশঙ্করকে তাঁদের গুরুবংশের সতীশ ভট্টাচার্য বলেছিলেন—“তোমার জীবনে সেদিন একটি পরম লগ্ন এসেছিল। তোমার দীক্ষা হয়ে থাকলে তুমি সেদিন পরমবস্তু পেতে পারতে”।

     সেই তন্ময়তার সূত্রেই বোধ হয় দীক্ষার কথা ভেবেছিলেন তারাশঙ্করতাঁদের পারিবারিক কুলগুরুর শেষপুরুষ সতীশ ভট্টাচার্য ছিলেন তন্ত্রপথের মানুষ এবং কালীকুলের সাধকতাঁর কাছেই প্রথম দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই কুলগুরুর তল্পি বহন করেছেন, তারাপীঠ শ্মশানে তাঁর চক্রাসনের যোগাড় করে দিয়েছেনসতীশ ভট্টাচার্য তাঁকে বলেছিলেন—শক্তিমন্ত্রে তোমাকে দীক্ষা নিতে হলে ‘তারা’ মন্ত্রে নিতে হবে। শক্তিমন্ত্রে তারাই হলেন সরস্বতী। তারার অপর নাম হল—নীল সরস্বতী। কালী হলেন মহালক্ষ্মী। কুলগুরুর এই কথা মেনে নিয়েছিলেন তারাশঙ্করমনে করেছিলেন—‘শক্তিমন্ত্রে দীক্ষাই যদি নিই, তবে এই মন্ত্র ছাড়া আর কোন মন্ত্র আমি নিতে পারি?’ কিন্তু সতীশ ভট্টাচার্য তারাশঙ্করকে ‘তারা’ মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণের কথা বললেও দীক্ষা তাঁকে দেননি। বলেছিলেন—‘এ-পথে তোমার তৃপ্তি হবে না বাবা’। তারাশঙ্কর তখন সাহিত্যচর্চা করলেও রাজনীতির দিকেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। এই জন্যই বোধ হয় তিনি জানিয়েছিলেন—

তোমার মন ছুটেছে আলাদা সড়ক ধরে। তার দুধারে বাড়ি, কাতারে কাতারে লোক। এ পথ যে জনমানবহীন পথ। আর দশজন যেমন, তোমার ধাত তেমন হলে আমি ‘না’ করতাম না। দিতাম কানে ফুঁ। ব্যবসা, তেজারতি, চাষ, মামলা—দেওয়ানি ফৌজদারি করে ঘরে ফিরে কাপড় ছেড়ে আসনে বসে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে বীজমন্ত্রটি স্মরণে এনে জপে বসে যেতে ; কারণের বোতল পেলেই ‘কালী কালী বল মন’, ‘জয় তারা’ বলে অকারণে চক্রের নামে কুচক্রে বসে যেতে। বাবা, আমরা তান্ত্রিক বামুন পণ্ডিত লোক, ইংরেজি মত বুঝি না, মনে করি—ওতে ইহলোকের খুব ভালো মন্ত্র আছে। একশোটা ধনদা-কবচ ধারণ করলে যা না-হবে, ওই মতে দীক্ষা নিলে তাই হবে। তবে ও মন্ত্রে তার পর এগিয়ে যাওয়া বড়ো কঠিনযারা চেষ্টা করে, তারা প্রায় দেখি নাস্তিক হয়ে যায়, তুমি বাবা সেই পথ ধরেছ। খানিকটা না এগুলে তোমার যে কী মতি হবে, তা তো বুঝতে পারছি না। যারা একপা এ-পথে, একপা ও-পথে ফেলে চলে, ইহকালের জন্যে ইংরিজি মত আর পরকালের জন্যে দেশি মত ধরে, তাদের ধরণের মানুষ তুমি নও। কাজেই মন্ত্রদীক্ষা এখন তোমার নেওয়াও উচিত নয়; আমার দেওয়াও উচিত নয়আগে তোমার মন স্থির হোক।

 

     কুলগুরুর উপদেশ তারাশঙ্করের মনে রেখাপাত করেছিল। সাময়িক নীরব হয়েছিলেন তিনি।

 

১৯৩২ সালে তারাশঙ্করের ছ-বছরের একটি কন্যা মারা যায়। কন্যাশোকের ব্যাকুলতা তারাশঙ্করকে বিভ্রান্ত করে তোলে। বিদীর্ণচিত্ত তারাশঙ্কর আত্মার শান্তি কামনায় আবার গুরুর সন্ধান করেছিলেন। তখন সদ্য আলাপ হয়েছিল তন্ত্রমার্গের বিজ্ঞ মানুষ কবি মোহিতলাল মজুমদারের সঙ্গে। দু-একবার ঢাকার বাড়িতে গিয়েও মোহিতলালের সাধনার আসন দেখে এসেছিলেন তারাশঙ্করতাঁর চরিত্র, তাঁর সাধনার নিষ্ঠা, জীবন ও জগৎ-রহস্য উদ্ঘাটন করে তার লীলা প্রত্যক্ষ করার বিচিত্রদৃষ্টিতে তারাশঙ্কর এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে মোহিতলালের কাছে দীক্ষা নেওয়ার বাসনা জাগে তাঁর। চিঠিতে লিখেছিলেন—আমি দীক্ষা গ্রহণের জন্য গুরু অনুসন্ধান করছি। আপনি কি আমাকে দীক্ষা দিতে পারেন?

    মোহিতলাল জেনেছিলেন তারাশঙ্করের শক্তিতন্ত্রের উপাসক বংশের সন্তান। সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন—‘আপনি নিজে তন্ত্রসাধনা করেছেন?’

    তারাশঙ্কর উত্তর দিয়েছিলেন—‘দীক্ষা হয়নি, তবে গুরুর তল্পি বয়ে বেড়িয়েছি’।

    তারাশঙ্করের রাজনৈতিক জীবনের কথা শুনে অপ্রসন্ন মোহিতলাল বলেছিলেন, “এ-পথে চলতে হলে ও-সংস্রব চলবে না। ধর্ম নইলে মানুষ বাঁচে না, প্রতিটি মানুষেরই একটা-না-একটা ধর্ম আছে, কিন্তু যারা ধর্মপ্রচারক হয় তারা নিজেরাই ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট, ধর্মকে প্রতিষ্ঠা দিতে হয়—নিজের অন্তরে দাও। অন্যের অন্তরে তাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার চেষ্টা যখনই করবে তখনই হবে অধর্ম! তাছাড়া, রাজনীতি হল সাময়িক—কালে কালে পাল্টায়, কিন্তু সাহিত্যধর্ম শাশ্বত।” 

     একবার জানতে চেয়েছিলেন—‘কারণ করেছেন কখনও?

     তারাশঙ্কর জানিয়েছিলেন—না। সে করিনি। আমাদের কুলগুরু আমার মানসিক গতি দেখে নিষেধ করে বলেছিলেন, সে-মন তোমার নয়। মনের গতির পরিবর্তন না হলে এ-পথে পা দিয়ো না। তারাপীঠে চক্রাসনের কথা বলেছিলেন তারাশঙ্কর। বলেছিলেন চক্রের পাশে বসে চক্রের উপকরণ জুগিয়েছি। চক্র দেখেছি। তারাপীঠের সাধকদের চক্রের কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন মোহিতলাল। বলেছিলেন—‘অদ্ভূত ব্যাপার’। পরে ঢাকা থেকে চিঠিতে তারাশঙ্করকে লিখেছিলেন—আপনার উপর প্রত্যাশা রাখি, তাই চিন্তাও হয়। যে সর্বনাশা ছোঁয়াচ একবার আপনার লেগেছিল তা সহজে মানুষকে রেহাই দেয় না। বার বার সাবধানবাণী উচ্চারণ করছি সেই কারণে

