আসামে বঙ্গভাষা
আন্দোলনে তারাশঙ্কর
দেবাশিস
মুখোপাধ্যায়
সাহিত্যিক হিসেবে
একসময় আসামের অনেক মানুষের সঙ্গে তারাশঙ্করের আলাপ হয় এবং নিবিড় বাঙালিয়ানায় একটি
আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে—পত্র বিনিময় হয় অনেকের সঙ্গে। সেই সূত্রেই রামচন্দ্র
দাস নামে এক ব্যক্তির পত্রোত্তরে ১৯৫৮ সালের ৩০ অক্টোবর তারাশঙ্কর লেখেন—
আসাম
ও বাঙলাদেশ [পশ্চিমবঙ্গ] যমজ ভগিনীর মত—আমরা গঠনে এক, মননে এক, ধর্মে এক—আমাদের
ভাষা পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কযুক্ত। আমরা বন্ধু বা সহকর্মীরও অধিক। আমরা
নিকটতম জাতি, আমরা ভ্রাতৃত্ব সূত্রে আবদ্ধ। পরাধীন ভারতবর্ষে আমাদের পরস্পরকে জানা
কঠিন হয়তো ছিল না। কিন্তু সেকালে সেই মন যেন আমাদের ছিল না। আজ স্বাধীন দেশে ক্রমশ
আমরা পরস্পরের নিকটস্থ হয়ে আসছি। আপনার পত্রখানি তারই একটি নিদর্শন।
স্বাধীনতার
আগে এবং পরে আসামে বাঙালির যন্ত্রণা তারাশঙ্করের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আসামে
বাংলা ভাষা আন্দোলনে কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান অবিস্মরণীয়। বিভিন্ন
সময়ে আসামের একাধিক শহরে অনুষ্ঠিত আসাম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে
তারাশঙ্কর যেমন তাঁর কর্তব্যকর্মে সচেতন ছিলেন; তেমনি বঙ্গভাষা কেন্দ্রিক ঘটনায়
আসামে বাঙালি নির্যাতনের যে রক্তাক্ত ইতিহাস রচিত হয় তার বিরুদ্ধে কলকাতায়
সমবেতভাবে উচ্চকণ্ঠে সরব হয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ে রাজ্যসভার সাংসদ তারাশঙ্কর
প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে কঠোরভাবে অভিযুক্ত করে কৈফিয়ৎ চেয়েছিলেন এবং
পত্রবাণে জর্জরিত করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—আসামে বাঙালি কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়; তারা
সমগ্র বাঙালিজাতির অবিচ্ছিন্ন আপনজন। বালকৃষ্ণ দত্তাত্রেয় তথা কাকা কালেলকর
সাহেবের পক্ষপাতিত্বমূলক উপদেশকে নস্যাৎ করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—আসামে বাঙালি কোনো
অন্যায় করেনি।
তারাশঙ্কর
বন্দ্যোপাধ্যায়ের একশো পঁচিশতম জন্মবৎসরে তাঁর সেই একনিষ্ঠ কর্তব্যকর্মের কথা
স্মরণে আসাম ও বঙ্গের বঙ্গভাষী মানুষের মিলন-ঐক্য নিবিড়তর হোক—সর্বশক্তিমানের কাছে
এই প্রার্থনা জানাই।
১
১৯৪৪ সালে শিলং শহরে অনুষ্ঠিত আসাম বঙ্গ-সাহিত্য
সম্মেলনে মূল সভাপতি ছিলেন এস. ওয়াজেদ আলি; আর সাহিত্য শাখার সভাপতি ছিলেন
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাশঙ্করের ষোলো বছরের লেখক জীবনে তখন অনেক বিখ্যাত
বিখ্যাত ছোটগল্প সহ—চৈতালী ঘূর্ণি পাষাণপুরী নীলকণ্ঠ ধাত্রীদেবতা কালিন্দী গণদেবতা
উপন্যাসগুলিও প্রকাশিত হয়েছে। তারাশঙ্করের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন—কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরণ অধ্যাপক ডঃ বিজনবিহারী ভট্টাচার্য।
আসামের সমকালীন প্রেক্ষাপট তথা বাংলা ভাষার সঙ্কটমুক্তির নিরিখে সেই
সম্মেলনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনের সময়োচিত প্রাসঙ্গিতার কথায় তারাশঙ্কর
