
তারাশঙ্কর-স্মৃতি
সাহিত্যসমাজ
পঞ্চম বর্ষপূর্তি
সম্মেলন, ২০২৪
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
পঞ্চম স্মারক বক্তৃতা
জাতীয় আলোচনাচক্র
এবং স্বরচিত গল্প-কবিতা পাঠ
সম্পাদক এবং আহ্বায়কের
প্রতিবেদন
ড. দেবাশিস মুখোপাধ্যায়
২১ জুলাই ২০২৪
সকাল সাড়ে দশটা থেকে বিকাল
সাড়ে চারটে
বীরভূম সাহিত্য পরিষদ
সভাকক্ষ
সিউড়ি, বীরভূম,
পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ
মঞ্চে উপস্থিত—
মাননীয় শ্রীযুক্ত বিপিন
মুখোপাধ্যায়
অবসরপ্রাপ্ত জেলা বিচারক
এবং
সভাপতি—তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ
ড. সঙ্গীতা সান্যাল
অধ্যাপিকা—বাংলা বিভাগ,
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ
ড. নবগোপাল রায়
অধ্যাপিকা—বাংলা বিভাগ,
সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়,
পশ্চিমবঙ্গ
ড. দেবাশিস কর্মকার
অধ্যাপক—সংস্কৃত বিভাগ,
ওড়িশা কেন্দ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়, ওড়িশা
শ্রীমহাদেব দত্ত
ম্যানেজিং কমিটির সদস্য—তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ
সম্মাননীয় সুধীবৃন্দ—
উপস্থিত সুধীবৃন্দ এবং মঞ্চে উপস্থিত
সম্মাননীয় অতিথিবৃন্দ—মহোদয়েরা, আপনারা সকলেই তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ-এর পক্ষ থেকে বিনম্রচিত্তের শ্রদ্ধা
আন্তরিক অভিনন্দন এবং যুক্তকরের সমবেত কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করবেন। আজ গুরুপূর্ণিমা তিথির পরম পবিত্র দিনে সারস্বত গুরু এবং প্রতিদিনের প্রতিটি মুহূর্তে যাঁরা কোনো না কোনোভাবে আলোকের দিশা দিয়ে থাকেন সেইসব গুরুস্থানীয়দের ব্যক্তিগতভাবে এবং সংস্থার পক্ষ থেকে বিনম্রচিত্তের সমবেত
প্রণামাঞ্জলি নিবেদন করছি। প্রার্থনা জানাই—আলোকশিখায় স্নাত করে বিনত কর হে নিত্য দিনে।
আজ ৫ই শ্রাবণ; তথাপি ঋতুর উদাসীন বৈরাগ্যলীলায় রিমিঝিমি শব্দে শ্রাবণের বরিষণধারা আমরা এবার পাইনি—পেয়েছি কঠোর রৌদ্রের তীব্দ্র দাবদাহময় চিটচিটে আবহাওয়া কিন্তু এই রিক্ততার মধ্যেও বাঙালি বিস্মৃত হয়নি শ্রাবণের সারস্বত ঐতিহ্যকে স্মরণে রাখতে। দুই চিরস্মরণীয় বাঙালি তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিরোভাব এবং তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাবের মাস হিসেবে শ্রাবণের ঐতিহ্যকে মহাসমারোহে পালন করতে বঙ্গবাসী ব্যাকুল। সেই ঐতিহ্য অনুসরণে আগামী ৮ই শ্রাবণ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন স্মরণে বঙ্গসরস্বরতীর সেবক হিসেবে তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজও তার অন্তরের নৈবেদ্য নিবেদনে তৎপর হয়েছে। হে সারস্বত সমাজ—আজ আপনারা আমাদের এই নৈবেদ্য গ্রহণ করে আমাদের কৃতার্থ করুন—ধন্য করুন। একই সঙ্গে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একশো পঁচিশতম জন্মবছর—ইত্যাদি স্মরণীয় সময়গুলিকে সমবেতভাবে শ্রদ্ধায় স্মরণে রাখতে—তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতার আয়োজনের সঙ্গে আধুনিক বাংলাসাহিত্যে প্রাচীন ভারত—বিষয়ক আলোচনার আয়োজন করতে আমরা সচেষ্ট হতে চেয়েছি।
