লাভপুর জনপদের ভৌগোলিক রূপরেখা
জরিপ
মানচিত্র অঙ্কিত হওয়ার পূর্ববর্তীকালে লাভপুরের অনুমান নির্ভর একটি ভৌগোলিক
রেখাচিত্রের কথা আমরা ভাবতে পারি। আমরা জানি, প্রাচীনকালে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল জলপথ। নদীবিধৌত সমভূমি জুড়ে গড়ে উঠত মানবসভ্যতা। লাভপুর ভূখণ্ড তেমনই এক সমভূমি। এই ভূখণ্ডের দুপাশে দুই নদী—কোপাই ও ময়ূরাক্ষী সেই ইতি হাসের সাক্ষ্য বহন করছে। কালাতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি ক্ষয়ের কারণে নদীর নাব্যতাশক্তি এখন হ্রাস পেয়েছে সত্য কিন্তু এককালে এই দুই নদীই ছিল মানব-সভ্যতার সঙ্গে এই এলাকার মানুষের যোগসূত্রের প্রবেশ-দ্বার। এই চিত্র ময়ূরাক্ষী ও কোপাই —এই দুই নদীর মধ্যবর্তী এক ভৌগোলিক চিত্র; যা এক সময় ‘মণ্ডল ভুক্তি’র অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বর্তমান লাভপুর ছিল সেই মণ্ডলের প্রবেশ দ্বার বা ‘দ্বারমণ্ডল’। কয়েকটি ‘গ্রাম’ নিয়ে ছিল একটি ‘বীথি’ এবং কয়েকটি ‘বীথি’
নিয়ে ছিল একটি ‘মণ্ডল’। বাংলায় শাসন-বিভাগীয় এই স্তর বিভাজন গুপ্ত আমল থেকে শুরু
হয় এবং সেন শাসনের আমলেও তার অস্তিত্ত্ব ছিল। পরবর্তীকালে আর
দিকে সীমায়িত করেছে আগয়া নদী।
প্রাচীন লাভপুরের ভৌগোলিক মানচিত্র সঠিকভাবে
জানার কোন সুযোগ আজ অমাদের হাতে নেই; কিন্তু অনুমান নির্ভর করে যে মানচিত্রকে আমরা
অবলম্বন করতে চেয়েছি তা একদিকে যেমন লাভপুর গ্রাম তেমনি একই সঙ্গে বর্তমানে লাভপুর
থানার মানচিত্রসহ তৎসংলগ্ন কিছু অংশ অবলম্বনে আমরা এই পথে অগ্রসর হতে চেয়েছি। এই চিত্র
ময়ূরাক্ষী, কোপাই ও আগয়া—এই তিন নদীর মধ্যবর্তী এক ভৌগোলিক চিত্র।
‘গ্রাম’ ‘বীথি’ এবং ‘মণ্ডল’ বাংলায় শাসন-বি ভাগীয় এই স্তর বিভাজন গুপ্ত আমল থেকে শুরু হয় এবং সেন শাসনামলেও তার অস্তিত্ত্ব ছিল। সেন শাসনামলে বীরভূম রাঢ়বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। অনুমান যে এই
এলাকা এক সময় বন্দ্য বা বন্দ্যঘটী গ্রামন নামে পরিচিত ছিল। পাল ও বর্মন রাজত্বে লাভপুরের অস্তিত্ব ছিল মূলত অট্টহাস কেন্দ্রিক। বর্মন রাজত্বে এই এলাকা সামলাবাদ নামে পরিচিত ছিল। সামলাবাদের রাজধানী ছিল বর্তমান ওপার বাংলার বি ক্রমপুর। সামলাবাদ নামের অস্তি ত্ব সম্ভবত চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত। তার অনেক পরে, শেরশাহের আমলে তথা ১৫৮২ খ্রি স্টাব্দে রাজা টোডর মল্ল বাঙলাদেশকে ১৯টি সরকার এবং ৬৮২ টি পরগণায় বি ভক্ত করেন। সেই সময় বীরভূমের অধি কাংশ অংশ ‘মাদারুণ সরকার’র অধীন ছিল। বাকি বীরভূমের দক্ষিণ পূর্বাংশ ও বর্ধমান ছিল ‘সরি ফাবাদ’ সরকারের অধীন। লাভপুর সরিফাবাদ সরকারের অধীন ছিল বলেই মনে করি ।
সপ্তদশ শতাব্দীতে
