Sunday, 30 June 2024

 

 

 

 

তারাশঙ্করের উপন্যাসের নরনারী : যাদের দেখেছি

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

সামাজিক উপন্যাসের চরিত্রচ্ছায়া—সে তো ধূলিমলিন বাস্তবের কায়ার অনুরূপ; রক্তমাংস-সম্ভূত মানুষের পরিমার্জিত প্রতিবিম্ব—এবং সেই সত্য সামাজিক শিল্পীর যেন চিরায়ত অবলম্বনসামাজিক ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কথা তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলির অধিকাংশই তাঁর নিজের চোখে দেখা এবং কথা বলা পরিচিত মানুষ। দেখেছি পুস্তকাকারে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘চৈতালী ঘূর্ণী’ থেকে শুরু করে মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘১৯৭১’ নামক উপন্যাস অবধি কমবেশি একথা স্মরণীয়। অনুসন্ধান করে এমন অনেক মানুষের নাম-ঠিকানা সহ বাস্তব পরিচয় জানাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে; এমনকি তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে মুখোমুখি বসে আলাপচারিতার সুযোগও আমরা পেয়েছি। তারাশঙ্করের সাতটি উপন্যাস এবং প্রসঙ্গতঃ বিশেষ একটি গল্প থেকে এমন দশজন নরনারীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হলো। বড়ো আনন্দের বিষয় যে তাঁদের একজন দু’জন শতবর্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজও আমাদের মধ্যে রয়েছেন।

 

বীরভূমের লাভপুরে তারাশঙ্করের বন্ধুপুত্র ডাঃ সুকুমারচন্দ্র চন্দ্র ওরফে বিশু ডাক্তার  শতবর্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আজও চিকিৎসাপথে মানুষের সেবা করে চলেছেন। লাভপুরের এই বিশু ডাক্তার তারাশঙ্করের গল্পে এবং উপন্যাসে স্বনামে এবং অন্যনামে একজন চিকিৎসক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত। আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের স্মৃতিচারণায় ডাক্তারবাবু নিজেই সে কথা জানিয়েছেন।

     ১৯৯৮ সাল, তারাশঙ্করের সাহিত্যের চরিত্রগুলির বাস্তব পরিচয়ের অনুসন্ধানে ক্ষেত্রসমীক্ষা শুরু করেছি। লাভপুর অঞ্চলের অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। সেই সময় ডাক্তারবাবুর সঙ্গেও পরিচয় হয়। আমার ডায়রিতে লেখা রয়েছে তারাশঙ্কর অনুসন্ধানে ডাক্তারবাবুর কাছে প্রথম গিয়েছিলাম ১৯৯৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারিতখন তিনি সত্তর বছরের প্রবীণ ডাক্তার। সেই যোগাযোগ আমাদের এখনো রয়েছে। মনে পড়ে ২০১৫ সালে মায়ের চিকিৎসা করতে আমাদের সিউড়ির বাড়িতেও তিনি এসেছিলেনফিজ তো দূরের কথা, গাড়িভাড়াটুকুও ধরাতে পারিনি; বরং আমার কন্যার জন্য বিবিধ রকমের বিস্কুট এবং চকোলেট নিয়ে এসেছিলেন। দীর্ঘদিন পর আজ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, রাত্রি সাড়ে ন’টার সময় এই প্রবন্ধ লিখতে বসে তাঁর সঙ্গে আবার ফোনে কথা বললাম। মনে পড়ল প্রথম সাক্ষাৎ-সময়ের কয়েকটি দিনের কথা। একদিন স্মৃতিচারণায় তিনি বলেছিলেন—

     তারাশঙ্করবাবু তো আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। আমাকে ছেলের মতোই ভালোবাসতেন। আমি তখন কলকাতার আর. জি. কর. মেডিকেল কলেজে পড়ি। হোস্টেলে থাকি। মাঝে মধ্যেই ফোন করতেন—একবার এসো। নির্দেশ মনে করে তাঁর কলকাতার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হতাম। তিনিও হোষ্টেলে গিয়ে দেখা করতেন। ডাক্তারি পাশ করার পর নির্দেশ দিলেন—গ্রামে বসে মানুষের সেবা কর। আমি আজও তাঁর সেই নির্দেশ পালন করছি।

     তারাশঙ্করের ‘এ মেয়ে কেমন মেয়ে’ গল্পে বিশু ডাক্তার নামে একটি চরিত্র রয়েছে। একদিনের এক সাক্ষাৎকারে সে কথা বলতেই ডাক্তারবাবু উত্তর দিলেন—তুমি ঠিকই ধরেছো দেবাশিস। ওটা আমারই কথা বলেছেন তিনি। এছাড়াও ‘জগন্নাথের রথ’ গল্পে এবং ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসেও আমার কথা বলে গেছেন তারাশঙ্করবাবু। ওই গল্প এবং উপন্যাস দুটোই আমার পড়া ছিল। ‘জগন্নাথের রথ’ গল্পে বিশু ডাক্তারের কথা সরাসরি উল্লেখ রয়েছে কিন্তু উপন্যাসে তো পাইনি!

     ডাক্তারবাবু হাসতে হাসতে বললেন—তাঁর আদরের বিশু তখন ডাক্তার আশুবাবু হয়ে গেছে। বললেন, তারাশঙ্কর কলকাতা থেকে গ্রামের বাড়িতে এলে অনেক মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। আমিও যেতাম। একদিন দেখা করতে গেছি—উনি যেন একেবারে চিৎকার করেই বলে উঠলেন—এসো ডাক্তার আশুবাবু এসো। বিস্ময়ের দৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকালাম—শেষকালে আমার নামটাও কি ভুলে গেলেন! আমার নীরবতা দেখে উনি বোধ হয় আমার মনের ভাব বুঝতে পারলেন। সঙ্গে সঙ্গেই বললেন—ডাক্তার বিশুবাবু এখন থেকে আমার কাছে আশুবাবু। সেদিন এর অর্থ বুঝতে পারিনি; কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসও হয়নিপরে যখন ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসটি পড়ি তখন তাঁর কথার অর্থ আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপন্যাসে ডাক্তার আশু সিংহীর চেম্বারের যে ভৌগোলিক পরিচয় দেওয়া হয়েছে—বাস্তবে সেটাও তো আমারই ঠিকানা।

     ডাক্তারবাবুর কথা যত শুনছি ততই বিস্ময়ে যেন নিজেকে অজানা কোনো এক রোমাঞ্চের মধ্যে হারিয়ে ফেলছি। কত কিছু জানার কৌতূহল জাগছে। আলাপচারিতায় জানতে পারি উভয়ের মধ্যে পত্রবিনিময়ের কথা। বলেছেন—চিঠি তো অনেক লিখেছেন। আমিও লিখেছি। তবে কলকাতা থেকে যত না চিঠি লিখতেন তার থেকে গ্রামে এলে আমার কাছে তাঁর হাতচিঠি আসত অনেক। ছোট্টো টুকরো কাগজে দু’লাইন লেখা—ডাক্তার একে একটু দেখে দিও। ওষুধপথ্যের ব্যবস্থা করে দিও। জানাতেন খরচপত্র তিনি দেবেন। কত দুঃস্থ মানুষ তাঁর চিঠি নিয়ে আসত—আমি তাদের যথাসাধ্য করতাম। তখন থেকেই আমি বিনা পয়সায় দুঃস্থদের সেবা করার তাগিদ অনুভব করি। একদিন জানতে চেয়েছিলাম—চিকিৎসা বিষয় নিয়ে লেখা তারাশঙ্করের ‘আরোগ্য নিকেতন’ এর কথা। বলেছিলেন—‘আরোগ নিকেতন’ উপন্যাসের মূল বিষয়টি আমার পিতৃদেব স্বর্গীয় শরৎচন্দ্র একটি খাতায় লিখে তারাশঙ্করকে দিয়েছিলেন। আর আধুনিক চিকিৎসার বিষয়ে তিনি কয়েকবার্‌ই আমার সঙ্গে অনেক কথা আলোচনা করেন।

 

একদিনের আলাপচারিতায় ডাক্তারবাবু  বলেছিলেন,  ‘জগন্নাথের রথ’ গল্পের জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসের সীমা—এই দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে তারাশঙ্কর বাস্তবের দুই ব্যক্তির কথা বলেছেন। জগন্নাথকে আমরা জগা বলি। ‘জগন্নাথের রথ’ গল্পের জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে চরিত্রটিকে তারাশঙ্কর লাভপুরের মাটি থেকে সরাসরি স্বনামেই গল্প উপস্থাপিত করেছেন। জগন্নাথ বাস্তবিক লাভপুর বালিকা বিদ্যালয়ে, বিশু ডাক্তারের চেম্বারে, লাভপুর স্টেশনে—নিজের খেয়ালে স্বেচ্ছায় নিয়মিত দায়িত্ব পালনের মতো অনেক কাজ করতো। গল্পে তারাশঙ্কর তাঁর সেই সব দায়িত্ব পালনের বিষয়টি এক রকম হুবহু তুলে ধরেছেন। আমরা লাভপুর রেলস্টেশন এবং বালিকা বিদ্যালয়ে গিয়েও জগন্নাথের খবর নিয়েছিলাম। লাভপুর গার্লস স্কুলে জগন্নাথ যে সময় স্বেচ্ছাশ্রমে আত্মনিয়োগ করেছিলেন—সেই সময়ের দিদিমণিরা—কল্যাণী দেবনাথ, ঝর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা সেন সকলেই সেদিন জগন্নাথের কথায় খুশিতে ভরে উঠেছিলেন। এইসব দিদিমণিরাও গল্পে এক এক নামে উপস্থাপিত হয়েছেন। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জগন্নাথবাবুর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে মুখোমুখি বসে কথা বলিজানতে পারি আটচল্লিশ বছর বয়সী জগন্নাথবাবু একজন রেলকর্মী, মল্লারপুর স্টেশনে পোস্টিং; আমোদপুরে ১১/এ নম্বর রেল-কোয়াটার্সে বাস করছেন। বাকশক্তির জড়তাপূর্ণ স্মৃতিচারণায় তিনি তাঁর অতীতের কথা বলে গেলেন। চাকরির কথায় বলেছিলেন লাভপুরে বালিকা বিদ্যালয়ের দিদিমণি সুনীতি গোস্বামী তাঁকে বাসায় নিয়ে গিয়ে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভালো লাগেনি। তখন থেকেই তিনি লাভপুর ছেড়ে আমোদপুর স্টেশনে চলে আসেন। সেখানেও তাঁর স্বচ্ছাশ্রমে খুশি হয়ে কোনো এক ‘রেলবাবু’ তাঁকে এই চাকরিটি করে দেন।

     গল্পে জগন্নাথবাবুর চাকরিজীবনের কথা নেই; সুনীতি দিদিমণির মমতা এবং স্নেহ উপেক্ষা করে তাঁর চলে যাওয়ার কথা রয়েছে। সুনীতিদেবীর স্বামী জনার্দন গোস্বামী যিনি গল্পে নারায়ণবাবু, তিনি বলেছেন—“জগন্নাথের রথ যে শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবনের পথে ছোটে সুমতি। বোকা জগন্নাথের রথ ছোটে উঁচু থেকে নীচু পথে দুর্দান্তবেগে জগন্নাথের উল্লাস সেই রথেই বেশী”। তাঁর বাসায় গিয়ে দেখেছিলাম—জগন্নাথের রথ তখনো ছুটছে; যৌবন অতিক্রম করে প্রজন্মের পথে ছুটছে; তিনি তখন সরকারি চাকরি এবং স্ত্রী-কন্যা নিয়ে সুখ-স্বর্গের বাসিন্দা।

 

তারাশঙ্করের ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসের নায়িকা সীমা এক বিস্ময়কর চরিত্রসেদিনের সমাজে—একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ হয়েও সাইকেলে চড়ে স্কুলে আসত এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতায় স্বনির্ভরশীল হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতো। চাকরি তাঁর জীবনের স্বপ্ন; বিবাহ বিষয়ে—জাত-ধর্ম-মন্ত্র ব্যতিরেকে সে ‘ম্যারেজ কণ্ট্র্যাক্ট’ এ ইচ্ছুক। সেদিনের সমাজ—সীমার এই মানসিকতাকে সমর্থন না করে জোরপূর্বক বিয়ের ব্যবস্থা করলে—অধিবাসের দিন সে পালিয়ে গিয়ে আইনের আশ্রয় নেয়। সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে বি. এ. পাশ করে বি. টি.-তে ভর্তি হয়।

     ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসের সীমা বাংলা কথাসাহিত্যে নারীচরিত্রের এক স্বতন্ত্র দৃষ্টান্ত। ব্যক্তিত্বপরায়ণা নারীচরিত্র সৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পর্যন্ত একটি বিশেষ ধারার পরিচয় পাওয়া যায়; সেই ধারায় তারাশঙ্কর আরও অনেক বেশি প্রগতিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন—সীমা চরিত্রের মধ্য দিয়ে। ‘শুকসারী কথা’ উপন্যাসের এই সীমা বাস্তবিক লাভপুরের সন্নিকট কুনেড়া গ্রামের দুর্গা পাল 

     ১৯৯৮ সালে আমরা দুর্গা পালের বাড়িতে গিয়ে কথা বলি। তখন তিনি সিউড়িতে ডাক্তার নির্মল পালের স্ত্রী হয়ে সুখে সংসার করছেন। স্মৃতিচারণায় জানিয়েছিলেন—আমাদের সময় গ্রামের মেয়েরা সাইকেলিং করতো না; মেয়েদের আলাদা স্কুলও ছিল না। সেই সময় সাইকেলিং করে ছেলেদের স্কুলে পড়তে যেতাম। তার জন্য অনেক টিটকারী এবং অবজ্ঞা আমাকে সহ্য করতে হয়েছিল। একটি মেয়ে আমাকে নিয়ে ভাদুগান লিখে পাড়ায় পাড়ায় গেয়ে বেড়াতো। আরও বলেছিলেন—তারাশঙ্করবাবু আমাকে খুব ভালোবাসতেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে আমাদের স্কুলে তারাশঙ্করবাবুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনুষ্ঠানের দিন উনি আমাকে কাছে ডেকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। দিদিমণিদের বলেছিলেন—এরাই তো আমার সম্বল—লেখার উপাদান। দুর্গাদেবী যখন লাভপুর যাদবলাল হাইস্কুলে পড়তেন—সেই সময় ওই স্কুলের শিক্ষিকাদের মধ্যে—শ্যামলীদি, রমাদি, কল্যাণীদি—স্কুল সেক্রেটারি সত্যনারায়ণ ব্যানার্জীর একটি বাড়িতে থাকতেন। একবার পরীক্ষার আগে দুর্গাদেবী তাঁদের কাছে কয়েকদিন ছিলেন। বাস্তবে দুর্গাদেবীর স্কুলজীবনের ঘটনাগুলি উপন্যাসে সীমা চরিত্রেও রয়েছে।

 

বিখ্যাত ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসের এক মুখ্য চরিত্র করালী কাহার দুর্দান্ত সাহসী এবং আচার-আচরণে এক স্বতন্ত্র চরিত্রযেমন তার মনের জোর তেমনি শারীরিক শক্তি। বাস্তবে করালী মণ্ডল নামে এমন এক ব্যক্তিকে তারাশঙ্কর জানতেন; এবং পরে একসময় তাঁর ব্যক্তিগত ড্রাইভার ছিলেন। জানা যায় বাস্তবের করালী মণ্ডল তারাশঙ্করের ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসের করালী কাহার 

     বীরভূমের মহুটার গ্রামে করালী মণ্ডলের বাড়ি। ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন আমরা উপস্থিত হয়েছিলাম—মহুটার গ্রামে, সত্তর বছরের প্রবীণ করালী মণ্ডলের বাড়িতেমুখোমুখি বসে কথা বলার সময় দোহারা স্বাস্থ্যের লম্বা মানুষটিকে দেখেই বিস্ময়ে চমকে উঠেছিলামতিনি প্রবীণ তবু তাঁর দিকে তাকাতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উপন্যাসে তরুণ করালীর বর্ণনায় তারাশঙ্করের কথা—“লম্বা দীঘল চেহারা, সাধারণ হাতের চারহাত খাড়াই...সরু কোমর, চওড়া বুক, গোলালো পেশীবহুল হাত, সোজা পা-দুখানি, লম্বা আমের মত মুখ, বড় বড় চোখ..”

     আমার বিস্ময়ের কথা শুনে করালী বলেছিলেন—মিলবে না কেন! ওটা তো আমাকে নিয়েই লেখা। স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, পরে তারাশঙ্করবাবুর কলকাতার বাড়িতে আমি ড্রাইভারী করতাম। কিন্তু তার আগে বাবুর তখন নিজের গাড়ি ছিল না। কলকাতা থেকে ট্রেনে আসতেন আমোদপুর। সত্যনারাণবাবুদের গাড়িতে করে আমি তাঁকে লাভপুরে নিয়ে যেতাম। একদিন অনেক রাতে বাবু আমোদপুরে নেমেছেন। সুঁদীপুরের জঙ্গল পেরিয়েছি। বাবু বললেন—তোর তো খুব সাহস! তোর সাহসের কথা আমি লিখব। কি লিখেছেন আমি পড়িনি তবে সিনেমাটা দেখেছি। আমি তো ধূতি পড়ি কিন্তু সিনেমাতে আমাকে ফুলপ্যাণ্ট পরিয়েছেন বাবু।

     মনে মনে ভাবলাম—বাস্তবের এই করালী মণ্ডল যার সামনে বসে কথা বলছি সেই তো উপন্যাসে করালী কাহার‘মনের আয়না’ বইতেও তারাশঙ্কর বলেছেন—“করালী বলিষ্ঠ; করালী সাহসী; দুঃসাহসী” কলকাতার বাড়ির ড্রাইভার করালীকে তারাশঙ্কর খুব ভরসা করতেন তাই কামাই করলে রাগারাগি করে যা খুশি বলতেন।  ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে কলকাতা থেকে করালীকে লেখা একটি চিঠিতে তারাশঙ্কর বলেছেন—“এখানে আমার আর লোক ভিন্ন চলছে না। তুমি চারদিনের মধ্যে না এলে আমি স্থায়ী লোক বহাল করব”

 

বিখ্যাত ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের স্বর্ণ এক মুখ্য মহিলা চরিত্র। চরিত্রটির মধ্য দিয়ে তারাশঙ্কর উপন্যাসে নারীসাম্য—নারী স্বাধীনতার কথা ভেবেছিলেন। উপন্যাসের অন্যতম মুখ্য চরিত্র দেবু ঘোষ—স্বর্ণকে কেন্দ্র করেই নতুন জীবন ও নতুন জগতের স্বপ্ন দেখেছে। ‘পঞ্চগ্রাম’ উপন্যাসের এই স্বর্ণ বাস্তবিক তারাশঙ্করের জন্মগ্রাম লাভপুরের—অন্নপূর্ণা পাল। গ্রামে তিনি অন্নদি নামে সুপরিচিতা ছিলেন। আমরা অন্নদির সঙ্গে যোগাযোগ করে একদিন তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলাম। তখন তিনি সত্তর পার করেছেন; পথ চলতে লাঠির সহযোগিতা নিয়েছেন। স্মৃতিচারণায় জানিয়েছিলেন—

     তারাশঙ্করকে আমি তো কাকা ডাকতাম। কাকা আমার গান শুনতে ভালোবাসতেন। যখন লাভপুরে আসতেন—আমাদের বাড়ির বাইরে থেকেই—অন্ন অন্ন বলে চিৎকার করে ডাকতেন। আমি দেখা করে প্রণাম করতাম; খোঁজ-খবর নিতেন—আমিও নিতাম। আমাকে নিয়ে কাকা যে বই লিখেছেন তা আমি জানতাম না। বছর কুড়ি [১৯৯৮] বাইশ আগে একদিন সাহিত্যিক আশাপূর্ণাদেবী এসেছিলেন লাভপুরে। আমার দিকে হাত দেখিয়ে কাকা আশাপূর্ণাদেবীকে বললেন—এই আমার পঞ্চগ্রামের স্বর্ণ। পরে বইটি পড়ে দেখি—কাকা স্বর্ণ নাম দিয়ে আমার কথাই লিখেছেন। বললেন, বিয়ের বয়স থেকে বৈধব্যের বয়স এবং গ্রামের স্কুল থেকে সিউড়ির স্কুলের পড়াশোনা—সবই তো আমার জীবনের ঘটনা। তবে দ্বিতীয়বার বিয়ে আমি করিনি। ওটা কাকা বাড়িয়ে লিখেছেন।

 

তারাশঙ্করের ‘না’ উপন্যাসের কাহিনি বীরভূমের কীর্ণাহারের দুই পরিবারের ঘটনা নিয়ে লেখা; ঘটনাটি আজও লাভপুর অঞ্চলে মানুষের মুখে মুখে রয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্র অনন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক তরুণ—দাম্পত্যজীবনের জটিলতায় কালীনাথ নামে এক পিসতুতো ভাইকে গুলি করে হত্যা করে। উপন্যাসে অনন্ত চরিত্রের সততা, মহত্ব এবং করুণ পরিণতি আমাদের বিস্মিত করে বেদনায় আপ্লুত করে। অনন্তর জীবনের বিস্ময়কর ঘটনার মতো একটি ঘটনা বীরভূমের কীর্ণাহার গ্রামে অনাদিনাথ সরকার নামে এক তরুণের জীবনেও ঘটেছিল। অনাদিনাথ গ্রামে খোকাবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। হত হওয়া কালীনাথের প্রকৃত  নাম ছিল—জগন্নাথ ব্যানার্জী; আর ব্রজরানী ছিলেন নন্দরানি। আত্মীয়তা সূত্রে তারাশঙ্কর তাঁদের জানতেন।

     কীর্ণাহার গ্রামে ওই দুই পরিবারে আমরা একদিন হাজির হয়েছিলাম। একানব্বই বছরের [১৯৯৮]প্রবীণ ব্যক্তি এবং অনাদিনাথের খুড়তুতো ভাই উমাশঙ্কর সরকার বলেন—আমাদের দুই পরিবারের দুই কুলাঙ্গারকে নিয়ে তারাশঙ্কর তাঁর ‘না’ উপন্যাস লিখেছেন। বললেন, অনাদিনাথের জীবনে এই বিপর্যয়ের সময় আমার বয়স কুড়ি বছর। সবকিছু আমার মনে আছে। উপন্যাসে দেখবেন অনন্ত নামটি পাল্টে অনাদিনাথ করেছেন তারাশঙ্কর। শুনেছিলাম—তারাশঙ্কর একবার কি দুবার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন এবং ওদের বাড়িতেও গিয়েছিলেন

     সরকার পরিবার থেকে গিয়েছিলাম জগন্নাথ ব্যানার্জীর পরিবারে। জগন্নাথবাবু গ্রামে জগনবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পঁচাশি বছরের [১৯৯৮] প্রবীণ পুত্র প্রিয়নাথবাবুর সঙ্গে কথা হয়। পিতার স্মৃতিচারণায় তিনি জানালেন—বাবা জগন্নাথ আমাদের গ্রামের হাইস্কুলে ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। খোকাবাবু তো বাবার মামাতো ভাই ছিলেন। উভয়ের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল কিন্তু খোকাবাবুর বিয়ের পর কিছু জটিলতা নিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। দিনটি ছিল—বাংলা ১৩৩৬ সালের অঘ্রাণ মাস; বাবার বয়স তখন বত্রিশ বছর।

     আরও বলেন—আমি তখন বছর পাঁচেকের ছেলেমানুষ।  ঘটনার কথা ঘরে-বাইরে এত শুনেছি যে মনে হয় সবই যেন নিজের চোখে দেখেছি উপন্যাসে দেখবেন ব্রজরানী নামে একটি চরিত্র আছে। উনিই আমার মা। নামটা পাল্টে দিয়েছেন। আমার মায়ের নাম নন্দরানি। বলেছিলেন—ঘটনার পর খোকাবাবু তো গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ছ’মাস পরে তিব্বত বর্ডারে রামলিং নামে একটি জায়গাতে ধরা পড়ে। তখন উন্মাদ প্রায়। রাঁচির পাগলা গারদেও কিছুদিন ছিল। দীর্ঘদিন ধরে বিচার হয় সিউড়ি কোর্টে। আমি তখন বড়ো হয়েছি। রায়ঘোষণার দিনটি আমার বেশ মনে পড়ে। কোর্ট ময়দানে মেলার মতো ভিড়। কোর্টের ভিতরে একদিকে চুলদাড়ি নিয়ে খাঁচাবন্দি খোকাবাবু আর একদিকে সাদা থান পরে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মা—পাথরের মতো নিশ্চল। তারাশঙ্কর লিখেছিলেন বলে—মানুষ সেই দুর্ঘটনার কথা এখনো জানতে পারছে।

 

‘বিচারক’ উপন্যাসে রয়েছে—ষাট বছর বয়সী বৃদ্ধ বাপকে খুন করার অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিল পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের জোয়ান ছেলে। গভীর রাতে কুড়ুল দিয়ে দু-দুটো কোপ বসিয়ে বাবাকে খুন করে। পালিয়ে যাওয়ার সময়—মা ছেলেকে চিনেছিল। উপন্যাসে ছেলের নাম বলাই দাস। উপন্যাসের এই বলাই দাস—বাস্তবিক বীরভূম জেলার বাকুল গ্রামের নন্দদুলাল দাস; তারাশঙ্করের লেখা এবং ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার থেকে এমন অনুমানের কথা বলতে পারি।  

