তাঁর জননী তাঁর
দীক্ষাগুরু
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
দীক্ষা
মানে মন্ত্রগ্রহণে দেহের সূচিতা নয়; তাঁর মতে—“জীবনে বিশেষ একটি মতবাদে বিশ্বাস
স্থাপন করাটাই দীক্ষাগ্রহণ এবং সেই মতবাদসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবন ও জগৎকে দেখা,
বুঝতে পারা এবং সেই মতবাদ অনুমোদিত পন্থায় নিজের জীবনযাত্রা নির্বাহ করাই হল জীবন
সাধনা”।
নিজের দীক্ষা সম্পর্কে এমন অভিমত দিয়েছিলেন
কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক ব্যাকুলতা নিয়ে অনেক মন্ত্রগুরুর কাছে আবেদনের পর ১৮৫৪
সালে ছাপান্ন বছর বয়সে তারাশঙ্কর তাঁর জননী প্রভাবতীদেবীকে গুরুর আসনে বসিয়ে
প্রচলিত প্রথায় দীক্ষামন্ত্র গ্রহণ করেন। তাঁর জননী তাঁর দীক্ষাগুরু। পিতা ও মাতা শ্রেষ্ঠ
গুরু এমন কথা আমরা মুখে বলি কিন্তু তারাশঙ্কর বাস্তবিক নিজের জীবনে তা প্রমাণ করে
দেখিয়ে গেছেন। প্রায় বৃদ্ধ বয়সে সারস্বত সাধনার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত তারাশঙ্করের
দীক্ষা গ্রহণের এই দৃষ্টান্ত—দীক্ষা পথে বিশ্বাসী বঙ্গের তথা ভারতবর্ষের প্রতিটি
মানুষের কাছে তুলে ধরার মতো এক উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা বলেই মনে করতে হয়। কিন্তু মনে
রাখতে হবে যে, সরাসরি কোনো আকস্মিক আবেগে তারাশঙ্কর তাঁর অন্তর্জীবন গঠনের এমন
গুরুত্বপূর্ণ মৌল সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেননি। জননীর কাছে দীক্ষা গ্রহণের সময়
পর্যন্ত তারাশঙ্করের গুরু অনুসন্ধানের ধারাবাহিক একটা চিত্র রয়েছে। সেই চিত্র
দর্শনে জানা যায়, বাস্তবিক অনুসন্ধানের একাধিক পারাবার পার হয়ে এমন শুচিসিদ্ধ মানস
সরোবরে স্নাত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর।
১
১৯২৯
সালের আষাঢ় মাস, তারাশঙ্করের বয়স একত্রিশ বছর;
জাতীয় আন্দোলনে তখন তিনি তাঁর অঞ্চলের এক অন্যতম নেতা। সেই সময়কালে সংঘটিত আকস্মিক
এক তন্ময়তার সূত্র ধরে তারাশঙ্কর তাঁর জীবনে প্রথম গুরুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব
করেন। একদিন একজন আত্মগোপনকারী রাজনৈতিক কর্মী তাঁর সঙ্গে
গোপনে দেখা করতে আসার কথা জানিয়েছিলেন। সন্ধ্যার ট্রেনে নামবেন। আষাঢ় মাসে
কৃষ্ণপক্ষের রাত্রে আগন্তুকের অপেক্ষায় তারাশঙ্কর ধ্যানমগ্ন হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে
ছিলেন। ট্রেন চলে যাওয়ার পর অনেক রাত্রে সর্বাঙ্গ আবৃত কোনো ব্যক্তিকে আসতে দেখেন
তিনি। আগন্তুক তারাশঙ্করের সামনে মুহূর্তমাত্র দাঁড়িয়ে আবার চলতে শুরু করেন। তাঁকে
অনুসরণ করে এক নিবিড় তন্ময়তায় তারাশঙ্করও চলতে থাকেন। বর্ষার গভীর অন্ধকার