বলেছেন—
এই সম্মেলনটি সাধারণ আর পাঁচটা সম্মেলনের মতো
সম্মেলন ছিল না, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন ছিল। তখনই আসামে স্বর্গীয় বড়দলুইয়ের
নেতৃত্বে ভাষার সূত্র ধরে অসমীয়া ও বাঙালীদের মধ্যে এই [ভাষা] মারাত্মক বিদ্বেষের
অঙ্কুরটি সবে উপ্ত হয়েছে এবং তার গোড়ায় প্রচুর জল এবং গলিত সার প্রয়োগ করা হচ্ছে
তাকে মহীরূহে পরিণত করবার জন্য। তখন গৌহাটিতে কামরূপ ইউনিভারসিটি স্থাপনের উদ্যোগ সম্পূর্ণ।
কিছুদিনের মধ্যেই ইউনিভার্সিটি সম্পূর্ণ হয়ে কাজ আরম্ভ হবে। এই ইউনিভারসিটিতে
অসমীয়া ভাষার একাধিপত্য এবং বাংলা ভাষাকে নির্বাসিত করবার একটি পরিকল্পনা রচিত
হচ্ছে। তখন দেশ পরাধীন। আসাম স্বতন্ত্র
প্রদেশ হলেও শ্রীহট্ট শিলচর কাছাড় বাঙালী প্রধান অঞ্চল, সেখানে বাঙালী অনেক। তখন
হিন্দু মুসলমানে বিরোধ যত তীব্রই হোক, দেশভাগের কল্পনা কেউ করে না। বাঙালী
মুসলমানও তখন বাঙালী হিন্দুর পক্ষে। শিলংয়ে নিখিল আসাম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন হয়,
এই অসমীয়া ভাষা সর্বস্ব কামরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাস থেকে বাঙালীর মাতৃভাষায়
শিক্ষার অধিকারকে বাঁচাবার জন্য আর একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অভিপ্রায়ে।
তারাশঙ্কর কামরূপ ইউনিভার্সিটির কথা বলেছেন।
কামরূপ নামাঙ্কিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কি আসামে আছে বা কোনোদিন ছিল? বোধ হয় ১৯৪৮
সালে প্রতিষ্ঠিত আসামে কামরূপ জেলার গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়—এর কথা বলেছেন
তিনি।
তদানীন্তন আসাম বিধানসভার স্পীকার ১৯৪৪ এ
আসাম বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন। বাংলা ভাষার গুরুত্ব
দিতে সম্মেলনে আর একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সঙ্কল্পও গ্রহণ করা হয়েছিল। উদ্যমের
দিক থেকে কোনো ত্রুটি ছিল না; কিন্তু তারাশঙ্করের অভিজ্ঞতা প্রসূত অভিমত অনুসারে
শ্রীহট্ট শিলচর কাছাড় অঞ্চলের বাঙালীদের অসহযোগিতার জন্যই সেই সঙ্কল্প এবং উদ্যম
কাজে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। সিলেট শিলচর থেকে প্রতিনিধি এসেছিলেন অল্পসংখ্যক
কিন্তু তাঁদের সমর্থনে জোর ছিল না। কারণ তাঁরা তখন নিশ্চিত জেনে বসেছিলেন
যে—প্রদেশ পুনর্গঠন হতেই হবে এবং তাঁরা সেই পুনর্গঠনের মধ্যে অবশ্যম্ভাবীরূপে
বাংলাদেশেই ফিরে যাবেন। মনে থাকার কথা—সিলেট বাংলাদেশেই ফিরে যায় কিন্তু খণ্ডিত
ভারতবর্ষের খণ্ডিত বাংলায়।
সেই সম্মেলনে ভট্টাচার্য পদবী সমন্বিত এক
মহিলা তাঁর বক্তৃতায় “বিস্ফোরকে অগ্নি সংযোগ” করেছিলেন। তারাশঙ্কর জানিয়েছেন—“কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এবং বাঙালীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে
বাংলাভাষার অধিকার বিষয়ক প্রস্তাবের বিরোধীতা করে ইংরেজীতে বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। কিন্তু
সভাপতি মহাশয় সুচতুর কৌশলে ওই মহিলাকে দিয়েই সম্মেলনের প্রস্তাবগুলি সমর্থন করিয়ে