     সামাজিক ভাবে মোহিতলাল ছিলেন বৈদ্য।  ব্রাহ্মণ সন্তানের বৈদ্যগুরুর কাছে দীক্ষা নিতে চাওয়া সামাজিকতায় অবৈধ। একমাত্র সন্ন্যাসী গুরুর ক্ষেত্রে সেই বাধা থাকে না। কারণ, সন্ন্যাসীর জাতি নেই, বর্ণ নেই, ইহলোক-পরলোক কিছুই নেই—আছে শুধু তপ এবং সাধনা। সেই তপ এবং সাধনা তাঁর কাছে সকলেই গ্রহণ করতে পারে, তিনিও বিতরণ করতে পারেন। বিকৃত বর্ণাশ্রম ধর্মের গণ্ডিকে লঙ্ঘন করার মতো সাহস ও ইচ্ছা তারাশঙ্করের ছিল। আবার জ্ঞানযোগে মোহিতলালের দৃষ্টির গভীরতা, ধ্যানযোগের মতো সাহিত্যতন্ময়তা, নিজের মতের দৃঢ়তা, জগৎ ও জীবন ব্যাখ্যায় সূচিতা ও অসূচিতার ঊর্দ্ধস্তরের অনুভূতি অথচ তার প্রকাশে জ্যোতির্ময় পবিত্রতার ধারণা, সাধনফল সম্পর্কে নির্লোভ অনাসক্তি দেখে মোহিতলালকে একজন গৃহী সন্ন্যাসী বলেই মনে হয়েছিল তারাশঙ্করের। সেই ভেবে মোহিতলাল মজুমদারের কাছেই দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন তারাশঙ্কর। মোহিতলাল সম্মত হননি। চিঠিতে লিখেছিলেন—দীক্ষা নিয়ে কী করবেন? দীক্ষায় আমার নিজের কোনও বিশ্বাস নাই। আমার দীক্ষা সাহিত্যের দীক্ষা, সে মন্ত্র আপনি স্ফুরিত হয়। অন্তরে বীজ থাকলে সাধনার উত্তাপে নিষ্ঠার অভিসিঞ্চনে সে বীজ আপনি উপ্ত হবে, মন্ত্র-চৈতন্য আপনি ঘটবে। বিষণ্ণ তারাশঙ্কর দীক্ষার বিষয়ে মোহিতলালকে আর কখনও কিছু লেখেননি।

     তন্ত্রে বিজ্ঞ মোহিতলাল মূলতঃ সাহিত্যিক। মোহিতলালের কাছে তারাশঙ্কর সারস্বত-তন্ত্রমতে দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন এই রীতি ভারতবর্ষের প্রাচীন রীতিমহাকবি বাল্মীকি এবং মহর্ষি বেদব্যাসের জীবন থেকে তার আভাস পেয়েছিলেন তারাশঙ্করএ বিষয়ে তাঁর অভিমত—“তাঁদের জীবনে যে-পরিশুদ্ধতা, যে-প্রসন্নতা, যে-শান্ত কাঠিন্য আমরা দেখতে পাই, তাঁদের যে মহর্ষিত্ব স্বীকারে কোনো সংশয় জাগে না, তার একটি সাধনপন্থা নিশ্চয় আছে। সে পথ ও সে-তন্ত্র পরবর্তীকালে যেন হারিয়ে গেছে  কালিদাস মহাকবি, কিন্তু মহর্ষি আখ্যা পাননি। অথচ নতুনকালে রবীন্দ্রনাথ ঋষিত্ব অর্জন করলেন আমাদের চোখের সামনে”দীক্ষা সম্পর্কে তারাশঙ্করের এই  অভিমত জ্ঞানযোগের পথে পরিশুদ্ধ। মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে ভক্তত্ব অর্জনের সাধনা ছিল কিন্তু ‘খাঁটি সরস্বতী-তন্ত্রমতে সাধনা তাঁদের মূল সাধনা ছিল না’। বাংলাদেশে নবজাগরণের সময় সারস্বত-তন্ত্রের পুনরুত্থান হয়েছে। সেই পথ অবলম্বনেই বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঋষিত্ব অর্জনের স্বীকৃতি পেয়েছেন। সেই পথের প্রত্যাশা নিয়ে তারাশঙ্কর সেই সারস্বত-তন্ত্রের পথই অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন দীক্ষার পথে তিনি জানতে চেয়েছিলেন জন্ম-মৃত্যুর রহস্যকে—বায়োলজি এবং মেডিকেল সায়েন্সের পরও যা আছে তাকে অনুভব করতে চেয়েছিলেন তিনিঅন্তত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চিত্তের আনন্দ অনুভবের শক্তি অর্জন করতে চেয়েছিলেনজ্ঞানযোগে দীক্ষার এই পথ, মানব-জীবনের মধ্যে থেকেই ঋষিত্ব অর্জনের পথসারস্বত পথে তারাশঙ্করের সময়কালে রবীন্দ্রনাথ তো স্বমহিমায় বিরাজমান ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে যাওয়ার মতো সাহস তাঁর হয়নি।

 

কন্যা-বিয়োগের ফলে যে-নিদারুণ আঘাত তারাশঙ্কর পেয়েছিলেন তাতে তাঁর মনের গতির কাঁটা উদভ্রান্তের মতো পাক খাচ্ছিল। মনে তখন দারুণ তৃষ্ণা জেগেছিল পরলোকতত্ত্ব জানাবার। প্রায় নিত্যই গ্রামের শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেনএকদিন সন্ধ্যায় শ্মশান থেকে ফিরে আসার পথে গ্রামের অট্টহাস মন্দিরে সীতারাম নামে এক সন্ন্যাসীর দেখা পেয়ে তারাশঙ্কর তাঁর কাছেও দীক্ষার আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি তান্ত্রিক নন, বৈষ্ণব নন, খাঁটি যোগী—এবং সাগ্নিক তপস্বী। সন্ন্যাস গ্রহণের দিনে যে হোমকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করে দীক্ষা নিয়েছিলেন সেই অগ্নিকে তিনি একমাত্র স্নান, আহার ইত্যাদি জৈব-কৃত্যের সময় ছাড়া, অহরহই স্পর্শ করে থাকেন। তারাশঙ্কর দেখেছিলেন—“একখানা পাথরের উপর পা রেখে সেই জ্বলন্ত কাঠখানি হাতে সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আছেন, অধীরতা নেই একবিন্দু, চেয়ে রয়েছেন রক্তিম আকাশের দিকে।” এই সন্ন্যাসীকে দেখে তারাশঙ্করের মনে দীক্ষা গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা আবার প্রবল হয়ে ওঠেতাঁকে প্রার্থনা জানান, বাবা, আমার চিত্ত বড় অশান্ত, দীক্ষার জন্য আমি ব্যাকুলতা আনুভব করি। আপনি আমাকে দীক্ষা দেবেন?  

     সন্ন্যাসী সরব উত্তর না দিয়ে ঠোঁট দুটি নেড়ে বুঝিয়ে ছিলেন—সুধা রাখতে হলে স্বর্ণপাত্র চাই বাবা, মৃৎপাত্রে হয় না।  সন্ন্যাসীর কথায় আহত হয়েছিলেন তারাশঙ্করনিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন—

কি হবে আমার সেই সুধায় যে সুধা স্বর্ণপাত্র ব্যতীত ক্ষয় হয়, দূষিত হয়? যে অমৃত মৃৎপাত্রকে অক্ষয় এবং সূচি করতে না পারে, সে আবার অমৃত কিসে?

আর আমিই বা মৃৎপাত্র কিসে?

রক্তমাংসের এই জরা-মরণশীল দেহের আধারে আমার আত্মা যে তপস্যার হোমাগ্নি জ্বেলেছে তার স্বরূপ তো আমি জানি। সে সম্পদ চায়নি, সে তো স্বার্থ চায়নি, সুখ চায়নি, সে হোমাগ্নি আমার জীবনকে দহন করছে, সুতরাং আমি মৃৎপাত্র কিসে? কেন?       