রাত্রি—শেয়াকুল কাঁটার জঙ্গল, নেকড়ে এবং ভয়ানক সাপের ভয়কে তুচ্ছ করে আগন্তুকের
সঙ্গলাভ তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য। পথে
হঠাৎ করে শেয়াকুল কাঁটায় আটকে তাঁর তন্ময়তা ভঙ্গ হয়। দেখেন ধারেপাশে কেউ তো নেই।
নিজেকে প্রশ্ন করেন—কাকে দেখলাম? কি দেখলাম? পরে জানতে পারেন যাঁর আসার কথা ছিল
তিনি আসেননি। তারপর কতদিন সন্ধ্যায় সেই স্থানে গিয়ে তাঁর প্রতীক্ষা করেছেন
তারাশঙ্কর কিন্তু তাঁর দেখা পাননি। দেখা না পেলেও তারাশঙ্কর বলেছেন, “তার কিছু ফল
সে আমাকে দিয়ে গিয়েছে। সে ফল ‘তন্ময়তা’ যোগ। তার আস্বাদ আমি পেয়েছি। আমার
সাহিত্যজীবনে সাধনকর্মে সে-ই আমার সবচেয়ে বড় সম্বল”। পরে ঘটনার কথা শুনে
তারাশঙ্করকে তাঁদের গুরুবংশের সতীশ ভট্টাচার্য বলেছিলেন—“তোমার জীবনে সেদিন একটি
পরম লগ্ন এসেছিল। তোমার দীক্ষা হয়ে থাকলে তুমি সেদিন পরমবস্তু পেতে পারতে”।
সেই তন্ময়তার সূত্রেই বোধ হয় দীক্ষার কথা
ভেবেছিলেন তারাশঙ্কর। তাঁদের পারিবারিক কুলগুরুর শেষপুরুষ সতীশ ভট্টাচার্য ছিলেন
তন্ত্রপথের মানুষ এবং কালীকুলের সাধক। তাঁর কাছেই প্রথম দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই কুলগুরুর
তল্পি বহন করেছেন, তারাপীঠ শ্মশানে তাঁর চক্রাসনের যোগাড় করে দিয়েছেন। সতীশ ভট্টাচার্য তাঁকে
বলেছিলেন—শক্তিমন্ত্রে তোমাকে দীক্ষা নিতে হলে ‘তারা’ মন্ত্রে নিতে হবে।
শক্তিমন্ত্রে তারাই হলেন সরস্বতী। তারার অপর নাম হল—নীল সরস্বতী। কালী হলেন
মহালক্ষ্মী। কুলগুরুর এই কথা মেনে নিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। মনে করেছিলেন—‘শক্তিমন্ত্রে
দীক্ষাই যদি নিই, তবে এই মন্ত্র ছাড়া আর কোন মন্ত্র আমি নিতে পারি?’ কিন্তু সতীশ
ভট্টাচার্য তারাশঙ্করকে ‘তারা’ মন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণের কথা বললেও দীক্ষা তাঁকে
দেননি। বলেছিলেন—‘এ-পথে তোমার তৃপ্তি হবে না বাবা’। তারাশঙ্কর তখন সাহিত্যচর্চা
করলেও রাজনীতির দিকেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। এই জন্যই বোধ হয় তিনি জানিয়েছিলেন—
তোমার মন ছুটেছে আলাদা সড়ক ধরে।
তার দুধারে বাড়ি, কাতারে কাতারে লোক। এ পথ যে জনমানবহীন পথ। আর দশজন যেমন, তোমার
ধাত তেমন হলে আমি ‘না’ করতাম না। দিতাম কানে ফুঁ। ব্যবসা, তেজারতি, চাষ,
মামলা—দেওয়ানি ফৌজদারি করে ঘরে ফিরে কাপড় ছেড়ে আসনে বসে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে
বীজমন্ত্রটি স্মরণে এনে জপে বসে যেতে ; কারণের বোতল পেলেই ‘কালী কালী বল মন’, ‘জয়
তারা’ বলে অকারণে চক্রের নামে কুচক্রে বসে যেতে। বাবা, আমরা তান্ত্রিক বামুন
পণ্ডিত লোক, ইংরেজি মত বুঝি না, মনে করি—ওতে ইহলোকের খুব ভালো মন্ত্র আছে। একশোটা