নিয়েছিলেন। তাতে সম্মেলন সফল হয় কিন্তু আসল সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং বিদ্বেষ
কিছুটা বেড়েছিল। তারাশঙ্করের মতে সেই বিদ্বেষের বীজ নিহিত ছিল ইতিহাসের গভীরে।
বাঙালির সমবেত সহযোগিতার মাঝেও তিনি বিরোধ-বিদ্বেষের স্রোত প্রবাহিত হতে
দেখেছিলেন। তারাশঙ্কর নিজের চোখে দেখেছিলেন—রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অসমীয়া প্রাধান্য
স্থাপিত হলেও শিলং গৌহাটি অঞ্চলে বাঙালিরাই ছিল প্রধান এবং উচ্চতর রাজকর্মচারীদের
শতকরা সত্তর-পঁচাত্তর জন ছিল বাঙালি। ব্যবসা-বাণিজ্যের
ক্ষেত্রেও বাঙালিরাই ছিল প্রধান। বড়দলুইয়ের
মন্ত্রমণ্ডলী তখন নেই, তখন সাদুল্লা মুখ্যমন্ত্রী। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কংগ্রেস তখন
বাইরে এবং অনেকে কারাপ্রাচীরের অন্তরালে। ভারতীয় কম্যুনিষ্ট পার্টির আসাম শাখা তখন
বেশ সক্রিয়। সম্মেলন উপলক্ষ্যে অকম্যুনিষ্ট এবং কংগ্রেস মনোভাব সম্পন্ন বাঙালিরা
হাত মিলিয়ে কাজ করলেও অন্তরালে বিদ্বেষের স্রোত প্রবাহিত ছিল। আত্মঘাতী বাঙালি
সম্পর্কে তারাশঙ্করের এমন ঐতিহাসিক অভিমত ইতিহাস মিলিয়ে মূল্যায়ণ করবেন পাঠকবর্গ—আমরা
কেবল অভিমত উপস্থাপিত করলাম।
২
১৯৫৬ সালে মহালয়ার আগের দিন তারাশঙ্কর গৌহাটি
যাত্রা করেন। সেখানে--একটি কলেজে বাংলা সাহিত্য সম্মেলন ছিল। তখন তাঁর আরও
অনেকগুলো উপন্যাস এবং গল্প প্রকাশিত হয়েছে এবং ঔপন্যাসিক হিসেবে বাংলা অকাদেমি
পুরস্কার পেয়েছেন।
গৌহাটিতে মহালয়ার দিন ভোরবেলা তারাশঙ্করের জীবনে
একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটে। গৌহাটিতে শিলং
ইলেক্ট্রিক সাপ্লাইয়ের এলাকার মধ্যে ছিলেন তিনি। একজন বাঙালী ইঞ্জিনীয়ার
তারাশঙ্করের আপ্যায়ণ করেন। তিনি রাত্রে তারাশঙ্করকে খাইয়ে নিজের বাংলোয় যাবার সময়
একটি রেডিও দিয়ে গিয়েছিলেন—মহালয়ার অনুষ্ঠান শোনার জন্য। বেতারে মহালয়ার বোধন
অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র’র উদাত্তকণ্ঠের চণ্ডী আবৃত্তির ঝঙ্কার মানুষকে
আকৃষ্ট করত—এখনও করে। তাঁর চণ্ডী আবৃত্তির ঝঙ্কার তারাশঙ্করের মনেও বিশেষ প্রভাব
বিস্তার করে এবং সেই প্রভাবে ধরিত্রী মাতৃময়ী রূপে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তাঁর সম্মুখে।
তাঁর সেই প্রতক্রিয়ার কথা নিজেই জানিয়েছেন ‘আমার কথা’ নামক আত্মজীবনী বইতে। তেমন
অনুভবে নিজেকে হিন্দু এবং ভারতীয় ভাবতে গর্ববোধ করেছিলেন তিনি।
সেদিন
দুপুরে স্নান সেরে কামাখ্যা মন্দিরে গিয়েছিলেন পুজো করতে।
গৌহাটি কলেজে বাঙালি ছাত্রদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বাংলা সাহিত্য সম্মেলন। উপস্থিত
ছিলেন আসামের দেবকান্ত বড়ুয়া, নবীন উপন্যাসিক বীরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য প্রমুখ। আসাম
মন্ত্রীসভার শিক্ষামন্ত্রী সভা উদ্বোধন করেই শিলং চলে গিয়েছিলেন। শিক্ষামন্ত্রীর
উদ্বোধনী ভাষণে অসমীয়া ও বাঙালীদের মধ্যে বিদ্বেষের উত্তাপ বিকীর্ণ হতে দেখেছিলেন
তারাশঙ্কর। এর আগে ১৯৪৪ সালে নিখিল আসাম
বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন বারো বছর পর আরও