 

     এই ঘটনার কয়েক মাস পর অসুস্থ সন্ন্যাসীকে সুস্থ করে তোলার জন্য গোপালদাসী নামে তাঁর এক মহিলা ভক্ত তাঁদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় সন্ন্যাসী খোঁজ করেছিলেন তারাশঙ্করের। অনিচ্ছুক তারাশঙ্করকে তাঁর মা সঙ্গে করে গোপালদাসীর ঘরে সন্ন্যাসীর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে প্রদীপ জ্বালছে গোপালদাসী। তারাশঙ্করের উপস্থিতির কথা শুনে প্রসন্ন কণ্ঠে সন্ন্যাসী বলেছিলেনন—এসেছ? বলেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে অগ্রসর হয়ে আসেন এবং তাঁর দীর্ঘ দুই হাত বাড়িয়ে তারাশঙ্করের দক্ষিণ হাতখানি টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলেন—তোমার কাছে আমার অপরাধ জমা হয়ে আছে। তুমি আমাকে মার্জনা কর।  সন্ন্যাসীর কথা শুনে  গোপালদাসীর হাতে থেকে সদ্যজ্বালা প্রদীপটি মেঝেতে পড়ে নিভে যায়। ঘরখানা অন্ধকারে ভরে ওঠেসন্ন্যাসীর কথার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ঘরখানা স্তব্ধতায় যেন স্তম্ভিত হয়ে যায় সেই মাহেন্দ্রলগ্নে পরম প্রাপ্তির স্মৃতিচারণায় তারাশঙ্কর বলেছেন—

আমি যেন মুহূর্তে মুহূর্তে হারিয়ে ফেলছি আমাকে। আমার অন্তরের মধ্যে প্রচণ্ড কম্পনে সব যেন ভেঙেচূড়ে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘকায় অশীতিপর সন্ন্যাসীর মাথা যেন ঊর্ধ্বলোক থেকে সস্নেহে আনত হয়ে আমার মস্তক আঘ্রাণ করছেন বলে মনে হল।

বোধ হয় মিনিট খানেক, তার বেশি নয়, কিন্তু আমার স্মৃতিতে সে যেন একটা কাল মনে হয়েছিল, যেন জন্ম-জন্মান্তরের তপস্যার সিদ্ধিফল আমার হাত ধরে এসে দাঁড়িয়েছিল।

সন্ন্যাসী নিজে আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বিচিত্রভাবে আমাকে পরাজিত করলেন। সে-পরাজয়ে যে-আনন্দ, তার আস্বাদ আজও  আমার অন্তরলোকে অমৃতের মতোই অক্ষয় হয়ে আছে। তাঁর প্রসঙ্গ আমার জীবনকে ধন্য করে দিয়েছে। সে অমৃতে সেদিন আমার সকল অশান্তির দাহ জুড়িয়ে গিয়েছিল

তিনি আমাকে দীক্ষার কথায় বলেছিলেন, দীক্ষার জন্য অধীর হয়ো না। জীবনে যার সাধনা থাকে, তার গুরু আপনি আসেন। তোমার গুরু আসবেন। তোমার সাধনা তুমি করে যাও। শুনেছি, তুমি জ্ঞানের সাধনা কর। তার সঙ্গে এই রকম কর্মের সাধনা করো। নইলে পূর্ণ হবে না সাধনা। আমি তখনকার মতো গুরুর সন্ধানে বিরত হলাম। রত হলাম সাহিত্যসাধনায়।      

 

    গোপালদাসী পুনরায় প্রদীপ জ্বালালোসন্ন্যাসী স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তারাশঙ্করকে বললেন—সেদিন তোমাকে দীক্ষা দিলে আমি ভুল করতাম। না হত তোমার প্রকৃতিগত পথে সাধনায় সিদ্ধি না হত মন্ত্রজপে পরিতৃপ্তি। দীক্ষা তোমার হয়ে গিয়েছে। যদি কোনোদিন এ দীক্ষায় সাধন তোমার অসাধ্য হয়, সেদিন গুরু তোমার কাছে আপনি আসবে। বিগলিত হলেন তারাশঙ্কর। জীবনে তাঁর যেন অমৃত প্রাপ্তি ঘটল। রাত্রে নিশ্চিন্তে ঘুমালেন। পরের দিন সকালের স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছেন—

সকালে উঠলাম। মনে হয় এমন প্রসন্ন জীবন দীর্ঘকাল আমি পাইনিজীবনের ক্ষোভ অভিমান শোক শান্ত হয়ে গেছে, মিলিয়ে গেছে, জুড়িয়ে গেছে। বুলু যেন হারায়নি। কেউ যেন কখনও আমাকে দুঃখ দেয়নি। এমনি প্রসন্ন জীবন ফুলেভরা বাগানের মতো আনন্দে তৃপ্তিতে ঝলমল মনএমন পাওয়া কখনও আমি পাইনি   ...        

আমার যে কন্যার শোকে আমি প্রায় উদাসী হয়ে উঠেছিলাম, মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব এবং রহস্য অনুসন্ধানের অভিপ্রায়ে সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা শ্মশানে কাটিয়ে এসেছি অথচ কোনো সন্ধানই পাইনি, যে অবস্থাটা বলতে পারি শোকাচ্ছন্নতা শাস্ত্রমতে যা নাকি মূঢ়তার সামিল—তাই থেকে মুক্তি পেলাম—এক পূর্ণিমা রাত্রের অমৃত আস্বাদনে।

 

    এই সাগ্নিক সন্ন্যাসী কন্যাশোকে বিদীর্ণচিত্ত তারাশঙ্করের জীবনে এক আলোকবর্তিকা। এই সন্ন্যাসীর কাছেই তারাশঙ্কর শুনেছিলেন তন্ত্রসাধনার মূল রহস্যের কথা।

 

ওই ঘটনার পর কুড়ি-বাইশ বছর তখন কেটে গেছে। প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতির তুঙ্গে অবস্থানকারী তারাশঙ্করের মন তখন আবার নিয়ত অশান্তির অনলে দগ্ধ হয়। পুজোপাঠে শান্তি আসে না। মনে হয়—

কি চাই? কে আমি? জীবনের উদ্দেশ্যটা কি? মনে হয় আত্মমগ্নতায় আনন্দ নেই—তন্ময়তায় আছে। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন তন্ময়তার সেই তৎটি কি?

 

     নিরন্তর এই যন্ত্রণায় উদভ্রান্ত তারাশঙ্কর বুঝেছিলেন—তাঁর উদ্বোধিত চৈতন্যলোকে মেধার কোনো মূল্য নাই; বুদ্ধির অতিরিক্ত একমাত্র বোধ ও বোধির দ্বারা সেখানে অনুপ্রবেশ সম্ভব। তখন অন্তরে এক ‘তুমি’র অস্তিত্ব উপলব্ধি করেছেন তিনি। সেই সময় তাঁর জীবনে ঘটেছে এক অলৌকিক ঘটনা।  মুর্শিদাবাদে কাঁদির রাজবাড়িতে আমন্ত্রিত তারাশঙ্কর দেবালয় প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে নিজের কানে শুনেছেন—দেববিগ্রহ রাধামাধব তাঁর নাম ধরে ডাকছেন। এই ঘটনা তাঁর অন্তরের অন্তপুরে এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব এনে দেয়। সেই সময়ে নিজের মানসিকতার কথা জানিয়ে তারাশঙ্কর বলেছেন—

মন তখন এত অধীর, এত চঞ্চল, এত তৃষ্ণার্ত যে কোথায় আমার জীবনের প্রশ্নের উত্তর, কোথায় কিসে আমার তৃপ্তি সেই চিন্তায় আমি এত একক, এত উদভ্রান্ত যে সমস্ত সংসারের সঙ্গে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিগোটা সংসার ভাবছেন আমি থেকেও নেই, আমি পর হয়ে গেছি। গোটা সংসারের প্রতিনিধি হিসেবে আমার পত্নী আমাকে প্রচণ্ড ব্যাকুলতায় আঁকড়ে ধরতে চাইলেন। শত প্রশ্ন তাঁর।–কেন এমন হয়ে গেলে তুমি? কি চাও তুমি? কি ভাব তুমি? আমি কি উত্তর দেব? যে উত্তরহীন প্রশ্ন আমাকে এমনভাবে অধীর অস্থির একান্ত বিচ্ছিন্ন একক করেছে সে প্রশ্নের কথা উত্তর হিসেবে বললেও সে উত্তর তো উত্তর নয়। সে প্রশ্নই।

সুখ চাই বললে, প্রশ্ন করেন—সুখ কিসে? শান্তি চাই বললে প্রশ্ন করেন—তাই বা কোথায়? এর উত্তর আমি খুঁজছি, আমি জানি না, সুতরাং কি উত্তর দেব?