২
অতিথিবৃন্দকে আন্তরিক অভিনন্দন
জানাতে গিয়ে জানাতে হচ্ছে যে, রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. গৌতম মুখোপাধ্যায় শারীরিক অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে পারেননি; তবে ঝাড়খণ্ড বাংলাভাষা
ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতির রাজ্য সম্পাদক এবং বাংলা ও হিন্দি সংবাদপত্রের সাংবাদিক শ্রীগৌতম
চট্টোপাধ্যায়কে আমরা পেয়েছি। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয়া অধ্যাপিকা সঙ্গীতা সান্যাল মহাশয়া, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাননীয়
নবগোপাল রায় মহাশয়; বঙ্গবহির্ভূত রাজ্য থেকে উপস্থিত ওড়িশার কেন্দ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয়
অধ্যাপক দেবাশিস কর্মকার এবং ঝাড়খণ্ড বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা সমিতির রাজ্য সম্পাদক মহাশয়দের
প্রত্যেককে আজ আমরা বঙ্গীয় রীতিতে বীরভূমের গৈরিক মৃত্তিকার ভক্তিতিলকে অভিসিঞ্চিত
করে নিতে চাই। আপনারা তা গ্রহণ করে আন্তরিকতার
স্পর্শে আমাদের ধন্য করুন। আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণে সাড়া দিয়ে আপনাদের এই উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে সমৃদ্ধতার সঙ্গে জাতীয় সম্মানে সম্মানিত করেছে। বীরভূমবাসী তাঁর এই প্রাপ্তির সমৃদ্ধতা এবং আনন্দ জাতীয় সারস্বত সমাজের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে ধন্য হতে চায়। বলতে আনন্দ অনুভব করছি যে আজকের দুই মুখ্য আলোচক নবগোপাল রায় এবং দেবাশিস কর্মকার উভয়েই তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ এর আপনজন। আমাদের অভিভাবক এবং সদস্য সহ উপস্থিত অধ্যাপক, গবেষক এবং সারস্বত সমাজের সকলের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভক্তির কৃতজ্ঞতা জানাই; এবং স্নেহপূর্ণ শুভেচ্ছা জানাই উদীয়মান ক্ষুদে সাহিত্যিক ও সাহিত্যপ্রেমীদের। আজ আমরা অনুষ্ঠান সঞ্চালনার জন্য পেয়েছি—ড. তপন গোস্বামী মহাশয়কে। তিনি হেতমপুর কৃষ্ণচন্দ্র কলেজ-এর বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি আমাদের সদস্য। তাঁকে আমরা বিনত শ্রদ্ধা জানাই।
ওড়িশার কেন্দ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য ড. চক্রধর ত্রিপাঠী মহাশয় এবং জাপান থেকে মাননীয় অধ্যাপক মাসাইয়ুকি ওনিশি আমাদের অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করে শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে আমরা সারস্বত প্রণাম নিবেদন করি। বলতে পারি তাঁদের শুভেচ্ছাবার্তা আজকের এই সারস্বত সম্মেলনকে জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিকার স্পর্শ অনুভবে সুরভিত করেছে।
তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ- পঞ্চম বর্ষ অতিক্রম করে ষষ্ঠ বৎসরে
পদার্পণ করেছে। ম্যানেজিং কমিটি সহ সদস্যদের অকুণ্ঠ সহযোগিতার অবদানে অত্যন্ত