     ‘বিচারক’ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। এর কিছুদিন আগে ১৯৫২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ওই বাকুল গ্রামের তেমন একটি খুনের ঘটনার কথা তারাশঙ্কর তাঁর ‘মনের আয়না’ বইতে লিখে গেছেন। পুলিশের কাছে শুনে তিনি লিখেছেন, বাকুল গ্রামের নন্দদুলাল দাস—বাবা রাজকৃষ্ণ দাসকে খুন করার অপরাধে আইনে অভিযুক্ত হন। ঘটনাটি মর্মান্তিক বেদনাদায়ক কিন্তু সিনেমার মতো রোমহর্ষক।

     করালী এবং নন্দদুলাল নামে দুই ব্যক্তি কাজের লোক এবং ড্রাইভার হিসেবে তারাশঙ্করের কলকাতার বাড়িতে একই সঙ্গে থাকতেন। খুনের দিন করালীর সঙ্গে ঝগড়া করে দুলাল গ্রামে এসে সেই কর্ম করেন এবং পরের দিন বিকেলে তারাশঙ্করের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন। ১২ সেপ্টেম্বর দুলাল তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। ১৫ সেপ্টেম্বর তারাশঙ্কর অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে সিউড়ি আসেন এবং জানতে পারেন তাঁর এক ভাইপো জলে ডুবে মারা গেছে। সেই সূত্রে তিনি লাভপুরের বাড়িতেও আসেন। তাঁর বাড়িতে তখন থানার দারোগাবাবু। পুলিশের কাছেই তারাশঙ্কর নন্দদুলালের পিতৃহত্যার ঘটনার কথা জেনেছিলেন।

     তারাশঙ্করের ‘বিচারক’ এবং ‘মনের আয়না’ বই দুটি পড়ার পর একদিন বাকুল গ্রামে নন্দদুলালের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। বৃদ্ধ নন্দদুলাল সাক্ষাৎকারে আমাদের কথা উপেক্ষা করে বলেছিলেন—মানুষের জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে; উনি কোথাও কিছু লিখেছেন, কেউ বলেছিল কিন্তু আমি জানি না। তবে তারাশঙ্করবাবুর বাড়িতে আমি বছর দেড়েক ছিলাম। গাঁয়ের লোকের কার মুখে হাত দেবেন। আপনি যা জেনেছেন লিখবেন। মানা করলে তো শুনবেন না, কিন্তু পুরনো কথা টেনে আর কী হবে? আমার তো মৃত্যুর বয়স হয়েছে

 

তারাশঙ্করের ‘বসন্তরাগ’—এক শান্ত এবং স্নিগ্ধ প্রেমের উপন্যাস বলে পরিচিত। উপন্যাসে রয়েছে ব্রাহ্মণ সঙ্গীতসাধক রঙ্গনাথন—লল্লা নামে এক শবরকন্যার প্রেমে মুগ্ধ হন এবং দেবতা সাক্ষী করে তাকে বিয়ে করেন। উপন্যাসের পটভূমি দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ অঞ্চলের; কিন্তু নায়িকা লল্লা তারাশঙ্করের অতি কাছের এক বঙ্গকন্যা বলে আমরা মনে করি। উপন্যাসে রঙ্গনাথন এবং লল্লার ঐশ্বরিক প্রেমের ন্যায় তারাশঙ্করের ব্যক্তিজীবনেও এক ঐশ্বরিক প্রেমের কাহিনি ছিল। তারাশঙ্করের ব্যক্তিজীবনে প্রাণের রাধার বিরহ—যেন উপন্যাসে রঙ্গনাথনের জীবনে লল্লাবিরহে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।

     ‘আমার কথা’ বইতে তারাশঙ্কর লিখেছেন—“আমার ছবি আঁকার কথা আমার গোপন প্রেমের কথার মতো গোপনে রাখতে চেয়েছি বরাবর”। অন্যত্র আরও বলেছেন—“মনের সাতমহলার কোন গোপন মহলে কোন এক মেয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে যাকে পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পাইনি, পাওয়া হয়নি”। কে সেই প্রেয়সী! লিলি সাহা নামে কলকাতা নিবাসিনী এক বিদূষী বঙ্গনারীর সঙ্গে তারাশঙ্করের পারস্পরিক দেখাসাক্ষাতের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তারাশঙ্করের এক গুচ্ছ চিঠি পড়ে মনে হয়েছে—লিলি সাহা তারাশঙ্করের প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধজীবনে ঐশ্বরিক প্রেমের প্রেয়সী। ১৯৬৩ সালের ২০ জানুয়ারি লিলির এক পত্রোত্তরে তারাশঙ্কর লেখেন—“তোমার সঙ্গে স্নেহের সম্পর্ক নামহীন একটি ফুলের মত। জীবনের কোন দেবতার পায়ে তার স্থান তার বিধান খুঁজে পাইনি। হয়তো সব দেবতার পায়েই তার স্থান আছে।... সময় সময় মনে হয় খুব স্পষ্ট—মানুষের সঙ্গে মানুষের পরম সম্পর্ক”বৃদ্ধ বয়সে লিলিকে নিয়েই তাঁর বিরহ। ১৯৬৪ সালে জগদীশ ভট্টাচার্যকে তারাশঙ্কর লেখেন—“একটি ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপ্ত করা বিরহের মধ্যে আমার বেঁচে থাকা। সাধনা আমার সাহিত্যের নয়—সাধনা আমার জীবনের—সেটা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে করে থাকি। সম্বল আমার কাউকে ভালবাসার। একটা গানের লাইন—কেমন করে ভুলব আমি পাইনি তোমারে। অথবা প্রাণের রাধার কোন ঠিকানা”।

      লিলিকে আমরা পাইনি কিন্তু কলকাতার কসবা’র বাড়িতে গিয়ে লিলি সাহার ভাইপো সুপ্রকাশ সাহার সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম। আলাপচারিতায় তারাশঙ্করের সঙ্গে তাঁর পিসির দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্কের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন—‘বসন্তরাগ’ নামে  উপন্যাসটির কথাও

     বাস্তবে লিলিকেন্দ্রিক তারাশঙ্করের বিরহীজীবনের চিত্ররূপ তাঁর ‘বসন্তরাগ’ উপন্যাস এবং নায়িকা লল্লা বাস্তবে কলকাতার লিলি সাহা বলেই মনে করি। সাহিত্য জীবনের সূচনাপর্বে তারাশঙ্কর কমলিনী বৈষ্ণবীকে সামনে রেখেসাহিত্যশিল্পে সোনার-কাঠির স্পর্শ পেয়েছিলেন; আর এই বৃদ্ধ বয়সে বঙ্গনারী লিলির মধ্যে পেয়েছিলেন তাঁর বিরহীজীবনের প্রেমগায়ত্রী। স্মরণীয় যে ‘বসন্তরাগ’ উপন্যাসটি প্রকাশের পর লিলিকে পড়ে দেখার কথা জানিয়েছিলেন তারাশঙ্কর।

 

তারাশঙ্করের ‘১৯৭১’ নামে উপন্যাসে বাংলাদেশের ঘটনা নিয়ে লেখা একটি কাহিনি—‘একটি কালো মেয়ের কথা’। কাহিনির কেন্দ্রিয় নারী চরিত্র নাজমা নামে একটি কালো মেয়ে। এই নাজমা চরিত্রের অন্তরালে জড়িয়ে রয়েছে—তারাশঙ্কর-সাহিত্যানুরাগিনী বাংলাদেশের কল্পনা দত্ত নামে এক ফর্সা মহিলার আত্মকথা। মুক্তিযুদ্ধের আগে বাংলাদেশের নারীজীবনের সঙ্কটকালে কল্পনা দত্ত কলকাতার বাসিন্দা হয়েছিলেন; পরে মধ্যমগ্রামে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। তারাশঙ্করের চিঠি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ৯ এপ্রিল ২০১৩ আমি তাঁর বাসায় হাজির হয়েছিলাম। মুখোমুখি বসে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় মনে হয় এই কল্পনাদেবীর কথা নিয়েই তারাশঙ্কর তাঁর নাজমা চরিত্রটি নির্মাণ করেন। স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন তাঁর জন্ম ১৯৪৮ সালে, বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। ১৯৬৪ সালে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনুসারে—মেয়েদের বারো বছর পার হলেই আতঙ্কিত অভিভাবকেরা আত্মীয় সূত্র ধরে এদেশে পাঠিয়ে দিতেন। কল্পনাদেবীকেও কোলকাতায় আত্মীয় বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। দেশ ছেড়ে আসার স্মৃতি তিনি ভুলতে পারেননি। সাহিত্যিক তারাশঙ্করকে চিঠি দিয়ে তাঁর বেদনার কথা লিপিবদ্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেনপত্রোত্তরে ১৯৬৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কল্পনাদেবীকে তারাশঙ্কর লেখেন—

তোমার পত্র পেয়েছি। তোমার জীবনে বেদনা আছে ক্ষোভ আছে—তার আভাস তোমার পত্র থেকে আগুনের উত্তাপের মত ছোঁয়া দিয়ে যায়। তার স্পর্শে আমি দুঃখ অনুভব করেছি।...

আমি লেখক—আমি সকল মানুষের সব সুখ-দুঃখেরই ভাগ নিতে চাই। বিশেষত দুঃখ যার তার সমব্যথী হওয়াই লেখকের শ্রেষ্ঠ ধর্ম্ম ও কর্ত্তব্য বলেই আমি মনে করে এসেছি এবং দুঃখের উপকরণেই সাহিত্যের নৈবেদ্য সাজাতে চেয়েছি।

তোমার কয়েকটি ছত্র আমার ভারী ভাল লাগল। লিখেছ—“আমার বলা কথা আপনি লেখকের মনোভঙ্গি নিয়ে লিখতে পারলে যে অস্বস্তির মধ্যে আমি আছি—তার প্রতিকার হবে”। বেশ তো, যে সত্য তোমার বুকের মধ্যে খাঁচার পাখির মত বদ্ধ হয়ে মাথা কুটছে—তাকে আমার প্রকাশের মধ্যে মুক্তি দিয়ো তুমি। আমি চেষ্টা করব এই পর্যন্ত বলতে পারবো। সব থেকে ভাল হয় যদি ভেবে চিন্তে নিজে গুছিয়ে একটা খসড়া মত করে আনো।

 

     কল্পনাদেবী আমাকে জানিয়েছিলেন—তিনি তাঁর জীবনের বেদনা এবং ক্ষোভের কথা একটি খাতায় লিপিবদ্ধ করে নিজে গিয়ে তারাশঙ্করের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কাছে বসে বলেছিলেন—সে তো শুধু তাঁর একার বেদনা নয়; সমগ্র বাংলাদেশের নারীদের বেদনা। সেই ঘটনার পর—বাংলাদেশের অগ্নিময় এক অখণ্ড জীবনচিত্র নিয়ে রচিত হয়েছে তারাশঙ্করের ‘একটি কালো মেয়ের কথা’ নামক কাহিনিটি। সাক্ষাৎকারের পরে কোনো একদিন ফোনে ‘১৯৭১’ নামক উপন্যাসটির কথা বলে ওই কাহিনি পড়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। পরে তিনি ফোনে জানিয়েছিলেন—তারাশঙ্কর তো এখানে আমার কথাগুলোই লিখেছেনআমি নাজমা নই কিন্তু নাজমার মধ্যে নিজেকে অনুভব করেছি আনেক; তবে যা চেয়েছিলাম তার সবটা পাইনি। আমাদের বিশ্বাস কল্পনাদেবীর লিপিবদ্ধ করা কাহিনির সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বাস্তবতাকে মিলিয়ে তারাশঙ্কর নাজমা চরিত্রটি নির্মাণ করেন। মনে করি ‘একটি কালো মেয়ের কথা’ নামে কাহিনিতে নাজমা চরিত্রের উৎসমূলে রয়েছেন মধ্যমগ্রামের এই কল্পনা দত্ত।

     সামাজিক উপন্যাসে ছায়ারূপে বিবৃত নরনারীর উৎসমূল—রক্তমাংস সম্ভূত কায়ারূপের—মুখোমুখি আলাপচারিতা বেশ বিস্ময়ের; যেন এক রোমাঞ্চকর ঘটনা। সমাজে যারা বিখ্যাত এবং অখ্যাত কুখ্যাত সাধারণভাবে তারা অনেকটাই একক এবং সময়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ কিন্তু সাহিত্যের পাতায় উপস্থাপিত হলে তারা দেশ ও কালের গণ্ডী পেরিয়ে হয়ে ওঠে অনেকের আনন্দের আধার। তারাশঙ্কর অনুসন্ধানে এমন অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি প্রাপ্তির সুযোগ আমাদের হয়েছে।