নিজের জীবনের অশান্তি অসুখে সারা সংসারটাই অশান্তি এবং অ-সুখে ভরে গেল। আমার অসহ্য হয়ে উঠল।

 

     মনের গভীর শূন্যতার কারণে সংসারের সকলের মাঝে থেকেও তারাশঙ্কর একা হয়ে পড়েন। নীরবে জল ভরা চোখে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। লেখাও প্রায় ছেড়ে দেন। মনের এই ব্যাকুলতা নিয়ে তিনি একবার কাশী চলে গিয়েছিলেন। পূর্ব-পরিচিত এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর সেই অশান্ত হৃদয়কে শান্ত করতে, জীবনে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে তারাশঙ্কর--বাড়িতে না জানিয়ে ১৯৫৪ সালের ০৬ জুলাই কাশী যাত্রা করেন। সেই তাঁর প্রথম কাশী যাত্রা। কিন্তু বড় উদ্বেগের বিষয়, যে সন্ন্যাসীর সন্ধানের উদ্দেশ্যে নিয়েই তাঁর কাশী যাত্রা, নৌকা করে মণি-কর্ণিকা থেকে রাজা হরিশ্চন্দ্রের ঘাট পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে তাঁর সন্ধান করে ফিরেছিলেন তবু কোথাও তাঁর সন্ধান পাননি তিনিসেখানে ডাক্তার মৈত্র এবং প্রবোধ চট্টোপাধ্যায় নামে দুই বাঙালি ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাঁর। ডাক্তার মৈত্র’র চেম্বারে গিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। ডাক্তার মৈত্র বলেছিলেন—দেখুন, এ পথ যখন টানছে তখন দীক্ষার দরকার। বাড়ি ফিরে গিয়ে দীক্ষা নিন। বলেছিলেন—সন্ন্যাসী চেনা বড় কঠিন তারাশঙ্করবাবু। হাজার ছদ্মবেশির মধ্যে একজন খাঁটি প্রকৃত সন্ন্যাসীর সন্ধান মানে গিলটির হাটে খাঁটি সোনার সন্ধান। তার থেকে গৃহী গুরু ভালো। ডাক্তার মৈত্র’র সঙ্গে কথা বলে তারাশঙ্করের জীবন-যন্ত্রণা অনেকখানি প্রশমিত হয়েছিল। আর প্রবোধ চট্টোপাধ্যায়কে তারাশঙ্কর বলেছিলেন—দুঃখ কি পেয়েছি জানি না; তবু অনন্ত দুঃখ আমার। একটা কিছু ধরতে চেয়ে ধরতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন আশেপাশে লুকোচুরির মতো খেলা খেলে আমাকে হয়রান করছে। সেটা কি, কেমন করে তাঁকে ছোঁয়া যায়, ধরা যায়, তার পথ কি তার জন্য আমার অশান্তির শেষ নাই। অ-সুখের অন্ত নাই। প্রবোধবাবু বলেছিলেন—আপনি স্থির হোন, সাহিত্যের আসনকে জীবনের সাধনার আসন করুন

     ডাক্তার মৈত্র এবং প্রবোধ চট্টোপাধ্যায় উভয়ের উপদেশ তাঁর জীবনের সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিল। যে মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন করে তারাশঙ্কর জীবন ও জগৎকে দেখেছিলেন এবং নিজের জীবন নির্বাহ করেছিলেন—সেই মতবাদের উৎসমূল তো নিহিত তাঁর জননীর মনোভূমিতে। প্রায় সমকালে রচিত ‘আমার কালের কথা’ বইতে তারাশঙ্কর লেখেন—“আমার জীবনে মা-ই আমার সত্যসত্যই ধরিত্রী, তাঁর মনোভূমিতেই আমার জীবনের মূল নিহিত, শুধু সেখান থেকে রস গ্রহণ করেনি, তাঁকে আঁকড়েই দাঁড়িয়ে আছেওই ভূমিই আমাকে রস দিয়ে বাঁচিয়ে প্রেরণা  দিয়ে বলেছে, ‘আকাশলোকে বেড়ে চল, সূর্য-আরাধনায় যাত্রা করতুলে ধর তোমার জীবনপুষ্প দিয়ে সূর্যার্ঘ্য” সেই মানসিকতায়, কাশী থেকে ফিরে এসে তারাশঙ্কর জননীকে গুরু করে তাঁর কাছেই দীক্ষা নিয়েছিলেন। দীক্ষাকর্মে শাস্ত্রসম্মত ক্রিয়াগুলি করে দিয়েছিলেন শ্রীগৌরীনাথ শাস্ত্রীর এক আত্মীয়১৩৬১ বঙ্গাব্দের ০৭ শ্রাবণ ছাপান্ন বছর বয়সে জননী প্রভাবতীদেবীর কাছে কালীমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। দীক্ষান্তে বলেছিলেন—“এবার জীবন আমার একটা সোজা পথ ধরল”।

-------------------

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি

বীরভূম-৭৩১১০২।

মোবাইল নম্বর-৯২৩৩১২৪৭১৮

ইমেইল আইডি—debashismukherjee67@gmail.com

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের নিবন্ধ--"আসামে বঙ্গভাষা আন্দোলনে তারাশঙ্কর"

 

 

 

আসামে বঙ্গভাষা আন্দোলনে তারাশঙ্কর

                                             দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

সাহিত্যিক হিসেবে একসময় আসামের অনেক মানুষের সঙ্গে তারাশঙ্করের আলাপ হয় এবং নিবিড় বাঙালিয়ানায় একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে—পত্র বিনিময় হয় অনেকের সঙ্গেসেই সূত্রেই রামচন্দ্র দাস নামে এক ব্যক্তির পত্রোত্তরে ১৯৫৮ সালের ৩০ অক্টোবর তারাশঙ্কর লেখেন—

আসাম ও বাঙলাদেশ [পশ্চিমবঙ্গ] যমজ ভগিনীর মত—আমরা গঠনে এক, মননে এক, ধর্মে এক—আমাদের ভাষা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কযুক্ত। আমরা বন্ধু বা সহকর্মীরও অধিক। আমরা নিকটতম জাতি, আমরা ভ্রাতৃত্ব সূত্রে আবদ্ধ। পরাধীন ভারতবর্ষে আমাদের পরস্পরকে জানা কঠিন হয়তো ছিল না। কিন্তু সেকালে সেই মন যেন আমাদের ছিল না। আজ স্বাধীন দেশে ক্রমশ আমরা পরস্পরের নিকটস্থ হয়ে আসছি। আপনার পত্রখানি তারই একটি নিদর্শন।

 

     স্বাধীনতার আগে এবং পরে আসামে বাঙালির যন্ত্রণা তারাশঙ্করের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

     আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনে কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান অবিস্মরণীয়। বিভিন্ন সময়ে আসামের একাধিক শহরে অনুষ্ঠিত আসাম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে তারাশঙ্কর যেমন তাঁর কর্তব্যকর্মে সচেতন ছিলেন; তেমনি বঙ্গভাষা কেন্দ্রিক ঘটনায় আসামে বাঙালি নির্যাতনের যে রক্তাক্ত ইতিহাস রচিত হয় তার বিরুদ্ধে কলকাতায় সমবেতভাবে উচ্চকণ্ঠে সরব হয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ে রাজ্যসভার সাংসদ তারাশঙ্কর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে কঠোরভাবে অভিযুক্ত করে কৈফিয়ৎ চেয়েছিলেন এবং পত্রবাণে জর্জরিত করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—আসামে বাঙালি কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়; তারা সমগ্র বাঙালিজাতির অবিচ্ছিন্ন আপনজন। বালকৃষ্ণ দত্তাত্রেয় তথা কাকা কালেলকর সাহেবের পক্ষপাতিত্বমূলক উপদেশকে নস্যাৎ করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—আসামে বাঙালি কোনো অন্যায় করেনি।

     তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একশো পঁচিশতম জন্মবৎসরে তাঁর সেই একনিষ্ঠ কর্তব্যকর্মের কথা স্মরণে আসাম ও বঙ্গের বঙ্গভাষী মানুষের মিলন-ঐক্য নিবিড়তর হোক—সর্বশক্তিমানের কাছে এই প্রার্থনা জানাই।

 

১৯৪৪ সালে শিলং শহরে অনুষ্ঠিত আসাম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতি ছিলেন এস. ওয়াজেদ আলি; আর সাহিত্য শাখার সভাপতি ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাশঙ্করের ষোলো বছরের লেখক জীবনে তখন অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত ছোটগল্প সহ—চৈতালী ঘূর্ণি পাষাণপুরী নীলকণ্ঠ ধাত্রীদেবতা কালিন্দী গণদেবতা উপন্যাসগুলিও প্রকাশিত হয়েছে। তারাশঙ্করের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন—কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরণ অধ্যাপক ডঃ বিজনবিহারী ভট্টাচার্য।

