Monday, 11 May 2026

 

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: দেশভক্তি এবং দেশভাবনা

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামীণ ভারতের এক মহান চিন্তাধিনায়ক এবং মৃত্তিকালগ্ন জাতীয়তাবাদী কথাসাহিত্যিকদেশসেবা ছিল তাঁর জীবনসাধনাজাতীয় আন্দোলন এবং সাহিত্যরচনা ছিল তার মাধ্যমস্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পরেও দেশের প্রগতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাঁর দেশভাবনার দূরদৃষ্টি আমাদের কাছে বড়ো বিস্ময়কর বলে মনে হয় বর্তমানে দেশ যে যে সমস্যার সমাধানের কথা ভাবছেন, স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরে—‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ ‘হর ঘর ত্রিরঙ্গা’, বীরসা-মুণ্ডাদিবসমেরি মৃত্তিকা মেরা দেশইত্যাদি যে যে সঙ্কল্পে ব্রতী হয়েছেনআজ থেকে ষাট-সত্তর-আশি বছর আগে সে সব বিষয়ে তারাশঙ্কর সচেতন এবং সক্রিয় উদ্যোগী ছিলেন১৯৬৫ সালে ২৬ জানুয়ারি স্মরণে বলেছেন—“গৃহশীর্ষে চক্রলাঞ্ছিত ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উড্ডীন হোক; আলোয় আলোয় সাজিয়ে দাও নগরী গ্রামউত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম দিকপ্রান্ত পর্যন্ত তারাশঙ্করের সাহিত্যপাঠে আমাদের মনে হয় জাতি ও জাতীয়তার চিন্তায় দেশের কর্তব্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশ সম্পর্কিত ধারণায় সচেতন করতে তিনি যা বলেছেন বর্তমানে  দেশভাবনার পথে তা যেন অনিবার্যভাবে অনুসরণীয় 

 

পরাধীন ভারতবর্ষে অর্ধশতাব্দীকাল  এবং পঁচিশ বছর স্বাধীন দেশের সেবায় তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন জাতীয় আন্দোলনে অনুশীলন সমিতি সদস্য তারাশঙ্কর মার্কসবাদের সাম্য-সমাজব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদের আধার থেকে গান্ধীবাদকে তিনি তাঁর সমগ্র জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেনগ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের উন্নয়ন, স্বাধীনতার সতেরো বছর আগে গ্রামে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে কারাবরণের মধ্য দিয়ে তারাশঙ্কর তাঁর দেশভক্তির পরিচয় দিয়ে গেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামী তারাশঙ্কর আদালতে বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেনরাজনীতি ছাড়ব না, দেশকে আমি ভালোবাসি, সুভাষচন্দ্র  বসুর সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, কোনো ব্যক্তিপূজা নয়, আমার উদ্দেশ্য দেশসেবাসাহিত্যপথে চৈতালী ঘূর্ণি, ধাত্রী দেবতা, গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম উপন্যাসগুলির মধ্য দিয়ে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের রূপ এবং মহিমাকে তিনি প্রকাশ করেছেনগ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের সঙ্গে মেলামেশার নিবিড় অভিজ্ঞতায় জেনেছিলেন, সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক আদর্শ বা ইংরেজ তাড়ানোর নাম স্বাধীনতা নয়; শোষণমুক্ত সমাজইতাদের স্বাধীনতা তাদের দেশ