===============

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি, বীরভূম—৭৩১১০২,

পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ।

মোবাইল—৯২৩৩১২৪৭২১৮।

ইমেইল debashismukherjee67@gmail.com

Sunday, 12 September 2021

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রীচরণেষু

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

 

বাংলা সাহিত্য তথা ভারতীয়-সাহিত্যাচার্য ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তোমাকে প্রণাম জানাবার প্রবল ইচ্ছা কিন্তু প্রণামের মন্ত্র আমার জানা নেই। আসলে কি জানো, ঋষি, সাহিত্যাচার্য কি সাহিত্য-সম্রাট—যে মন্ত্রই উচ্চারণ করি না কেন, মনে হয় বুঝি ঠিক হ’ল না, তোমাকে বিশেষিত করতে কোথাও যেন অপূর্ণতা রয়ে যায় অনেকখানি। তাই তোমার দেওয়া  ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রেই তোমাকে প্রণাম জানাই, শ্রদ্ধা ও বিনম্রচিত্তের ভক্তি নিবেদন করি।

     বড় বিস্ময়ের বিষয় কি জানো বঙ্কিম, তোমাকে চোখে দেখিনি কোনোদিন, তোমার জন্মের সার্দ্ধশত বৎসরে—কলেজ জীবনে তোমার উপন্যাস পাঠের মধ্য দিয়ে তোমার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তোমার এক কাছের ভক্ত, যিনি তোমার জীবনী লিখেছেন সেই অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য মহাশয়ের কাছ থেকেই তোমাকে দেখার মতো দৃষ্টি পেয়েছিলাম প্রথম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার গবেষণার প্রথম বিষয়ও ছিল তোমারই সাহিত্য। কিন্তু তা শেষ করতে পারিনি জানো—কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশেই সাঙ্গ করতে হয়েছিলতারপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর তারাশঙ্করের প্রেমে পড়ে তোমার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল অনেক। আকস্মিকভাবেই সেই দূরত্ব কমিয়ে দিলেন ত্রিপুরা সরকার। ২০১৯ সালের জুন মাসে তোমার জন্মদিন স্মরণে তোমার আরতি করার দায়িত্ব দিলেন আমারই হাতে। ত্রিপুরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলি সেই কলেজ জীবন ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দৃষ্টি অতিক্রম করে অর্ধশত বৎসর বয়সের দৃষ্টি তোমাকে নতুনভাবে চিনিয়ে দিলো। তোমার উপন্যাস তোমার প্রবন্ধ গুলি নতুন করে পড়তে পড়তে বিষ্ময়ে অভিভূত হলাম। নতুন করে উপলব্ধি করছি তোমাকে। মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি জন্মের একশো একাশি বছর এবং মৃত্যুর একশো-পঁচিশ বছর অতিক্রম করেও তুমি আজও আমাদের স্মরণে-মননে এবং সংস্কৃতির আঙিনায় প্রদীপ্ত প্রদীপ-শিখার ন্যায় প্রজ্জ্বলিত রয়েছো। মনে করি কাল থেকে কালান্তরের পথে তোমার চেতনাপ্রবাহ আজও অনেকখানি অধরা রয়ে গেছে। তোমার জন্ম ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, সাহিত্য কর্ম ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আর একবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের পাঠক আমরা তোমার সাহিত্যপাঠে তৃপ্ত হই, বিস্মিত হই এবং কোথাও কোথাও আজও অনুপ্রাণিত হই আমরা। কি অপূর্ব গৌরবান্বিত মহিমা তোমার! তোমার স্মরণে তোমাকে প্রণাম জানাবার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে বার বার।

 

নিছক সাহিত্যসৃষ্টি নয়, মানবজাতির মঙ্গল সাধনের উদ্দেশ্য নিয়ে তুমি কলম ধরেছিলে, তোমার  সাহিত্যপাঠে আজও আমাদের সেই মঙ্গলময়তার প্রাপ্তি ঘটে। সেই যে তুমি বলেছো, “কাব্য-গ্রন্থ মনুষ্যজীবনের কঠিন সমস্যা সকলের ব্যাখ্যা মাত্র”। সার্ধশত বৎসরের অধিককাল পরেও তোমার এই কথা তোমার উপন্যাস আলোচনায় সত্য হয়ে ওঠে। সত্য হয়ে ওঠে একালের আধুনিক মনুষ্যজীবনের স্বরূপ সন্ধানে। প্রাজ্ঞ-চেতনায় তোমার দৃষ্টি বড় বিস্ময়কর ও রহস্যমণ্ডিত। দাম্পত্য জীবনের সমস্যা নিয়ে তুমি তোমার উপন্যাস ও প্রবন্ধে সেকালে যা বলেছো তা যেন একালের এক চরম সত্য। সেদিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে তুমি তোমার প্রজ্ঞাদৃষ্টিতে যেন দেখতে পেয়েছিলে বঙ্গীয় দাম্পত্য-জীবন-সম্পর্কের পরিণামকে। সেই কথা ভেবেই বোধ হয় লিখেছিলে ‘দাম্পত্য দণ্ডবিধির আইন’। তোমার এই লেখায় হাসির ছড়াছড়ি তথাপি এই হাসির অন্তরালে বঙ্গীয় বিবাহিত পুরুষ সমাজের যে অশ্রুধারা লুক্কায়িত তা আমাদের দৃষ্টির অগোচর থাকে না। তোমার ওই রচনাতে তুমি তো সেদিন বলেছিলে—স্বামী হল স্ত্রীর অধীন সচল অস্থাবর সম্পত্তি।  বলেছিলে, স্ত্রীর আজ্ঞা অনুসারে স্বামীর কোন কাজই অপরাধ নয়, স্ত্রীর আজ্ঞা বহির্ভূত কাজই অপরাধের। তোমার মনে আছে কি না জানি না, মনে করে দেখ, তুমি লিখেছিলে “হরমণি রামের মা। রাম কামিনীর স্বামী। কামিনী যেরূপে টাকা খরচ করিতে বলে, সেরূপে খরচ না করিয়া, রাম হরমণির পরামর্শে অন্য প্রকার খরচ করিল। স্ত্রীর অনভিমতে খরচ করা একটি দাম্পত্য অপরাধ। হরমণি তাহার সহায়তা করিয়াছে”। তোমার মসী প্রদত্ত এই দাম্পত্যনীতি আজকের সভ্য সমাজেও এক চরম সত্যের উদাহরণ। শুধু তাই নয় স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদ করা, কি বিবাদ করতে উদ্যোগী হওয়া অথবা সহায়তা করা এই দণ্ডবিধির অধীনে আসে। স্ত্রী ভিন্ন অন্য কোন যুবতী স্ত্রীলোকের প্রতি কিছুমাত্র দয়া বা অনুকম্পা দেখালেই তা লাম্পট্য বলে গণ্য হবে। তুমিই তো বলেছিলে বঙ্কিম—“নিষ্কারণে স্বামীদিগকে এ অপরাধে অপরাধী বিবেচনা করা, স্ত্রীলোকদিগের অধিকার রহিল। আমি এ অপরাধ করি নাই বলিয়া কোন স্বামী খালাস পাইতে পারিবে না। ‘অপরাধ করিয়াছে’ বলিলেই এ অপরাধ সপ্রমাণ হইয়াছে বিবেচনা করিতে হইবে”। পুরুষের দণ্ডবিধানের জন্য তোমার এই নীতি আজকের দিনের দাম্পত্যজীবনেও কতখানি সত্য তা ভারতীয় পীনাল কোডের ‘৪৯৮ক’ ধারা এবং ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ নামক আইন দুটি স্মরণ করলেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ৪৯৮ক ধারার সূচনা বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আর ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ আইনের সূচনা ২০০৫ এর সেপ্টেম্বর মাসে। বঙ্গীয় পুরুষ সমাজের সদস্য হিসেবে তোমার এই কথাগুলো আর ভুলি কিভাবে বল! আজ বেশি করে তোমাকেই মনে পড়ে গো বঙ্কিম। মনে হয় যদি তোমার কলম দিয়ে বিপরীত কিছু লিখে যেতে তা-ই হয়তো আজ সত্য হয়ে আমাদের অনেক উপকার করতো! কেন তা করলে না তুমি বলতো?

     হয়তো তুমি জেনেছিলে, দাম্পত্য-জীবনের সমস্যা সমাজের এক বড় সমস্যা। স্বামী অথবা স্ত্রী অথবা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই এই সমস্যার জন্য দায়ী হতে পারে। স্ত্রী শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে পালালে সমাজ পুরুষকে দোষারোপ করে, আদালতের আঙিনায় পুরুষের প্রায়শ্চিত্ত শুরু হয়। অথচ দাম্পত্য-জীবনের অন্দরমহলের গোপন রহস্য স্বামী-স্ত্রী ব্যতীত কেউ-ই জানতে পারে না। তুমি কিভাবে দেখেছিলে জানি না, মনে হয় যেন মনোবিজ্ঞানটা তুমি ভালোই পড়েছিলে, তাই মনসমীক্ষকের দৃষ্টিতে সেই রহস্য উদ্ঘাটন করে প্রকৃত সমস্যার স্বরূপ আমাদের সামনে তুলে ধরেছো তুমি তোমার সচল চিত্র মৃন্ময়ী, সূর্যমুখী, শৈবলিনী এবং ভ্রমর—এরা প্রত্যেকেই বিবাহিতা তথা গৃহবধূ কিন্তু শ্বশুরবাড়ি থেকে পলাতকা রমণী। ভাবতে অবাক লাগে, কিভাবে এইসব নারীমনের রহস্য উদ্ঘাটন করে দেখিয়েছো—কেন তারা শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।  কপালকুণ্ডলা সংসারশিক্ষা বিহীনা এবং প্রণয়হীনা, স্বামীর প্রতি অবিশ্বাসিনী এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্যা এক অবাধ্য মহিলা। শৈবলিনী গ্রন্থকীট স্বামী চন্দ্রশেখরের ভালোবাসা পায়নি একথা যেমন সত্য তেমনি পূর্বপ্রণয়ী প্রতাপের প্রতি ভালোবাসাও তার গৃহত্যাগের আর এক কারণ। শৈবলিনী প্রতাপকে বলেছে, “তুমি কি জান না, তোমারই রূপ ধ্যান করিয়া গৃহ আমার অরণ্য হইয়াছিল? তুমি কি জান না যে, তোমার সঙ্গে সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হইলে যদি কখনো তোমায় পাইতে পারি, সেই আশায় গৃহত্যাগিনী...” ভ্রমরের স্বামী গোবিন্দলাল ভালো মানুষ তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বড় মধুর। কিন্তু সাময়িকভাবে রোহিনীর প্রেমাসক্ত হয়। এর জন্য গোবিন্দলালের অনুশোচনা হয়েছে, ভ্রমরের ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজেকে সংশোধনে সচেষ্ট হয়েছে। তথাপি কেবলমাত্র লোকের কথায় বিশ্বাস করে ভ্রমর গোবিন্দলালকে বিবাহ-বিচ্ছেদের চরম পত্র লিখেছে। তারা যেমন গৃহাঙ্গনা হয়েও বীরাঙ্গনা, স্বামীর প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে নারী স্বাতন্ত্রের পরিচয় দিয়েছে তেমনি তাদের উদ্ধত আচরণের ধ্বংসাত্ম পদক্ষেপ একালের সমধর্মী যে কোন মহিলাকে হার মানায়। ধন্য তুমি বঙ্কিম! নারী চরিত্রের রহস্য-উদ্ঘাটনে তোমার তুলনা নাই আজও

     নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন সভ্যতার এক বিশেষ পরিচয় বহন করে। শ্রদ্ধাশীলতায় তুমি নারীসাম্যের পক্ষে ছিলে তথাপি সংসার-শিক্ষা বিহীনা অথবা প্রীতিশূন্যা রমণীকে সংসারে প্রতিষ্ঠা দিতে তুমি পার নি, বিবাহিতা রমণীর পূর্ব-প্রণয়ীকেও মানতে পার নি তুমি তোমার মনে আছে ঠিকই—তুমি যে সময় তোমার উপন্যাসগুলি রচনা করেছিলে সে সময় কলকাতায় ‘স্ত্রী স্বত্বরক্ষিণী সভা’ স্থাপিত হয়েছে। সেই নারী সম্মানের আনুষ্ঠানিক সূচনাপর্বেই তুমি বুঝেছিলে, যে নারীর আত্মমর্যাদাবোধ নেই, যে নারীর হৃদয়ে প্রেম নেই, যে নারী অন্যের কথায় স্বামীকে অবিশ্বাস করে এবং যে নারী হঠাৎ করেই স্বামীর বিরুদ্ধে পূর্বাপর ভাবনা বিহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে—দাম্পত্যজীবনে তার প্রতিষ্ঠা হয় না। দাম্পত্য জীবন ঘিরে নারী মনস্তত্বের এই রহস্য কেবল সেকালের নয়, এই সত্য একালের এবং আগামী কালেরও। সেদিনে কি করে বুঝেছিলে তুমি এই সব কথা! দাম্পত্যজীবনে  প্রগতিশীল পুরুষশ্রেষ্ঠ না হলে কালান্তরের কাহিনি তুমি লিখতে পারতে না। তোমার পরিবার তোমাকে কতটা বুঝেছিলো জানি না, একালের রসজ্ঞ পুরুষ সমাজ তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনতে পারছে।