     আসামের সমকালীন প্রেক্ষাপট তথা বাংলা ভাষার সঙ্কটমুক্তির নিরিখে সেই সম্মেলনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের সময়োচিত প্রাসঙ্গিতার কথায় তারাশঙ্কর বলেছেন—

এই সম্মেলনটি সাধারণ আর পাঁচটা সম্মেলনের মতো সম্মেলন ছিল না, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন ছিল। তখনই আসামে স্বর্গীয় বড়দলুইয়ের নেতৃত্বে ভাষার সূত্র ধরে অসমীয়া ও বাঙালীদের মধ্যে এই [ভাষা] মারাত্মক বিদ্বেষের অঙ্কুরটি সবে উপ্ত হয়েছে এবং তার গোড়ায় প্রচুর জল এবং গলিত সার প্রয়োগ করা হচ্ছে তাকে মহীরূহে পরিণত করবার জন্য। তখন গৌহাটিতে কামরূপ ইউনিভারসিটি স্থাপনের উদ্যোগ সম্পূর্ণ। কিছুদিনের মধ্যেই ইউনিভার্সিটি সম্পূর্ণ হয়ে কাজ আরম্ভ হবে। এই ইউনিভারসিটিতে অসমীয়া ভাষার একাধিপত্য এবং বাংলা ভাষাকে নির্বাসিত করবার একটি পরিকল্পনা রচিত হচ্ছেতখন দেশ পরাধীন। আসাম স্বতন্ত্র প্রদেশ হলেও শ্রীহট্ট শিলচর কাছাড় বাঙালী প্রধান অঞ্চল, সেখানে বাঙালী অনেক। তখন হিন্দু মুসলমানে বিরোধ যত তীব্রই হোক, দেশভাগের কল্পনা কেউ করে না। বাঙালী মুসলমানও তখন বাঙালী হিন্দুর পক্ষে। শিলংয়ে নিখিল আসাম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন হয়, এই অসমীয়া ভাষা সর্বস্ব কামরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাস থেকে বাঙালীর মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারকে বাঁচাবার জন্য আর একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অভিপ্রায়ে।

         

     তারাশঙ্কর কামরূপ ইউনিভার্সিটির কথা বলেছেন। কামরূপ নামাঙ্কিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কি আসামে আছে বা কোনোদিন ছিল? বোধ হয় ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আসামে কামরূপ জেলার গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়—এর কথা বলেছেন তিনি।      

     তদানীন্তন আসাম বিধানসভার স্পীকার ১৯৪৪ এ আসাম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন। বাংলা ভাষার গুরুত্ব দিতে সম্মেলনে আর একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সঙ্কল্পও গ্রহণ করা হয়েছিল। উদ্যমের দিক থেকে কোনো ত্রুটি ছিল না; কিন্তু তারাশঙ্করের অভিজ্ঞতা প্রসূত অভিমত অনুসারে শ্রীহট্ট শিলচর কাছাড় অঞ্চলের বাঙালীদের অসহযোগিতার জন্যই সেই সঙ্কল্প এবং উদ্যম কাজে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। সিলেট শিলচর থেকে প্রতিনিধি এসেছিলেন অল্পসংখ্যক কিন্তু তাঁদের সমর্থনে জোর ছিল না। কারণ তাঁরা তখন নিশ্চিত জেনে বসেছিলেন যে—প্রদেশ পুনর্গঠন হতেই হবে এবং তাঁরা সেই পুনর্গঠনের মধ্যে অবশ্যম্ভাবীরূপে বাংলাদেশেই ফিরে যাবেন। মনে থাকার কথা—সিলেট বাংলাদেশেই ফিরে যায় কিন্তু খণ্ডিত ভারতবর্ষের খণ্ডিত বাংলায়।

     সেই সম্মেলনে ভট্টাচার্য পদবী সমন্বিত এক মহিলা তাঁর বক্তৃতায় “বিস্ফোরকে অগ্নি সংযোগ” করেছিলেন। তারাশঙ্কর জানিয়েছেন—“কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এবং বাঙালীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাভাষার অধিকার বিষয়ক প্রস্তাবের বিরোধীতা করে ইংরেজীতে বক্তৃতা করেছিলেন তিনিকিন্তু সভাপতি মহাশয় সুচতুর কৌশলে ওই মহিলাকে দিয়েই সম্মেলনের প্রস্তাবগুলি সমর্থন করিয়ে নিয়েছিলেন। তাতে সম্মেলন সফল হয় কিন্তু আসল সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং বিদ্বেষ কিছুটা বেড়েছিল। তারাশঙ্করের মতে সেই বিদ্বেষের বীজ নিহিত ছিল ইতিহাসের গভীরে। বাঙালির সমবেত সহযোগিতার মাঝেও তিনি বিরোধ-বিদ্বেষের স্রোত প্রবাহিত হতে দেখেছিলেন। তারাশঙ্কর নিজের চোখে দেখেছিলেন—রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অসমীয়া প্রাধান্য স্থাপিত হলেও শিলং গৌহাটি অঞ্চলে বাঙালিরাই ছিল প্রধান এবং উচ্চতর রাজকর্মচারীদের শতকরা সত্তর-পঁচাত্তর জন ছিল বাঙালিব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাঙালিরাই ছিল প্রধানবড়দলুইয়ের মন্ত্রমণ্ডলী তখন নেই, তখন সাদুল্লা মুখ্যমন্ত্রী। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কংগ্রেস তখন বাইরে এবং অনেকে কারাপ্রাচীরের অন্তরালে। ভারতীয় কম্যুনিষ্ট পার্টির আসাম শাখা তখন বেশ সক্রিয়। সম্মেলন উপলক্ষ্যে অকম্যুনিষ্ট এবং কংগ্রেস মনোভাব সম্পন্ন বাঙালিরা হাত মিলিয়ে কাজ করলেও অন্তরালে বিদ্বেষের স্রোত প্রবাহিত ছিল। আত্মঘাতী বাঙালি সম্পর্কে তারাশঙ্করের এমন ঐতিহাসিক অভিমত ইতিহাস মিলিয়ে মূল্যায়ণ করবেন পাঠকবর্গ—আমরা কেবল অভিমত উপস্থাপিত করলাম

 

১৯৫৬ সালে মহালয়ার আগের দিন তারাশঙ্কর গৌহাটি যাত্রা করেন। সেখানে--একটি কলেজে বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ছিল। তখন তাঁর আরও অনেকগুলো উপন্যাস এবং গল্প প্রকাশিত হয়েছে এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে বাংলা অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন।

     গৌহাটিতে মহালয়ার দিন ভোরবেলা তারাশঙ্করের জীবনে একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটে।  গৌহাটিতে শিলং ইলেক্ট্রিক সাপ্লাইয়ের এলাকার মধ্যে ছিলেন তিনি। একজন বাঙালী ইঞ্জিনীয়ার তারাশঙ্করের আপ্যায়ণ করেন। তিনি রাত্রে তারাশঙ্করকে খাইয়ে নিজের বাংলোয় যাবার সময় একটি রেডিও দিয়ে গিয়েছিলেন—মহালয়ার অনুষ্ঠান শোনার জন্য। বেতারে মহালয়ার বোধন অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র’র উদাত্তকণ্ঠের চণ্ডী আবৃত্তির ঝঙ্কার মানুষকে আকৃষ্ট করত—এখনও করে। তাঁর চণ্ডী আবৃত্তির ঝঙ্কার তারাশঙ্করের মনেও বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে এবং সেই প্রভাবে ধরিত্রী মাতৃময়ী রূপে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তাঁর সম্মুখে। তাঁর সেই প্রতক্রিয়ার কথা নিজেই জানিয়েছেন ‘আমার কথা’ নামক আত্মজীবনী বইতে। তেমন অনুভবে নিজেকে হিন্দু এবং ভারতীয় ভাবতে গর্ববোধ করেছিলেন তিনি।