     তারাশঙ্করের দেশভাবনার আধার ছিলবাস্তু তথা তাঁর জন্মগ্রাম সকল জীবের ধাত্রী যিনি ধরিত্রী, জাতির কাছে তিনিই দেশ, মানুষের কাছে তিনি বাস্তু বাস্তুকে চিনেই তিনি দেশকে চিনতে চেয়েছিলেনজন্মগ্রামকে আধার করে দেশদেখার যে আদর্শ তারাশঙ্করের দেশভাবনার পরিচয়ে জানা যায়, বর্তমান দেশের ভাষায় এর নামমেরি মাটি মেরা দেশ তাঁর মতে দেশ কেবল একটি ভূখণ্ডমাত্র নয়; নিজের এলাকায় বসবাসকারী সব শ্রেণির মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থানগত পরিচয়ের মধ্য দিয়ে দেশকে জানতে হয়দেখেছিলেন জমিদার মহাজনের শোষণে গ্রামের মানুষ শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছেজেনেছিলেন, ব্রাহ্মণ্যধর্মের জন্মভূমি আর্যসভ্যতার গৌরবময়ী ভারতের বুকে শুধু শূদ্র আর শূদ্র, অনার্য আর অনার্য বর্ণগতভাবে সমাজের অন্ত্যজ, আর্থিক দিক থেকে অসহায় এইসব অনার্যজাতিজাতির হয়েও জনজাতি হাজার হাজার বছর ধরে জনজাতিকে জাতিতে উন্নীত করে তোলা হয়নি বলেই বিদেশীর হাতে ভারতবর্ষ বার বার পরাজিত হয়েছে জমিদার এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের গণ্ডী অতিক্রম করে তারাশঙ্কর অনার্যজাতির সেবায় এবং তাদের জাতিতে উন্নীত করার সংকল্পে আত্মনিয়োগ করেছিলেন তিনি জানতেন পরাধীনতা মুক্তির সঙ্গে সকল মানুষের অর্থবৈষম্য এবং বর্ণবৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে নৈতিক চেতনাসম্পন্ন সাম্য-সমাজ গড়তে পারলে তবেই দেশের উন্নয়ন সম্ভবতবেই দেশের আত্মনির্ভরশীল প্রতিটি নাগরিক ভাবতে পারবেআমি ভারতবাসী, ভারতবর্ষ আমার; এবং অমিত শক্তিতে শক্তিশালী জাতির অভ্যুত্থান ঘটবে দেশভক্তি মানে দলীয় রাজনীতি নয়; দেশভক্তি হলো মাটির সঙ্গে মানুষের, সংস্কৃতির সঙ্গে জীবনের ভক্তিভাবান্বিত ভালোবাসার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনযা কর্মনিষ্ঠা সেবার সঙ্গে দেশের কল্যাণ ও উন্নতির জন্য বিদ্রোহ-বিপ্লব এবং আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করবে

     তারাশঙ্কর যে ভারতবর্ষকে চেয়েছিলেন সেই ভারতকথা ইতিহাসের ঘটনাপঞ্জী নয়; তা ন্যায়-অন্যায় সত্য-অসত্য এবং স্বার্থ ত্যাগের দ্বন্দ্বে বিচিত্র প্রকাশে প্রকাশিত এক নতুন মহাভারততিনি জানতেন ভারতবাসীর কাছে দেশের প্রতি ক্ষেত্র ধর্মক্ষেত্র, নদী তীর্থ, পর্বত দেবতাত্মা। ভারতবাসী জানেযে মাটি অন্নদান করে সে অন্নদা, যে জল শস্যক্ষেত্রে রসসঞ্চার করে সে প্রাণদা; অন্ন-বস্ত্র-আশ্রয় প্রদায়িনী এই ধাত্রীদেবতা ভারতভূমি আমাদের দেশ, আমাদের রাষ্ট্রতারাশঙ্করের দেশভাবনা যেন আমাদের বুঝিয়ে দিতে চায় যে, অন্নদা-প্রাণদা শস্যময়ী ভারতভূমি আমাদের ধারক এবং সুরক্ষার দুর্গতাই তিনি দুর্গা তারাশঙ্করের দেশভাবনায় ধাত্রীদেবতার আদর্শ ভারতীয়-সভ্যতার চিরায়ত কথাঋগ্বেদের দেবীসূক্তে ভূমিদেবীর উক্তি— ‘অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং স্কন্দপুরাণের আর্য-আচরণীয় আসনশুদ্ধির মন্ত্রে সেই ধাত্রীদেবতাকে স্মরণ করে বলা হয়, অনন্ত শক্তি বিষ্ণু তোমাকে ধারণ করে আছেন আর আমাদের ধারণ করে আছো তুমি তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো তারাশঙ্করেরও দেশভক্তির মূলমন্ত্র ছিলবন্দেমাতরমআর্যসভ্যতার অনার্য ইতিহাসকে তুলে ধরে তারাশঙ্করস্বামী  বিবেকানন্দের মতো বলেছেন মুচি-মেথর-চণ্ডাল-শূদ্র-ব্রাহ্মণ সকলেই ভারতমাতার সন্তানভক্তি-নিষ্ঠার জ্ঞান কর্মে মৃন্ময়ী মা চিন্ময়ী হয়ে ওঠেনভারতীয় চেতনার উত্তরাধিকারী তারাশঙ্কর জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী সাধক; গণদেবতার পূজারী তারাশঙ্করের জীবনসাধনা জাতি ও জাতীয়তার পথে মনুষ্যধর্মের সাধনা। পাঁক থেকে পঙ্কজের জন্মের মতো সেই সাধনা কমলদল বিহার সেই অর্থেই বোধ হয় ভারতবর্ষ কমলদল বিহারিণী সুহাসিনী দেশধর্মের সুরক্ষায় তিনি অবতারবাদের গীতার সশস্ত্র আদর্শ থেকে বুদ্ধের অহিংসায় উন্নীত হওয়ার কথা বলেছেন