ধীর গতিতে হলেও সংস্থার বিকাশ যে সম্ভব হয়ে উঠছে—একথা প্রাণভরে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণার আনন্দ অনুভবে আমরা ঋদ্ধ। সংস্থার বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে ইংরেজি বছরের শুরুতে জানুয়ারি
মাসে। বিশেষ পরিস্থিতির কারণে
এবারে তার বিলম্ব ঘটল। অনিচ্ছাকৃত অনিবার্যতায় ম্যানেজিং কমিটি সহ সকল সদস্যদের কাছে
সম্পাদক মার্জনা প্রার্থী। বিলম্বে হলেও বর্ষপূর্তি অধিবেশনের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছে—ম্যানেজিং কমিটি এবং পরে সদস্যদের আন্তরিকতার
সহযোগিতায়। সংস্থা সকলের প্রতি বিনত
কৃতজ্ঞতা জানায়। ম্যানেজিং কমিটির শ্রীযুক্ত মহাদেব দত্ত তাঁর বৃদ্ধ বয়স এবং শিথিল শরীরকে উপেক্ষা করেও এক ঋজু স্তম্ভ স্বরূপ সক্রিয় সহযোগিতায়
অবিচল আছেন তা আমাদের চরম প্রাপ্তি। আর এক স্তম্ভ সংস্থার সভাপতি শ্রীযুক্ত বিপিন মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের চরম সহিষ্ণুতা এবং উদার সরলতা কত গভীর তা একান্ত অনুভবের বিষয়। বিশেষ করে সংস্থার কোনো কোনো সঙ্কট মুহূর্তে সম্পাদকের ঔদ্ধত্যময় রূঢ় ভাষা সভাপতি মহাশয় যে স্নেহে সহ্য করেন—তা কোনো মহৎ পিতৃহৃদয় ছাড়া সম্ভব নয় বলেই মনে করি। সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে তাঁকে ভক্তি নিবেদনে নিজেকে গ্লানিমুক্ত মনে হচ্ছে। সহযোগিতায় যেমন কেউ রথের দড়ি ধরে টানছেন কেউ বা স্রোতোধারার পাশে শক্ত বাঁধের ন্যায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থেকে স্রোতোধারাকে গতিশীল করে চলেছেন। সকলকেই আমাদের কৃতজ্ঞতা এবং প্রণাম জানাই। সম্পাদকের ভূমিকা থেকে সাময়িক সরে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সংস্থার প্রত্যেক আপনজনের কাছে বিনীত অনুরোধ যে, সংস্থার সম্পাদকের যে কোনো পদক্ষেপে কোনো সংশয় অথবা কৌতূহল থাকলে রীতি ও নীতির বিধান অনুসারে তার আলোচনা এবং সংস্কারমূলক পদ্ধতির পথ আমাদের পাথেয়
হোক। কারণ, যে কোনো ক্ষেত্রেই নীতি বহির্ভূত রীতি—ব্যক্তির অহং সত্তাকে সঙ্কীর্ণ পথে চালিত করে বিশ্বাসের বন্ধনে
সংশয়ের আশঙ্কা এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। আমরা জানি বর্জনের পথে নয় সংস্কারকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়। সেই সূত্রে আমাদের প্রত্যেকের অহং সত্তার সংস্কারের অনুরোধ জানিয়ে সংস্থা মধুরের পথে আয়ত এবং নিত্য-নূতন আপনজনের প্রতীক্ষায় থাকবে। আপনারা ভালোবেসে সেবকের ব্রতধর্ম
অবলম্বনে বলুন—তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ আমার এবং আমাদের।
৩
তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ-এর উদ্দেশ্য বাংলাসাহিত্য সহ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্যচর্চা
এবং তার বিকাশ। আমরা যেমন নিয়মিত তারাশঙ্করচর্চা করে থাকি তেমনি বিকাশের ক্ষেত্রেও
ধীরে ধীরে তার সফলতার অঙ্কুর উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। বিগত পাঁচ বছর যাবৎ যে উদ্যোগ
আমরা গ্রহণ করেছি সেখানে বছর দুয়েক যাবৎ বঙ্গে এবং আসাম-ত্রিপুরা-ঝাড়খণ্ড রাজ্যগুলিতেও তারাশঙ্করচর্চার প্রকাশ ও বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। আমাদের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ
হয়ে রাঁচী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলা একাডেমি নামে একটি
সংস্থা গত বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে প্রথম তারাশঙ্করের জন্মদিন পালন করেন। ত্রিপুরার বাংলা একাডেমি
নামে সংস্থার সভাপতি মাননীয় ভাস্কর বর্মন মহাশয় আমাদের জানিয়েছেন—এবারেও তাঁরা উদ্যোগী
হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে তারাশঙ্কর
স্মরণ অনুষ্ঠান সহ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাধিপ্রাপ্তির জন্য তারাশঙ্কর গবেষণার বহর বৃদ্ধি
পেয়েছে। মঞ্চে উপস্থিত অধ্যাপিকা
সঙ্গীতা সান্যাল মহাশয়া সেকথা আরও ভালো বলতে পারবেন বলেই মনে করি।
প্রসঙ্গক্রমে একটি কথার জবাবদিহি করতে সম্পাদক বাধ্য বলেই মনে করি। কথা উঠেছিল—তারাশঙ্করের সাহিত্যপ্রতিভা
তো রবীন্দ্রনাথের মতো বিশাল নয়; তবে তাঁকে নিয়ে এতো মাতামাতি
কেন? কথাটা যেখানে যেভাবেই আলোচিত হোক না কেন ‘মাতামাতি’ কথাটি মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে পীড়াদায়ক। সম্পাদক এবং একজন তারাশঙ্কর
অনুরাগী হিসেবে আমাদের কথা তুলে ধরতে চাইব—উপস্থিত সারস্বত সমাজ তার মূল্যায়ণ করবেন। এই প্রসঙ্গে আমরা বলতে
চাইব—প্রথমত, সমগ্র বঙ্গের মধ্যে বীরভূম—সাহিত্য ও সংস্কৃতির
এক অন্যতম সাধনপীঠ। সাহিত্যে ভবভূতি থেকে শুরু করে কবি জয়দেব চণ্ডীদাস রবীন্দ্রনাথ
এবং কথাসাহিত্যে তারাশঙ্কর-শৈলজা-ফাল্গুনী-সজনীকান্ত
প্রমুখের যে সারস্বত ধারা জাতীয় চেতনা এবং মনুষ্যত্বের জয়গানে বীরভূমের মহিমাকে বিশ্বসম্মুখে
তুলে ধরেছেন এবং ধরতে চেয়েছেন—আমরা সেই বীরভূমের মানুষ। কুলজ সন্তান হিসেবে তাঁদের
মহিমান্বিত আশীর্বাদী-সৌরভ ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের কর্তব্যকর্ম। তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ
সেই নৈতিক দায়বদ্ধতাকে জীবনের ব্রত করতে চেয়েছে মাত্র। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্যচর্চা সেই ব্রতপালনের বিশেষ এক আধারমাত্র।
তারাশঙ্কর
বন্দ্যোপাধ্যায় বীরভূমের মানুষ হয়েও সাহিত্যমহিমায় তিনি সমগ্র ভারতবর্ষ এবং বিশ্বসাহিত্যের
ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। বীরভূমের গ্রাম্যভাষা সহ একেবারে সম্পুর্ণ বাঙালিয়ানায় উপস্থাপিত
তারাশঙ্করের গল্প-উপন্যাস বিশ্বের সারস্বত
সমাজকে নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট করেছে। আমরা
অনুসন্ধান করে দেখেছি, তাঁর সমকাল থেকে একাল
পর্যন্ত এশিয়া ইউরোপ আমেরিকা এবং অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশের—ভারতবর্ষ
বাংলাদেশ অষ্ট্রেলিয়া আমেরিকা চীন চেকোশ্লোভাকিয়া জাপান রাশিয়া সুইডেন কত কত দেশের
সারস্বত সমাজ—অনুবাদে গবেষণায় জার্নালে তারাশঙ্কর চর্চা করছেন
তা জানলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। সেই
অনুসন্ধানের পথেই আমরা জানতে পারি সুদূর আমেরিকা এবং জাপান থেকে তারাশঙ্কর অনুসন্ধিৎসু