কিছু প্রত্যাশিত থাকবে বলে ভেবেছিলেন তিনি। মনে মনে
প্রস্তুত ছিলেন তারাশঙ্কর এবং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদও করেছিলেন কিন্তু
মন্ত্রী তখন উপস্থিত ছিলেন না।
স্মরণীয় যে, ১৯৪৪ সালের সম্মেলনের কথায় তারাশঙ্কর ভাষা বিষয়ে আসামে
বাঙালিদের সৌভাতৃত্বে বিরোধ-বিদ্বেষের ফল্গুধারা প্রবাহিত হতে দেখেছিলেন। ১৯৫৬
সালের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণায় অসমীয়া সাহিত্যিক দেবকান্ত বড়ুয়া, বীরেন্দ্রনাথ
ভট্টাচার্যদের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন—“তাঁদের মধ্যে যে উদারতা ও মানবিক প্রেম
দেখেছি তার অল্প অংশও যদি সমগ্র আসামের বাঙালী-অসমীয়া জনসাধারণের মধ্যে থাকত তবে
পরবর্তীকালে যে শোচনীয় ঘটনা ঘটেছে তা ঘটত না”। সেদিনে উক্ত তারাশঙ্করের এমন অভিমত বঙ্গভাষী
হিসেবে আজ আমাদের আত্মসমীক্ষায় ব্রতী করেছে বলেই বিশ্বাস রাখি।
৩
১৯৫৮ সালের এপ্রিল
মাসের প্রথম সপ্তাহে তারাশঙ্কর আবার আসামে উপস্থিত হয়েছিলেন—আসামের কটন কলেজের
একটি অনুষ্ঠানে। সেবারে তিনি—ওই কলজের অধ্যাপক এবং ধুবুড়ির বাসিন্দা ড. অজয় চক্রবর্তীর
আতিথ্য গ্রহণ করে মনের আনন্দে কয়েকদিন ছিলেন সেখানে।
১৯৬০-৬১ সালে স্বাধীন ভারতবর্ষে আসামে
বঙ্গভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তরুণ-তরুণীর শহীদদের কথা আমাদের জানা। সেই দাঙ্গার
স্মৃতিচারণায় তারাশঙ্কর বলেছেন—সেদিন কোনো একটি সংবাদপত্রে এই বাঙালি নিধন বা
নির্যাতন-আন্দোলনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আসামের প্রায় সবকটি রাজনৈতিক দলকেই
দায়ী করেছিলেন।
মনে রাখার কথা যে, সেই দাঙ্গার প্রভাবে
কলকাতাও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সমগ্র শহর জুড়ে চাপা উত্তেজনা তখন থমথম করছে। অসমীয়া
ছাড়াও অন্যান্য অবাঙালিদের মধ্যেও তখন শঙ্কাতুর আতঙ্ক। কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে
বাংলাদেশকে অবাঙালি মুক্ত করার বিজ্ঞাপন। অসমীয়াদের
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলকাতায় প্রতিবাদ-সভা ডাকা হয় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে। তারাশঙ্কর
ছিলেন সেই সভার সভাপতি। সভায় উপস্থিত
ছিলেন মনোজ বসু, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ত্রিদিব চৌধুরি, সিদ্ধার্থশঙ্কের রায়,
বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, মন্মথকুমার চৌধুরি, আসামের নেতা
স্বর্গীয় অরুণ চন্দ’র পত্নী জ্যোৎস্না চন্দ প্রমুখ। সভাটির উদ্যোক্তাদের মধ্যে
প্রধান ছিলেন—শ্রীপ্রফুল্লকান্তি বা শতদলকান্তি ঘোষ। এছাড়া কংগ্রেস বা কম্যুনিষ্ট
পার্টির কোনো নেতা সভায় উপস্থিত ছিলেন না। সভার কাজ
আরম্ভ হয়েছিল বরিশালের মুকুন্দদাস মশায়ের রচিত একটি গান দিয়ে। সভার হিংস্র
উত্তেজনা দেখে তারাশঙ্কর প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করে সভার প্রারম্ভেই আবেদন জানিয়ে
বলেছিলেন—
আমাদের এই প্রতিবাদ যেন আমাদের বাঙালীর জাতীয়
জীবনের ঐতিহ্যের গৌরব এবং মর্যাদাকে ক্ষুন্ন না করে। আমরা যেন রাজা রামমোহন রায়,