 

স্বাধীনতা-পূর্ব এবং স্বাধীনতা-উত্তরকালে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনকে তারাশঙ্কর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে দেখেছিলেন। তাঁর সেই অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতালব্ধ প্রতিক্রিয়ার প্রতিটি বাক্য আজ আমাদের জাতীয় জীবনের এক অমূল্য সম্পদ বলেই মনে করতে হয়। তাঁর মতে উন্নত এবং প্রগতিশীল দেশ মানে নৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ আত্মনির্ভরশীল জীবনবিপ্লবে নবজীবন বিন্যাসের জয়যাত্রা; কিন্তু রাজনৈতিক জটিলতায় স্বাধীন দেশের জীবন বিন্যাস সেইভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক চেতনায় তারাশঙ্কর অত্যন্ত কঠোর এবং সত্যনির্ভর ছিলেন। তাঁর মতে  গণতন্ত্র একটি শাসন পদ্বতিই নয় তার মূল হল গণতান্ত্রিক মানসিকতা কিন্তু নেতাদের কারণে সেই মানসিকতা বিনষ্ট হয় তারাশঙ্কর দেখেছিলেন স্বাধীন দেশের মূল সমস্যা রাজনীতির নগ্ন জটিলতা; রাষ্ট্রশক্তি করায়ত্ত করার জন্য স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক দলগুলিতে দুর্নীতি-পরায়ণ চতুর চক্রীদের প্রভাব ও প্রাধান্য বেশী। তিনি দেখেছিলেন দেড়শত বছরের সাধনার ফল মূল্যবান জীবনমূল্যে লব্ধ স্বাধীনতাকে রাজনীতির নগ্ন-জটিলতা বিনষ্ট করে এক গভীর অন্ধকারকে আহ্বান করেছে বুঝেছিলেন যে, “এই মিথ্যাসর্বস্ব রাজনীতির পথে ভারতের মানুষের জীবনে শান্তি সম্ভব নয় বলেছেন, “স্বাধীন ভারতের গোটা সংবিধানখানার ধারার পর ধারা পড়ে প্রমাণ করা যায় গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে ভোটের দ্বন্দ্বে রাষ্ট্রশক্তি করায়ত্ত করার অত্যধিক আগ্রহে গণতন্ত্র ধ্বজাবাহীরা দেশের সর্বনাশ করেছেবলেছেন—দলগত কলহে, দল ও ব্যক্তিস্বার্থের টানাটানিতে জাতীয় কল্যাণ এবং জাতি গঠনের পরিকল্পনা বিনষ্ট হয়েছে দেখেছিলেন স্বাধীনতার দুদশকে ভৌগোলিক সংগঠন ও পুনর্বিন্যাসে দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে, আধুনিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে কিন্তু ভারতবর্ষে এক জাতি গড়ে ওঠেনি, জাতীয় সংহতি তৈরি হয়নিবলেছেন, প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলালজী ভৌগোলিক ভারতবর্ষের সংগঠন করতে পেরেছিলেন কিন্তু আত্মিক সংগঠনে চরিত্রবান মানুষ এবং দৃঢ় চরিত্রের আদর্শবাদী সমাজের সৃষ্টি করতে পারেননি হয়নিমহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে যে জাতীয়তা গড়ে উঠেছিল সেই দিন বিগত; সেই হিন্দুস্থান খতম হয়ে গেছে। মরে গেছে সেই ভারতবর্ষ।