গবেষক লাভপুরে এসে তারাশঙ্করের জন্মগ্রামের মাটি ছুঁয়ে তারাশঙ্কর অনুসন্ধান করেছেন। এমন সংবাদ অভাবনীয় না হলেও যে বড়ো আনন্দের তা আর
বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশ্চাত্যলেখকের
ইংরেজি এবং বাংলাভাষায় লেখা তারাশঙ্কর বিষয়ক রচনা আমরা পড়েছি। এই সূত্রে আমেরিকা ও জাপানের দুই অধ্যাপক এবং এক
অধ্যাপিকার সঙ্গে পত্রালাপে ও ফোনালাপে তারাশঙ্কর বিষয়ক আলোচনায় সেই আনন্দ
অনুভবের সুযোগও আমরা পেয়েছি। তাঁদের তারাশঙ্কর বিষয়ক বেশকিছু লেখা পড়ে স্বাভাবিকভাবেই জানা গেছে যে তাঁদের
তারাশঙ্কর অনুসন্ধানের মূল কারণ তারাশঙ্করের সাহিত্যদর্শন—যা ভারতভূগোলের গণ্ডিকে অতিক্রম করে বিশ্বমানবতার
জীবনদর্শনে সমৃদ্ধ। সাহিত্যে
বিশ্বমানবতার আবেদন ছিল বলেই ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেলের
জন্য বিখ্যাত সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস, আর্থার মিলার, বোর্হেসের মতো বিদেশের সাহিত্যিকদের সঙ্গে বাংলা সাহিত্য থেকে মনোনীত হয়েছিলেন তারাশঙ্কর। ৫১ বছর পর সেই তথ্য প্রকাশ করেছেন নোবেল
কমিটি। মৃত্যু
পুরস্কার প্রাপ্তির পথে বাধা হয়েছে ঠিকই কিন্তু সাহিত্যদর্শনের মহিমায় বিশ্বের
সারস্বত সমাজে তারাশঙ্করের নাম উজ্জ্বল অক্ষরে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে এবং থাকবে।
তারাশঙ্কর তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনাপর্ব থেকেই
নিজেকে বিশ্বমানবতার সন্তান বলে মনে করতেন এবং বিশ্বচেতনার সুরেই যেন নিজের
জীবনসাধনা এবং সাহিত্যসাধনার সুরটি বেঁধে নিতে চেয়েছিলেন। প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালী ঘূর্ণি’ থেকেই
তার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯৩৮
সালে চল্লিশ বছর বয়সে প্রকাশিত ‘ধাত্রীদেবতা’ উপন্যাসে তিনি বলেছেন—“সমস্ত জীবের ধাত্রী যিনি ধরিত্রী; জাতির মধ্যে তিনিই
তো দেশ। মানুষের কাছে তিনি
বাস্তু”। ধরিত্রী তথা বিশ্বকে চেনার মধ্য দিয়ে তিনি যেমন
তাঁর বাস্তু তথা জন্মভূমিকে চিনে নিতে চেয়েছিলেন তেমনি নিজের জন্মভূমি জন্মগ্রামের
মানুষকে জানার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানুষকে জানতে চেয়েছিলেন। তাঁর সাহিত্যে বিশ্বমানবের জীবনদর্শনের পরিচয়
নিহিত রয়েছে বলেই একজন সাহিত্যিক হিসেবে আমন্ত্রিত তারাশঙ্কর পৃথিবীর
বাংলাদেশ চীন রাশিয়া রেঙুন বিভিন্ন দেশে উপস্থিত হয়েছিলেন; এমনকি আমেরিকা থেকেও তাঁর আমন্ত্রণ এসেছিল।
৪
তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ
বর্ষপূর্তি অধিবেশন উপলক্ষ্যে যে যে বিষয়গুলি আয়োজনের উদ্যোগ নিয়ে থাকেন—তার একটি হলো তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা। এবারে পঞ্চম স্মারক বক্তৃতা
দেবেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের তারাশঙ্কর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপিকা মাননীয়া সঙ্গীতা সান্যাল
মহাশয়া। “দুই পথিকের পথপরিক্রমণ:
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ফণীশ্বরনাথ ‘রেণু’”