ধনদা-কবচ ধারণ করলে যা না-হবে, ওই মতে দীক্ষা নিলে তাই হবে। তবে ও মন্ত্রে তার পর
এগিয়ে যাওয়া বড়ো কঠিন। যারা
চেষ্টা করে, তারা প্রায় দেখি নাস্তিক হয়ে যায়, তুমি বাবা সেই পথ ধরেছ। খানিকটা না
এগুলে তোমার যে কী মতি হবে, তা তো বুঝতে পারছি না। যারা একপা এ-পথে, একপা ও-পথে
ফেলে চলে, ইহকালের জন্যে ইংরিজি মত আর পরকালের জন্যে দেশি মত ধরে, তাদের ধরণের
মানুষ তুমি নও। কাজেই মন্ত্রদীক্ষা এখন তোমার নেওয়াও উচিত নয়; আমার দেওয়াও উচিত নয়। আগে তোমার মন স্থির হোক।
কুলগুরুর উপদেশ
তারাশঙ্করের মনে রেখাপাত করেছিল। সাময়িক নীরব হয়েছিলেন তিনি।
৩
১৯৩২
সালে তারাশঙ্করের ছ-বছরের একটি কন্যা মারা যায়। কন্যাশোকের ব্যাকুলতা তারাশঙ্করকে
বিভ্রান্ত করে তোলে। বিদীর্ণচিত্ত তারাশঙ্কর আত্মার শান্তি কামনায় আবার গুরুর
সন্ধান করেছিলেন। তখন সদ্য আলাপ হয়েছিল তন্ত্রমার্গের
বিজ্ঞ মানুষ কবি মোহিতলাল মজুমদারের
সঙ্গে। দু-একবার ঢাকার বাড়িতে গিয়েও মোহিতলালের সাধনার আসন দেখে এসেছিলেন
তারাশঙ্কর। তাঁর চরিত্র, তাঁর সাধনার নিষ্ঠা, জীবন ও জগৎ-রহস্য
উদ্ঘাটন করে তার লীলা প্রত্যক্ষ করার বিচিত্রদৃষ্টিতে তারাশঙ্কর এতটাই প্রভাবিত
হয়েছিলেন যে মোহিতলালের কাছে দীক্ষা নেওয়ার বাসনা জাগে তাঁর। চিঠিতে লিখেছিলেন—আমি দীক্ষা গ্রহণের জন্য গুরু অনুসন্ধান করছি।
আপনি কি আমাকে দীক্ষা দিতে পারেন?
মোহিতলাল জেনেছিলেন তারাশঙ্করের
শক্তিতন্ত্রের উপাসক বংশের সন্তান। সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন—‘আপনি নিজে তন্ত্রসাধনা
করেছেন?’
তারাশঙ্কর উত্তর দিয়েছিলেন—‘দীক্ষা হয়নি, তবে
গুরুর তল্পি বয়ে বেড়িয়েছি’।
তারাশঙ্করের রাজনৈতিক জীবনের কথা শুনে
অপ্রসন্ন মোহিতলাল বলেছিলেন, “এ-পথে চলতে হলে ও-সংস্রব চলবে না। ধর্ম নইলে মানুষ
বাঁচে না, প্রতিটি মানুষেরই একটা-না-একটা ধর্ম আছে, কিন্তু যারা ধর্মপ্রচারক হয়
তারা নিজেরাই ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট, ধর্মকে প্রতিষ্ঠা দিতে হয়—নিজের অন্তরে দাও। অন্যের
অন্তরে তাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার চেষ্টা যখনই করবে তখনই হবে অধর্ম! তাছাড়া, রাজনীতি
হল সাময়িক—কালে কালে পাল্টায়, কিন্তু সাহিত্যধর্ম শাশ্বত।”
একবার জানতে চেয়েছিলেন—‘কারণ করেছেন কখনও?
তারাশঙ্কর জানিয়েছিলেন—না। সে করিনি। আমাদের
কুলগুরু আমার মানসিক গতি দেখে নিষেধ করে বলেছিলেন, সে-মন তোমার নয়। মনের গতির
পরিবর্তন না হলে এ-পথে পা দিয়ো না। তারাপীঠে চক্রাসনের কথা বলেছিলেন তারাশঙ্কর।
বলেছিলেন চক্রের পাশে বসে চক্রের উপকরণ জুগিয়েছি। চক্র দেখেছি। তারাপীঠের সাধকদের
চক্রের কথা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন মোহিতলাল। বলেছিলেন—‘অদ্ভূত ব্যাপার’। পরে