     সেদিন দুপুরে স্নান সেরে কামাখ্যা মন্দিরে গিয়েছিলেন পুজো করতে।

     গৌহাটি কলেজে বাঙালি ছাত্রদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বাংলা সাহিত্য সম্মেলনউপস্থিত ছিলেন আসামের দেবকান্ত বড়ুয়া, নবীন উপন্যাসিক বীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ। আসাম মন্ত্রীসভার শিক্ষামন্ত্রী সভা উদ্বোধন করেই শিলং চলে গিয়েছিলেন। শিক্ষামন্ত্রীর উদ্বোধনী ভাষণে অসমীয়া ও বাঙালীদের মধ্যে বিদ্বেষের উত্তাপ বিকীর্ণ হতে দেখেছিলেন তারাশঙ্করএর আগে ১৯৪৪ সালে নিখিল আসাম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন বারো বছর পর আরও কিছু প্রত্যাশিত থাকবে বলে ভেবেছিলেন তিনিমনে মনে প্রস্তুত ছিলেন তারাশঙ্কর এবং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদও করেছিলেন কিন্তু মন্ত্রী তখন উপস্থিত ছিলেন না।

     স্মরণীয় যে, ১৯৪৪ সালের সম্মেলনের কথায় তারাশঙ্কর ভাষা বিষয়ে আসামে বাঙালিদের সৌভাতৃত্বে বিরোধ-বিদ্বেষের ফল্গুধারা প্রবাহিত হতে দেখেছিলেন। ১৯৫৬ সালের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণায় অসমীয়া সাহিত্যিক দেবকান্ত বড়ুয়া, বীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যদের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন—“তাঁদের মধ্যে যে উদারতা ও মানবিক প্রেম দেখেছি তার অল্প অংশও যদি সমগ্র আসামের বাঙালী-অসমীয়া জনসাধারণের মধ্যে থাকত তবে পরবর্তীকালে যে শোচনীয় ঘটনা ঘটেছে তা ঘটত না”। সেদিনে উক্ত তারাশঙ্করের এমন অভিমত বঙ্গভাষী হিসেবে আজ আমাদের আত্মসমীক্ষায় ব্রতী করেছে বলেই বিশ্বাস রাখি।     

 

১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে তারাশঙ্কর আবার আসামে উপস্থিত হয়েছিলেন—আসামের কটন কলেজের একটি অনুষ্ঠানেসেবারে তিনি—ওই কলজের অধ্যাপক এবং ধুবুড়ির বাসিন্দা ড. অজয় চক্রবর্তীর আতিথ্য গ্রহণ করে মনের আনন্দে কয়েকদিন ছিলেন সেখানে 

     ১৯৬০-৬১ সালে স্বাধীন ভারতবর্ষে আসামে বঙ্গভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তরুণ-তরুণীর শহীদদের কথা আমাদের জানা। সেই দাঙ্গার স্মৃতিচারণায় তারাশঙ্কর বলেছেন—সেদিন কোনো একটি সংবাদপত্রে এই বাঙালি নিধন বা নির্যাতন-আন্দোলনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আসামের প্রায় সবকটি রাজনৈতিক দলকেই দায়ী করেছিলেন।

     মনে রাখার কথা যে, সেই দাঙ্গার প্রভাবে কলকাতাও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

     সমগ্র শহর জুড়ে চাপা উত্তেজনা তখন থমথম করছেঅসমীয়া ছাড়াও অন্যান্য অবাঙালিদের মধ্যেও তখন শঙ্কাতুর আতঙ্ক। কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে বাংলাদেশকে অবাঙালি মুক্ত করার বিজ্ঞাপনঅসমীয়াদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলকাতায় প্রতিবাদ-সভা ডাকা হয় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে। তারাশঙ্কর ছিলেন সেই সভার সভাপতি।  সভায় উপস্থিত ছিলেন মনোজ বসু, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ত্রিদিব চৌধুরি, সিদ্ধার্থশঙ্কের রায়, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, মন্মথকুমার চৌধুরি, আসামের নেতা স্বর্গীয় অরুণ চন্দ’র পত্নী জ্যোৎস্না চন্দ প্রমুখ। সভাটির উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন—শ্রীপ্রফুল্লকান্তি বা শতদলকান্তি ঘোষ। এছাড়া কংগ্রেস বা কম্যুনিষ্ট পার্টির কোনো নেতা সভায় উপস্থিত ছিলেন নাসভার কাজ আরম্ভ হয়েছিল বরিশালের মুকুন্দদাস মশায়ের রচিত একটি গান দিয়ে। সভার হিংস্র উত্তেজনা দেখে তারাশঙ্কর প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করে সভার প্রারম্ভেই আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন—

আমাদের এই প্রতিবাদ যেন আমাদের বাঙালীর জাতীয় জীবনের ঐতিহ্যের গৌরব এবং মর্যাদাকে ক্ষুন্ন না করে। আমরা যেন রাজা রামমোহন রায়, থেকে বিশ্বমানব রবীন্দ্রনাথ এবং মহানায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্রকে মনে রেখে আজ এই সভায় আমাদের দুঃসহ দুঃখ ক্ষোভকে উপযুক্তভাবে প্রকাশ করি। একের অন্যায়ে তার জ্ঞাতি বা আত্মীয়কে নির্যাতিত না করি।

 

     বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সভা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে দেখে হাতজোড় করে তারাশঙ্কর বলেছিলেন, আমাকে আপনারা মার্জনা করুন, কারণ সংসারে বর্বরতার প্রতিবাদে বর্বর হ’ব এই সঙ্কল্প গ্রহণ করে ঘোষণা করবার জন্য কোনো সভা সমিতির প্রয়োজন হয় না। উত্তেজিত সভা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর বিবেকানন্দবাবু বলেছিলেন, আমার শিক্ষা মহাভারতের শিক্ষা। আমার শিক্ষা—দ্রৌপদীর অপমানে দুঃশাসনের বক্ষরক্ত পান করতে বলে ভীমকে। কৌরবদের সবংশে নিধন করতে বলেবিবেকানন্দবাবুর বক্তৃতায় সভায় আবার ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। কলরব কোলাহলে হাত-পা ছুঁড়ে শাসনের আষ্ফালন শুরু হয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল তারাশঙ্কর। জ্যোৎস্না চন্দ হাতজোড় করে বলেন—“আপনারা এখানে ধৈর্য্য হারিয়ে এখানকার অসমীয়া বা অবাঙালির উপর অত্যাচার করলে আসামে আমরা আরও অধিক পরিমাণে বিপন্ন হব”। উত্তেজিত সভা হৈ চৈ করে তাঁকে রূঢ়তম বাক্যে থামিয়ে দেয়। এইভাবেই পুরো আড়াই ঘণ্টা ক্ষোভ প্রকাশের পর সভা শেষ হয় কিন্তু কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয় না এমনকি যাঁরা আসামে মারা গেছিলেন এবং লাঞ্ছিতা হয়েছিলেন তাঁদের জন্য কোনো সমবেদনাও প্রকাশ করা হয় না। মারের হাত থেকে বেঁচে মানসিক আঘাতে জর্জরিত তারাশঙ্কর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে বাড়ি ফেরেন

     আসামে অনুষ্ঠিত ঘটনাবলী সম্পর্কে বিখ্যাত বালকৃষ্ণ দত্তাত্রেয় তথা কাকা কালেলকর কোনো একটি সভায় উপদেশ দিয়ে বলেন--অহিংসাতত্ত্ব ও ধর্ম্মানুযায়ী আজ বাঙ্গালীদের দুর্যোগময় নিষ্ঠুর অতীত বিস্মৃত হয়ে অসমীয়াদের ক্ষমা করা উচিৎ; এবং তাই ভারতধর্ম্ম।

     কালেলকর সাহেব প্রবীণ দেশসেবক এবং মহাত্মা গান্ধীর সাহচর্য্য-ধন্য ব্যক্তি তারাশঙ্কর তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন; তথাপি কালেলকর সাহেবের উপদেশকে বাঙালির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি মানতে পারেননি পত্র মারফত তীব্রভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কালেলকর সাহেবের উপদেশে বিস্মিত ও ব্যথিত তারাশঙ্কর পত্রে লিখেছিলেন—অহিংসা ও সত্যধর্ম্মের প্রতি আমারও অশেষ শ্রদ্ধা এবং অনুরাগ আছেসেই দিক থেকে রামায়ণের দৃষ্টান্ত দিয়েই বলি—