এই বিষয়ে তিনি আজ আলোকপাত করবেন। আমরা জানি—অসমীয়া,
উর্দু, ওড়িয়া কন্নড়, গুজরাটি,
তামিল, তেলেগু, পাঞ্জাবী,
মারাঠী, মালয়ালম, সিন্ধি,
হিন্দী—এইসব ভারতীয় ভাষায় তারাশঙ্করের বিভিন্ন
বই অনূদিত হয়েছে। এছাড়া, ভারতবর্ষের অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে
তারাশঙ্করের তুলনামূলক আলোচনা যেমন সঙ্গত তেমনি তারাশঙ্করের প্রভাব বিষয়টিও আলোচনাযোগ্য। “প্রতিবেশী ভারতীয়
সাহিত্য ও তারাশঙ্কর” বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রাক্তন অধ্যাপক বিপ্লব চক্রবর্তী মহাশয়। ফণীশ্বরনাথ রেণু একজন হিন্দী সাহিত্যিক; তাঁর মূল উদ্দেশ্য গ্রামীণ চাষীদের শোষণমুক্তির
কথা তুলে ধরা। দুটি ভাষার ভারতীয় দুই
সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সঙ্গীতা সান্যাল মহাশয়া যে বক্তব্য রাখতে চলেছেন
তা শোনার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছি।
৫
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং
বাংলাসাহিত্যকে শ্রদ্ধা জানাতে--এবারে আমরা এক জাতীয় আলোচনাচক্রের আয়োজন করেছি। আমরা জানি, আধুনিক বাংলাসাহিত্য বঙ্গভাবনা
এবং জাতীয় চেতনায় সমগ্র বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে; বাঙালি হিসেবে
বাংলাভাষার সারস্বত সমাজের সদস্য হিসেবে এ আমাদের অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়। যুগোচিত আধারে পরিশোধিত
হলেও বাংলাসাহিত্যের এমন উন্নত মস্তকের অস্তিত্বমূলে রয়েছে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের
রসধারা।
আধুনিক যুগে তথা ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত মাইকেল মধুসূদন
দত্ত থেকে বঙ্কিমচন্দ্র বিবেকানন্দ রবীন্দ্রনাথ তারাশঙ্কর নজরুল সতেন্দ্রনাথ জীবনানন্দ
সকলেই সেই রসধারায় স্নাত এবং সিক্ত। বাংলাসাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তাঁরা তাঁদের সমগ্র জীবন ধরে
ভারতবর্ষকেই বিনির্মান করতে এবং ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শনকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। সেই বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ
করছেন—দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সম্মানীয় অধ্যাপক। তাঁদের আলোচনা শোনার জন্যও আমরা
অধীর অগ্রহে অপেক্ষায় আছি।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে ইচ্ছে করছে
যে, আধুনিক বঙ্গসাহিত্যের ন্যায় আধুনিক জীবন তথা ব্যক্তিত্ব বিনির্মানেও
প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করতে হয়। প্রাচীন ঐতিহ্যের অধ্যয়ণ অনুশীলন
এবং সৌজন্য-শিষ্টাচারের উপাদানগুলি যুগোচিত আধারে শোধন করেই প্রকৃত ব্যক্তিত্বের বিকাশ
সম্ভব বলে মনে করি। আমিত্বের আমিকে ধ্বংস করেই তো ক্রমাগত আমিত্বের বিকাশ; আমিত্ব অর্জনই
তো মনুষ্যত্ব্ এবং সেই আমিত্ব অর্জনের পথেই তো রত্নাকর থেকে বাল্মিকীর জন্ম; রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্ম-উপলব্ধিময় আমিত্বের বিকাশ, কবি নজরুলের বিদ্রোহ, জমিদার হয়েও সামন্ততন্ত্র