     দেশ এবং সমাজকে পরিচালনা করে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রকে পরিচালনা করে নেতা এবং মন্ত্রীবর্গ জনসাধারণের ভোটে নেতা এবং মন্ত্রী নির্বাচিত হন কিন্তু মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক থাকে না তাঁদের কাছে মানুষের উন্নয়ন বা দেশ বড়ো নয়দল বড়ো, লোভ-লালসাময় আগ্রাসী মনোভাব বড়ো যেখানে রাজনীতির অর্থ রাজা হওয়ার নীতি, "যেখানে আমি চোর তুমি চোর সে চোরসরকারী কর্মচারী অসৎ অসাধু জনপ্রতিনিধি অসাধু অসৎসেখানে আর জাতীয়তাবোধ কোথায়জাতিই বা কোথায়! স্বাধীনতা সেখানে কোন আসনে বসে স্থির থাকবে?"  তাঁর মতে,  জাতি গঠনের প্রথম ভিত্তি হল বিশ্বাস এবং আত্মবিশ্বাস; যেখানে আমরাই আমাদের শাসন করতে সক্ষম হয়ে উঠবজাতীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভের নিচে নির্ধারিত নীতিবাক্যসত্যমেব জয়তে’; সত্যের প্রতি ভরসা ও বিশ্বাস--জাতি ও জাতীয়তার মূল ভিত্তিসাংবিধানিক সত্যকে পালন প্রয়োগের নিষ্ঠায় চিন্ময় করে তুলবেন যাঁরা তাঁরা আধিকারিক-নেতা-মন্ত্রী; কিন্তু আগ্রাসী মন্ত্রী-নেতা-আধিকারিকেরা ভয়ঙ্কর লোভ ও লালসায় সত্যকে সমাধিস্ত করে আসছেন এমন অসৎ ও অসাধুতার কারণে জাতি ও জাতীয়তাবোধ হারিয়ে দলের কাছে দেশ অপেক্ষা রাজনীতি এবং নেতৃত্ব বড়ো হয়ে উঠেছে; এবং তার মন্দ প্রভাব পড়েছে সামাজিক উন্নয়ন এবং সমাজের অর্থনীতিতে এমন ভয়াবহ বিষজর্জর রাজনীতিজড়বাদী রাজনীতি, আগ্রাসনের রাজনীতিপঞ্চায়েত পুরসভা থেকে সরকারি অফিস, জনসাধারণের বাকস্বাধীনতা থেকে অধিকারবোধ, নেতা নির্ধারণ, এমনকি সম্প্রীতি বিনষ্টি সহ ধর্ষণ, হত্যা খুনের মাঠেও রাজনীতি রাজনৈতিক রাষ্ট্রসমাজজীবনকে গ্রাস করেছে রাজনীতির প্রবল পীড়নে সমাজ আপেক্ষিক স্বাধীনতা হারিয়েছে; রাজনীতি আজ গণতন্ত্রের সংকট এবং সাধারণ মানুষের কাছে বড়ো আতঙ্কের বিষয়। রাজনীতির কাছে মানুষের পরিচয় একজন ভোটার হিসেবে এই সমস্যার সমাধানে তারাশঙ্করের নির্দেশিত পথমন্ত্রমণ্ডলীর শুদ্ধিকরণ সহ দেশের উন্নয়নে মাটি ও মানুষের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকারভারতীয় চেতনায় অনুশীলনের পথে চিত্তশুদ্ধ নেতা তৈরি হলে সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি সবকিছুই সদর্থক পথে প্রগতিশীল হয়ে উঠবে তারাশঙ্কর এমন নেতার কথা বলেছেনযিনি মহামানবিকতা সহ আদর্শবাদী নেতৃত্ব দেবেন, তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি জাগ্রত শুদ্ধ স্বত্ত্ব পবিত্র চিত্ত সত্যাশ্রয়ী নির্ভীক-সাধক পুরোহিত আমরা তাঁর যজমান