ঢাকা থেকে চিঠিতে তারাশঙ্করকে লিখেছিলেন—আপনার উপর প্রত্যাশা রাখি, তাই চিন্তাও
হয়। যে সর্বনাশা ছোঁয়াচ একবার আপনার লেগেছিল তা সহজে মানুষকে রেহাই দেয় না। বার
বার সাবধানবাণী উচ্চারণ করছি সেই কারণে।
সামাজিক ভাবে মোহিতলাল ছিলেন বৈদ্য। ব্রাহ্মণ সন্তানের বৈদ্যগুরুর কাছে দীক্ষা নিতে
চাওয়া সামাজিকতায় অবৈধ। একমাত্র সন্ন্যাসী গুরুর ক্ষেত্রে সেই বাধা থাকে না। কারণ,
সন্ন্যাসীর জাতি নেই, বর্ণ নেই, ইহলোক-পরলোক কিছুই নেই—আছে শুধু তপ এবং সাধনা। সেই
তপ এবং সাধনা তাঁর কাছে সকলেই গ্রহণ করতে পারে, তিনিও বিতরণ করতে পারেন। বিকৃত
বর্ণাশ্রম ধর্মের গণ্ডিকে লঙ্ঘন করার মতো সাহস ও ইচ্ছা তারাশঙ্করের ছিল। আবার
জ্ঞানযোগে মোহিতলালের দৃষ্টির গভীরতা, ধ্যানযোগের মতো সাহিত্যতন্ময়তা, নিজের মতের
দৃঢ়তা, জগৎ ও জীবন ব্যাখ্যায় সূচিতা ও অসূচিতার ঊর্দ্ধস্তরের অনুভূতি অথচ তার
প্রকাশে জ্যোতির্ময় পবিত্রতার ধারণা, সাধনফল সম্পর্কে নির্লোভ অনাসক্তি দেখে
মোহিতলালকে একজন গৃহী সন্ন্যাসী বলেই মনে হয়েছিল তারাশঙ্করের। সেই ভেবে মোহিতলাল
মজুমদারের কাছেই দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন তারাশঙ্কর। মোহিতলাল সম্মত হননি। চিঠিতে
লিখেছিলেন—দীক্ষা নিয়ে কী করবেন? দীক্ষায় আমার নিজের কোনও বিশ্বাস নাই। আমার
দীক্ষা সাহিত্যের দীক্ষা, সে মন্ত্র আপনি স্ফুরিত হয়। অন্তরে বীজ থাকলে সাধনার
উত্তাপে নিষ্ঠার অভিসিঞ্চনে সে বীজ আপনি উপ্ত হবে, মন্ত্র-চৈতন্য আপনি ঘটবে।
বিষণ্ণ তারাশঙ্কর দীক্ষার বিষয়ে মোহিতলালকে আর কখনও কিছু লেখেননি।
তন্ত্রে বিজ্ঞ মোহিতলাল মূলতঃ সাহিত্যিক। মোহিতলালের
কাছে তারাশঙ্কর সারস্বত-তন্ত্রমতে দীক্ষা নিতে চেয়েছিলেন। এই রীতি ভারতবর্ষের প্রাচীন
রীতি। মহাকবি বাল্মীকি এবং মহর্ষি বেদব্যাসের জীবন থেকে তার আভাস পেয়েছিলেন তারাশঙ্কর। এ বিষয়ে তাঁর অভিমত—“তাঁদের জীবনে যে-পরিশুদ্ধতা, যে-প্রসন্নতা,
যে-শান্ত কাঠিন্য আমরা দেখতে পাই, তাঁদের যে মহর্ষিত্ব স্বীকারে কোনো সংশয় জাগে
না, তার একটি সাধনপন্থা নিশ্চয় আছে। সে পথ ও সে-তন্ত্র পরবর্তীকালে যেন হারিয়ে
গেছে। কালিদাস মহাকবি, কিন্তু মহর্ষি আখ্যা পাননি। অথচ নতুনকালে রবীন্দ্রনাথ
ঋষিত্ব অর্জন করলেন আমাদের চোখের সামনে”। দীক্ষা সম্পর্কে
তারাশঙ্করের এই অভিমত জ্ঞানযোগের পথে
পরিশুদ্ধ। মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে ভক্তত্ব অর্জনের সাধনা ছিল কিন্তু ‘খাঁটি সরস্বতী-তন্ত্রমতে
সাধনা তাঁদের মূল সাধনা ছিল না’। বাংলাদেশে নবজাগরণের সময় সারস্বত-তন্ত্রের
পুনরুত্থান হয়েছে। সেই পথ অবলম্বনেই বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ঋষিত্ব অর্জনের