থেকে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় তারাশঙ্করের সাধনা। এই বৃহৎ আমিত্ব সমবেত আমিত্ব বোধই
তো সমাজকল্যাণের আধার। তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ-এর
প্রতিষ্ঠাতা সমবেতভাবে সেই প্রাচীন এবং চিরায়ত আমিত্ব পথের পথিক এবং সেই উপলব্ধি থেকেই
সংস্থার লোগোটি নির্মাণ করা হয়েছে। সংবেদনশীলতার অনুভবে নমনীয়তা থাকলেও সংস্থার যিনি প্রতিষ্ঠাতা--সমবেত আমিত্বের
পথে তাঁর ঋজু এবং প্রাসঙ্গিক অনমনীয়তা অনিবার্য বলেই মনে করি।
৬
বার্ষিক অধিবেশনে তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ
যে যে কর্মের উদ্যোগ নিয়ে থাকে—তার একটি হলো ‘অরণ্য-অগ্নি’ নামে গবেষণাধর্মী
একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ। এবারে বিশেষ কারণে সেই প্রকাশনা সম্ভব হয়নি; তবে গত ২০২৩ সালে
বীরভূম মহাবিদ্যালয়ের সহযোগিতা নিয়ে তারাশঙ্কর-স্মৃতি সাহিত্যসমাজ—তারাশঙ্কর বিষয়ে দুদিনের এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলির
সংকলন প্রকাশে আভ্যন্তরীণ বিচিত্র জটিলতায় সম্পাদককে
নাজেহাল হতে হয়। অবশেষে আর্থিক অক্ষমতার ঝুঁকি আপাত নিজের কাঁধে নিয়ে “আন্তর্জাতিক মঞ্চে
তারাশঙ্কর ভাবনা” নামে একটি সংকলন প্রকাশ সম্ভব হয়েছে। আজ তার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
ঘটবে; বইটি বিভিন্ন মাত্রায় অসম্পূর্ণ থাকার কারণে—বইটির প্রকাশ
ঘটলেও পরিবেশন সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বাস রাখি স্বল্প সময়ের মধ্যেই তার ত্রুটিহীন প্রকাশ সম্ভব
হয়ে উঠবে। কেবলমাত্র আজ এই অনুষ্ঠানের জন্য অসম্পূর্ণ দুটি বই আমাদের হাতে এসেছে—একটি উদ্বোধন এবং আর একটি প্রুফ সংশোধনের জন্য। বইটি প্রকাশের জন্য সংস্থার সভাপতি মহাশয়কে অনুরোধ জানাব আর প্রুফ দেখার অনুরোধ জানাব—হাওড়া বেলুড় মঠ, রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যাপক এবং আমাদের সদস্য ড. সপ্তর্ষি পাল মহাশয়কে।
বিশ্বাস রাখি স্বল্প সময়ের মধ্যেই
তার ত্রুটিহীন প্রকাশ সম্ভব হয়ে উঠবে।
৬
আজকের এই অনুষ্ঠানে মহাবিদ্যালয়
এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে আগত কয়েকজন অধ্যাপক, কয়েকজন গবেষক এবং সিউড়ি সদর হাসপাতালের
এক খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁদের গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য বিষয় শিরোনাম আমাদের
কাছে পাঠিয়েছেন। সকলকেই আমাদের সারস্বত অভিনন্দন জানাই। এছাড়া কয়েকজন কবি, গল্পকার এবং বাচিক
শিল্পীর সান্নিধ্য আমাদের বিশেষ প্রাপ্তি। সিউড়ির গল্পকথা এবং অনতিদূরের
শিল্পীদের সঙ্গে দুর্গাপুরের ‘স্বরবাক’ শিল্পীদের উপস্থিতি
সহ সিউড়ি সরোজিনীদেবী সরস্বতী শিশু মন্দির-এর ছাত্রছাত্রীদের
অংশগ্রহণ এক ভিন্নমাত্রার সমৃদ্ধতা বলে মনে করি। বিশেষ করে স্কুল পড়ুয়া ক্ষুদে
উদীয়মান সাহিত্যিকদের কথায়—পরিণামী বিশ্বাসের স্বপ্ন দেখি—একদিন এদেরই
মধ্যে থেকে আর এক তারাশঙ্কর অথবা মহাশ্বেতা জন্মগ্রহণ করবেন। সকালের সূর্যকিরণ অঙ্কুরিতদের
নিত্য আশীর্বাদ করেন; আপনারাও ওদের আশীর্বাদ করুন এই আবেদন জানাই।