 

কেবল মাত্র বঙ্গীয়-সমাজের পরিবার জীবনেই নয়, সারস্বত সমাজ-জীবনেও তোমার সাহিত্য আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সাহিত্যতত্ত্ব আলোচনায় ও ইতিহাস পর্যালোচনায় বাংলার সারস্বত সমাজের কাছে আজও তুমি ঐতিহ্য অনুসরণের আদর্শ। সাহিত্যতত্ত্বের আলোচনায় তুলনামূলক পদ্ধতি ও ঐতিহাসিক পদ্ধতি ব্যবহারে আজও তোমার উত্তরাধিকার সূত্রকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। তুমি তো ঐতিহাসিক ছিলে না, ইতিহাসের কোন বইও তুমি লেখ নি; কিন্তু জাতির গৌরব উদ্ধারে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের যে পথ তুমি দেখিয়েছো তা একালের ইতিহাসবিদদেরও স্মরণ করতে হয়। বেশ মনে পড়ে তোমার কথা,বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালী কখনও মানুষ হইবে না”। শুধু তাই নয়,  ইতিহাস অনুসন্ধানের পথ-নির্দেশে তোমার পরামর্শ ছিল, “কোন দেশের ইতিহাস লিখিতে গেলে সেই দেশের ইতিহাসের প্রকৃত যে ধ্যান, তাহা হৃদয়ঙ্গম করা চাই। এই দেশ কি ছিল? আর এখন এদেশ যে অবস্থায় দাঁড়াইয়াছে, কি প্রকারে—কিসের বলে এ অবস্থার প্রাপ্তি, ইহা আগে না বুঝিয়া ইতিহাস লিখিতে বসা অনর্থক কালহরণ মাত্র”তুমি ইতিহাস না লিখেও ঐতিহাসিক এবং বিশেষ ঐতিহাসিক পথরেখার পথপ্রদর্শক 

     শুধু তাই নয়, আর্থসামাজিক সমাজভাবনায় বর্তমানকালের সর্বাপেক্ষা প্রগতিশীল আন্দোলনের প্রধান অগ্রদূত তুমিতোমার দেশপ্রীতির মূল উদ্দেশ্য লোকপ্রীতি। শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের তুমিই প্রথম ও প্রধান নেতা। সাধারণ প্রজার সুখই তোমার কাছে মুখ্য অবলম্বন ও প্রতিপাদ্য ছিল। বাংলায় তুমি শিক্ষা ও সম্পদ দাবি করেছিলে শ্রমিক এবং কৃষির ও কৃষকের জন্য—হাসিম শেখ, রামা কৈবর্ত্ত ও রামধন পোদের জন্য। তুমি বলেছিলে ভূমিতে প্রজার অধিকার শাশ্বত; দাবি করেছিলে জমিদার ও ধনীর সঙ্গে কৃষক ও প্রজার সমান অধিকার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে তুমি বঙ্গের চিরস্থায়ী কলঙ্ক বলে মনে করতে বঙ্কিম এবং এর উচ্ছেদ না হলে যে দেশের উন্নতি হতে পারে না এই মত উমি অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা করেছিলে। ভারতীয় সংবিধানেও তোমার কথাই সত্যে পরিণত হয়েছে। তোমার প্রবন্ধগুলি পড়লে আর নতুন করে সাম্যবাদ বা মার্কসবাদ পড়তে হয় না। তুমি যে সাম্যবাদী সমাজ-গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলে আজকের রাস্ট্রবিদরা  সেই স্বপ্নকে সফল করার চেষ্টায় কত ব্যাখ্যা অপব্যাখ্যা শ্লোগান ও হিংসায় এই সমাজ এই দেশকে রক্তিম করে তুলেছে তার হিসাব তোমাকে কেউ দেয়নি। তোমার কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি কেউ। আসলে তুমি যে সাম্যবাদের জাতীয় নেতা, নব্যভারতের সাম্যচিন্তার প্রথম পথপ্রদর্শক সে কথা আজকের শিক্ষিত নেতারা জানে না, আর জানলেও বোধ হয় কালাপানির নেশায় বলতে লজ্জা পায়। যারা তোমার এই সত্যকে অস্বীকার করে তারা ভারতে থেকেও কতটা ভারতবাসী তা ভাবতে হয় আমাদের। এ আমাদের জাতীয় লজ্জা বঙ্কিম, তোমাকে না জানা বা জেনেও না মানা আমাদের জাতীয় লজ্জা। তোমার রচনা যতই পড়ি ততই কোন গভীরে হারিয়ে যাই জানো! মনে হয়  তুমি একাধারে যেমন মনোবিজ্ঞানী-মনোসমীক্ষক তেমনি সাম্যবাদ ও জাতীয়তাবাদের আদর্শ নেতা এক অন্যতম রাস্ট্রনায়ক। ইংরেজ আমলের মানুষ হয়ে ইংরেজের অধীনে চাকরি করেও তুমি এক অখণ্ড স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলে, স্বাধীনতাকামী তামাম ভারতবাসীর হৃদয়ে অখণ্ড দেশপ্রেমের জোয়ার এনে দিয়েছিলে।

 

বঙ্কিমচন্দ্র তুমি সাহিত্য সম্রাট—সাহিত্যের আধারে তুমি দেশ গঠনের কারিগর, ভারত-ভাবনার বড় বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। যে গভীর প্রজ্ঞাদৃষ্টিতে সাহিত্যসম্রাট, তুমি তোমার সাহিত্যে ভারত-ভাবনার পরিচয় রেখে গেছো, তাতে আমাদের মনে হয় তুমি যেন একবিংশ শতাব্দীর ভারতের এক অদ্বিতীয় রাজনীতিবিদ এবং সমাজতান্ত্রিক এক মহান  দার্শনিক—তুমি ভারত সাধক একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একজন ভারতবাসী হিসেবে ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে যেসব প্রধান প্রধান সমস্যার কথা আজ আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, উত্তর সন্ধানে সচেষ্ট হই; ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রচিত তোমার সাহিত্যপাঠে সেই সব সমস্যার সমাধান-সূত্র পাওয়া যায়। বর্তমানে আমাদের সামনে ভারতীয় ঐক্য বা সংহতি চিন্তা যেমন এক বড় চিন্তা, তেমনি অনেক সময় প্রাদেশিক কোন জয়ী দলের জয়োল্লাসের ভয়ঙ্কর রূপ আমাদের বিভ্রান্ত করে, আতঙ্কিত করে, আবার কোন কোন প্রাদেশিক বা সর্বভারতীয় নেতার আচরণ আমাদের অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলে অথচ সর্বসম্মত উত্তরের আশায় হতাশ হতে হয়। এই সব সমস্যার সমাধান-সূত্র অনুসন্ধানে তোমার সাহিত্য পর্যালোচনা আজ আমাদের একান্ত অপরিহার্য বলেই মনে করি।

     স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর আগত প্রায়, দেশের উন্নতিও অনেক হয়েছে তথাপি সর্বভারতীয় ঐক্যবোধের চিন্তায় আজও আমরা আশঙ্কিত। কখনও ভাষা, কখনও ধর্ম, কখনও প্রাদেশিকতা আমাদের এই আশঙ্কাকে ক্রমাগত ঘনীভূত করে তুলেছে। জাতীয় জীবনে আজ আমাদের বড় সমস্যা সংহতি সমস্যা। প্রায় দেড়শত বৎসর পূর্বে ১২৭৯ বঙ্গাব্দে আমাদের এই জাতীয় সমস্যার চিন্তায় চিন্তিত হয়েছিলে তুমিভারতের ইতিহাস অনুসন্ধানে ‘ভারত কলঙ্ক’ নামক প্রবন্ধে তুমি সেদিন লিখেছিলে—

এই ভারতবর্ষে নানা জাতি। বাসস্থানের প্রভেদে, ভাষার প্রভেদে, বংশের প্রভেদে, ধর্ম্মের প্রভেদে নানা জাতি। বাঙ্গালি, পাঞ্জাবি, তৈলঙ্গী, মহারাষ্ট্রী, রাজপুত, জাঠ, হিন্দু, মুসলমান ইহার মধ্যে কে কাহার সঙ্গে একতাযুক্ত হইবে। ধর্ম্মগত ঐক্য থাকিলে বংশগত ঐক্য নাই, বংশগত ঐক্য থাকিলে ভাষাগত ঐক্য নাই। রাজপুত, জাঠ, এক ধর্ম্মাবলম্বী হইলে, ভিন্নবংশীয় বলিয়া ভিন্ন জাতি; বাঙ্গালি বেহারী একবংশীয় হইলে, ভাষাভেদে ভিন্ন জাতি; মৈথিলী কনৌজী একভাষী হইলে, নিবাসভেদে ভিন্ন জাতিকেবল ইহাই নহে। ভারতবর্ষের এমনই অদৃষ্ট, যেখানে কোন প্রদেশীয় লোক সর্ব্বাংশে এক; যাহাদের এক ধর্ম্ম, এক ভাষা, এক জাতি, এক দেশ, তাহাদের মধ্যেও জাতির একতা জ্ঞান নাই 

 

     ভারতবর্ষের এমন খণ্ড খণ্ড রূপের অখণ্ডতায় তুমি জাতীয় ঐক্য বা জাতীয়তাবাদের চিন্তায় কলম ধরেছিলে সেদিন ১২৭৯ বঙ্গাব্দের এই চিন্তা মাথায় রেখে এর দু’বছরের মাথায় ‘আমার দুর্গোৎসব’ (কার্তিক ১২৮১) প্রবন্ধে তুমি জন্মভূমির মাতৃরূপ দর্শন করেছিলেতোমার কমলাকান্ত তাঁর সেই মাতৃভূমির কথায় বলেছিল—

চিনিলাম, এই আমার জননী জন্মভূমি, এই মৃন্ময়ী মৃত্তিকারূপিণী—অনন্তরত্নভূষিতা—এক্ষণে কালগর্ভে নিহিতা। রত্নমণ্ডিত দশভুজ—দশ দিকে প্রসারিত; তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানাশক্তি শোভিত; পদতলে শত্রুবিমর্দিত—পদাশ্রিত বীরজনকেশরী শত্রুনিপীড়নে নিযুক্ত। এ মূর্তি কালস্রোতে পার না হইলে দেখিব না—এখন দেখিব না—আজি দেখিব না—কাল দেখিব না—কিন্তু একদিন দেখিব দিগভুজা, নানাপ্রহারিণী শত্রুবিমর্দিনী, বীরেন্দ্রপৃষ্ঠবিহারিণী—দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরূপিণী, বামে বাণী বিদ্যাবিজ্ঞানমূর্তিময়ীসঙ্গে বলরূপী কার্তিকেয়, কার্যসিদ্ধিরূপী গণেশ, আমি সেই কালস্রোতোমধ্যে দেখিলাম এই সুবর্ণময়ী প্রতিমা।

 

    ‘আমার দুর্গোৎসব’ রচনার স্বল্পকাল পরেই ‘বন্দেমাতরম’  নামে বিখ্যাত সঙ্গীতটি রচনা করেছিলে এবং পরে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ব্যবহৃত ‘বন্দেমাতরম’ গানেও সেই মাতৃরূপের কল্পনা করেছিলে তুমি ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতে ভারতমাতৃকার সুজলা-সুফলা-মলয়জশীতলা—শস্যশ্যামলা মায়ের বন্দনা গেয়েছিলে, ভবিষ্যতে মায়ের বীর্য, ঐশ্বর্য, বিদ্যা, বল, সিদ্ধির মোহিনী প্রতিমা কল্পনা নেত্রে দেখে বিস্ময়ে মুগ্ধ ও উৎসাহে স্ফীত হয়ে উঠেছিলে যেমন; তোমার আনন্দমঠের সত্যানন্দ ঠাকুরও তেমনি সেই একই মূর্তি দেখেছিলেন। তিনি জগদ্ধাত্রী, কালী ও দুর্গা এই তিন প্রতিমায় বাংলার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মূর্তি দেখেছিলেন। তাঁর ধারণায় জগদ্ধাত্রী মূর্তি বঙ্গের সুদূর অতীত অবস্থার চিত্রঅতীতে অরণ্যময় প্রদেশে হিন্দু ঔপনিবেশিকগণের প্রথম বসতি এবং তার সঙ্গে সঙ্গে দেশের স্বাভাবিক আর্থিক ঐশ্বর্যময় রূপ এই জগদ্ধাত্রী। তারপর মুসলমান রাজত্বের অন্তিম দশায় দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশের প্রতিরূপ তিনি কালীমূর্তিতে দেখেছেন। আর পুনরুন্নত ও সমৃদ্ধ বঙ্গের প্রতিকৃতি দেখেছেন দুর্গা প্রতিমার মধ্যে। মনে রাখতে হবে দুর্গা-প্রতিমার প্রতীকে কল্পিত এই মা কেবল হিন্দুর দেবী নন—ইনি সুবর্ণময়ী বঙ্গপ্রতিমা, সোনার বাংলা—ইনিই ভারতমাতৃকা।  স্বপ্নময় দেশের ভবিষ্যৎ কল্পনায় আর্থিক উন্নতি, জ্ঞানের উম্মতি, সামরিক তথা প্রতিরক্ষার উন্নতি এবং গণজাগরণের  সিদ্ধিতে তার  জগদ্ব্যাপিনী প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলে তুমি। আজও তো আমাদের ভারত-ভাবনায় এমন উন্নয়নের কথা পাথেয় হয়ে রয়েছে।

     বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দেশের স্বাধীনতার চিন্তায় এবং স্বাধীনতার পরবর্তীকালের ভারত ভাবনায় কেউ কেউ রাশিয়া বিপ্লবের আদর্শে মার্কসবাদ, লেনিনবাদের পথে চলেন, কেউ কেউ অসহযোগ আন্দোলনের ধারায় গান্ধীবাদের পথে চলেন, কেউ কেউ বিবেকানন্দের শূদ্রজাগরণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেনকিন্তু এই সব পথ ও পাথেয় তো দূরের কথা, ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে স্বাধীনতাও তখন কল্পনাতীত। সেই সময়ে সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা ভারতবর্ষের জন্য অন্তর্দেশীয় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে—দেশের প্রান্তবাসী সাধারণ মানুষদের নিয়ে গণজাগরণের পথে অগ্রসর হয়েছিলে তুমিতোমার ধ্যানের ভারতের কথায় তুমি  বলেছিলে, “যবে মার সকল সন্তান মাকে মা বলিয়া ডাকিবে”—অর্থাৎ দেশের সকল মানুষের মধ্যে দেশাত্মবোধ জেগে উঠলে তবেই মায়ের ওই রূপ দেখা সম্ভব হবে। ভক্তিনত চিত্তে তুমি বলেছিলে—“ছয় কোটি মুণ্ড তোমার পদপ্রান্তে লুণ্ঠন করিব, এই ছয় কোটি কণ্ঠে তোমার নাম ধরিয়া ডাকিব—না পারি, এই দ্বাদশ কোটি চক্ষে তোমার জন্য কাঁদিব”। যোগী-পুরুষের ন্যায় তোমার সঙ্কল্প ছিল—“এবার আপনা ভুলিব, ভ্রাতৃবৎসল হইব, পরের মঙ্গল সাধিব, অধর্ম আলস্য ইন্দ্রিয়ভক্তি ত্যাগ করিব”। উদাত্ত আহ্বানে ডাক দিয়েছিলে—“এস, আমরা দ্বাদশ কোটি ভুজে ঐ প্রতিমা তুলিয়া ছয় কোটি মাথায় বহিয়া ঘরে আনি”। হিন্দু নবজাগরণের যুগে ভক্তিভাব চিত্তে  যে কল্পনা যে সঙ্কল্প তুমি করেছিলে তাতে হিন্দু কল্পনার ভাবাধিক্য থাকলেও ছয় কোটি মানুষের মধ্যে থেকে কোনো সম্প্রদায়কে বাদ দাও নি তুমি এই ছয়কোটি মানুষের মধ্যে হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্ত্তের মত সাধারণ মানুষের কথাও বলেছিলেবর্তমান ভারতবর্ষ সেই দেশাত্মবোধের ভাবনাতেই প্রতিষ্ঠিত তথাপি তোমার মতো অসাম্প্রাদায়িক মনোভাব এই প্রগতিশীল সভ্যতার বুকে যেন আজও বড় বিরল

     দেশজননীকে কেমন করে ভালোবাসতে হয়—বঙ্গদেশে বঙ্গভাষায় বঙ্গবাসী তথা ভারতবাসীকে সে-মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলে তুমি। তোমার কাছ থেকেই বাঙালী শিখেছে জাতীয়তা কি, স্বদেশপ্রেম কাকে বলে, আর পেয়েছে সেই শিহরণজাগা বন্দেমাতরম সঙ্গীত—যে মন্ত্র সমগ্র মানবজাতিকে শিখিয়েছে জননী ও জন্মভূমির মধ্যে কোনো প্রভেদ নেই। আমরা জানি, ‘বন্দেমাতরম’ হিন্দুস্থানের মর্মসঙ্গীত ও হৃদয়ের গানবন্দেমাতরম জাতীয়তাবাদী চেতনার গান—এর ধর্ম ভারতধর্ম—এর উদ্দেশ্য দেশের ঐক্য। বন্দেমাতরম শুধু একটি গান নয়, একটি মন্ত্র—মহামন্ত্র, যে মহামন্ত্রের ধ্বনি কানের ভিতর দিয়ে মর্মে প্রবেশ করে সুপ্ত ভারতবর্ষকে জাগিয়ে তুলেছিল, আসমুদ্র হিমাচল ব্যাপ্ত এই বিশাল দেশ ভারতবর্ষের সকল জাতির সকল ভাষাভাষীর মনে দেশাত্মবোধ জন্মেছিল, সকল মানুষ এককণ্ঠে মাতৃবন্দনায় উন্মুখ হয়ে উঠেছিল। সূচনাপর্বে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি ছ’কোটি মানুষের কণ্ঠধ্বনি ছিল, ‘আনন্দমঠ’এ তা সপ্তকোটিকণ্ঠের জীবনসঙ্গীত, আর ধীরে ধীরে তা সারা ভারতের জাতীয় সঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়। সময় ও কালের প্রেক্ষাপটে সংহতি চিন্তায় তোমার রচিত ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র প্রাসঙ্গিকতায় ও তাৎপর্যে আজও ব্যাখ্যাতীত। দেশের একপ্রান্তে ধ্বনিত এই ধ্বনির প্রতিধ্বনি যদি অন্যপ্রান্তে ধ্বনিত করতে পারি, সমস্ত কুসংস্কার বা সঙ্কীর্ণতাকে অতিক্রম করে যদি সমস্ত ভারতবাসী ‘বন্দেমাতরম’ মহামন্ত্রে দীক্ষিত হতে পারি  তবেই আজ তোমার জন্মদিন স্মরণ সার্থক হয়। কিন্তু অনেক আক্ষেপ হয় জানো, বড় বড় মঞ্চ গড়ে তোমার জন্মদিনের পুরোহিত সেজে মন্ত্রোচ্চারণের স্রোতোধারায় তোমাকে স্তব্ধ করে দিই, তোমাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিতে চাই—তোমার উত্তরসুরি, তোমার শিষ্য হতে চাই না আমরা। অন্তরালে যেন এমন জাতীয় কলঙ্ক নিয়েই তোমার জন্মদিনের ঢাক পেটা্‌ই।

   জানো বঙ্কিম, যখন তোমাকে এই চিঠি লিখি সেই সময় আমার এক অধ্যাপক বন্ধু বসেছিলেন, চিঠিখানা শুনে তিনি মন্তব্য করলেন—রবীন্দ্রনাথের জনগণমনঅধিনায়ক গানটি জাতীয় সঙ্গীতের সাংবিধানিক মর্যাদা পেয়েছে, এটি ভালো কবিতা কিন্তু এর মধ্যে ‘বন্দেমাতরম’এর উদ্দীপনা নেই, এই কবিতায় দেশের উর্ধে দেশ-নায়কের জয়গান গাওয়া হয়েছে। বন্দেমাতরম মন্ত্রে দেশের বন্দনা গান গাওয়া হয়েছে। বন্দেমাতরম সঙ্গীত অনেক গভীর অনেক উদাত্ত অনেক প্রসারিত। তোমার চিঠির প্রতি মনোনিবেশ নষ্ট হবে বলে আমি আর কোনো কথা তুলি নি। তোমার কথাটি পাঠক বলবেন বলে প্রসঙ্গ উপেক্ষা করেছি। আমাকে তুমি মার্জনা কর বঙ্কিম। তবে এখানে তোমার কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে বঙ্কিম। তোমার আগে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি গান লিখেছিলেন—“মিলে সব ভারত সন্তান / এক তান মন প্রাণ / গাও ভারতের যশোগান”ইত্যাদি। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান কি তোমাকে বন্দেমাতরম সঙ্গীত রচনায় অনুপ্রাণিত করেছিলো?

   আনন্দমঠ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার প্রাসঙ্গিক নিবন্ধগুলিও পড়েছি। দেখেছি তোমার লেখায় দেশমাতৃকার রূপ-কল্পনায় হিন্দুর দেবদেবীর উল্লেখ আছে কিন্তু তা কোনো সঙ্কীর্ণ মানসিকতায় তাদের কথা তুমি বলোনি‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতে কাব্যের অর্থ প্রতীকের সাহায্যে মূর্ত করতে শিল্পশৈলী বা ভাষার অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দান করতেই এমন প্রতীকের ব্যবহার করেছো বলেই মনে হয়েছে আমারবিখ্যাত মুসলমান কবি ইকবালও তো তাঁর ‘হিন্দুস্থান হামারা’ কবিতায় স্বর্ণসম্ভবা স্রোতস্বিনী গঙ্গা তথা পৃথিবীর নদীকে স্বর্গের সঙ্গে যুক্ত করে এবং অনাদি, অনন্ত সত্তায় আবিষ্কার করে তাকে এক অপার্থিব মহিমায় মণ্ডিত করেছেন। এই প্রতীকধর্ম্মিতা তো কাব্যের অবিচ্ছেদ্য লক্ষণ।

    তোমার ‘বন্দেমাতরম’ এর মা ভারতমাতা। সকল ভারতীয়ের মা তিনি। সংস্কারে ভিন্ন হলেও মায়ের কাছে সন্তানের জাত-পরিচয় বড় নয়। এর ভুল ব্যাখ্যা অনেক সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতের সঙ্কীর্ণ ব্যাখ্যা দেশের অনেক ক্ষতি করেছে। জানো তোমার বন্দেমাতরম মন্ত্রের এমন অপব্যাখ্যার কথা শুনে মনে পড়ে তোমার এক যোগ্য উত্তরসুরি কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কথা। এক সময় রাজ্যসভার সাংসদ এবং জ্ঞানপীঠ পুরষ্কার প্রাপ্ত এই কথাসাহিত্যিক কি বলেছেন জানো! বলেছেন—

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতেই হয়েছিল ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদের উদ্বোধন; ‘আনন্দমঠে’র কল্পনাই ছিল পরবর্তীকালে বাংলাদেশ এবং সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস রচনার ভূমিকালিপি। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের সাধনায় বঙ্কিমচন্দ্র যে আদর্শকে আমাদের মনোজগতে রূপায়িত করেছেন, সে আদর্শকে দেশের কর্মনায়কেরা বাস্তবে রূপায়িত করতে সক্ষম হন নাই বলেই পরাধীনতামুক্তির শুভলগ্নে ক্ষোভ ও আক্রোশ হতে উদ্ভুত দুই জাতিত্ত্বের ভ্রান্ত উপলব্ধিকে সত্যের মর্য্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছে ভাররতবর্ষ। তাই ভারতবর্ষ আজ দ্বিধাবিভক্ত।

 

     যে মাটিতে আমাদের জন্ম, যার জল, হাওয়া ও শস্যদানায় আমাদের জীবন ও জীবিকা এবং যে মাটিতেই আমাদের পরিণতি ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রে তুমি সেই মাটির বন্দনা করেছো বঙ্কিমভারতবর্ষ—প্রতিটি ভারতবাসীরই মা। তোমার রচিত মন্ত্রে ভারতমাতারই জয়গান গেয়েছো তুমি। আমরা যে প্রান্তবাসী বা যে ভাষাভাষীই হই না কেন দেশকে ভালোবাসলে, দেশকে পুজো করতে হলে বন্দেমাতরম আমাদের বলতেই হবে। বন্দেমাতরম কেবল ভারতবর্ষ কেন—বিশ্বের সকল দেশের দেশভক্তির মন্ত্র। তোমার এই মন্ত্র বাংলা ভাষায় রচিত হলেও তা আজ জাতীয় মন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক ভাবনার বিকাশ। দেশ ও মানবজাতির মঙ্গলের কথায় তুমি এক সময় বলেছিলে, “সকল ধর্মের উপর স্বদেশপ্রীতি” এবং “পরিবারই প্রথম প্রীতির শিক্ষার স্থল”। জাতির উদ্দেশ্যে যেদিন এই কথা তুমি বলেছিলে সেদিনই তুমি কালের সীমা অতিক্রম করে জাতি ও জাতির জাতীয় জীবনে সর্বকালের হয়ে উঠেছো তোমার নিজেরই অগোচরে তা আজও আমরা অনুভব করছি।