স্বীকৃতি পেয়েছেন। সেই পথের প্রত্যাশা নিয়ে তারাশঙ্কর সেই সারস্বত-তন্ত্রের পথই
অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন। দীক্ষার পথে তিনি জানতে চেয়েছিলেন জন্ম-মৃত্যুর রহস্যকে—বায়োলজি
এবং মেডিকেল সায়েন্সের পরও যা আছে তাকে অনুভব করতে চেয়েছিলেন তিনি। অন্তত মৃত্যুর
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চিত্তের আনন্দ অনুভবের শক্তি অর্জন করতে চেয়েছিলেন। জ্ঞানযোগে দীক্ষার এই
পথ, মানব-জীবনের মধ্যে থেকেই ঋষিত্ব অর্জনের পথ। সারস্বত পথে তারাশঙ্করের
সময়কালে রবীন্দ্রনাথ তো স্বমহিমায় বিরাজমান ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের
কাছে যাওয়ার মতো সাহস তাঁর হয়নি।
৪
কন্যা-বিয়োগের
ফলে যে-নিদারুণ আঘাত তারাশঙ্কর পেয়েছিলেন তাতে তাঁর মনের গতির কাঁটা উদভ্রান্তের
মতো পাক খাচ্ছিল। মনে তখন দারুণ তৃষ্ণা জেগেছিল পরলোকতত্ত্ব জানাবার। প্রায় নিত্যই
গ্রামের শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন। একদিন সন্ধ্যায় শ্মশান থেকে ফিরে আসার পথে গ্রামের অট্টহাস
মন্দিরে সীতারাম নামে এক সন্ন্যাসীর দেখা পেয়ে তারাশঙ্কর তাঁর কাছেও দীক্ষার আবেদন
জানিয়েছিলেন। তিনি তান্ত্রিক নন, বৈষ্ণব নন, খাঁটি যোগী—এবং সাগ্নিক তপস্বী।
সন্ন্যাস গ্রহণের দিনে যে হোমকুণ্ড প্রজ্জ্বলিত করে দীক্ষা নিয়েছিলেন সেই অগ্নিকে
তিনি একমাত্র স্নান, আহার ইত্যাদি জৈব-কৃত্যের সময় ছাড়া, অহরহই স্পর্শ করে থাকেন। তারাশঙ্কর দেখেছিলেন—“একখানা পাথরের উপর পা
রেখে সেই জ্বলন্ত কাঠখানি হাতে সন্ন্যাসী দাঁড়িয়ে আছেন, অধীরতা নেই একবিন্দু, চেয়ে
রয়েছেন রক্তিম আকাশের দিকে।” এই সন্ন্যাসীকে দেখে তারাশঙ্করের মনে দীক্ষা
গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা আবার প্রবল হয়ে ওঠে। তাঁকে প্রার্থনা জানান, বাবা, আমার চিত্ত বড় অশান্ত,
দীক্ষার জন্য আমি ব্যাকুলতা আনুভব করি। আপনি আমাকে দীক্ষা দেবেন?
সন্ন্যাসী
সরব উত্তর না দিয়ে ঠোঁট দুটি নেড়ে বুঝিয়ে ছিলেন—সুধা রাখতে হলে স্বর্ণপাত্র চাই
বাবা, মৃৎপাত্রে হয় না। সন্ন্যাসীর
কথায় আহত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর। নিজেকে
প্রশ্ন করেছিলেন—
কি হবে আমার সেই সুধায় যে সুধা
স্বর্ণপাত্র ব্যতীত ক্ষয় হয়, দূষিত হয়? যে অমৃত মৃৎপাত্রকে অক্ষয় এবং সূচি করতে না
পারে, সে আবার অমৃত কিসে?
আর আমিই বা মৃৎপাত্র কিসে?
রক্তমাংসের এই জরা-মরণশীল দেহের
আধারে আমার আত্মা যে তপস্যার হোমাগ্নি জ্বেলেছে তার স্বরূপ তো আমি জানি। সে সম্পদ
চায়নি, সে তো স্বার্থ চায়নি, সুখ চায়নি, সে হোমাগ্নি আমার জীবনকে দহন করছে, সুতরাং
আমি মৃৎপাত্র কিসে? কেন?