থেকে বিশ্বমানব রবীন্দ্রনাথ এবং মহানায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্রকে মনে রেখে আজ এই সভায়
আমাদের দুঃসহ দুঃখ ক্ষোভকে উপযুক্তভাবে প্রকাশ করি। একের অন্যায়ে তার জ্ঞাতি বা
আত্মীয়কে নির্যাতিত না করি।
বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সভা ক্ষিপ্ত হয়ে
উঠতে দেখে হাতজোড় করে তারাশঙ্কর বলেছিলেন, আমাকে আপনারা মার্জনা করুন, কারণ সংসারে
বর্বরতার প্রতিবাদে বর্বর হ’ব এই সঙ্কল্প গ্রহণ করে ঘোষণা করবার জন্য কোনো সভা
সমিতির প্রয়োজন হয় না। উত্তেজিত সভা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর
বিবেকানন্দবাবু বলেছিলেন, আমার শিক্ষা মহাভারতের শিক্ষা। আমার শিক্ষা—দ্রৌপদীর
অপমানে দুঃশাসনের বক্ষরক্ত পান করতে বলে ভীমকে। কৌরবদের সবংশে নিধন করতে বলে। বিবেকানন্দবাবুর
বক্তৃতায় সভায় আবার ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। কলরব কোলাহলে হাত-পা ছুঁড়ে শাসনের
আষ্ফালন শুরু হয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল তারাশঙ্কর। জ্যোৎস্না চন্দ হাতজোড় করে
বলেন—“আপনারা এখানে ধৈর্য্য হারিয়ে এখানকার অসমীয়া বা অবাঙালির উপর অত্যাচার করলে
আসামে আমরা আরও অধিক পরিমাণে বিপন্ন হব”। উত্তেজিত সভা হৈ চৈ করে তাঁকে রূঢ়তম
বাক্যে থামিয়ে দেয়। এইভাবেই পুরো আড়াই ঘণ্টা ক্ষোভ প্রকাশের পর সভা শেষ হয় কিন্তু
কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয় না এমনকি যাঁরা আসামে মারা গেছিলেন এবং লাঞ্ছিতা হয়েছিলেন
তাঁদের জন্য কোনো সমবেদনাও প্রকাশ করা হয় না। মারের হাত থেকে বেঁচে মানসিক আঘাতে
জর্জরিত তারাশঙ্কর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
আসামে অনুষ্ঠিত ঘটনাবলী সম্পর্কে বিখ্যাত
বালকৃষ্ণ দত্তাত্রেয় তথা কাকা কালেলকর কোনো একটি সভায় উপদেশ দিয়ে বলেন--অহিংসাতত্ত্ব ও ধর্ম্মানুযায়ী আজ বাঙ্গালীদের
দুর্যোগময় নিষ্ঠুর অতীত বিস্মৃত হয়ে অসমীয়াদের ক্ষমা করা উচিৎ; এবং তাই
ভারতধর্ম্ম।
কালেলকর
সাহেব প্রবীণ দেশসেবক এবং মহাত্মা গান্ধীর সাহচর্য্য-ধন্য ব্যক্তি।
তারাশঙ্কর তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন; তথাপি কালেলকর সাহেবের উপদেশকে বাঙালির প্রতিনিধি
হিসেবে তিনি মানতে পারেননি। পত্র
মারফত তীব্রভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কালেলকর সাহেবের উপদেশে বিস্মিত ও ব্যথিত
তারাশঙ্কর পত্রে লিখেছিলেন—অহিংসা ও সত্যধর্ম্মের প্রতি আমারও অশেষ শ্রদ্ধা এবং অনুরাগ
আছে। সেই দিক থেকে রামায়ণের দৃষ্টান্ত দিয়েই বলি—
সীতাকে যেদিন
পৌরাণিক অত্যাচারী হরণ করে নিয়ে যায়—সেদিন কোন দেবতা কোন ঋষি—কেউ এসে কী উপদেশ
দিয়ে বলতে পারতেন—হে রামচন্দ্র যেহেতু অহিংসা ও প্রেম জগতে ও জীবনে শ্রেষ্ঠধর্ম্ম
সেই হেতু তুমি অপহরণকারীকে ক্ষমা কর? কাকা সাহেব—আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন—আপনার দৈহিক
অক্ষমতার কথা জানি; কিন্তু আজ যদি মহাত্মা জীবিত থাকতেন তবে কি তিনি বৃদ্ধ বয়সেও
আসামের নারী শিশু ও মানুষের কাতর ক্রন্দন শোনামাত্র বৃদ্ধ জটায়ুর মত তাঁর বার্দ্ধক্য