 

 

 

 

অত্যন্ত দুঃখের বিষয় কি জানো বঙ্কিম, তোমার সাহিত্যপাঠে তোমার অনেক পাঠক তোমাকে সাম্প্রদায়িক বলে অভিযুক্ত করেছে এবং আজও করে। মনে হয় তারা তোমার লেখা ঠিকমতো হজম করতে পারেনি অথবা ঠিকমতো পড়েনি। তাছাড়া এমন অভিযোগ তোমার উপর খাড়া করার কোনো কারণ থাকে না। এইখানেই আমাদের ভালো করে বুঝে নেওয়া দরকার জাতীয়তাবাদী চিন্তায়, হিন্দুত্বের ব্যাখ্যায় তোমার যথার্থ স্বরূপ কি ছিল? সেই সব পাঠকেরা জানে না তুমি যদি সাম্প্রদায়িক মনোভাবের দ্বারা আক্রান্ত হতে তাহলে হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠার মধ্যেই তোমার আনন্দমঠের পরিসমাপ্তি ঘটত। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস প্রকাশের ন’বছর পূর্বে ১২৮০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং পরাধীনতা’ প্রবন্ধে তুমি জানিয়েছিলে, “যে দেশের রাজা প্রজাপীড়ক, সেই রাজা স্বজাতীয় হোন আর পরজাতীয়ই হোন—সে দেশ পরাধীন”। সেই মানসিকতা নিয়েই তো তুমি  আকবর শাসিত ভারতবর্ষকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন বলেছো

     সন্তান সম্প্রদায় জয়ী হলেও তাদের হাতে দেশ শাসনের অধিকার ছেড়ে দাও নি কারণ, হিন্দু সন্তান সম্প্রদায়ের আচরণে হিন্দুত্ব ছিল না, তারা তখনও জ্ঞানবান ও গুণবান হয়ে ওঠে নি তোমার শেষ উপন্যাস ‘সীতারাম’। সেখানে শাসক চরিত্র হিন্দু রাজা সীতারাম। এই উপন্যাসে মুসলমান ফকির চাঁদশাহের মুখ দিয়ে সীতারামের উদ্দেশ্যে তুমি জানিয়েছো—

ফকির বলিল, বাবা! শুনিতে পাই, তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ, কিন্তু অত দেশাচারে বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দুরাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে। সেই একজনেই হিন্দু মুসলমানকে সৃষ্টি করিয়াছেন; যাহাকে হিন্দু করিয়াছেন, তিনিই করিয়াছেন, যাহাকে মুসলমান করিয়াছেন, সেও তিনিই করিয়াছেন। উভয়ের তাহার সন্তান; উভয়েই তোমার প্রজা হইবে। অতএব দেশাচারে বশীভূত হইয়া প্রভেদ করিও না। প্রজায় প্রজায় প্রভেদ পাপ। পাপের রাজ্য থাকে না।

 

   রাজসিংহ’ উপন্যাসের উপসংহারে ‘গ্রন্থকারের নিবেদন’ অংশে তুমি যে কথা বলেছিলে সে-কথা আনন্দমঠ উপন্যাস সম্পর্কেও গভীরভাবে সত্য। তুমি বলেছো—

গ্রন্থকারের বিনীত নিবেদন এই যে, কোন পাঠক না মনে করেন যে, হিন্দু মুসলমানের কোনপ্রকার তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। হিন্দু হইলেই ভাল হয় না, মুসলমান হইলেই মন্দ হয় না, অথবা হিন্দু হইলেই মন্দ হয় না, মুসলমান হইলেই ভাল হয় না। ভালমন্দ উভয়ের মধ্যেই তুল্যরূপে আছে। ...অনেক স্থলে মুসলমানরাই হিন্দুর অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অনেক স্থলে হিন্দু রাজা মুসলমান অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণের সহিত যাহার ধর্ম আছে—হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, সেই শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণ থাকিতেও যাহার ধর্ম নাই—হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, সেই নিকৃষ্ট।

 

বঙ্গদর্শন, ভাদ্র ১২৭৯ বঙ্গাব্দে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় দেশের কৃষকদের কথায় তুমি বলেছো “দেশের মঙ্গল, কাহার মঙ্গল? তোমার আমার মঙ্গল দেখিতেছি, কিন্তু তুমি আমি কি দেশ? তুমি আমি দেশের কয়জন? আর এই কৃষিজীবি কয়জন? ... যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই, সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই”। এই কৃষক তো হাসিম শেখ ও রামা কৈবর্ত্তরা। আবার চৈত্র সংখ্যায় রাজনারায়ণ বসুর ‘হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা’ গ্রন্থটির সমালোচনা প্রসঙ্গে তুমি তো উচ্চকণ্ঠে জানিয়েছো  “আমরা হিন্দু, কোন সম্প্রদায়ভুক্ত নহি”। হিন্দু ও মুসলমান প্রসঙ্গে ‘কাফের’ ও ‘নেড়ে’ শব্দগুলি ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এসেছে তোমার সাহিত্যে—এর মধ্যে তোমার কোনো সঙ্কীর্ণতা আমরা দেখি না। আসলে যারা তোমাকে সাম্প্রদায়িক বলে অভিযুক্ত করে তারা ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে জানে না অথবা জেনেও পক্ষপাতিত্ব করে তোমার প্রতি অবিচার করে। এই অবিচার সত্যের প্রতি অবিচার, দেশের প্রতি সঙ্কীর্ণ মনোভাবের প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়।

   আমরা দেখেছি এবং খুব ভালো করে দেখেছি বঙ্কিম, ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দেশপ্রেমের প্রেরণায় সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলেছো তুমি কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদকে  মেনে নিতে পার নি কোনোভাবেইএই উপন্যাসের যে মূল ঘটনা—সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তা তো তুমি ইতিহাসের পাতা থেকেই সংগ্রহ করেছিলেযে সময়ের কাহিনী এই উপন্যাসে বিবৃত করেছ সেই সময়ের ঐতিহাসিক পরিবেশটুকু রক্ষা করতে চেয়েছিলে এই গ্রন্থে। আমরা জানি সে যুগে মুঘল রাজশক্তির দ্বারা বঙ্গদেশ নানাভাবে পীড়িত হয়েছিল—একথাও যেমন ঐতিহাসিক সত্য, তেমনি এই বঙ্গদেশে সেকালে বহু দরিদ্র মুসলমান যে হিন্দু জমিদার কর্তৃক অত্যাচারিত হয়েছিল—এও তেমনি ঐতিহাসিক সত্যতোমার আমন্ত্রিত সন্ন্যাসীদের সংগ্রাম দেশের বহিঃশত্রুর সঙ্গে। তারা বঙ্গদেশ থেকে রাজশক্তিরূপে মুসলমান এবং ইংরেজ উভয়কেই বিতাড়িত করে স্বাধীন হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। আসলে আনন্দমঠ লেখার আগে থেকেই তো তুমি জেনেছিলে যে এই বঙ্গভূমিতে যত সংখ্যক বঙ্গভাষী বাঙালী বাস করে তার অর্ধেক মুসলমান। তাই তোমার সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ তার স্বদেশবাসীর বিরুদ্ধে নয়, অত্যাচারী এবং প্রজাপালনে অক্ষম শাসক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেউপন্যাসে ভবানন্দের বর্ণনায় অত্যাচারী রাজার যে অত্যাচারের বিবরণ দিয়েছ তা যেমন নৃশংস তেমনি মর্মান্তিক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির তীব্র বিরূপতা—অনাবৃষ্টি—মন্বন্তর। এই পরিবেশ ও পরিমণ্ডলের হাত থেকে মুক্তি নেই কারও—না হিন্দু না মুসলমানের। যে রাজা দেশের মানুষের রক্ষণাবেক্ষণ করে না আনন্দমঠের সন্ন্যাসীরা সেই রাজার বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমেছে। তাদের যুদ্ধ শুধু মুসলমান রাজশক্তির সঙ্গেই নয়, ইংরেজ বাহুবলের সঙ্গেও তাদের যুদ্ধ। যুদ্ধে মুসলমান ও ইংরেজ একই সঙ্গে পরাজিত হয়েছে, জয় হয়েছে সন্তান সম্প্রদায়ের। কিন্তু জয়োল্লাসের পরিণাম হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর। সেই জয়োল্লাসের ভয়ঙ্কর চিত্র অঙ্কন করে তুমি  বলেছ—

সেই রজনীতে হরিধ্বনিতে বীরভূমি পরিপূর্ণা হইল। সন্তানেরা দলে দলে যেখানে সেখানে উচ্চৈঃস্বরে কেহ ‘বন্দে মাতরং’ কেহ ‘জগদীশ হরে’ বলিয়া গাইয়া বেড়াইতে লাগিল... কেহ গ্রামাভিমুখে, নগরাভিমুখে ধাবমান হইল, পথিক বা গৃহস্থকে ধরিয়া বলে ‘বল বন্দে মাতরং নহিলে মারিয়া ফেলিব’। কেহ ময়রার দোকান লুটিয়া খায়, কেহ গোয়ালার বাড়ি গিয়া হাঁড়ি পাড়িয়া দধিতে চুমুক মারে, কেহ বলে ‘আমরা ব্রজগোপ আসিয়াছি, গোপিনী কই?’ সেই এক রাত্রের মধ্যে গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে মহাকোলাহল পড়িয়া গেল। সকলে বলিল, ‘ইংরেজ মুসলমান একত্রে পরাভূত হইয়াছে, দেশ আবার হিন্দুর হইয়াছে। সকলে একবার মুক্তকণ্ঠে হরি হরি বল’। গ্রাম্য লোকেরা মুসলমান দেখিলেই তাড়াইয়া মারিতে যায়। কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুটিয়া লইতে লাগিল। অনেক যবন নিহত হইল, অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল, জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল, ‘মুই হেঁদু’।

 

     বোধ করি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ঘটনার এই অনিবার্যতাকে তুমি জোর করে বাধা দাও নি। স্বাভাবিকতাকে গুরুত্ব দিতেই তোমার এই চিত্ররূপ। ঠিক কি না বল!

     ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পুস্তকাকারে প্রকাশিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে জয়ী সন্তান-সম্প্রদায়ের জয়োল্লাসের যে ভয়ঙ্কর চিত্র তুমি চিত্রিত করেছিলে দেড়শত বৎসর পরে ২০২০ সালেও তা কতখানি বাস্তব তা আমরা সকলেই নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করছি বঙ্কিম অনুভব করতে পারছি তুমি কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলে, কেন তোমাকে ঋষি আখ্যা দেওয়া হয়েছিলো! আমরা দেখছি বর্তমানে এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে স্বীকার করে রাজনৈতিক অস্তিত্বের বলিষ্ঠতা জাহির করা হচ্ছে। এ আমাদের বড় দুর্ভাগ্য। কিন্তু তুমি দেশের এই দুর্ভাগ্যকে প্রতিষ্ঠিত কর নি। আনন্দমঠে হিন্দুর জয় হল বটে, কিন্তু দেশে হিন্দু রাজ্যের প্রতিষ্ঠা তুমি দিলে না। সন্তাগণের দেশাত্মবোধ জাগরণ বলতে তুমি অজ্ঞানে আত্মদান বা জীবনবিসর্জনের মধ্যেই থেমে থাক নি। দেশভক্তিতে সন্তানগণের জীবনসর্বস্ব পণের সঙ্গে ভক্তিকে যোগ করেছো তোমার দেশভক্তির কথায় সেই ভক্তিবাদের চিত্র তুমি তোমার আনন্দমঠ উপন্যাসে চিত্রিত করেছো। সত্যানন্দের মুখ দিয়ে দেশপ্রিয় সন্তানকে বলিয়েছো—‘জীবন তুচ্ছ সকলেই ত্যাগ করিতে পারে চায় ভক্তি।” সন্তানগণের দেশাত্মবোধ জাগরণে সেই ভক্তিযোগের কথাই তো তুমি বলেছো বঙ্কিমসন্তানগণের মধ্যে ভক্তিযোগ জাগরণের কারণেই দেশমাতৃকাকে তুমি দেবত্বে আরোপিত করেছেো একথা আর বলার অপেক্ষা থাকে না। ভারতভাবনার এই আদর্শবোধে তুমি বর্তমান ভারতবর্ষ থেকেও কয়েকশো বছর প্রাগ্রসর হয়ে রয়েছো হিন্দু সন্তান সম্প্রদায়ের আচরণে হিন্দুত্ব ছিল না, তারা তখনও জ্ঞানবান ও গুণবান হয়ে ওঠে নি তাই সন্তান সম্প্রদায় জয়ী হলেও তাদের হাতে দেশ শাসনের অধিকার তুমি ছেড়ে দাও নিধন্য তোমার দেশ ভাবনা। আজকের ভারতভাবুকেরা তোমার ভাবনায় ভাবিত হলো কৈ!—আমাদের এই আক্ষেপ নিবেদনেই বলি, তুমি তাদের করুণা করে উপেক্ষা করো না বঙ্কিম, তুমি তাদের আশীর্বাদ কর। বল—হে জ্ঞানবান ভারতীয় রাজনীতিবিদ তোমাদের হৃদয়ে ভক্তি জাগ্রত হোক, তোমারা চৈতন্যপ্রাপ্ত হও। তোমার অনুশীলনের পথে আহ্বান করে তুমি তাদের দেশপ্রেমের দীক্ষা দাও। তুমি যেমন ভেবেছিলে প্রশিক্ষণহীন সন্তান-সম্প্রদায়কে দেশাত্মবোধে জাগ্রত হলেও তাদের অনুশীলনের দ্বারা মার্জিত ও বিশুদ্ধ করতে হবে, শিক্ষক হিসেবে ভবানী পাঠকের মতো মহানকে শিক্ষককে উপস্থিত করেছিলে—তেমনি করে কোনো এক শিক্ষকের সামনে আজকের নেতাদের দাঁড় করিয়ে দাও। তুমি বল—দল বড় নয়, দেশ বড়। দেশের জন্য বলিপ্রদত্ত হও দল সহজেই তোমার আপন হবে।