     তারাশঙ্কর বলেছেন, জাতির পরিচয় তার একাত্মতায় কিন্তু মানুষের ঐক্য যান্ত্রিক উপায়ে হয় নামানুষকে বুদ্ধি ও শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিমান জীবে পরিণত করা যায় কিন্তু মানুষমানুষ হয় আত্মিক জাগরণে তাঁর মতে, শিক্ষা কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়, বরং মনুষ্যত্বের জাগরণ। বলেছেন, "আজ সমগ্র শিক্ষার মধ্যে তথ্য অনেক আছে কিন্তু কোন নীতিবাদই নেই। টেকনিক্যাল এক্সপার্ট তৈরীর ব্যাপক প্রসার হচ্ছে কিন্তু মনুষ্যত্ব কি এবং কিসে তার সংজ্ঞা ক্রমশ অস্পষ্টতর হয়ে চলেছে।" এর ফলে শিক্ষিত সমাজ চতুর থেকে চতুরতর হচ্ছে কিন্তু মমত্ববোধে যে মনুষ্যত্বের অখণ্ড ঐক্য সৃষ্টি হয়জীবনের সেই উৎসটি হারিয়ে গেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান বা যুক্তি দিয়ে নয়, বরং এক "আত্মিক সাধনায়" মানুষের মধ্যে নিবিড় আত্মীয়তাবোধ তৈরি হয়। যে বোধের মাধ্যমে একজন গর্ব করে বলতে পারে— "আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই।"

 

চীন-ভারত, ভারত-পাকিস্তান, বেরুবাড়ি, গোর্খাল্যাণ্ড ইত্যাদি সীমান্ত সমস্যার কারণগুলি সম্পর্কে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন স্বাধীনতার সময় থেকে ভারতের বড়ো সমস্যা দ্বিজাতিতত্বের সমস্যা এবং সে বিষয়ে  তাঁর ব্যাকুলতা ছিল অনেক বেশি ইতিহাস অনুসন্ধানে তাঁর অভিমত, ভারতবর্ষে মুসলমান ধর্ম সাতশ বছর রাজনীতিকে আশ্রয় করে রাজনৈতিক সাধনাই করেছে তাঁরা হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে যে পৃথক নীতি অনুসরণ করেছিলেন তার মূলে ছিল নিজেদের দিকে একটা শক্তিকে সংহত করবার রাজনীতিধর্ম এখানে অবলম্বন মাত্র স্বাধীন দেশেও হিন্দু-মুসলমান সমস্যার মূলে রয়েছে পাকিস্তানে ধর্মাশ্রিত রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা তারাশঙ্কর দেখেছিলেন, দেশভাগের পর হিন্দু পূর্বপাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে—তার কারণ হিন্দুত্ব অর্থাৎ ধর্ম। মুসলমান ভারতবর্ষের বাসিন্দা হয়েও পাকস্তানী ধ্বনি দিচ্ছে—তার কারণও তার ধর্ম। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ; পাকিস্তান মুসলমান রাষ্ট্র অনেক মুসলমান ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিতে ভারতে নিরাপদ এবং অন্তরালে ভারত বিরোধিতায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে; কিন্তু হিন্দুর তেমন কোনো অধিকার নেই, যে অধিকার বলে হিন্দুহিন্দুকে বাঁচাতে পারে, হিন্দু নারীকে ধর্ষণের লাঞ্ছনা থেকে রক্ষা করতে পারে ভিন্ন রাষ্ট্রে হিন্দু সংখ্যালঘু বলে অত্যাচারিত এবং ধর্মে হিন্দু বলে ভারতের হিন্দুর কাছেও তাদের কোনো বিশেষ দাবি নাই।  বলেছেন, ওখানকার সংখ্যালঘু হিন্দুদের এখানে আনা হোক। যারা ভিন্ন রাষ্ট্রমুখি তারা বিদায় হোন। যারা সম্প্রদায়গত বিদ্বেষের ধাক্কায় এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন—তাঁদের অহিংসার পথ ধরে অসাম্প্রদায়িক করে তুলতে হবে। এ দায় রাস্ট্রকে নিতে হবে। বলেছিলেন, ভারতের সীমান্ত উন্মুক্ত হোকপূর্বপাকিস্তানের সংখ্যালঘিষ্ঠদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতবর্ষের মুসলমান সম্প্রদায় হিন্দুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই পুণ্যকর্মের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রমাণ দিক তাঁর হিন্দুবিরোধী, ভারতবিরোধী নন বিপন্ন হিন্দুর পুনর্বাসন এবং ভারতবিদ্বেষীদের নির্বাসনের অধিকারে তারাশঙ্কর কি তবে হিন্দুরাষ্ট্রের কথা বলতে চেয়েছিলেনএমন কৌতূহল উঠে আসা অত্যন্ত স্বাভাবিক বলেই মনে করি