এই ঘটনার
কয়েক মাস পর অসুস্থ সন্ন্যাসীকে সুস্থ করে তোলার জন্য গোপালদাসী নামে তাঁর এক
মহিলা ভক্ত তাঁদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময় সন্ন্যাসী খোঁজ করেছিলেন
তারাশঙ্করের। অনিচ্ছুক তারাশঙ্করকে তাঁর মা সঙ্গে করে গোপালদাসীর ঘরে সন্ন্যাসীর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। প্রদীপ জ্বালছে গোপালদাসী। তারাশঙ্করের উপস্থিতির কথা শুনে
প্রসন্ন কণ্ঠে সন্ন্যাসী বলেছিলেনন—এসেছ? বলেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে অগ্রসর হয়ে আসেন
এবং তাঁর দীর্ঘ দুই হাত বাড়িয়ে তারাশঙ্করের দক্ষিণ হাতখানি টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলেন—তোমার
কাছে আমার অপরাধ জমা হয়ে আছে। তুমি আমাকে মার্জনা কর। সন্ন্যাসীর কথা শুনে গোপালদাসীর হাতে থেকে সদ্যজ্বালা প্রদীপটি
মেঝেতে পড়ে নিভে যায়। ঘরখানা অন্ধকারে ভরে ওঠে। সন্ন্যাসীর কথার সঙ্গে
সঙ্গে সমস্ত ঘরখানা স্তব্ধতায় যেন স্তম্ভিত হয়ে যায়। সেই মাহেন্দ্রলগ্নে পরম প্রাপ্তির স্মৃতিচারণায়
তারাশঙ্কর বলেছেন—
আমি যেন মুহূর্তে মুহূর্তে
হারিয়ে ফেলছি আমাকে। আমার অন্তরের মধ্যে প্রচণ্ড কম্পনে সব যেন ভেঙেচূড়ে ধূলিসাৎ
হয়ে যাচ্ছে। আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘকায় অশীতিপর সন্ন্যাসীর মাথা যেন
ঊর্ধ্বলোক থেকে সস্নেহে আনত হয়ে আমার মস্তক আঘ্রাণ করছেন বলে মনে হল।
বোধ হয় মিনিট খানেক, তার বেশি
নয়, কিন্তু আমার স্মৃতিতে সে যেন একটা কাল মনে হয়েছিল, যেন জন্ম-জন্মান্তরের
তপস্যার সিদ্ধিফল আমার হাত ধরে এসে দাঁড়িয়েছিল।
সন্ন্যাসী নিজে আমাকে বুকে টেনে
নিয়ে বিচিত্রভাবে আমাকে পরাজিত করলেন। সে-পরাজয়ে যে-আনন্দ, তার আস্বাদ আজও আমার অন্তরলোকে অমৃতের মতোই অক্ষয় হয়ে আছে।
তাঁর প্রসঙ্গ আমার জীবনকে ধন্য করে দিয়েছে। সে অমৃতে সেদিন আমার সকল অশান্তির দাহ
জুড়িয়ে গিয়েছিল।
তিনি আমাকে দীক্ষার কথায়
বলেছিলেন, দীক্ষার জন্য অধীর হয়ো না। জীবনে যার সাধনা থাকে, তার গুরু আপনি আসেন।
তোমার গুরু আসবেন। তোমার সাধনা তুমি করে যাও। শুনেছি, তুমি জ্ঞানের সাধনা কর। তার সঙ্গে
এই রকম কর্মের সাধনা করো। নইলে পূর্ণ হবে না সাধনা। আমি তখনকার মতো গুরুর সন্ধানে বিরত
হলাম। রত হলাম সাহিত্যসাধনায়।
গোপালদাসী পুনরায়
প্রদীপ জ্বালালো। সন্ন্যাসী স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে
তারাশঙ্করকে বললেন—সেদিন তোমাকে দীক্ষা দিলে আমি ভুল করতাম। না হত তোমার প্রকৃতিগত
পথে সাধনায় সিদ্ধি না হত মন্ত্রজপে পরিতৃপ্তি। দীক্ষা তোমার হয়ে গিয়েছে। যদি
কোনোদিন এ দীক্ষায় সাধন তোমার অসাধ্য হয়, সেদিন গুরু তোমার কাছে আপনি আসবে। বিগলিত
হলেন তারাশঙ্কর। জীবনে তাঁর যেন অমৃত প্রাপ্তি ঘটল। রাত্রে নিশ্চিন্তে ঘুমালেন।
পরের দিন সকালের স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছেন—
সকালে উঠলাম। মনে হয় এমন প্রসন্ন
জীবন দীর্ঘকাল আমি পাইনি। জীবনের
ক্ষোভ অভিমান শোক শান্ত হয়ে গেছে, মিলিয়ে গেছে, জুড়িয়ে গেছে। বুলু যেন হারায়নি।
কেউ যেন কখনও আমাকে দুঃখ দেয়নি। এমনি প্রসন্ন জীবন ফুলেভরা বাগানের মতো আনন্দে
তৃপ্তিতে ঝলমল মন। এমন পাওয়া কখনও আমি পাইনি। ...