   মনে পড়ছে বঙ্কিম, ভারতবর্ষের অতীত ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেশের উপযুক্ত নেতার উদাহরণ হিসেবে তুমি মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণকে উপস্থিত করেছো। বলেছো—

শ্রীকৃষ্ণ অদ্বিতীয় রাজনীতিবিদ—সাম্রাজ্যের গঠন বিশ্লেষণে বিধাতৃতুল্য কৃতকার্য—সেইজন্য ঈশ্বরাবতার বলিয়া কথিত। ... যে অবধি ইনি মহাভারতে দেখা দিলেন, সেই অবধি এই মহেতিহাসের মূল গ্রন্থিরজ্জু ইঁহার হাতে—প্রকাশ্যে কেবল পরামর্শদাতা—কৌশলে সর্বকর্তা। ইঁহার মর্ম কেহ বুঝিতে পারে না, কেহ অন্ত পায় না, সে অনন্ত চক্রে কেহ প্রবেশ করিতে পারে না। ... কেবল পাণ্ডবগণকে একেশ্বর করাও তাঁর অভীষ্ট নহে। ভারতবর্ষের ঐক্য তাঁহার উদ্দেশ্য।

 

     ‘কৃষ্ণচরিত্র’ গ্রন্থে আবৃতভাবে এবং ‘ধর্ম্মতত্ত্ব’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে দেশপ্রীতির কথা তুমি বলেছআদর্শ মনুষ্যত্বের স্থাপনকর্তা হিসাবে শ্রীকৃষ্ণ দেশপ্রীতির শ্রেয়রূপে প্রবর্তক। তুমি বার বার বলেছো, নির্গুণ ঈশ্বর নিয়ে ধর্ম হয় না। গুণময় ঈশ্বরকে চায় ধর্মের জন্য এবং তিনি অশরীরী থাকলে সেই ধর্মসত্য মানবগোচর হবেও না, তাই ইশ্বরের অবতার। ঈশ্বর অবতীর্ণ হন পূর্ণ মনুষ্যত্বের আদর্শ স্থাপনের জন্য। আর পূর্ণ মনুষ্যত্বই হল ধর্ম। কিভাবে পূর্ণ মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটবে ধর্ম্মতত্ত্ব গ্রন্থে তার পথনির্দেশও করেছো তুমিমানুষের বিভিন্ন বৃত্তিকে—শারীরিকী, জ্ঞানার্জনী, কার্যকারিণী এবং চিত্তরঞ্জিনী এই চারভাগে বিভক্ত করেছো দেখিয়েছো তুমিমানবজীবনে এই বৃত্তিগুলির সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশেই পূর্ণ মনুষ্যত্ব। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বিচার করে তুমি দেখাতে চেয়েছো—বুদ্ধ নন, খ্রিস্ট নন, শ্রীচৈতন্যদেবও নন, একমাত্র কৃষ্ণের মধ্যেই বৃত্তিগুলির সর্বাঙ্গীন সামঞ্জস্যময় বিকাশ ঘটেছিল। এই বৃত্তিসমূহের সামঞ্জস্য বিধানের পদ্ধতির নাম দিয়েছো তুমি ‘অনুশীলন ধর্ম’, এবং বলেছো এই অনুশীলন ধর্ম’ গীতানির্ভর।  এক্ষেত্রে তুমি অন্যধর্মের তুলনায় হিন্দুধর্ম এবং হিন্দুধর্মের অন্যান্য ধর্মাচার্যদের তুলনায় শ্রীকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠত্বের কথা জানিয়ে বলেছো—

মনুষ্যের সকল বৃত্তিগুলির সম্পূর্ণ স্ফূর্তি ও সামঞ্জস্যে মনুষত্বযাঁহাতে সে সকলের চরম স্ফূর্তি ও সামঞ্জস্য পাইয়াছে, তিনিই আদর্শ মনুষ্যখ্রীস্টে তাহা নাই—শ্রীকৃষ্ণে তাহা আছে। যিশুকে যদি রোমক সম্রাট য়িহুদার শাসনকর্তৃত্বে নিযুক্ত করিতেন, তবে কি তিনি সুশাসন করিতে পারিতেন? তাহা পারিতেন না। যদি য়িহুদীরা রোমকের অত্যাচারপীড়িত হইয়া, স্বাধীনতার জন্য উত্থিত হইয়া, যীশুকে সেনাপতিত্বে বরণ করিত, যীশু কী করিতেন? যুদ্ধে তাঁহার শক্তিও ছিল না, প্রবৃত্তিও ছিল না। ... কৃষ্ণও যুদ্ধে প্রবৃত্তিশূন্য, কিন্তু ধর্ম্মার্থ যুদ্ধ হইলে অগত্যা প্রবৃত্ত হইতেন। যীশু অশিক্ষিত, কৃষ্ণ সর্বশাস্ত্রবিৎ। আদর্শ মনুষ্য সকল শ্রেণীরই আদর্শ হওয়া উচিতএইজন্য শ্রীকৃষ্ণের শাক্যসিংহ যীশু বা চৈতন্যের ন্যায় সন্ন্যাস গ্রহণ-পূর্বক ধর্মপ্রচার ব্যবসায় স্বরূপ অবলম্বন করা অসম্ভব। কৃষ্ণ সংসারী গৃহী, রাজনীতিজ্ঞ, যোদ্ধা, দণ্ডপ্রণেতা, তপস্বী, ধর্মপ্রচারক, সংসারী ও গৃহীদিগের, রাজাদিগের, যোদ্ধাদিগের, রাজপুরুষদিগের, তপস্বীদিগের, ধর্মবেত্তাদিগের এবং একাধারে সর্বাঙ্গীন মনুষ্যত্বের আদর্শ

 

     দেখেছি আনন্দমঠে সরাসরি কৃষ্ণ নেই। তবে সুদর্শনধারী চতুর্ভুজ বিষ্ণু আছেন, ‘হরে মুরারে গান’ আছে, এবং সেই বিষ্ণুকোলে স্থাপিতা দেশমাতৃকা। আর আছেন সন্ন্যাসী সম্প্রদায়, লোকহিত যাঁদের ব্রত, যাঁরা কৃষ্ণের অস্পষ্ট ছায়াবাহী সত্যানন্দের প্রেরণায় নব কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ বাধিয়েছেন। সত্যানন্দ খাঁটি কৃষ্ণ নন বলে পরাভূত হয়েছেন। আর সন্তানদলের মধ্যে অনুশীলন ধর্মের উপলব্ধির অভাব হেতু জয়োল্লাসে তাঁরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছেন। সীতারামের পরাজয়ও সেই একই কারণেই। আর দেবী চৌধুরাণীতে অনুশীলন ধর্ম দক্ষ প্রফুল্ল হয়ে উঠেছেন ‘নারী কৃষ্ণ’। দেশ ও মানবজাতির মঙ্গলের কথায় তুমি এক সময় বলেছিলে, “সকল ধর্মের উপর স্বদেশপ্রীতি” এবং “পরিবারই প্রথম প্রীতির শিক্ষার স্থল”। জাতির উদ্দেশ্যে যেদিন এই কথা তুমি বলেছিলে সেদিনই তুমি কালের সীমা অতিক্রম করে জাতি ও জাতির জাতীয় জীবনে সর্বকালের হয়ে উঠেছো তোমার নিজেরই অগোচরে তা আজও আমরা অনুভব করছি। রাষ্ট্র-গঠনের আগে পরিবার গঠনের দরকার। রাষ্ট্র পরিবারের সমষ্টি, আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের আগে আদর্শ পরিবার গঠন প্রয়োজন। আনন্দমঠ লেখার পর রাষ্ট্রের সঙ্গে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্মরণ করে তুমি দেবী চৌধুরাণী রচনা করেছো‘দেবী চৌধুরাণী’ এবং ‘সীতারাম’ উপন্যাসের মূল বিষয় চরিত্র গঠন। চরিত্র গঠনে বীরত্বের সঙ্গে পূর্ণ মনুষ্যত্বের অনুশীলনের কথা বলেছো তুমি। এমন এক চিরন্তন সমাজবাস্তবতা নিয়েই তোমার প্রফুল্ল গৃহাঙ্গনা হয়েও বীরাঙ্গনা হয়ে উঠেছে।

   বঙ্গীয় পরিবার জীবন, সমাজ জীবন এবং ভারতের জাতীয় জীবনে তোমার সাহিত্য যেমন আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, ‘দুর্গেশনন্দিনী’ থেকে শুরু করে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ ও ‘বিষবৃক্ষ’ পর্যন্ত উপন্যাসগুলিতে বঙ্গীয় মধ্যবিত্ত সমাজ যেমন তার আত্মদর্শনের সুযোগ পায়, সাহিত্যতত্ত্ব আলোচনায় ও ইতিহাস পর্যালোচনায় বাংলার সারস্বত সমাজের কাছে তুমি যেমন  আজও ঐতিহ্য অনুসরণের আদর্শ, কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলনের উৎস অনুসরণের ইতিহাস নিহিত তোমারই রচনায়।; তেমনি জাতীয় জীবনে তোমার অবদান আরও ব্যাপক ও বৃহৎ। জাতীয় সংহতি সাধন ও দেশগঠনের পথে আজও তুমি আমাদের পথ প্রদর্শক। এখানে তোমার ভূমিকা যেন মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ অনুসরণমহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ যেমন অর্জুনের রথের সারথী হয়ে অর্জুনকে দেশের কাজে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছিলেন, তাঁকে উদ্বোধিত করতে এক বিশেষ দর্শনের উপস্থাপন করেছিলেন তুমিও তেমনি দেশের দেশপ্রেমিকদের তোমার সাহিত্য রথে চড়িয়ে জাতীয়তার যুদ্ধে প্রবৃত্ত করতে চেয়েছিলে বলেই মনে করি তোমার ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র আজও আমাদের জাতীয় সংহতি সাধনের শঙ্খনাদ একথা একজন ভারতবাসী হিসেবে সগৌরবে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করতে আনন্দ অনুভব করি।  শুধু তাই নয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পরাধীনতার মাটিতে দাঁড়িয়েও তুমি যে নূতন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলে, একবিংশ শতাব্দীর স্বাধীন ভারতবর্ষ কি তোমাকে তোমার স্বপ্নের সেই ভারতবর্ষ উপহার দিতে পেরেছেন—আজ আমাদের এমন কথা ভাববারও অবকাশ রয়েছে। তোমাকে জাতীয়তার সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার না করে তোমার আদর্শপথ অনুসরণে আমাদের আশীর্বাদ কর তুমি। আশীর্বাদ কর ভারতবর্ষের বুকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর যেন সেই কৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। শঙ্খধ্বনি দিয়ে আমরা তাঁকে আহ্বান জানাব, বরণ করে নেব। ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রে তোমাকে পুনরায় প্রণাম জানিয়ে আজকের চিঠি এখানেই শেষ করলাম।

 

 

দেবাশিস মুখোপাধ্যায়

হাটজনবাজার, সিউড়ি, বীরভূম—৭৩১১০২।

Debashismukherjee67@gmail.com

9233124718.