     সীতাকে যেদিন পৌরাণিক অত্যাচারী হরণ করে নিয়ে যায়—সেদিন কোন দেবতা কোন ঋষি—কেউ এসে কী উপদেশ দিয়ে বলতে পারতেন—হে রামচন্দ্র যেহেতু অহিংসা ও প্রেম জগতে ও জীবনে শ্রেষ্ঠধর্ম্ম সেই হেতু তুমি অপহরণকারীকে ক্ষমা কর? কাকা সাহেব—আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন—আপনার দৈহিক অক্ষমতার কথা জানি; কিন্তু আজ যদি মহাত্মা জীবিত থাকতেন তবে কি তিনি বৃদ্ধ বয়সেও আসামের নারী শিশু ও মানুষের কাতর ক্রন্দন শোনামাত্র বৃদ্ধ জটায়ুর মত তাঁর বার্দ্ধক্য দুর্বল পক্ষ বিস্তার করে ওই অত্যাচারের স্থানে উপনীত হয়ে এই অত্যাচারীর রথের গতিরোধ করতেন না? তিনি অক্ষম হলেও ক্ষত বিক্ষত দেহে বাঙ্গালীকে সম্বোধন করে কি বলিতেন?—তোমরা—এ অত্যাচারের প্রতিরোধ কর? অথবা বলতেন—ক্ষমা কর? আর ক্ষমার কথাই বা উঠছে কেন? বাঙ্গালী কী বলেছে—বা এমন কী করেছে যাতে মনে হচ্ছে—বাঙ্গালীরা দলবদ্ধভাবে প্রতিহিংসা-জর্জ্জর হয়ে প্রতিশোধে অসমীয়াদের উপর এমনই কোন অত্যাচার অনুষ্ঠিত করতে চায়? না—তা তারা চায় নাই। তা তারা করে নাই। তাদের মনে এমন কোন নিষ্ঠুর সঙ্কল্প নাই। হিংসাকে তারা প্রশ্রয় দেয় নাই। অহিংসা ও ক্ষমা দুটি পৃথক ধর্ম্ম। অহিংসা প্রতিশোধ চায় না—কিন্তু প্রতিবিধান ন্যায় বিচার—তার ন্যাহ্য অধিকার সে চাইবে না কেন? ভারতবর্ষে অহিংসা পন্থায় পরিচালিত স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল লক্ষ্যও তো তাই। প্রতিশোধ নয় কিন্তু প্রতিবিধান—ন্যায়-ধর্ম্ম অনুযায়ী আমার দেশে আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা।

     ক্ষমা করার বিষয়ে বলেছিলেন, কাকাসাহেব—আপনি যদি প্রথমেই বলতেন যে—আজ অসমীয়াদের যারা এই অন্যায় করেছে ভারত-ধর্ম্ম অনুযায়ী তাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিৎ এবং তার পর যদি বলতেন যে, বাঙ্গালীরও ক্ষমা করা উচিৎ তবেই ঠিক বলা হত এবং আমি আপনার নিকটা কৃতজ্ঞ হতাম। কিন্তু আজও কি একজন দুষ্কৃতিকারী প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছে? অসমীয়া ভাষীদের এমন কোন সভা হয়েছে কী যেখানে সমগ্র ভারতবর্ষের সম্মুখে অকপটে অন্যায় স্বীকার করে বলেছে অন্যায়ের জন্য তারা অনুতপ্ত, সমগ্র ভারতবর্ষের নিকট তারা ক্ষমাপ্রার্থী? ক্ষমা না চাইলে ক্ষমা করার প্রসঙ্গে আসবে কিভাবে? রাজনীতিবিদ দু-একজন যা বলেছেন তার বিবেচনা ভারেতের সরাষ্ট্র–সচিবেরতাছাড়া ভারতবর্ষের জীবনে তো রাজনীতি বড় নয়। সেখানে নীতি বড়—ন্যায় বিচার বড়—ধর্ম্ম বড়—সত্য বড়।

     কাকাসাহেব—রামায়ণে অনুরূপ ঘটনা—স্মরণ করুন।

     লঙ্কা কাণ্ডের শেষ অগ্নি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণা অপাপবিদ্ধা সীতাকে নিয়ে রাম দেশে ফিরলেন এবং সম্রাট হলেন। তখন একদিকে সতী সীতা—অন্যদিকে অসন্তুষ্ট প্রজা—তারা সীতার চরিত্রে সন্দিগ্ধ। একদিকে নীতি ও সত্য অন্যদিকে রাজনীতি ও কৌশল। রাম রাজনীতির কাছে মস্তক অবনত করলেন—কৌশলকে প্রশ্রয় দিলেন। সীতাকে বনবাসে দিয়ে অন্তঃপুরে উপবনে সীতা সীতা বলে অসহায়ের মত কাঁদলেনরাম রাজ্যের গৌরব ম্লান হল, অশ্বমেধেও তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় নাই। অবশেষে ভারতলক্ষ্মী সীতা রসাতলে প্রবেশ করে ভারতভূমি রাম রাজত্বকে হাহাকারে পূর্ণ করে দিয়ে গেলেন।

     কাকাসাহেব, আমি বিংশ শতাব্দীর একজন বাঙালী সাহিত্যিক মাত্র। এই শতাব্দীতে আমরা পুরাণের সেই শতাব্দী থেকে অনেক পথ অতিক্রম করেছি—তবুও চিরন্তন প্রশ্ন এক। অহিংসা এবং জননী ভগ্নী কন্যা ভ্রাতাদের উপর নৃশংস অত্যাচার নীরবে সহ্য করা কী এক? প্রতিবিধান প্রার্থনা এবং প্রতিহিংসা প্রতিশোধ কী এক? সত্যকে শিরোধার্য করে অন্যায়কে স্বীকার করে, ক্ষমা না চাইতেই যে ক্ষমা—সে ক্ষমা—এবং অক্ষমতা ও পশুতা কি এক নয়?

 

 

কলকাতার প্রতিবাদ সভার প্রতিক্রিয়ায় তারাশঙ্কর অসুস্থ হয়ে পড়েন তথাপি চলতি হুজুগে নীরব থাকতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে চিঠি লিখে সেই মর্মান্তিক ঘটনার অবসান চেয়েছিলেন। ২১ মে ১৯৬১, প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুকে পরামর্শমূলক এক চিঠিতে তারাশঙ্কর লেখেন—

I am sure, that this tremendous but well founded faith of the people in you must be honored at all costs to ensure the stability, security and prosperity of a growing community of four hundred sixty million men and women. This is a great responsibility but you have seldom been found wanting to fulfill it.

The Silchar firing on Satyagrahis resulting in the death of nine (until today) including a teen-ager girl has reopened the wound which, so many of us wishfully thought, was healing. The eagerness of the state Government to maintain of law and order in the present case, so violently in contrast with their lasses-faire attitude last year, gives much support to the contention that State Government is determined in fragrant defiance of all  ethical and patriotic principles to liquidate all democratic opposition to their linguistic chauvinism. Must this continue without opposition indefinitely? Is the autonomy of the State so much stronger than the balancing authority of the centre?  Many like me are seeking answers to these questions in bewilderment. I again approach you with my doubts and misgivings and very respectfully suggest that there should be an open announcement at your level of the concrete measures that are proposed to be taken to re-dress the grievances of all sections of the minorities in Assam and to prevent outrages by the majority and the State Govt. It also necessary to announce the ways and means of carrying out these assurances.       