দুর্বল পক্ষ বিস্তার করে ওই অত্যাচারের স্থানে উপনীত হয়ে এই অত্যাচারীর রথের
গতিরোধ করতেন না? তিনি অক্ষম হলেও ক্ষত বিক্ষত দেহে বাঙ্গালীকে সম্বোধন করে কি
বলিতেন?—তোমরা—এ অত্যাচারের প্রতিরোধ কর? অথবা বলতেন—ক্ষমা কর? আর ক্ষমার কথাই বা
উঠছে কেন? বাঙ্গালী কী বলেছে—বা এমন কী করেছে যাতে মনে হচ্ছে—বাঙ্গালীরা দলবদ্ধভাবে
প্রতিহিংসা-জর্জ্জর হয়ে প্রতিশোধে অসমীয়াদের উপর এমনই কোন অত্যাচার অনুষ্ঠিত করতে
চায়? না—তা তারা চায় নাই। তা তারা করে নাই। তাদের মনে এমন কোন নিষ্ঠুর সঙ্কল্প
নাই। হিংসাকে তারা প্রশ্রয় দেয় নাই। অহিংসা ও ক্ষমা দুটি পৃথক ধর্ম্ম। অহিংসা
প্রতিশোধ চায় না—কিন্তু প্রতিবিধান ন্যায় বিচার—তার ন্যাহ্য অধিকার সে চাইবে না
কেন? ভারতবর্ষে অহিংসা পন্থায় পরিচালিত স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল লক্ষ্যও তো তাই।
প্রতিশোধ নয় কিন্তু প্রতিবিধান—ন্যায়-ধর্ম্ম অনুযায়ী আমার দেশে আমার অধিকার
প্রতিষ্ঠা।
ক্ষমা
করার বিষয়ে বলেছিলেন, কাকাসাহেব—আপনি যদি প্রথমেই বলতেন যে—আজ অসমীয়াদের যারা এই
অন্যায় করেছে ভারত-ধর্ম্ম অনুযায়ী তাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিৎ এবং তার পর যদি
বলতেন যে, বাঙ্গালীরও ক্ষমা করা উচিৎ তবেই ঠিক বলা হত এবং আমি আপনার নিকটা কৃতজ্ঞ
হতাম। কিন্তু আজও কি একজন দুষ্কৃতিকারী প্রকাশ্যে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছে? অসমীয়া
ভাষীদের এমন কোন সভা হয়েছে কী যেখানে সমগ্র ভারতবর্ষের সম্মুখে অকপটে অন্যায়
স্বীকার করে বলেছে অন্যায়ের জন্য তারা অনুতপ্ত, সমগ্র ভারতবর্ষের নিকট তারা ক্ষমাপ্রার্থী?
ক্ষমা না চাইলে ক্ষমা করার প্রসঙ্গে আসবে কিভাবে? রাজনীতিবিদ দু-একজন যা বলেছেন তার
বিবেচনা ভারেতের সরাষ্ট্র–সচিবের। তাছাড়া ভারতবর্ষের জীবনে তো রাজনীতি বড় নয়। সেখানে
নীতি বড়—ন্যায় বিচার বড়—ধর্ম্ম বড়—সত্য বড়।
কাকাসাহেব—রামায়ণে
অনুরূপ ঘটনা—স্মরণ করুন।
লঙ্কা
কাণ্ডের শেষ অগ্নি-পরীক্ষায় উত্তীর্ণা অপাপবিদ্ধা সীতাকে নিয়ে রাম দেশে ফিরলেন এবং
সম্রাট হলেন। তখন একদিকে সতী সীতা—অন্যদিকে অসন্তুষ্ট প্রজা—তারা সীতার চরিত্রে
সন্দিগ্ধ। একদিকে নীতি ও সত্য অন্যদিকে রাজনীতি ও কৌশল। রাম রাজনীতির কাছে মস্তক
অবনত করলেন—কৌশলকে প্রশ্রয় দিলেন। সীতাকে বনবাসে দিয়ে অন্তঃপুরে উপবনে সীতা সীতা
বলে অসহায়ের মত কাঁদলেন। রাম রাজ্যের গৌরব ম্লান হল, অশ্বমেধেও তার
পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয় নাই। অবশেষে ভারতলক্ষ্মী সীতা রসাতলে প্রবেশ করে ভারতভূমি রাম রাজত্বকে
হাহাকারে পূর্ণ করে দিয়ে গেলেন।
কাকাসাহেব,
আমি বিংশ শতাব্দীর একজন বাঙালী সাহিত্যিক মাত্র। এই শতাব্দীতে আমরা পুরাণের সেই
শতাব্দী থেকে অনেক পথ অতিক্রম করেছি—তবুও চিরন্তন প্রশ্ন এক। অহিংসা এবং জননী
ভগ্নী কন্যা ভ্রাতাদের উপর নৃশংস অত্যাচার নীরবে সহ্য করা কী এক? প্রতিবিধান প্রার্থনা
এবং প্রতিহিংসা প্রতিশোধ কী এক? সত্যকে শিরোধার্য করে অন্যায়কে স্বীকার করে, ক্ষমা
না চাইতেই যে ক্ষমা—সে ক্ষমা—এবং অক্ষমতা ও পশুতা কি এক নয়?