সাধক কৃষ্ণানন্দ গিরির সাধনায় সিদ্ধি লাভের সময় থেকেই সম্ভবত এই জনপদ ‘লাভপুর’ নামে পরিচিত হয়ে থাকবে। তখন এই অঞ্চল জঙ্গলপূর্ণ ছিল বলেই জানা যায়। ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে RICHARD SMITH অঙ্কিত একটি মানচিত্র আমরা দেখেছি ।
সেখানে বীরভূম The Jungle Terry District হিসাবে পরিচিত। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা টোডরমল্ল সরকার ও পরগণা বি ভাগের সংস্কার করেন। ১৭২২ খ্রি স্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ রাজস্ব আদায়ের সুবি দার্থে বাঙলাকে তেরোটি চাকলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এর একশো বছর পর লাভপুর তালুক বা থানার মানচিত্র ধরে একটি মৌজার কথা আমরা প্রথম জানতে পারি। সেই চিত্র সি . এস. মানচিত্র। ইংরেজি ১৯৫৪ সালে অঙ্কি ত সরকারীভাবে সি . এস. মানচিত্র আমরা দেখেছি ; সেখানে বড় বড় বাংলা হরফে লেখা রয়েছে—লাভপুর থানা, মৌজার প্রকাশ্য নাম-রাজারামপুর মৌজা। এই মানচি ত্রের বহির্ভূত চারদিকে রয়েছে সুঁদীপুর, ফরিদপুর, বাবনা, ধোয়াডাঙা, কুসুমডিহি, কৃষ্ণপুর, উধা-প্রভৃতি জনপদগুলি ।
সম্ভবতঃ রাজারামপুর মৌজার নাম অনুসারেই গুগুল মানচিত্রে আমোদপুর কীর্ণাহারগামী সড়কটিকে বলা হয়েছে-রামজীবনপুর রোড। বর্তমান যে লাভপুর, তার ভৌগোলিক মানচিত্রটিতে দেখতে পাই-পূর্বে অট্টহাস থেকে পশ্চিমে ষষ্টীনগর, উত্তরে ছোটগোগা মহুগ্রামের শেষাংশ থেকে দক্ষিণে লাভপুর শম্ভুনাথ কলেজ ও তারামায়ের ডাঙা জুড়ে এর অবস্থান। এখানে লাভপুর মূলম মৌজার সঙ্গে ছোটো গোগা, মহুগ্রাম, চৌহাট্টা ও মহিস্থলী মৌজা মিলে-মিশে লাভপুরের পরিচিত ভূগোল তৈরি হয়েছে।বা বিভাগে ভাগ করেন। তারমধ্যে বীরভূম ছিল—মুর্শিদাবাদ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। তখন দেওঘর, সাঁওতাল পরগণার অধিকাংশ এবং বিষ্ণুপুর জমিদারী (বাঁকুড়া), বীরভূম জমিদারীর অধীন ছিল। তৎকালে বিষ্ণুপুর জমিদারী বাদ দিলেও, বীরভূমের আয়তন ছিল ৩৮৫৮ বর্গমাইল। ১৭৮৭ খ্রি স্টাব্দে বাঙলার প্রদেশ আবার নতুনভাবে-গঠিত হয়। তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিস-মুর্শি দাবাদকে বিচ্ছিন্ন করে বাঁকুড়া ও বীরভূমকে এক করে রাখেন। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে ‘বোর্ড অব রেভেনিউ’র আদেশ মতো বীরভূম থেকে বাঁকুড়া ও বিষ্ণুপুরের জমিদারি বর্ধমান বিভাগে নিয়ে আসেন। ১৮৪৯-৫২ খ্রিস্টাব্দে ডেপুটি সার্ভেয়ার জেনারেল ক্যাপটেন শের উইন বীরভূম জেলা জরিপ করে একটি মানচিত্র অঙ্কিত করেন। তখন বীরভূম ৩৮ টি পরগণায় বিভক্ত ছিল। তারমধ্যে লাভপুর সম্ভবত ‘আকবরসাহী’ পরগণার অধীন ছিল। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতাল পরগণাকে বীরভূম