  

     কেবলমাত্র পরামর্শই নয়, নেহেরুজীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিলম্বে একেবারে সরাসরি কৈফিয়ৎ তলব করে আর এক চিঠিতে তারাশঙ্কর লেখেন—

পরম শ্রদ্ধাষ্পদ নেহেরুজী

আসামে নির্য্যাতিত বাঙালী সমাজের জন্য উৎকণ্ঠায় সমগ্র বাঙালী জাতির সহিত আমিও হৃদয়াবেগে পীড়িত। তাহা সম্বরণের সাধ্য আমার নাই। আপনি স্বকীয় মানবিকতার আহ্বানে কর্ত্তব্যের নির্দ্দেশ আসাম স্বচক্ষে পরিদর্শন করিয়াছেন। আমিও ওই মর্ম্মে আপনাকে যে অনুরোধ জানাইয়াছিলাম। তাহাও ইহাতে রক্ষিত হইয়াছে। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি ভারতবর্ষের ন্যায়বোধে দৃঢ়তা—সততা ও সাহসের আশ্রয়স্থল কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের মত অসংখ্য মানুষের সমর্থনে তাহা আজ বিশ্ববন্দিত। তাই আপনি আসামের জনসভায় যে সমস্ত উক্তি করিয়াছেন তাহা অসুস্থ রুগ্ন অবস্থাতেও সযত্নে শ্রদ্ধার সহিত পড়িয়াছি বুঝিতে চাহিয়াছি। শুধু আমি নই—সমস্ত বাঙালী জাতিই চাহিয়াছে। আপনি পূর্ব্বে কলিকাতার জনসমাজের আবেগ-প্রবণতার সমালোচনা করিয়াছেন—সেই জনসমাজ কি অসীম ধৈর্য্য ও সংযমের সহিত শোকদিবস পালন করিয়াছেন তাহা অবশ্যই লক্ষ্য করিয়াছেন। আপনি আসাম যাইতেছেন—এটাই ছিল এক্ষেত্রে বাঙালীর বড় প্রত্যাশা। আপনি আসামের জনসভায় বলিয়াছেন—কংগ্রেস কর্ম্মীদের কর্ত্তব্য কর্ম্মীরা যথোপযুক্তভাবে পালন করেন নাই—তাহাতে কর্ম্মীরা গুঞ্জন তুলিয়াছে। তাহা লক্ষ্য করিয়াছি। মনে মনে বলিয়াছি—মানুষের স্বার্থান্ধতা যখন স্থির মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ এবং বিবেকের বাণীতে উগ্র হইয়া প্রতিবাদ তোলে তখন মানুষের যে আত্মিক সর্ব্বনাশ হয়—আসাম কংগ্রেসের তাহাই ঘটিয়াছে। কারণ আপনি আজও কংগ্রেসের স্থির মস্তিষ্ক স্বরূপ। তাহার বিবেক বাণী আপনার কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়। ভারতবর্ষ—একবার ধর্ম্মবিদ্বেষ ... [ছিন্ন] খণ্ডিত হইয়াছে—আবার ভাষা-বিদ্বেষের বিষময় ছূরিকা সূত্রপাত আসামে অসমীয়ারা টানিলেন তাহাতে সেই সূত্র বিরাট ফাটলে পরিণত হইয়া ভারতবর্ষকে কত খণ্ডে কত মর্ম্মান্তিক কলহে দীর্ণ করিবে তাহা—সংবিধান সম্মত চৌদ্দটি ভাষার সূচী অনুযায়ী চৌদ্দটি কলহেই শেষ হইবে না।

     আপনি বলিয়াছেন—আসামে অসমীয়া ভাষাই—প্রাদেশিক ভাষা হওয়া উচিৎএ কথাও আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনা করিয়া গ্রহণ করিতে চেষ্টা করিয়াছি। বিক্ষুব্ধ বিচারপ্রার্থীর মনস্তুষ্টি করিয়া বিচার হয় না মানি—তাহাও আমরা অন্তত আমি বলি না। বি. ..[ছিন্ন] এম. আর—সির প্রস্তাব সম্মুখে রাখিয়া বলি—যে যেখানে অসমীয়া ভাষা শতকরা ৭০ জনের ভাষা হওয়া দূরে থাক—মাত্র ৪০ জনের ভাষা—এবং বাঙলা যেখানে অন্তত ২৪/২৮ জনের ভাষা সেখানে তাহা মানি কি করিয়া? এখানে ১৯৪১।৫১ সালের আদমসুমারীর বৈচিত্র কথা উল্লেখ না করিলে এ বক্তব্য সম্পূর্ণ হয় না। এই দশ বৎসরে অসমীয়া ভাষার বৃদ্ধি ... [ছিন্ন] একমাত্র যাদুবিদ্যার প্রভাব ব্যতিরেকে ... এবং যাদুবিদ্যায় যাহা সম্ভব কঠোর বাস্তব বিচারে তাহাকে ... তাহা সম্ভবত আদম সুমারীর কর্ত্তাদের মন্তব্যেও স্বীকৃত হইয়াছে। অবশ্য পরে আপনি বলিয়াছেন—সকল সম্প্রদায় মিলিয়া এ সমস্যার সমাধান করিবেন--এবং ৩১ শে জুলাই অসমীয়া ছাত্রবৃন্দের সভায়—ভাষা সপ্তাহ কার্য্যকর্ম্ম নির্ণয়ে যদি হিংসাত্মক পন্থা গৃহীত হয় তবে সমস্ত শিক্ষা প্রাথমিকভাবে বন্ধ করিয়া দিবেন বলিয়াছেন। ইহা অবশ্যই আমাদিগকে কথঞ্চিৎ সাহস দিয়াছে। আপনি আসামে তিন সপ্তাহ সময় দিয়াছেন—নিরাপত্তা সূচক মনোভাব সৃষ্টি করিয়া নিপীড়িত পলায়িত বাঙালীদের ফিরাইয়া আনিবার জন্য। কিন্তু তাহা সৃষ্টি হইল কিনা—বাঙালী ফিরল কিনা—নিজেদের নিরাপদ ভাবিল কিনা—কে বলিয়া দিবে? বর্ত্তমান আসাম সরকার?

     যাহারা এতবড় নির্ম্মম অত্যাচারে বাঙালীকে উৎখাৎ করিতে গিয়া ভারতবর্ষে ভাষা সমস্যা লইয়া ঐক্যকে বিপন্ন করিবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করিল—তাহার বিচার হইল কই?

     তিন সপ্তাহে যদি বাঙালী না ফিরিতে সাহস করে তবে কি বাঙালী দায়ী হইবে? আজ রোগশয্যায় শুইয়া—সমস্ত চিন্তাকে একত্র করিয়া কূল পাইতেছি না—আপনাকেই প্রশ্ন করিতেছি আমরা কি করিব? তিন সপ্তাহ পর—আপনি কি করিবেন?

ইতি

শ্রদ্ধানত

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

----------------------

 

 

ড. দেবাশিস মখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি

বীরভূম-৭৩১১০২, পশ্চিমবঙ্গ

মোবাইল—৯২৩৩১২৪৭১৮

ইমেল—debashismukherjee67@gmail.com

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের বই


তারাশঙ্করজীবনী খণ্ড ১

দেবাশিস মুখোপাধ্যায় 

সেতু প্রকাশনী, কোলকাতা


তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্রোত্তর ভারতীয় কথাসাহিত্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র; অনেকের মতে বঙ্গসাহিত্যের চতুর্থ সম্রাট। তিয়াত্তর বছরে পূর্ণ তাঁর জীবনে গল্প-উপন্যাস সৃষ্টির সঙ্গে নাট্যকার ও নাট্যাভিনেতার কৃতিত্বময় তারাশঙ্কর পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী থেকে স্বাধীন দেশের বিধানসভা ও রাজ্যসভায় সদস্য এমনকি বহির্ভারতে ভারতবর্ষের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার স্বাক্ষরও রেখে গেছেন। তারাশঙ্করের মূল উদ্দেশ্য দেশসেবা আর সাহিত্য হল তার মাধ্যম। সাহিত্যপথে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ এবং বিবেকানন্দের আদর্শ অনুসরণে ভারতভাবনার পথিক। বাঙালি পাঠকের আক্ষেপ ছিল- বঙ্কিমচন্দ্রজীবনী আছে, রবিজীবনী আছে কিন্তু তারাশঙ্করজীবনী নেই। তিন দশকের অধ্যয়ন ও অনুশীলনে গ্রন্থকার বাঙালি পাঠকের সেই আক্ষেপ মোচনের সূচনা করলেন-এই গ্রন্থের মধ্য দিয়ে। তারাশঙ্করজীবনের প্রথম আঠারো বছরের ধারাবাহিক কাহিনি নিয়ে তারাশঙ্করজীবনী প্রথম খণ্ড বইটি সম্পূর্ণ হয়েছে। তারাশঙ্করজীবনী বাংলা জীবনীসাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন সংযোজন।

এক বা আরও বেশি ব্যক্তি এবং যে টেক্সটে 'তারাশহ্করজীবনী জীবনী খন্ড খন্ড১ ٢ দেবাশিস মুখোপাধ্যায়' লেখা আছে-এর একটি ছবি হতে পারে
Setu Prakashani