৪
কলকাতার
প্রতিবাদ সভার প্রতিক্রিয়ায় তারাশঙ্কর অসুস্থ হয়ে পড়েন তথাপি চলতি হুজুগে নীরব
থাকতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে চিঠি
লিখে সেই মর্মান্তিক ঘটনার অবসান চেয়েছিলেন। ২১ মে ১৯৬১, প্রধানমন্ত্রী জহরলাল
নেহেরুকে পরামর্শমূলক এক চিঠিতে তারাশঙ্কর লেখেন—
I am
sure, that this tremendous but well founded faith of the people in you must be
honored at all costs to ensure the stability, security and prosperity of a
growing community of four hundred sixty million men and women. This is a great
responsibility but you have seldom been found wanting to fulfill it.
The
Silchar firing on Satyagrahis resulting in the death of nine (until today)
including a teen-ager girl has reopened the wound which, so many of us
wishfully thought, was healing. The eagerness of the state Government to
maintain of law and order in the present case, so violently in contrast with
their lasses-faire attitude last year, gives much support to the contention
that State Government is determined in fragrant defiance of all ethical and patriotic principles to liquidate
all democratic opposition to their linguistic chauvinism. Must this continue
without opposition indefinitely? Is the autonomy of the State so much stronger
than the balancing authority of the centre?
Many like me are seeking answers to these questions in bewilderment. I
again approach you with my doubts and misgivings and very respectfully suggest
that there should be an open announcement at your level of the concrete measures
that are proposed to be taken to re-dress the grievances of all sections of the
minorities in Assam and to prevent outrages by the majority and the State Govt.
It also necessary to announce the ways and means of carrying out these
assurances.
কেবলমাত্র
পরামর্শই নয়, নেহেরুজীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিলম্বে একেবারে সরাসরি কৈফিয়ৎ তলব করে
আর এক চিঠিতে তারাশঙ্কর লেখেন—
পরম শ্রদ্ধাষ্পদ নেহেরুজী
আসামে নির্য্যাতিত বাঙালী সমাজের জন্য উৎকণ্ঠায় সমগ্র
বাঙালী জাতির সহিত আমিও হৃদয়াবেগে পীড়িত। তাহা সম্বরণের সাধ্য আমার নাই। আপনি
স্বকীয় মানবিকতার আহ্বানে কর্ত্তব্যের নির্দ্দেশ আসাম স্বচক্ষে পরিদর্শন করিয়াছেন।
আমিও ওই মর্ম্মে আপনাকে যে অনুরোধ জানাইয়াছিলাম। তাহাও ইহাতে রক্ষিত হইয়াছে।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনি ভারতবর্ষের ন্যায়বোধে দৃঢ়তা—সততা ও সাহসের আশ্রয়স্থল কেন্দ্রবিন্দু।
আমাদের মত অসংখ্য মানুষের সমর্থনে তাহা আজ বিশ্ববন্দিত। তাই আপনি আসামের জনসভায় যে
সমস্ত উক্তি করিয়াছেন তাহা অসুস্থ রুগ্ন অবস্থাতেও সযত্নে শ্রদ্ধার সহিত পড়িয়াছি
বুঝিতে চাহিয়াছি। শুধু আমি নই—সমস্ত বাঙালী জাতিই চাহিয়াছে। আপনি পূর্ব্বে
কলিকাতার জনসমাজের আবেগ-প্রবণতার সমালোচনা করিয়াছেন—সেই জনসমাজ কি অসীম ধৈর্য্য ও
সংযমের সহিত শোকদিবস পালন করিয়াছেন তাহা অবশ্যই লক্ষ্য করিয়াছেন। আপনি আসাম