আমার যে কন্যার শোকে আমি প্রায় উদাসী
হয়ে উঠেছিলাম, মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব এবং রহস্য অনুসন্ধানের অভিপ্রায়ে
সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা শ্মশানে কাটিয়ে এসেছি অথচ কোনো সন্ধানই পাইনি, যে অবস্থাটা
বলতে পারি শোকাচ্ছন্নতা শাস্ত্রমতে যা নাকি মূঢ়তার সামিল—তাই থেকে মুক্তি পেলাম—এক
পূর্ণিমা রাত্রের অমৃত আস্বাদনে।
এই সাগ্নিক সন্ন্যাসী কন্যাশোকে বিদীর্ণচিত্ত
তারাশঙ্করের জীবনে এক আলোকবর্তিকা। এই সন্ন্যাসীর কাছেই তারাশঙ্কর শুনেছিলেন
তন্ত্রসাধনার মূল রহস্যের কথা।
৫
ওই ঘটনার পর কুড়ি-বাইশ বছর
তখন কেটে গেছে। প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতির তুঙ্গে অবস্থানকারী তারাশঙ্করের মন তখন আবার
নিয়ত অশান্তির অনলে দগ্ধ হয়। পুজোপাঠে শান্তি আসে না। মনে হয়—
কি চাই? কে আমি? জীবনের উদ্দেশ্যটা কি? মনে হয় আত্মমগ্নতায়
আনন্দ নেই—তন্ময়তায় আছে। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন তন্ময়তার সেই তৎটি কি?
নিরন্তর এই যন্ত্রণায় উদভ্রান্ত তারাশঙ্কর
বুঝেছিলেন—তাঁর উদ্বোধিত চৈতন্যলোকে মেধার কোনো মূল্য নাই; বুদ্ধির অতিরিক্ত
একমাত্র বোধ ও বোধির দ্বারা সেখানে অনুপ্রবেশ সম্ভব। তখন অন্তরে এক ‘তুমি’র
অস্তিত্ব উপলব্ধি করেছেন তিনি। সেই সময় তাঁর জীবনে ঘটেছে এক অলৌকিক ঘটনা। মুর্শিদাবাদে কাঁদির রাজবাড়িতে আমন্ত্রিত
তারাশঙ্কর দেবালয় প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে নিজের কানে শুনেছেন—দেববিগ্রহ রাধামাধব তাঁর
নাম ধরে ডাকছেন। এই ঘটনা তাঁর অন্তরের অন্তপুরে এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব এনে দেয়। সেই
সময়ে নিজের মানসিকতার কথা জানিয়ে তারাশঙ্কর বলেছেন—
মন তখন এত অধীর, এত চঞ্চল, এত
তৃষ্ণার্ত যে কোথায় আমার জীবনের প্রশ্নের উত্তর, কোথায় কিসে আমার তৃপ্তি সেই চিন্তায়
আমি এত একক, এত উদভ্রান্ত যে সমস্ত সংসারের সঙ্গে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। গোটা সংসার ভাবছেন আমি থেকেও নেই, আমি পর হয়ে গেছি।
গোটা সংসারের প্রতিনিধি হিসেবে আমার পত্নী আমাকে প্রচণ্ড ব্যাকুলতায় আঁকড়ে ধরতে
চাইলেন। শত প্রশ্ন তাঁর।–কেন এমন হয়ে গেলে তুমি? কি চাও তুমি? কি ভাব তুমি? আমি কি
উত্তর দেব? যে উত্তরহীন প্রশ্ন আমাকে এমনভাবে অধীর অস্থির একান্ত বিচ্ছিন্ন একক
করেছে সে প্রশ্নের কথা উত্তর হিসেবে বললেও সে উত্তর তো উত্তর নয়। সে প্রশ্নই।
সুখ চাই বললে, প্রশ্ন করেন—সুখ
কিসে? শান্তি চাই বললে প্রশ্ন করেন—তাই বা কোথায়? এর উত্তর আমি খুঁজছি, আমি জানি
না, সুতরাং কি উত্তর দেব?