      তারাশঙ্কর জানতেন সময় এবং পরিস্থিতির কারণে মানবচিত্তের পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষকে জয় করার চিরায়ত কোনো মেডিজি মানবসভ্যতায় আবিষ্কার হয়নিদেশের রাজনৈতিক সংকট এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতায় মানুষ একদিকে যেমন বিচ্ছিন্ন এবং বিভ্রান্ত তেমনি নতুন পথের সন্ধানে উদ্ভ্রান্তওতারাশঙ্করের কথায় মানুষের ভাবনাই হচ্ছে কালের নতুন রূপবাস্তবের আঘাতে সেই ভাবনার জন্ম হয়আমাদের কৌতূহল সেই আঘাত যদি রাষ্ট্রবন্দনার দিক থেকে আসে! বন্দেমাতরম মন্ত্রগীতে ধর্মনিরপেক্ষতার কুণ্ঠাবোধ থাকলে তারাশঙ্করের ধাত্রীদেবতার আদর্শপথে সঙ্গীতটির আক্ষরিক ব্যাখ্যা যদি তুলে ধরা যায়! অন্নদা-প্রাণদা ধাত্রীদেবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সার্বজনীন এবং সর্বজনীন সত্য মাটি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্কের সনাতন সত্যটিকে সাংবিধানিক নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরলে ভারতভূমি ধাত্রীদেবতাকে সম্মান জানানো হয় যে ভারতভূমি আমাদের সকলের সুরক্ষার দুর্গ সেই ভারতের প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে নিয়মের নিষ্ঠায় নিত্য সমবেত ধ্বনিতে বন্দনাগান ধ্বনিত করে তুললে জাতীয় আবেগের পুনর্জাগরণ কি অসম্ভব! ধাত্রীদেবতা মানে ভারতমাতা; ভারতমাতা মানে তো ভারতবাসীর ধাত্রীদেবতা আসুন আমরা ভক্তিভরে সেই মায়ের বন্দনা করে তারাশঙ্করকে শ্রদ্ধা জানাই

                           দেবাশিস মুখোপাধ্যায়,

হাটজনবাজার, বীরভূম-৭৩১১০২

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

    

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

No comments:

Post a Comment

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। সময়মতো উত্তর পাবেন।

  তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় : দেশভক্তি এবং দেশভাবনা দেবাশিস মুখোপাধ্যায়   স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত তারাশঙ্কর...