যাইতেছেন—এটাই ছিল এক্ষেত্রে বাঙালীর বড় প্রত্যাশা। আপনি আসামের জনসভায়
বলিয়াছেন—কংগ্রেস কর্ম্মীদের কর্ত্তব্য কর্ম্মীরা যথোপযুক্তভাবে পালন করেন
নাই—তাহাতে কর্ম্মীরা গুঞ্জন তুলিয়াছে। তাহা লক্ষ্য করিয়াছি। মনে মনে
বলিয়াছি—মানুষের স্বার্থান্ধতা যখন স্থির মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ এবং বিবেকের বাণীতে
উগ্র হইয়া প্রতিবাদ তোলে তখন মানুষের যে আত্মিক সর্ব্বনাশ হয়—আসাম কংগ্রেসের তাহাই
ঘটিয়াছে। কারণ আপনি আজও কংগ্রেসের স্থির মস্তিষ্ক স্বরূপ। তাহার বিবেক বাণী আপনার
কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়। ভারতবর্ষ—একবার ধর্ম্মবিদ্বেষ ... [ছিন্ন] খণ্ডিত হইয়াছে—আবার
ভাষা-বিদ্বেষের বিষময় ছূরিকা সূত্রপাত আসামে অসমীয়ারা টানিলেন তাহাতে সেই সূত্র
বিরাট ফাটলে পরিণত হইয়া ভারতবর্ষকে কত খণ্ডে কত মর্ম্মান্তিক কলহে দীর্ণ করিবে
তাহা—সংবিধান সম্মত চৌদ্দটি ভাষার সূচী অনুযায়ী চৌদ্দটি কলহেই শেষ হইবে না।
আপনি বলিয়াছেন—আসামে অসমীয়া ভাষাই—প্রাদেশিক
ভাষা হওয়া উচিৎ। এ কথাও আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচনা করিয়া গ্রহণ করিতে চেষ্টা করিয়াছি।
বিক্ষুব্ধ বিচারপ্রার্থীর মনস্তুষ্টি করিয়া বিচার হয় না মানি—তাহাও আমরা অন্তত আমি
বলি না। বি. ..[ছিন্ন] এম. আর—সির প্রস্তাব সম্মুখে রাখিয়া বলি—যে যেখানে অসমীয়া
ভাষা শতকরা ৭০ জনের ভাষা হওয়া দূরে থাক—মাত্র ৪০ জনের ভাষা—এবং বাঙলা যেখানে অন্তত
২৪/২৮ জনের ভাষা সেখানে তাহা মানি কি করিয়া? এখানে ১৯৪১।৫১ সালের আদমসুমারীর
বৈচিত্র কথা উল্লেখ না করিলে এ বক্তব্য সম্পূর্ণ হয় না। এই দশ বৎসরে অসমীয়া ভাষার
বৃদ্ধি ... [ছিন্ন] একমাত্র যাদুবিদ্যার প্রভাব ব্যতিরেকে ... এবং যাদুবিদ্যায়
যাহা সম্ভব কঠোর বাস্তব বিচারে তাহাকে ... তাহা সম্ভবত আদম সুমারীর কর্ত্তাদের
মন্তব্যেও স্বীকৃত হইয়াছে। অবশ্য পরে আপনি বলিয়াছেন—সকল সম্প্রদায় মিলিয়া এ
সমস্যার সমাধান করিবেন--। এবং ৩১ শে জুলাই অসমীয়া ছাত্রবৃন্দের সভায়—ভাষা সপ্তাহ
কার্য্যকর্ম্ম নির্ণয়ে যদি হিংসাত্মক পন্থা গৃহীত হয় তবে সমস্ত শিক্ষা
প্রাথমিকভাবে বন্ধ করিয়া দিবেন বলিয়াছেন। ইহা অবশ্যই আমাদিগকে কথঞ্চিৎ সাহস
দিয়াছে। আপনি আসামে তিন সপ্তাহ সময় দিয়াছেন—নিরাপত্তা সূচক মনোভাব সৃষ্টি করিয়া
নিপীড়িত পলায়িত বাঙালীদের ফিরাইয়া আনিবার জন্য। কিন্তু তাহা সৃষ্টি হইল
কিনা—বাঙালী ফিরল কিনা—নিজেদের নিরাপদ ভাবিল কিনা—কে বলিয়া দিবে? বর্ত্তমান আসাম
সরকার?
যাহারা এতবড় নির্ম্মম অত্যাচারে বাঙালীকে উৎখাৎ
করিতে গিয়া ভারতবর্ষে ভাষা সমস্যা লইয়া ঐক্যকে বিপন্ন করিবার দৃষ্টান্ত স্থাপন
করিল—তাহার বিচার হইল কই?
তিন
সপ্তাহে যদি বাঙালী না ফিরিতে সাহস করে তবে কি বাঙালী দায়ী হইবে? আজ রোগশয্যায়
শুইয়া—সমস্ত চিন্তাকে একত্র করিয়া কূল পাইতেছি না—আপনাকেই প্রশ্ন করিতেছি আমরা কি
করিব? তিন সপ্তাহ পর—আপনি কি করিবেন?
ইতি
শ্রদ্ধানত
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
----------------------
ড. দেবাশিস মখোপাধ্যায়
হাটজনবাজার, সিউড়ি
বীরভূম-৭৩১১০২, পশ্চিমবঙ্গ
মোবাইল—৯২৩৩১২৪৭১৮
ইমেল—debashismukherjee67@gmail.com
No comments:
Post a Comment
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। সময়মতো উত্তর পাবেন।