নিজের জীবনের অশান্তি অসুখে সারা
সংসারটাই অশান্তি এবং অ-সুখে ভরে গেল। আমার অসহ্য হয়ে উঠল।
মনের গভীর শূন্যতার কারণে সংসারের সকলের
মাঝে থেকেও তারাশঙ্কর একা হয়ে পড়েন। নীরবে জল ভরা চোখে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে
থাকেন। লেখাও প্রায় ছেড়ে দেন। মনের এই ব্যাকুলতা নিয়ে তিনি একবার কাশী চলে
গিয়েছিলেন। পূর্ব-পরিচিত এক সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর সেই অশান্ত হৃদয়কে
শান্ত করতে, জীবনে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে তারাশঙ্কর--বাড়িতে না জানিয়ে
১৯৫৪ সালের ০৬ জুলাই কাশী যাত্রা করেন। সেই তাঁর প্রথম কাশী যাত্রা। কিন্তু বড়
উদ্বেগের বিষয়, যে সন্ন্যাসীর সন্ধানের উদ্দেশ্যে নিয়েই তাঁর কাশী যাত্রা, নৌকা
করে মণি-কর্ণিকা থেকে রাজা হরিশ্চন্দ্রের ঘাট পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে তাঁর সন্ধান করে
ফিরেছিলেন তবু কোথাও তাঁর সন্ধান পাননি তিনি। সেখানে ডাক্তার মৈত্র এবং
প্রবোধ চট্টোপাধ্যায় নামে দুই বাঙালি ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তাঁর। ডাক্তার
মৈত্র’র চেম্বারে গিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। ডাক্তার মৈত্র বলেছিলেন—দেখুন, এ পথ যখন
টানছে তখন দীক্ষার দরকার। বাড়ি ফিরে গিয়ে দীক্ষা নিন। বলেছিলেন—সন্ন্যাসী চেনা বড়
কঠিন তারাশঙ্করবাবু। হাজার ছদ্মবেশির মধ্যে একজন খাঁটি প্রকৃত সন্ন্যাসীর সন্ধান
মানে গিলটির হাটে খাঁটি সোনার সন্ধান। তার থেকে গৃহী গুরু ভালো। ডাক্তার মৈত্র’র
সঙ্গে কথা বলে তারাশঙ্করের জীবন-যন্ত্রণা অনেকখানি প্রশমিত হয়েছিল। আর প্রবোধ
চট্টোপাধ্যায়কে তারাশঙ্কর বলেছিলেন—দুঃখ কি পেয়েছি জানি না; তবু অনন্ত দুঃখ আমার।
একটা কিছু ধরতে চেয়ে ধরতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন আশেপাশে লুকোচুরির মতো খেলা
খেলে আমাকে হয়রান করছে। সেটা কি, কেমন করে তাঁকে ছোঁয়া যায়, ধরা যায়, তার পথ কি
তার জন্য আমার অশান্তির শেষ নাই। অ-সুখের অন্ত নাই। প্রবোধবাবু বলেছিলেন—আপনি
স্থির হোন, সাহিত্যের আসনকে জীবনের সাধনার আসন করুন।
ডাক্তার মৈত্র এবং প্রবোধ চট্টোপাধ্যায়
উভয়ের উপদেশ তাঁর জীবনের সমস্যার সমাধান করে দিয়েছিল। যে মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন
করে তারাশঙ্কর জীবন ও জগৎকে দেখেছিলেন এবং নিজের জীবন নির্বাহ করেছিলেন—সেই
মতবাদের উৎসমূল তো নিহিত তাঁর জননীর মনোভূমিতে। প্রায় সমকালে রচিত ‘আমার কালের
কথা’ বইতে তারাশঙ্কর লেখেন—“আমার জীবনে মা-ই আমার সত্যসত্যই ধরিত্রী, তাঁর
মনোভূমিতেই আমার জীবনের মূল নিহিত, শুধু সেখান থেকে রস গ্রহণ করেনি, তাঁকে আঁকড়েই
দাঁড়িয়ে আছে। ওই
ভূমিই আমাকে রস দিয়ে বাঁচিয়ে প্রেরণা দিয়ে
বলেছে, ‘আকাশলোকে বেড়ে চল, সূর্য-আরাধনায় যাত্রা কর। তুলে ধর তোমার জীবনপুষ্প দিয়ে
সূর্যার্ঘ্য”। সেই মানসিকতায়, কাশী
থেকে ফিরে এসে তারাশঙ্কর জননীকে গুরু করে তাঁর কাছেই দীক্ষা নিয়েছিলেন।
দীক্ষাকর্মে শাস্ত্রসম্মত ক্রিয়াগুলি করে দিয়েছিলেন শ্রীগৌরীনাথ শাস্ত্রীর এক
আত্মীয়।
১৩৬১
বঙ্গাব্দের ০৭ শ্রাবণ ছাপান্ন বছর বয়সে জননী প্রভাবতীদেবীর কাছে কালীমন্ত্রে
দীক্ষা নিয়েছিলেন তারাশঙ্কর। দীক্ষান্তে বলেছিলেন—“এবার জীবন আমার একটা সোজা পথ
ধরল”।
-------------------
দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
হাটজনবাজার, সিউড়ি
বীরভূম-৭৩১১০২।
মোবাইল
নম্বর-৯২৩৩১২৪৭১৮
ইমেইল আইডি—debashismukherjee67@gmail.com
